আয়নার প্রতিচ্ছবি (পাঠ ৬)

পলাশ
পলাশ
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
নীলা যখন আলোর পোর্টালে প্রবেশ করলো, তখন সে নিজেকে একটি নতুন জায়গায় আবিষ্কার করলো। চারপাশে একটি নির্জন মরুভূমির মতো পরিবেশ ছিল, যেখানে সূর্যের আলো তীব্রভাবে পড়ছিল। তবে এই জায়গার মধ্যে একটি রহস্যময় স্থাপনা ছিল—একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যা যেন কোনো পুরনো রহস্যকে ধারণ করে রেখেছে।

"এখানে কেন এসেছি?" নীলা প্রতিচ্ছবির কাছে জানতে চাইলো।

"এটি হলো শেষ পরীক্ষা," প্রতিচ্ছবি বললো। "এই মন্দিরে প্রবেশ করলে, তুমি তোমার সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখোমুখি হবে। যদি তুমি তা অতিক্রম করতে পারো, তবে তুমি আমার মুক্তির পথ উন্মোচন করতে পারবে।"

নীলা একটু থমকে দাঁড়ালো। তার মনে ভয় কাজ করছিল, কিন্তু সে জানতো যে, তাকে এগোতে হবে। সে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের দিকে পা বাড়ালো।

মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলে, চারপাশে প্রাচীন দেওয়ালে খোদাই করা অজস্র চিত্রকর্ম দেখা গেলো। তারা প্রাচীন কোনো ইতিহাসের গল্প বলছিল, কিন্তু সবকিছু অন্ধকারে ডুবে ছিল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর, নীলা একটি বিশাল দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজাটি পুরোনো, কিন্তু এর মধ্যে এক শক্তিশালী জাদুর শক্তি ছিল।

"এই দরজা তোমার চূড়ান্ত বাধা," প্রতিচ্ছবি বললো। "তুমি যদি এর মধ্যে প্রবেশ করতে পারো, তবে আমার মুক্তির জন্য তোমার যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু এই দরজা খুলতে হলে, তোমাকে তোমার সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখোমুখি হতে হবে।"

নীলা ভয়ে কাঁপছিল, কিন্তু সে জানতো, পিছু হটার কোনো উপায় নেই। সে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত রাখলো। দরজাটি তখনই কাঁপতে শুরু করলো, আর নীলার সামনে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়ের দৃশ্য ফুটে উঠতে লাগলো।

সে দেখতে পেলো তার পরিবারের সদস্যদের, যারা তাকে ধীরে ধীরে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তার বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই একে একে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আর সে একা দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। এই ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মধ্যে, সে নিজের অস্তিত্ব হারানোর ভয় অনুভব করলো।

"তোমাকে এই ভয়ের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে," প্রতিচ্ছবি তার পাশে দাঁড়িয়ে বললো।

নীলা চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিতে শুরু করলো। সে নিজেকে মনে করিয়ে দিলো, এটা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ধীরে ধীরে সে তার ভয়গুলোকে কাটিয়ে উঠতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারলো, এসব ভয় শুধুই তার মন সৃষ্টি করেছে এবং তার বাস্তবতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

নীলা যখন তার মন থেকে ভয়কে সরিয়ে ফেললো, দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেলো। সে ভেতরে প্রবেশ করলো এবং দেখতে পেলো একটি উজ্জ্বল আলো, যা তার সামনে একটি চমৎকার সোনালী সিংহাসন তৈরি করেছে। সিংহাসনের উপরে একটি ছোট্ট বাক্স রাখা ছিল, যা থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছিল।

"এই বাক্সে আমার মুক্তির চাবি রয়েছে," প্রতিচ্ছবি বললো। "এটি খুলে দাও, এবং আমার বন্দিদশার অবসান ঘটাও।"

নীলা বাক্সটি হাতে নিয়ে খোলার চেষ্টা করলো। বাক্সটি ধীরে ধীরে খুলে গেলো, আর তার ভেতর থেকে একটি উজ্জ্বল রত্ন বের হয়ে আসলো। রত্নটির আলো মন্দিরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো এবং সেই আলোতে সবকিছু ধীরে ধীরে ম্লান হতে লাগলো।

প্রতিচ্ছবি ধীরে ধীরে আলোর মধ্যে মিশে যেতে লাগলো। "তুমি আমাকে মুক্ত করেছো, নীলা। তোমার সাহসিকতা এবং মনোবল আমাকে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন তুমি মুক্ত, এবং আমি তোমার কৃতজ্ঞ।"

নীলা দেখলো প্রতিচ্ছবি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। মন্দিরের ধ্বংসাবশেষও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো, আর সে নিজেকে আয়নার সামনে আবিষ্কার করলো। সবকিছু যেন একটি স্বপ্নের মতো ছিল, কিন্তু আয়নার কাঁচ এখন সম্পূর্ণ পরিষ্কার এবং সজীব দেখাচ্ছিলো।

নীলা আয়নার দিকে তাকিয়ে একটি প্রশান্তির হাসি দিলো। তার মনে এখন আর কোনো ভয় নেই, বরং আছে আত্মবিশ্বাস এবং সাহস। সে জানতো, এই অভিজ্ঞতা তাকে সবসময় শক্তি দেবে, আর তার জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার জন্য প্রস্তুত করবে।

( সমাপ্তি )
218 Views
6 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: