জানি ঠিকিই দেখা হবে (পর্ব-৮)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
জেবা সাইয়ারা কথার সাথে আজকের পরিস্থিতির কোনো মিল খুজে পেলো না। তাই সে কিছু একটা বলতে চাইলো। কিন্ত তার বলা শুরু করার আগেই সাইয়ারা আবার বলা শুরু করলো।
- জানো আপু ছেলেদের মেরুদন্ড হলো তাদের ব্যক্তিত্বে। যে ছেলের ব্যক্তিত্ব নেই তার কোনো মূল্যে নেই। আমি বুজলাম ছেলেটা ভালো তবুও সে আমার কাছে ভালো না কেন জানো? ওনার মধ্যে ব্যক্তিত্ব নেই। আমি যদি তার সামনে যেতাম হয়তো তার পরিবারের আমাকে ভালো লাগতো। হয়তো ওনারো লাগতো হয়তো না। এরপরে যখন ওনাকে জিঙ্গাসা করা হতো উনার পছন্দ হয়েছে কিনা উনি বলতো বাবা-মা বা পরিবারের পছন্দই উনার পছন্দ। এই কথায় বোঝা যায় একটা ছেলের কতটা ব্যক্তিত্ব। এরপর হয়তো আমার পরিবারেরও তাকে পছন্দ হতো। হয়তো তাদের পছন্দ হতোই। কেন না ছেলে সরকারি চাকরিজীবি? পরে হয়তো বিয়েও হয়ে যেতো। বিয়ের পরে ছেলে যদি ব্যক্তিত্বহীন হতো কিংবা মা-বোনকে বেশি প্রাধান্য দিতো বা মেনে চলতো তাহলে মা-বোন সংসারে রাজত্ব করতো। জীবনটা অতিষ্ট করে তুলতো। ছেলে মা-বোনের কথামতো চলতো আর ছেলের বউকে তিলে তিলে মরতে হতো। ছেলেটা হয়তো মায়ের ভালো ছেলে কিংবা বোনের ভালো ভালো হতো। কিন্তু স্বামী বা পিতা হিসেবে কখনো ভালো হতে পারতো না। মেয়েটার সব শখ আহ্লাদ চাপা পরে যেত শ্বাশুড়ি-ননদের প্রভাবের তলানিতে। আর শুধু তাই নয় সে ছেলের ঘরে যে সন্তান জন্ম নিতো তার উপরও প্রভাব বিস্তার করতে পিছ পা হতো না। এটা আমি আমার জীবন থেকে ভালোই বুজতে পারি। তাই একই ছত্রাকে আমি সংক্রমিত হতে চাই না। আমি তো বাঁচতে চাই আপু। প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে চাই। একটু অক্সিজেন চাই।
জেবার দৃষ্টি আবছা হয়ে এলো। এক ফোটা বর্ষণ হওয়ার আগেই সাইয়ারা জেবার চোখ মুছিয়ে দিলো।
- চিন্তা করো না আপু তোমার সাইয়ারা নিজেকে সামলে নিতে পারে।
- আর কতো সহ্য করবি বলতো। আমি হলে কবেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতাম।
সাইয়ার দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ করলো।
- তোমার সাইয়ারা সহ্য করতে পারে দেখে তাকে দুর্বল ভেবো না আপু। তোমার সাইয়ারা সমুদ্রের মতো। যা উপর থেকে যতটা সুন্দর ভেতরটা তার থেকে অনেক গুণ ভয়ংকর। সেই ভয়ংকরতাকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে সবাইকে তার সৌন্দর্যে মাতিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু সেই সৌন্দর্য যখন দুর্যোগের সাথে তাল মেলায় তখন ভয়ংকর রুপ ‍ধারণ করে সবকিছু ছাড়খার করে দেয়। সমুদ্রের সেই ক্ষমতাও আছে তোমার সাইয়ারা মধ্যে।
জেবা কিছু বলতে যাবে সানজা এসে জেবাকে ডেকে নিয়ে গেলো।
ফজরের আজানে ঘুম ভেঙে গেলো সাইয়ারার ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলো তার বিছানায় কাগজপত্র ছড়ানো। কালকে কাজ করতে করতে ওই অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো সে। হাত মুখ ধুয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে জাওয়াদের দেওয়া ফোনটা হাতে নিলে ৫-৬টা মিসড কল দেখতে পায় কাল রাতে জাওয়াদ কল করেছিলো। দেরি না করে জাওয়াদকে কল করলো সে। দুজনে সালাম বিনিময় করে কুশল বিনিময় করলো। জাওয়াদের কন্ঠে খুশির আভাস পাওয়ায় কারণ জিঙ্গাসা করলে জাওয়াদ কিছু বললো না। জাওয়াদের সাথে কথা-বার্তা শেষ করে সাইয়ারা রান্নাঘরে গেলো। রান্না শেষ করে সব গোছাচ্ছে তখন মাজেদার আগমন ঘটলো।
- হুন সাইয়ারা, আজকে আমার বাই আর বাইয়ের বউ আইবো সাথে হেগোর ছেড়া ছেড়িরে লইয়া। একটা মুরগি কাইট্টা রাইনদালা।
সাইয়ারা গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো।
*আইবো তার ভাই আর রানবাম আমি। আমার ঠেকা লাগছে।*
সাইয়ারা জানে মাজেদার কথা না শুনলে রাতে আবার অশান্তি হবে। তবু সাইয়ারা শুনলো না। হোক না অশান্তি। তা আবার নতুন কি। সব শুনেও যখন অশান্তি হয়। তাহলে না শুনেই হোক। অশান্তিও তো ভালো লাগে না কারণ ছাড়া হতে। সাইয়ারা তৈরি হয়ে স্কুলে চলে গেলো। মাজেদার ভাই আসবে একটু বেলার দিকে। সাড়ে এগারোটা বারোটায়। সকালের নাস্তার সময় খাবার ঘরে গিয়ে তার বলে যাওয়া সত্ত্বে সাইয়ারা রান্না না করে যাওয়ায় সে পুরো বাড়ি মাথায় তুললো। জামীর তখন খাচ্ছিলো। সে জামীরের কাছে গিয়ে বলতে থাকলো..,
- দেখছো তুমার ছেড়ি কততানি গাড়ত্যাড়া অইছে। হেরে কইছিলাম আমার বাই আইতাছে ইট্টু রাইন্দা থইয়া যাইতো। হে কি রানছে। কত দেমাগ অইছে তুমার ছেড়ির দেহো। ছেড়িডারে তো ইট্টু শাসন করো না। পরে বুজবা।
এতা অশান্তির মধ্যে কি খাওয়া যায়। তাই জামীর খাবার না খেয়ে উঠে চলে গেলো। ফাজেলা কয়েকবার আটকাতে চেয়েও জামীরের অগ্নি চোখ দেখে থেমে গেলেন। ফাজেলার রাগ হলো মাজেদার উপর কেননা কথাগুলো বলার জন্য কি অন্য সময় ছিলো না জামীরের খাওয়ার সময় তাকে বলতে হলো। সাইয়ারা উপরও তার রাগ হলো। সাইয়ারা যদি রান্না করে রেখে যেত তাহলে এমন হতো না।
বিকালের দিকে দশম শ্রেণির প্রি-টেস্ট পরীক্ষা থাকায় সাইয়ারদের অর্ধেক বেলা ক্লাস হয়েছে। দুপুরের দিকে বাসায় আসার কথা থাকলেও সাইয়ারা স্কুলেই থেকে ‍গেলো। বাসায় গেলেই এখন ঝামেলা হবে আর সে এখন ঝামেলাটা চাইছে না। সে প্রধান শিক্ষিকার অনুমতি নিয়ে স্কুলের পাঠাগারে গেলো। সাইয়ারা যখনই সময় পায় পাঠাগারে বই পড়তে যায়। প্রধান শিক্ষিকা কখনো কোনো ছাত্রীকে পাঠাগারে যেতে বারণ করেন না। তা স্কুলের সময়ে হোক কিংবা স্কুলের সময় শেষ হয়ে গেলে। তিনি জানেন বেশির ভাগ ছাত্রীর পাঠ্য বইয়ের বাইরে বই কেনার সামর্থ্য নেই আর অনেকের সামর্থ্য থাকলেও রাখার জায়গা নেই। তাই অন্তত স্কুল পাঠাগারেই পরুক। এর মধ্যে ঘটলো আরেক কান্ড সাইয়ারা ভুল করে মোবাইলটা বন্ধ না করেই স্কুলে চলে এসেছে। সিম কার্ডের অফিস থেকে কল আসায় মোবাইটা রিং হতে শুরু করলে সেটা কানে যায় মাজেদার। দুর্ভাগ্যেবশত তিনি তখন রান্নাঘরে রান্না করছিলেন। রিং হওয়ার শব্দে তিনি মোবাইল খুজতে খুজতে সাইয়ারা ঘরের দরজার সামনে যান। ঘরের দরজায় তালা থাকায় তিনি ফাজেলাকে ডেকে আনেন। তালার একটা চাবি ফাজেলার কাছে ছিলো। সাইয়ারায় দিয়েছিলো যদি দরকার লাগে। দরজা খোলার পর খোজা-খুজি করে সাইয়ারার পুরাতন ব্যাগে মোবাইলটা পাওয়ায় ভয়ংকর রেগে যায় ফাজেলা। তার উপর মাজেদার উসকানি তো রয়েছেই। পুরো বাড়িতে ঘটনাটা ছড়াতে বেশি সময় লাগে না। আর মাজেদা আর সাইয়ারার ফুফুরাতো আছেই এলাকায় ছড়ানোর জন্য। শুধু অপেক্ষা জামীরের কানে কথা পৌছানোর। বেচারী সাইয়ারা জানতেও পারলো না তার জন্য আজ কি অপেক্ষা করছে বাড়িতে। সে কিছুক্ষণ বই পড়ে বাড়ি চলে গেলো। বাড়ির পেছন দিয়ে যাওয়ায় বাড়ির কেউ জানতে পারলো না সে বাসায় এসেছে। অবশ্য খুব কম সময়ই সে সামনের দিক দিয়ে বাসায় আসে। সে হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়লো।
আসরের আজানে ঘুম ভেঙে গেলো সাইয়ারার ঘুম থেকে উঠে নিজেকে গুছিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে জায়নামাজটা গুছিয়ে রাখছিলো তখন সেজো বোন সারাহ এসে বললো তাকে জামীর ডাকছে। সে বুজতে পারলো কেন ডাকছে তাকে। সে জায়নামাজটা রেখে সারাহর সাথে চলে গেলো।
সাইয়ারা উঠানে পৌছোতেই মাজেদা জামীরকে উসকাতে লাগলো। সাথে তো দাদি আর ফুফুরা আছেই।
- তোর জেডি তোরে কি কইছিলো।
সাইয়ারা কিছু না বলে চুপ করে রইলো। জেবা তার ‍স্বামীর সাথে একটু কেনা-কাটা করতে গেছিলো। রাস্তায় এক বান্ধবীর সাথে দেখা হওয়ায় ফিরতে বিকাল হয়ে গেছে। বাসায় ফিরে কাকাকে রেগে থাকতে দেকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলো কিন্তু লাভ হয়নি। জাভেদও কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু ফলাফল শূন্য। মাজেদা, মুনিহা আর সাইয়ারার বোনদের খুব ভালো লাগছিলো তাকে বকা খেতে দেখে। সাইয়ারাকে চুপ থাকতে দেখে জামীর আরো রেগে গেলো। রেগে একটা থাপ্পর মারার আগেই জামীরের হাত আটকা পড়ে গেলো কারোর হাতে। পেছন ফিরে তাকানোর আগেই হাত হেঁচকা টানে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। ঘুরেই বড় ভাইকে দেখে থমকে গেলো জামীর। তার সাহস নেই ভাইয়ের সামনে কিছু বলার বা কাউকে রাগ দেখানোর। এই মুহূর্তটা কল্পনাও করেনি সে। এক পলকেই বাড়ীর পরিস্থিতি স্তব্ধ হয়ে গেলো। সকালে সাইয়ারার সাথে কথা বলার সময় জামীর বাসায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সেনাবাহিনীতে চাকরির সময় সীমা শেষ হওয়ার পরে তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা অংশীদারি কারবার শুরু করেছিলো। অংশীদারদের মধ্যে মত বিরোধ হওয়ায় কারবারটি বন্ধ করে দিতে হয়। এখন সে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করছে সাথে ছোট খাটো একটা ব্যবসাও শুরু করেছে। আশা করছে ব্যবসাটা ভালো ভাবে দাড়িয়ে গেলে চাকরিটা ছেড়ে দেবে। যখন অংশীদারি ব্যবসা করতো তখন কিছুদিন পর পর বাসায় যেতে পারতো। কিন্তু চাকরিতে তো আর চাইলেই ছুটি নেওয়া যায় না। কারণ দেখাও, আবেদন করো, উদ্ধতনে স্বক্ষর নাও কত ঝামেলা। কোম্পানিতে কিছু সমস্যা হওয়ায় কিছু দিন বন্ধ থাকবে যেহেতু ছুটি পেয়েছে তাই বাসায় চলে আসছে। তাই সাইয়ারার সাথে কথা বলার সময় তার কণ্ঠ আনন্দ মিশ্রিত ছিলো। সে চেয়েছিলো সবাইকে চমকে দেবে কিন্তু বাসায় এসে সে নিজেই যে চমকে যাবে তা তার আন্দাজ ছিলো না। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটার গায়ে হাত তুলছে তার ভাই। জাওয়াদকে দেখে সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলেও খুশি ফুটে উঠলো জেবা, জাভেদ, সাইয়ারা আর সামীরের মুখে। জাওয়াদ জামীরের হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিয়ে সাইয়ারার কাছে গেলো। দুজনে সালাম বিনিময় করলো।
- তুই ঠিক আছিস তো মা।
সাইয়ারা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো।
চলবে...
510 Views
10 Likes
0 Comments
3.7 Rating
Rate this: