কিশোর জীবনে প্রেমনদী (পর্ব ০৭)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:

ইত্যাদি আরো অনেক কিছু বলতে বলতে দেখি রিয়া কাছাকাছি এসে হাতটা ধরে ওর কাজল মাখা মনকাড়া জাদুময় নেত্র দুটো আমার চক্ষুর প্রতি রেখে বলেন যে, "রিয়াদ! আমি সর্বপ্রথম যেদিন ক্লাসে এসেছি, সেদিন তোমাকে বারবার দেখেছি। তোমার মাঝে একটা ভিন্ন ভাব আছে। তুমি সব ছেলেদের চেয়ে একটু আলাদা। আমি তোমাকে সেদিনের পর থেকে পছন্দ করতে আরম্ভ করি। তোমার প্রতি আমার ভালো লাগ তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। তাই তো তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছি। আমিও তোমাকে ভালো বাসতে শুরু করেছি। কথা দাও আমাকে তুমি কখনো ভুলে যাবে না তো? আমি কিন্তু মাঝেমধ্যে তোমার প্রতি রাগ করতে পারি। তাই বলে তুমিও আমার প্রতি রাগ করো না। আমার রাগ ভাঙার চেষ্টা করিও। আমি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি।" রিয়ার মুখ থেকে এমন সাড়া পাবো যেমনটা আশা করেছিলাম, এ দেখি তার চেয়ে অতিরিক্ত জবাব পেয়ে গেলাম মনে হলো। রিয়াকে তখন বললাম, "রিয়া! তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দেবো না। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তুমিই আমার প্রথম এবং তুমিই দিয়ে আমার জীবন শেষ হবে।" এসব বলা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ শ্রেণির কক্ষে একজন ছাত্রের আগমন হলো। রিয়া আর আমাকে কাছাকাছি হাতে হাত ধরে থাকা দেখে ছেলেটা উহ আহ শব্দ করে চেহেরাটা বাংলার পাঁচের মতো করে উভয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটার এমন অযাচিত আচরণ দেখে কিঞ্চিৎ লাজুক ভাব নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে রিয়া আর আমি সংযত হয়ে যে যাঁর বেঞ্চে বসে পড়লাম এবং আধটু হতভম্ব হয়ে নীরবতা পালনে সচেষ্ট হলাম। যেহেতু সেই ছাত্রটির সাথে শ্রেণির কক্ষে এর আগে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি, সেহেতু তাকে কিছু না বলাটাই উত্তম ভেবে কোনো সাড়া শব্দ না করে নিঝুম হয়ে আছি দু'জনে।

মিনিট খানেক পরে দেখি ছেলেটি কি যেনো একটা তাঁর থলিতে রেখে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ছেলেটার প্রস্থান করা দেখে রিয়া আমার দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটা মুচকি হাসি নিক্ষেপ করে চেয়ে রইলো। আমি রিয়ার হাসিটা সাদরে গ্রহণ করলাম এবং রিয়াকে একটু আসি বলে শ্রেণি কক্ষ থেকে বের হয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। কতদূর যেতেই দেখি শ্রেণির কক্ষে দেখা সেই ছাত্রটা আমার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। ভাবলাম তাকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়ে চুপ করে ফেলবো। তাকে "এই যে ভাই! শোনো তো একটু, এ বলে ডাক দিয়ে থামালাম। আমার ডাক তাঁর কানে পৌঁছাতেই ছেলেটা থমকে গিয়ে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস পেলে দাঁড়ালো। তাঁর সান্নিধ্যে গিয়ে তাকে বলতে শুরু করলাম। "দেখো ভাই! আমি তোমাকে এর আগে কখনো ক্লাসে দেখি নাই, তুমি আজকে যা দেখেছো, তা কাউকে বলার দরকার নাই। আমি আর সেই মেয়েটি একে অপরকে পছন্দ করি এবং ভালোবাসি। ভাই দয়া করে কাউকে এই ব্যাপারে বলিও না।" আমার তরফ হতে এমন অনুরোধ পেয়ে ছেলেটা বললো। "আরে না ভাই! আমি কি দালাল না-কি যে তোমাদের বিষয়টি অন্য কাউকে বলবো। আমি এখানে পড়ালেখা করতে এসেছি। কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খেলা করতে নয়। তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো যে, আমি ব্যাপারটা কাউকে বলবো না। আচ্ছা ভাই আজ থেকে আমরা একে অপরের বন্ধু! ভাই তোমার নামটা কি?" এই বলে ছেলেটার দিকে আমার হাতটা বাড়িয়ে দিলাম মুসাফা করার লক্ষ্যে। ছেলেটাও আমার হাতে তাঁর হাত রেখে হাসিমুখে বন্ধুত্ব গ্রহণ করে তাঁর নামটা রাফি বলে আমাকে কিছু পরামর্শ দিয়ে চলে গেলেন বিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশপথের দিকে।

তাঁর কথাগুলোর মধ্যে একটা কথা ভালো লাগলো। তা হলো, "ভাই! দেখো, ভালো লাগা আর ভালোবাসা ছেলে মেয়ে উভয়ের মাঝে সৃষ্টি হতে পারে। তাই বলে আবেগের বশে এসে প্রকাশ্যে অবাধ মিলামেশা করা ঠিক না। তাছাড়া প্রকাশ্যে আপত্তিকর অবস্থায় থাকা সম্পর্কের জন্য একটা বিপদ স্বরূপ। যদি কোনো স্যারে দেখতো, তাহলে হয়তো এতক্ষণে তোমাদের বারোটা বেজে যেতো। সুখে থাকো ভাই! আর মেয়েটিকেও সুখে রাখো। ওকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করো না। আমি ওর চোখে তোমার জন্য সত্যিকারের ভালোবাসা দেখতে পেয়েছি। এমন ভালোবাসার মানুষ ক'জনে পাই।" ইত্যাদি আরো অনেক উপদেশমূলক কথা বলে গেলেন। ছেলেটার কথাগুলো শুনে আজব লাগলো। কিছু সুন্দর করে গুছিয়ে কত বড়ো বড়ো পরামর্শ দিয়ে গেলেন এই অল্প বয়সে। নিশ্চয়ই সে মেধাবী ছাত্র হতে পারে। এসব ভেবে ভেবে পুনরায় শ্রেণির কক্ষে গিয়ে দেখি প্রায় ছাত্রছাত্রীদের আগমনে গোটা কক্ষটা ভরপুর হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে ভেতরে গিয়ে আপন আসনে উপবিষ্ট হলাম। রিয়ার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখি সে খাতার মধ্যে কি যেনো লেখালেখি করছে। হয়তো বাড়ির কাজ হতে পারে। খানিকক্ষণ পরে দেখি মাঠে সমাবেশে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত পেলাম। নির্দিষ্ট সময় অবধি সমাবেশের কাজ সম্পন্ন করে শ্রেণির কক্ষে গেলাম। সব শিক্ষার্থীরা যে যাঁর যাঁর মতো করে নিজ নিজ আসনে বসে বই বের করছেন। ততক্ষণে শ্রেণি শিক্ষক এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর মতিগতিতে আধ ঘণ্টা খানেক পাঠদান করে তিনি চলে গেলেন।

এভাবে একের পর এক ক্লাস চলতে থাকে। ক্লাস চলাকালীন রিয়া আর আমি কোনো কথা ছাড়াই একে অপরের দিকে একটু-আধটু হাসি ছেড়ে নেত্রপল্লব দিয়ে প্রীতির ভাষা আদান-প্রদান করি। এভাবে সব ক্লাসগুলো শেষে বিদ্যালয় অবকাশ দিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক শ্রেণি কক্ষ থেকে আস্তে-ধীরে সব শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে যে যাঁর যাঁর মতন করে নিজেদের গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন। রিয়া আর আমি সবার শেষে শ্রেণির কক্ষ থেকে বাহির হয়ে চুপিচুপি করে বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একসঙ্গে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। তখনই এক দোকানে চোখ পড়তেই দেখি সেই কালকের অর্থাৎ রিয়ার কাজিন নামের ছেলেটা দোকানে বসে আছে। ছেলেটাকে দেখে সহসা আবেগে নাড়া দিলো৷ তখনো হয়তো ছেলেটা আমি আর রিয়াকে দেখেনি। মস্তিষ্কের মধ্যভাগ দিয়ে রাগের গতি বাড়তে বাড়তে সমস্ত শরীরে বিচরণ করতে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বড়ো একটা শ্বাস নিয়ে ছেলেটাকে না দেখার ভান করে রিয়ার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে দোকানটা পার হয়ে রিয়া আর আমি মাঝেমাঝে একে অপরের দিকে মুচকি হাসি আর ভেলকি দিয়ে উভয়ে রিয়ার বাড়ির পথে অগ্রসর হলাম। ডানে-বামে তাকিয়ে হঠাৎ রিয়া বলে উঠেন, "আচ্ছা রিয়াদ! তুমি বড়ো হয়ে কি হতে চাও। আই মীন তোমার লক্ষ্য কী?" রিয়ার সওয়ালের জবাব দিবো এমন সময় দেখি পিছন থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠে আওয়াজ এলো যে, আমি বড়ো হয়ে তোমার স্বামী হতে চাই। তোমার বাচ্চার বাবা হতে চাই। পিছনে গাঢ় ঘুরিয়ে দেখি রিয়ার কাজিন বখাটে সেই ছেলেটা সাথে আরো দু'জন বখাটে পোলা দাঁত খিঁচিয়ে আমাদের উভয়ের দিকে আপাতদৃষ্টিতে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে। রিয়ার দিকে একটু তাকিয়ে আমি থেমে গেলাম........

বিঃদ্রঃ কাহিনীর পরের বিবরণ পরবর্তী পর্বে প্রকাশিত হবে। সঙ্গেই থাকুন ধন্যবাদ।
160 Views
3 Likes
2 Comments
5.0 Rating
Rate this: