দুপুরে বাড়ি ফিরেই তাড়াহুড়ো করতে লাগলাম কোচিংয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।তাই দুপুরে দুটো কোনোমতে খেয়েই দৌড় লাগালাম কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য। বিকাল সাড়ে তিনটার কোচিংয়ে আজ তিনটার সময় গিয়ে উপস্থিত। আর সেই কোচিংয়ে যাওয়া থেকেই অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে বসে আছি অয়ন্তির আসার অপেক্ষায়।
এভাবে প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেলো, কোচিংয়ের ক্লাসও শুরু হয়ে গেলো কিন্তু তখনও অয়ন্তির কোনো পাত্তা নেই। এদিকে অয়ন্তিকে আমার না বলা কথাগুলো বলবো বলে সেই কবে থেকেই এই দিনটার অপেক্ষায় আছি তাও আজ তার কোনো খোঁজ নেই।
ক্লাসের সারাটা সময়ই কেটে গেলো অয়ন্তির চিন্তায় আর তার আসার অপেক্ষায়। আজ আর ক্লাসে কোনো মন নেই একটু পর পরই জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছি অয়ন্তি আসছে কিনা।
কিন্তু অয়ন্তি সেদিন আমাকে নিরাশ করে আর কোচিংয়ে এলো না। এক বুক হতাশা নিয়ে ক্লাস শেষে বাড়ির পথে রওনা হলাম। আর মনে মনে খুব রাগ হচ্ছিলো অয়ন্তির ওপর । কোচিংয়ে আসবে বলেও না আসায় ,তাকে মনের কথা বলার জন্য যত পরিকল্পনা করেছিলাম সারাদিন ধরে- তার সবটাই বৃথা হয়ে গেলো।
সন্ধ্যা হয় হয় ঠিক তখনই বাসায় গিয়ে পৌঁছালাম। বাসায় পৌঁছেই কাঁধে রাখা ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলেই ফ্যান চালিয়ে শুয়ে পড়লাম। কি করবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না তখন। শুধুই অয়ন্তির কথা মনে হচ্ছিলো। তাই চোখ বন্ধ করে কপালে হাত রেখে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে রইলাম।
একটু পরেই মা আমার রুমে এসে দেখেন লাইট বন্ধ, রুম অন্ধকার আর আমি শুয়ে আছি চুপচাপ। এটা দেখে মা রুমের লাইট অন করে আমার পাশে এসে বসলেন। বললেন-" কি রে এই ঘোর সন্ধ্যায় লাইট বন্ধ করে অন্ধকার রুমে ভূতের মতো একা একা শুয়ে আছিস কেন? মন খারাপ নাকি? কিছু কি হয়েছে নাকি আজ কোচিংয়ে পড়া পারিস নি তাই স্যার বকেছেন?"
মায়ের আওয়াজ পেয়েই আমি হকচকিয়ে উঠলাম। উঠে বললাম - " না তেমন কিছু হয়নি। এমনিই শুয়ে আছি। "
মা, আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন -" সবার চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও -মায়ের চোখ ফাঁকি দিতে পারবি না। সত্যি করে বলতো - তোর কি হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি মন খারাপ?"
এবারে মায়ের কোলে মাথা রেখে বললাম -" সত্যিই মা তেমন কিছুই হয়নি। ঐ সারাদিন ক্লাস, কোচিংয়ে দৌঁড়দৌঁড়ি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। তাই একটু মাথাব্যথা করছে। এর বেশি কিছু নয়। তুমি চিন্তা কোরো না। একটু পর এমনিই সব ঠিক হয়ে যাবে।"
এটা শোনার পর মা আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন -" এখন তুই হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়, আমি তোকে কিছু খেতে দিচ্ছি। "
মা রুম থেকে চলে যাওয়ার পর আমিও বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওদিকে মা খাবার টেবিলে বসে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছেন। তাই তড়িঘড়ি করে ছুটতে যাবো ঠিক তখনই মোবাইলের রিংটোনটা বেজে উঠলো।
ফোন তুলে দেখি এক অজানা নাম্বার। তাই কৌতুহলবশত ফোনটা তুলতেই ওপাশ থেকে এক পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসলো। কণ্ঠটা ছিল অয়ন্তির।
অয়ন্তি আমাকে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই বললাম -" আজ তুমি কোচিংয়ে আসবে বলে এলে না কেন শুনি? তুমি কি জানো তোমার সাথে আমার কত গুরুত্বপূর্ণ কথা জমে আছে। আজ সারটা কোচিংয়ে শুধু তোমারই আসার অপেক্ষা করেছি তাও তুমি আসোনি। আর আসোনি তো ভালো কথা অন্তত একবার জানাতে তো পারতে যে তুমি আজ কোচিংয়ে আসতে পারবে না।"
এতক্ষণ ধরে এতগুলো কথা বলার পরও অয়ন্তি নীরব শ্রোতার মতো সবটা শুনেই যাচ্ছিলো শুধু কিন্তু প্রত্যুত্তরে কোনো কথা বললো না। অবশেষে নীরবতা ভেঙে অয়ন্তি বললো- " দেখো আজ আমার মাসি আর মৌসাতো ভাই এসেছে। অনেকদিন পর মৌসাতো ভাই এসেছে বলে ওর আবদার রাখতেই আজ আর কোচিংয়ে যেতে পারিনি। ও বায়না করছিলো আজ সারাটা বিকেল ওর সাথেই সময় কাটাতে তাই আজ আর আমি কোচিংয়ে যাইনি। তাই আমাকে তোমার যা বলার তুমি কাল ক্লাসেই বলো।"
আমি বললাম -" তা এই কথাটাই তো আমাকে একটু আগে বলতে পারতে। যাই হোক শুধু কি এই কথাটাই বলার জন্য ফোন করেছিলে? নাকি আরো কিছু বলবে?"
অয়ন্তি বললো-" আগামীকাল মনে করে আমার প্রাক্টিক্যাল খাতাগুলো নিয়ে এসো। মূলত এটা বলার জন্যই ফোন করেছিলাম তোমাকে।"
আমি বললাম -" আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আগামীকাল তোমার খাতাগুলো নিয়ে যাবো ক্লাসে। তবে কাল আর ক্লাস মিস করবে না তো? "
অয়ন্তি এই কথার কোনো উত্তর দিলো না। শুধু (বাই) বলে ফোনটা রেখে দিলো।
আমিও তখন ফোনটা হাতে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তখনই আবার মায়ের ডাক কানে আসতেই দৌঁড় দিয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে উপস্থিত হলাম ।
চলবে.....
বাক্সবন্দী স্মৃতি (১৩ তম পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
264
Views
6
Likes
0
Comments
5.0
Rating