নারীর বেদনা ( পাঠ ২ )

পলাশ
পলাশ
লেখক
অনিয়া সকালে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝল, আজ আবার দেরি হয়ে গেছে। শরীরের ব্যথা আর ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরেছে, কিন্তু অফিসে যাওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক। তাকে তো আর কেউ ছুটি দেবে না শুধু মাসিকের কারণে।

রাস্তায় বেরিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল অনিয়া। তার চারপাশের মানুষগুলো কেমন উদাসীন, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না, কেউ কারো খবর রাখছে না। বাস এসে থামল, অনিয়া ঢুকে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু ভিড়ের চাপে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হল। যন্ত্রণা আরও বাড়ল, কিন্তু মুখে হাসি রেখে দাঁড়িয়ে রইল সে।

অফিসে পৌঁছে ডেস্কে বসতেই পলাশের সাথে চোখাচোখি হল। পলাশ মৃদু হাসল, কিন্তু অনিয়া তার মনের ভেতর যে ঝড় বইছে, তা জানল না।

"আজ কেমন আছো?" পলাশ জিজ্ঞেস করল।

"ভালো," অনিয়া উত্তর দিল, কিন্তু তার চোখের নিচের কালি আর মুখের ক্লান্তি সব কথা বলে দিল। পলাশ আর কিছু বলল না, কিন্তু তার ভেতর একটা অস্বস্তি কাজ করল।

দুপুরের খাবার বিরতির সময় অনিয়া বাথরুমে গেল। দরজা বন্ধ করে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখল। পিরিয়ডের সময়টা তার জন্য এক কঠিন লড়াই, কিন্তু এ লড়াই সে একাই লড়ে যাচ্ছে, কারও সাহায্য ছাড়া।

ফিরে এসে ডেস্কে বসে কাজ শুরু করল, কিন্তু মনোযোগ হারাচ্ছিল বারবার। পলাশ দূর থেকে দেখছিল, কিন্তু কীভাবে সাহায্য করবে বুঝতে পারছিল না। তার কলম চলতে লাগল, যেন সেই কলমেই সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে।

অনিয়ার লড়াই শুধু পিরিয়ডের ব্যথা নিয়ে নয়, সমাজের কুসংস্কার এবং লজ্জার বিরুদ্ধে। তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয়, পিরিয়ড একটি লজ্জার বিষয়, যা নিয়ে কথা বলা যায় না। অথচ এই লড়াই প্রতিটি মেয়ের জীবনের একটি অংশ, যা তাদের প্রতিদিনের জীবনে প্রভাব ফেলে।

বিকেলে অফিস ছুটির পর পলাশ আবার অনিয়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করল। "অনিয়া, তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।"

অনিয়া তাকাল, চোখে একটু অবাক চাহনি। "কী কথা?"

"তোমার লড়াইয়ের কথা," পলাশ বলল। "আমি জানি, পিরিয়ড নিয়ে সমাজের কুসংস্কার তোমাকে কষ্ট দেয়। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, তোমার গল্পটা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।"

অনিয়া একটু থমকে দাঁড়াল। "তুমি কীভাবে জানো?"

"আমি অনুভব করি," পলাশ বলল। "আমাদের সমাজ বদলাতে হবে, আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই এই লড়াইয়ে।"

অনিয়া মৃদু হাসল। "ধন্যবাদ, পলাশ। এই লড়াই শুধু আমার নয়, আমাদের সবার।"

পলাশের কলম আবার চলতে লাগল। এই গল্প শুধু অনিয়ার নয়, এই গল্প প্রতিটি মেয়ের, যারা প্রতিদিন এই লড়াই লড়ে যাচ্ছে নীরবে। পলাশ জানে, তার লেখায় এই গল্পটা জীবন্ত হয়ে উঠবে, সমাজের চোখ খুলে দেবে।

অনিয়া বাসায় ফেরার পথে মনে মনে একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। তার লড়াইয়ে সে একা নয়, পলাশের মতো মানুষ আছে যারা তার পাশে দাঁড়াতে চায়। এটা এক নতুন সূচনা, এক নতুন সম্ভাবনার দিক।

পলাশের লেখার কাগজে লেখা হল, "শহুরে জীবনের কোলাহলের মাঝে লুকিয়ে থাকা এই নীরব যন্ত্রণার গল্প, পিরিয়ড নিয়ে লজ্জা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক সাহসী মেয়ের লড়াই।"

( চলবে...)
200 Views
5 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(4)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই