অনিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাঁচে পড়ে টুপটাপ শব্দ তুলছে। চারপাশের সবকিছু ধোঁয়াশা হয়ে গেছে, ঠিক যেমন তার জীবন। চিঠির সেই কবিতার প্রতিটি শব্দ এখনো তার মনের ভেতরে প্রতিধ্বনি তুলছে।
"তুমি আছো, ছিলে, থাকবে—আমার হৃদয়ের গভীরে।"
এতটা ভালোবাসার পরও কেন পলাশ তাকে ছেড়ে চলে গেল? অনিয়া ভেবে পায় না। সে কি সত্যিই ভুল করেছে? নাকি পলাশ নিজেই তার জীবন থেকে সরে যেতে চেয়েছিল?
অনিয়া নিজের ভেতরে একটা তীব্র ক্ষোভ অনুভব করে। এতদিন ধরে এই ভালোবাসার বোঝা সে একা বয়ে বেড়াচ্ছে। পলাশ কি কখনো তার ব্যথা বুঝেছে? নাকি সে কেবল নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত ছিল?
অনিয়া হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়। আর নয়। সে আর পলাশের অপেক্ষায় নিজেকে কষ্ট দেবে না। জীবন থেমে থাকে না, চলতে থাকে। অনিয়াও তার জীবন নিয়ে এগিয়ে যাবে।
অনিয়া টেবিলের উপর খামটা রেখে দেয়। সেই চিঠিটা আর কখনোই খোলা হবে না। পলাশকে নিয়ে তার জীবনের অধ্যায় এখানেই শেষ।
তারপর, অনিয়া খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির শীতল বাতাসের স্পর্শ অনুভব করে। মনটা একটু হালকা হয়। জীবনে অনেক কিছুই ঘটে, অনেক কিছুই ভুল হয়ে যায়, কিন্তু সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় শক্তি।
অনিয়া জানালাটা বন্ধ করে দেয়, আরেকটা নতুন দিনের অপেক্ষায়।
অনিয়া জীবনের নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিদিন সকাল তার জন্য নতুন শুরু নিয়ে আসে, কিন্তু পলাশের স্মৃতি এখনও মাঝে মাঝে তাকে পিছনে টেনে ধরে।
কিন্তু আজকের দিনটা অন্য রকম। অনিয়ার অফিসের কাজগুলো একটু আগেই শেষ হয়েছে। তাই, সে চিন্তা করে একটু হাঁটাহাঁটি করবে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, যেখানে সে কিছু সময় নিজেকে খুঁজে পাবে।
একটা ছোট ক্যাফে তার নজর কাড়ে। বেশ নিরিবিলি, তেমন কোনো ভিড় নেই। অনিয়া ভিতরে ঢুকে এক কোণায় বসে। ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কী নেবেন, ম্যাডাম?”
অনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর বলে, “এক কাপ ব্ল্যাক কফি।”
কফি আসতে একটু সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে অনিয়া ভাবনার জগতে হারিয়ে যায়। তার মাথায় নানা স্মৃতি, প্রশ্ন, আর অসংখ্য অনুত্তরিত কথা ঘুরপাক খায়।
কফি আসার পর সে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে থাকে। কফির তিক্ত স্বাদ তার ভেতরের তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ঠিক এমন সময়, ক্যাফের দরজায় একটা পরিচিত মুখ দেখা যায়।
পলাশ।
হ্যাঁ, পলাশই। অনিয়ার হারানো দিনের সেই পলাশ। সে ক্যাফের ভিতরে ঢুকছে, কিন্তু একা নয়। তার পাশে একজন নারী, মুখে উজ্জ্বল হাসি। পলাশের চোখে আনন্দের ঝিলিক, তার মুখে হাসির আভা। সে কফি নিয়ে মহিলার সাথে মগ্নভাবে কথা বলছে।
অনিয়া স্থির হয়ে বসে থাকে। তার দৃষ্টি পলাশের দিকে আটকে যায়। সে দেখতে পায়, পলাশের চোখে কোনো দুঃখের ছায়া নেই, কোনো শূন্যতা নেই। যেন সে তার জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে অনিয়ার কোনো স্থান নেই।
অনিয়া নিজেকে সংবরণ করে। তার হাতে ধরা কফির কাপ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার মনের মধ্যে আগুন জ্বলছে। সে বোঝে, পলাশ চলে গেছে, এবং সে আর ফিরে আসবে না।
অনিয়া মনে মনে নিজেকে বলে, “এটাই ছিল তার পথ। আমারও আমার পথ বেছে নিতে হবে।”
সে কফির শেষ চুমুকটা দেয়, এবং চুপচাপ ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আসে। অনিয়ার হৃদয়ে একটা অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছে, কিন্তু সে জানে, এটাই তার জীবনের পরিণতি।
(চলবে...)
চিঠির গল্প ( পাঠ ২ )
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
179
Views
5
Likes
0
Comments
5.0
Rating