চিঠির গল্প ( পাঠ ৪ )

পলাশ
পলাশ
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
অনিয়ার জীবন যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। পলাশের স্মৃতি যতই ধূসর হয়ে আসছে, ততই সে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। কিন্তু কখনও কখনও, রাতে নিস্তব্ধ ঘরের কোণ থেকে পুরনো স্মৃতিগুলো জেগে ওঠে। আজকের রাতটাও তেমনই এক রাত।

অনিয়া বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। মস্তিষ্কে অস্থির চিন্তাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। পলাশকে নিয়ে হাজারো প্রশ্নের জট ছাড়াতে গিয়ে নিজের মনকে আরও ক্লান্ত করছে সে।

অনেক কষ্টে ঘুম আসে তার। স্বপ্নে সে একটি লম্বা রাস্তায় হাঁটছে, রাস্তাটা একদম সোজা—শেষ কোথায় তা দেখা যাচ্ছে না। পথের দুই পাশে বড় বড় গাছের সারি। একটা অদ্ভুত শান্তি আছে এই রাস্তায়, যদিও পথটা একা পাড়ি দিতে হচ্ছে।

হঠাৎ, এক পাশে একটা বেঞ্চে বসে থাকা ছায়ামূর্তি চোখে পড়ে তার। মূর্তিটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, এবং অবশেষে সে বুঝতে পারে, এটা পলাশ।

অনিয়া কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পলাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়, এই পথটাও পলাশের মতো—দীর্ঘ, একা, এবং অদৃশ্য। কিন্তু তারপর সে বুঝতে পারে, এই রাস্তাটা তার নিজের জন্য। তাকে একাই যেতে হবে।

পলাশ তাকে দেখে একটু হাসে। সেই পুরনো হাসি, যা একসময় অনিয়ার হৃদয়কে উজ্জ্বল করে দিত। কিন্তু আজকের এই হাসি যেন অন্যরকম।

পলাশ অনিয়ার দিকে হাত বাড়ায়, কিন্তু অনিয়া পেছনে সরে আসে। পলাশকে ছেড়ে যেতে হবে, এবং এই সিদ্ধান্তটা একমাত্র তারই।

"তুমি তোমার পথে, আমি আমার," বলে অনিয়া। পলাশ কিছু বলে না, শুধু তার হাতটা নামিয়ে রাখে। অনিয়া ফিরে যায় তার পথের দিকে, যেখানে আলো অপেক্ষা করছে।

অনিয়া ঘুম ভেঙে দেখে ভোরের আলো ফিকে হয়ে এসেছে। স্বপ্নের সেই রাস্তা, সেই মুহূর্তগুলো মনে করলেই সে বুঝতে পারে, সত্যি সত্যি সে এগিয়ে যাচ্ছে।

এতদিনের অস্থিরতা, এতদিনের দ্বিধা, সবকিছুই যেন একটু একটু করে কমে আসছে। অনিয়া জানে, পলাশের স্মৃতি তার জীবনের একটা অংশ হয়েই থাকবে, কিন্তু সে আর সেই স্মৃতির মধ্যে আটকে থাকতে চায় না।

অনিয়া উঠে পড়ে, নতুন দিনের জন্য তৈরি হয়। আজকের দিনটা শুরু হবে তার জন্য, একেবারে নতুনভাবে।

তার হৃদয়ে আজ নতুন শক্তি, নতুন সাহস। হয়তো তার সামনে নতুন কিছু অপেক্ষা করছে। সে সেই আশাটুকু নিয়েই এগিয়ে যাবে, নিজের পথে।

অনিয়া নতুন দিনের সূর্যোদয়ের সাথে নতুন শক্তি অনুভব করে। অফিসের কাজগুলো আগের মতোই ব্যস্ত কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা স্থিতিশীলতা এসেছে।

আজ বিকেলে অনিয়া শহরের একটি বইমেলার জন্য যাচ্ছে। বই পড়া তার প্রিয়, এবং এই মেলার খোঁজ পাওয়া তার কাছে একটি ছোট উপহার। তার মনে হয়, এই বইমেলা তার জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার সঠিক সময়।

বইমেলার অস্থায়ী স্টলগুলোর মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে সে এক স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে। স্টলটির সামনের অংশে নানা ধরনের বই সাজানো। একটি বইয়ের কভারে আঁকা ছবি তার নজর কাড়ে। বইটির নাম "নতুন সূর্যের দিকে"।

অনিয়া বইটি হাতে তুলে নিয়ে পৃষ্ঠাগুলি উল্টাতে থাকে। বইটির লেখক একজন অখ্যাত কবি, যার কবিতাগুলোর মধ্যে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার আশা করছে সে।

হঠাৎ, একটি পরিচিত কণ্ঠ তার কানে আসে। "অনিয়া, তুমি?"

অনিয়া ঘুরে দেখে, পলাশের বন্ধু রিফাত দাঁড়িয়ে। রিফাতের মুখে এক অদ্ভুত মৃদু হাসি।

"হ্যাঁ, আমি," অনিয়া হাসি দিয়ে বলে। "এখন তোমাদের কি খবর?"

রিফাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, "পলাশ এখন তার নতুন জীবন নিয়ে খুব ব্যস্ত। সে আমাকে বলেছিল যে, সে খুব ভালো লাগছে।"

অনিয়া একটু থমকে যায়, কিন্তু রিফাতের কথা শুনে তাকে আশ্চর্য হতে হয় না। পলাশের নতুন জীবন সম্পর্কে শোনার পর তার মনে কোনো ঈর্ষা বা ক্ষোভ নেই। বরং, সে বুঝতে পারে যে পলাশের পথে হাঁটা তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।

বইমেলার সুকৌশল পরিবেশে অনিয়া অনুভব করে যে, তার নিজের পথের সন্ধান পাওয়া, নতুন কিছু শুরু করা—এইসবই তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের অংশ।

রিফাতের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর, অনিয়া তার দিকে সাদর অভিবাদন জানায়। তারপর স্টলটি ছেড়ে চলে আসে। হাতে বইটি, আর মনে নতুন আশা।

বইমেলার স্টলগুলোর মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে অনিয়া খুঁজে পায় একটি কবিতার বই। এই বইটি তার মনের অভ্যন্তরীণ শান্তি এনে দেয়। সে জানে, লেখকের কবিতাগুলোর মতো তার জীবনও একদিন সুন্দরভাবে ফুলে উঠবে।

বইটি হাতে নিয়ে অনিয়া ফিরে আসে। সন্ধ্যার আকাশে সূর্য ডুবে যায়, কিন্তু অনিয়ার হৃদয়ে একটি নতুন আলো জ্বলে ওঠে। তার জীবন, পলাশ, স্মৃতি—সবকিছুর মাঝেই এখন নতুন সম্ভাবনা ও নতুন পথে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পায় সে।

এই রাতেই অনিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, তার ভবিষ্যৎ আলোড়িত হবে। সে যে পথে চলছে, সেই পথই তার জন্য সঠিক।

( চলবে...)
160 Views
2 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: