পর্ব ১: শুরুর দিনগুলি
শীতের সকাল। গ্রামের ছোট্ট ঘরটি মাটির দেয়াল আর টিনের চালা দিয়ে তৈরি। ভেতরে খুব বেশি কিছু নেই, শুধু একটি খাট, কিছু পাত্র, আর এককোণে মায়ের পুরোনো সেলাই মেশিন। ঘরের দরজা দিয়ে কুয়াশা ঢুকছিল, আর মায়ের কাঁপা হাতে এক টুকরো ময়লা চাদর দিয়ে সাইমুনকে ঢেকে রাখছিলেন। সাইমুন তখন একেবারেই ছোট, মাত্র ছয় বছর। বাবা দু'বছর আগে মারা গেছে দুর্ঘটনায়। সেই থেকে মা সেলাইয়ের কাজ করে কোনো মতে সংসার চালাচ্ছেন।
সাইমুন খুব ভালো ছাত্র ছিল। যদিও পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল, তবুও তার মায়ের ইচ্ছা ছিল যে ছেলে বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হবে। প্রতিদিন সকালে মায়ের হাতে বানানো এক টুকরো রুটি নিয়ে সে স্কুলে যেত। গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা সাইমুনকে খুব পছন্দ করতেন, কারণ তার পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রচণ্ড।
কিন্তু অভাব যেন এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। মাঝে মাঝে খাবারের টান পড়ত, আর মায়ের অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করতে কষ্ট হতো। তবুও মা কখনো সাইমুনকে কিছু বুঝতে দিতেন না। সবসময় হাসিমুখে বলতেন, "তুই বড় হবি, তুই আমার সব স্বপ্ন পূরণ করবি।"
পর্ব ২: সংগ্রামের শুরু
সাইমুন যখন ক্লাস সেভেনে উঠল, তখন তার মায়ের শরীর দিন দিন খারাপ হতে শুরু করল। সেলাইয়ের কাজ করতে করতে মা একদিন প্রচণ্ড জ্বর আর দুর্বলতায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গ্রামের ছোট্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তার জানায়, তার মায়ের শরীরে রক্তাল্পতা আছে, যা চিকিৎসা না করলে আরও গুরুতর হয়ে উঠবে। কিন্তু তাদের এত টাকা নেই যে ঠিক মতো চিকিৎসা করাতে পারবে।
সাইমুনকে মায়ের কথাগুলো কষ্ট দিচ্ছিল। সে জানত, তার মা সবকিছু নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে, শুধু তার জন্য। মা চাইতেন না সাইমুন কিছু বুঝতে পারুক, কিন্তু সাইমুন মা’র কষ্টগুলো অনুভব করছিল। সেই থেকে সাইমুন স্কুলের পাশাপাশি মানুষের বাসায় টিউশনি শুরু করে। স্কুল শেষ করে বিকেলে ছুটে যেত এক বাসা থেকে আরেক বাসায়। মায়ের ওষুধ, খাওয়া, সবকিছু তার ওপর এসে পড়ে।
পর্ব ৩: স্বপ্নের পথচলা
বছরখানেকের মধ্যেই সাইমুনের মায়ের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। কিন্তু মায়ের চোখে ছিল একটাই আশা—সাইমুন পড়াশোনা শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্লাস টেনে উঠার পর সাইমুনের ফলাফল আরও ভালো হতে লাগল। কিন্তু তার নিজের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থাও ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছিল, কারণ তার ওপর কাজের চাপ ছিল খুব বেশি। সে দিনে চারটা টিউশনি করত, আর রাতে বসে মায়ের ওষুধের ব্যবস্থা করত। কিন্তু সাইমুন কখনও মা’র সামনে নিজের কষ্টের কথা বলেনি।
মা প্রতিদিন বিছানায় শুয়ে থাকতেন, আর সাইমুনের প্রতিটি পদক্ষেপ তার চোখের সামনে দিয়ে যেতে দেখতেন। সাইমুনের ভালো রেজাল্ট মাকে একটুখানি হলেও স্বস্তি দিত। কিন্তু মায়ের শরীর দিনকে দিন দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
পর্ব ৪: মায়ের শেষ ইচ্ছা
একদিন মা হঠাৎ করে সাইমুনকে ডেকে বলেন, "সাইমুন, তুই ভালো ছেলে। তুই খুব কষ্ট করছিস। কিন্তু জানিস, আমি বোধহয় তোর সাফল্যের দিনগুলো আর দেখে যেতে পারব না।"
মায়ের কথা শুনে সাইমুন হতভম্ব হয়ে যায়। সে মায়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, "এমন কথা বলো না, মা। তুমি আমার সবকিছু, তুমি না থাকলে আমি কী করব?"
মা মৃদু হেসে বলেন, "আমি জানি, তুই অনেক বড় হবি। তুই মানুষের মতো মানুষ হবি, আমার কষ্টের কোনো দাম থাকবে না।"
সাইমুন মাকে চুপ করাতে চায়, কিন্তু সে বুঝতে পারে, মায়ের শরীর আর বেশিদিন তাকে সঙ্গ দেবে না। মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা আর দায়িত্বের ভার তাকে আরও বেশি শক্ত করে তোলে।
পর্ব ৫: নিঃশেষ আশ্রয়
সাইমুন যখন মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে, তখন সে আরও বেশি আনন্দিত হয়। কিন্তু সেই আনন্দ খুব বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। তার মায়ের শারীরিক অবস্থা তখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন। মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় টাকার অভাবে সাইমুন একদিন হঠাৎ ভেঙে পড়ে। মা যেন মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিলেন, আর সাইমুনের অসহায়তা তাকে ক্রমাগত দুঃখী করে তুলছিল।
এক সন্ধ্যায়, যখন সাইমুন মায়ের শিয়রে বসে ছিল, তখন মা তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলেন, "আমি চলে যাচ্ছি, সাইমুন। তুই কখনও হাল ছাড়িস না। তুই তোর স্বপ্ন পূরণ করবি, আমি সবসময় তোর সঙ্গে থাকব।"
মায়ের সেই শেষ কথাগুলো যেন সাইমুনের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কয়েকদিন পরই তার মা মৃত্যুবরণ করেন। সাইমুনের পৃথিবী যেন অন্ধকারে ঢেকে যায়। তার চোখের সামনে শুধু সেই দিনের মায়ের হাসিমুখ ভেসে ওঠে, আর মায়ের শেষ কথাগুলো তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দেয় না।
পর্ব ৬: একা পথ চলা
মায়ের মৃত্যুর পর সাইমুন আরও একা হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, এখন তার পাশে কেউ নেই, যে তাকে আগলে রাখবে। কিন্তু মায়ের দেওয়া প্রতিজ্ঞা তাকে চালিত করে। সে কলেজে ভর্তি হয়, পড়াশোনা করে নিজেকে গড়ে তুলতে থাকে। যত কষ্টই হোক, সে মায়ের সেই কথাগুলো ভুলতে পারে না—"তুই হাল ছাড়িস না।"
সাইমুন প্রতিদিন কাজ করে, পড়াশোনা করে, আর মায়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে। তার চোখে জল আসে, কিন্তু সে শক্ত থাকে। কারণ সে জানে, তার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
---
শেষ: সাফল্য এবং স্মৃতির ভার
বছর কয়েক পরে, সাইমুন তার শিক্ষাজীবন শেষ করে একজন সফল মানুষ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সাফল্যের দিনগুলোতে তার পাশে মা নেই, যিনি সবসময় তাকে দেখে হাসিমুখে বলতেন, "তুই পারবি।" সাইমুনের জীবনের সব কিছু ছিল, কিন্তু মায়ের অনুপস্থিতি তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা হয়ে থেকে যায়।
যখন সে জীবনের সফলতার চূড়ায় পৌঁছায়, তখনো সে একা বসে মায়ের কথা মনে করে। তার মায়ের জন্য চোখে জল আসে, কারণ তার সমস্ত অর্জন, তার সমস্ত সফলতা—সবকিছু তার মায়ের দেওয়া ত্যাগ আর ভালোবাসার ফল।
মা তোর কাছে আমি ঋণী
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
112
Views
0
Likes
0
Comments
5.0
Rating