"কিশোর জীবনে প্রেমনদী" পর্ব- ০৬

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রিয়ার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। ততক্ষণে রিয়া তাঁর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন। এবার ছেলেটাকে দেখে কিঞ্চিৎ পরিমাণ শঙ্কিত হয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। সামনে দাঁড়ানো সেই ছেলেটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই সেই ছেলেটা আমার গতিপথ আটকে দেন এবং আমাকে থামতে বলেন। ছেলেটার স্বভাব চরিত্রের মতিগতি দেখে বখাটে জাতের পোলা বোধ হওয়াতেই কিঞ্চিৎ ভীতিপ্রদ মনোভাব নিয়ে দাঁড়ালাম। আমার শান্তশিষ্ট অবস্থা দেখে ছেলেটা ক্রোধাবেগে বলেন যে, "এই তুই কে রে? তুই রিয়ার সাথে কি করিস? আজকের পর থেকে যদি রিয়ার আশপাশেও দেখি তাহলে তোর হাত-পা ভেঙে দেবো। রিয়া শুধু আমার! আমি রিয়াকে অন্য কারো হতে দেবো না" ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক অকথ্য ভাষায় যা তা বলে যাচ্ছিলো। ছেলেটার এমন অসভ্য আচরণ আর হিংসাত্মক কথাগুলো শুনে মাথার ভেতরের ধৈর্য্যের সীমা কমতে আরম্ভ করে। ছেলেটাকে তৎক্ষণাৎ কোনো উচিত জবাব দিতে অভ্যন্তরে যেনো কেউ বাধা প্রদান করতেছিলো। যেহেতু সেই এলাকা আর ছেলেটি তেমন পরিচিত নয়, সেহেতু মাথা বেশি গরম না করে নিজেকে কোনোভাবে সামলিয়ে নিয়ে পাল্টা হিংসাত্মক মনোভাব না দেখিয়ে ভীতিকর অনুভূতিতে বললাম যে, "আচ্ছা ভাই ঠিক আছে। আপনার কথা কানে তুলবো। তবে রিয়ার সাথে আপনার কি সম্পর্ক একটু বলবেন কি? আমি তো শুধু রিয়ার কেবল একজন সহপাঠী আর বন্ধু মাত্র।

আমার তরফ থেকে এই কথা শুনে ছেলেটাকে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়তে দেখলাম। আমার প্রশ্নের জবাবে ছেলেটা বললো যে, "আমি রিয়ার কাজিন। আমরা ছোটবেলা থেকে একে অপরকে পছন্দ করি। আমাদের পরিবারে আমাদের বিয়ের ব্যবস্থাও করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।" ছেলেটার মুখ থেকে এমন কথা শুনে নিজেকে সামলিয়ে কোনোভাবে সেখান থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় ছেলেটা বলেন, "আচ্ছা তোর নামটা জানি কি? আর তুই কোন এলাকায় থাকিস?" তাঁর সওয়ালের জবাবে বললাম, "আমি রিয়াদ। বাড়ি পূব পাড়া। আচ্ছা ভাই আসি তাহলে। দেখা হবে অন্য কোনো একদিন" এই বলে সেখান থেকে ধীরে ধীরে আপন বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবলাম, রিয়াও কি ছেলেটাকে পছন্দ করে? আমি এখনো রিয়াকে আমার মনে জমে থাকা কথাটা বলতে পারলাম না, সেখানে তাঁরা একে অপরকে পছন্দও করে। করবেই না বা কেনো তাঁরা তো একে অপরের কাজিন। দেখি রিয়ার কাছ থেকে সব সত্য জেনে তারপর ছেলেটার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। আমি কি কম না-কি। আগে ছেলেটার সম্পর্কে রিয়ার কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে, রিয়াও যদি ছেলেটাকে ভালোবাসে তাহলে আমি রিয়ার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। আর রিয়া যদি ছেলেটাকে পছন্দও করে না এমন কোনো ইঙ্গিত পেলে তারপর না হয় ছেলেটার সাথে সরাসরি কথা বলবো। দেখি কালকেই রিয়ার কাছ থেকে আশানুরূপ জবাব ফেলে তখনই রিয়াকে আমার মনের কথাটা জানিয়ে দিবো।

এইসব মনে মনে বলতে বলতে আমার বাড়ির নৈকট্যে পৌঁছে গেলাম। বাসায় ঢুকে পোশাক পরিবর্তন করে পরিপাটি হয়ে খাবার খেয়ে বিশ্রামের জন্য বিছানায় গেলাম। বিছানায় মাথা রাখতে না রাখতেই সেই ছেলেটার কথাগুলো যেনো কানের কাছে পুনঃপুন আসা-যাওয়া করতেছে। মাথার চারপাশে ছেলেটার প্রতি প্রচণ্ড রাগ জমতে থাকে। এভাবে সেইদিনটা পার হয়ে যায়। পরের দিন সকালের নাস্তা না করে বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য সাতসকালে তৈরি হচ্ছিলাম। এমন সময় মা এসে সমাদরে বলেন, "রিয়াদ! এতো সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছিস, স্কুল তো খুলতে আরো ঘন্টা খানেক সময় আছে। নাস্তাও করছিস নি বাবা। কি হয়েছে বলবি তো? আমার উপর রাখ করিস নাই তো আবার?" এমনিতেই সেই ছেলেটার প্রতি ক্রোধে মাথা ভরপুর। তার উপর মায়ের আপ্যায়নও যেনো বিরক্তিকর মনে হচ্ছিলো। মাকে বললাম, "আরে না মা, তোমার সাথে কোনো রাগ করবো। আমরা বন্ধুরা মিলে আজকে একটু খেলা করবো তাই সবাই তাড়াতাড়ি যাওয়ার প্রতিযোগিতা করছি। আচ্ছা মা, আমাকে তুমি কিছু টাকা দাও আমি দোকান থেকে নাস্তা করে নিবো।" এই অনাকাঙ্ক্ষিত একটা মিথ্যা কথা বলে মায়ের কাছ থেকে শতাধিক টাকা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলাম। বাড়ির পথ পেরিয়ে যেতে যেতে পথিমধ্যে এক দোকান থেকে কিছু নাস্তা করে বিদ্যালয়ের কাছাকাছি গিয়ে দেখি গুটিকয়েক ছাত্র-ছাত্রীরা বিদ্যালয়ের মাঠে ছুটাছুটি করছে অফিস কক্ষ বন্ধ এবং রিয়া ও অন্য একটি মেয়ে আমাদের ক্লাসের প্রধান প্রবেশপথে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। রিয়াকে দেখে মনটা নড়ে উঠলো।

আমাকে দ্রুত গতিতে বিদ্যালয়ে ঢুকতে দেখে রিয়ার মুখে খুশির একটা লক্ষণ গোচর হলো। রিয়া কি যেনো বলে পাশে থাকা মেয়েটিকে অন্য একটি শ্রেণির কক্ষে যেতে বললেন। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দ্রুত আমাদের শ্রেণির কাছাকাছি গিয়ে রিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখে একটা ইশারা করে ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাগটা একটি বেঞ্চে রেখে স্বল্প দূরত্বে রিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখন রিয়া বলে উঠলো, রিয়াদ! তুমি নাস্তা করছো? তুমি এতো তাড়াতাড়ি চলে আসবে আমি ভাবিনি।" রিয়ার মুখ থেকে এমন একটা রহস্যজনক কথা শুনে মেজাজটা খেপে যাওয়ার মতো অবস্থা। মুখটাকে আটকে রাখতে না পেরে তখন মৃদু কণ্ঠে রিয়াকে বললাম, কেনো তুমিও তো খুব তাড়াতাড়ি এসেছো। আমি তো তোমার সাথে কালকের ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে তাড়াতাড়ি চলে আসলাম। আমি জানতাম তুমিও তাড়াতাড়ি ক্লাসে আসবে। আচ্ছা, রিয়া কালকের ছেলেটাকে তুমি চিনো না-কি? সে তোমার কি হয়? আর তুমি তাকে দেখা মাত্রই তাড়াতাড়ি চলে গেলে কেনো? আমার প্রশ্নের জবাবে রিয়া অনর্গলভাবে বলতেছিলেন যে, সেই ছেলেটা আমার খালতো ভাই। আমরা ছোটবেলা থেকে একসাথে বড়ো হচ্ছি। আমি তাকে আমার আপন ভাইয়ের মতো মনে করি। কিন্তু সে দেখি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে। আমাকে না-কি ভেতরে ভেতরে ভালোবাসে। আমি তাকে ভাই হিসেবে পছন্দ করি। কিন্তু সে আমার উপরে অধিকার চেয়ে বসে। আমরা একসাথে একটা স্কুলে পড়তাম। সে সেখানে বাজে ছেলেদের সাথে মিশে নেশা করতে আরম্ভ করেন এবং আমার দিকে খারাপ নজরে তাকিয়ে থাকতো। আমি আমার বাবাকে সবকিছু বলি। পরে জানতে পারি যে, আমার মা না-কি তার বোনকে অনেক আগেই কথা দিয়েছে যে আমাকে বিয়ে দিলে বোনের ঘরেই বিয়ে দিবে। আর আমার বাবা ঐসব একদম পছন্দ করে না। তাই সেই স্কুল থেকে এনে আমাকে এইখানে ভর্তি করিয়ে দেয়। তাকে আমাদের বাড়িতে একদম না যেতে বাবা নিষেধ করেছে। আমি এখানে এসেছি জানতে পেরেছে মনে হয়, তাই আবার বিরক্ত করতে চাই।

এসব শুনে বড্ড একটা নিশ্বাস ছেড়ে নির্ভয়ে রিয়াকে বললাম যে, "আচ্ছা রিয়া তুমি কি কাউকে পছন্দ করো কিংবা ভালোবাসো?" তখন রিয়া বললো যে, "না আমি কাউকে পছন্দ করি না এবং ভালোও বাসি না। তবে তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। আমি এর আগে আমার সেই কাজিন ছাড়া অন্য কোনো ছেলের সাথে কথাও বলতাম না। এখানে এসে দেখি তুমিও আমার মতন আলাদা। তাই তোমার সাথে কথা বলি।" রিয়ার মুখ থেকে এই কথা শুনে তৎক্ষণাৎ নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে রিয়াকে সরাসরি বুকে জমে থাকা কথাগুলো বলতে আরম্ভ করলাম। রিয়ার মায়াবী আঁখি দু'টোর দিকে আমার চোখ রেখে রিয়াকে একটানা বলতেছিলাম যে, রিয়া! তোমাকে সর্বপ্রথম যেই দিন দেখেছিলাম, সেইদিন থেকে তোমাকে আমার ভালো লাগতো শুরু করে। সেদিনের পর থেকে তোমাকে সবসময় অনুভব হয়। ঘুমাতে গেলে তোমাকে দেখি। খেতে গেলেও তোমাকে দেখি। ঘরে বাহিরে সবখানে তোমাকে মনে পড়ে। আমি তোমাকে ভালো বাসতে শুরু করেছি। তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করো এবং আমাকেও তুমি ভালোবাসলে আমি তোমাকে কখনো ভুলে যাবো না। ইত্যাদি আরো অনেক কিছু বলতে বলতে দেখি রিয়া আমার আরো কাছাকাছি এসে আমার হাতটা ধরে.........


বিঃদ্রঃ কাহিনীর পরের পর্ব দু-এক দিনের ব্যবধানে প্রকাশিত হবে। সঙ্গেই থাকুন। ধন্যবাদ।
174 Views
3 Likes
2 Comments
5.0 Rating
Rate this: