এরপর আমরা দুজনে মিলে আবারো নদীর পাড়ে গেলাম। নদীর পাড়ের মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে করতে হঠাৎই অয়ন্তি আমার হাতটা ধরে বসলো। আমি তখন একটু অবাক হয়ে যাই।
আর তখন অয়ন্তির মুখের দিকে তাকাতেই অয়ন্তি বলে উঠলো -" ধ্রুব আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই। এতদিন ধরে বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে তোমাকে এই কথাগুলো কিভাবে বলবো বা আদৌ বলে উঠা ঠিক হবে কিনা।কিন্তু বিশ্বাস করো আজ যদি তোমাকে এই কথাগুলো না বলতে পারি তাহলে আজীবন ধরে আমার খুব আফসোস হবে। তাই আজ তোমাকে আমার মনের কথাগুলো বলতে দাও। ধ্রুব আমি সত্যিই তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমি প্রথম প্রথম নিজেই এই বিষয়টা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম কিন্তু এখন আমার মনে আর কোনো সংশয় নেই। আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।"
অয়ন্তির মুখে এমন কথা শোনার জন্য আমি সেদিন মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এমন একটা কথার জবাবে আমি কি বলবো সেটাও ছিল আমার চিন্তা শক্তির বাইরে। আমি তখন নিথর হয়ে অয়ন্তির সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। এক মুহুর্তের জন্য যেন সবকিছু নীরব হয়ে গেলো।
একদিকে যেমন অয়ন্তির মুখে ভালোবাসার কথা শুনে আমার মন এক অজানা আনন্দে ভরে উঠলো অন্যদিকে বাস্তবতা আর পরিস্থিতির কাছে নিজের অসহায়ত্বকে দেখতে পেয়ে সেই ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দ নিমিষেই যেন বিরহ বেদনায় বদলে গেলো।
যে মেয়েটাকে আমি নিজেই খুব ভালোবাসি কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারছিলাম না আজ তারই মুখে ভালোবাসার কথা শুনে আমি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
সেই মুহূর্তেই অয়ন্তিকেও বলতে ইচ্ছে করলো আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু এমন ভালবাসায় জড়িয়েই বা কি লাভ যার কোনো পরিণতি নেই। আমি তাই সেদিন অয়ন্তিকে ভালোবাসি বলতে গিয়েও চুপ করে গেলাম।
এরপর নীরবতা ভেঙে আমি বলতে লাগলাম -" দেখো অয়ন্তি তুমি আমাকে ভালোবাসো এটা আমার জন্য সত্যিই বেশ সৌভাগ্যের বিষয় । আমি কখনো ভাবতেও পারি নাই যে তোমার মতো একটা মেয়ে আমার মতো একটা চুপচাপ ইন্ট্রোভার্ট টাইপের ছেলেকে ভালোবাসতে পারো। কিন্তু সত্যি তো এটাই যে আমি না তো তোমার যোগ্য আর না তো তোমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। আর তাছাড়া এমনও তো হতে পারে যে তুমি যেটাকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করছো সেটা আসলে শুধু মাত্র ভালো লাগা। যেটা কিনা সময়ের সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে। তাই আমাদের দুজনের জন্য এটাই ভালো হবে যে আমরা যদি আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক না টেনে আনি। নয়তো পরবর্তীতে এই ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা আমাদের দুজনকেই আজীবন ধরে ভোগ করতে হবে।"
আমার মুখে এমন একটা কথা শুনে অয়ন্তির চোখ ছলছল করে উঠলো। বুঝতে পারলাম বেচারীকে না চাইতেই আঘাত করে ফেলেছি। কিন্তু তখন এটা বলা ছাড়াও আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আমিও যে পরিস্থিতির কাছে নিরুপায় ছিলাম। কারণ এটা আমি ভালো করেই জানতাম অয়ন্তির বাবা মা কখনোই আমাদের এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। কারণ অয়ন্তি উচ্চবিত্ত ধনী পরিবারের রাজকন্যা হলেও আমি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ ছেলে। তাই বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর সাহস না করাই শ্রেয়।
অয়ন্তি আমার দিকে তাকিয়ে তখন বলে উঠলো-" তার মানে তুমি আমাকে ভালোবাসো না তাইতো। নয়তো কি এমন পরিস্থিতির কথা বলছো যার কারণে তুমি আমার ভালোবাসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছো?"
অয়ন্তির এই প্রশ্নের জবাবে আমি কোনো উত্তর দেই না। বরং নিশ্চুপ হয়ে মাথা নিচু করে ওর সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তখন অয়ন্তি আবারো বলে উঠলো -" জানি না তুমি কোন পরিস্থিতির ভয়ে আজ আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছো। কিন্তু আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয় তবে একদিন তুমি নিজেই আমার কাছে ফিরে আসবে।"
এই বলেই অয়ন্তি সেখান থেকে কাঁদো কাঁদো চোখে চলে গেলো। আমি অয়ন্তিকে থামানোর অনেক চেষ্টা করলাম, ওকে অনেকবার ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও আর পিছন ফিরে তাকালো না। আমার থেকে এক বুক ভরা কষ্ট নিয়ে হতাশ হয়ে চলে যেতে হলো তাকে।
আমিও তখন নদীর পাড়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। সারাটা রাস্তায় শুধু অয়ন্তির বলা কথাগুলোই আমার কানে বাজছিলো। আর খুব খারাপ লাগছিলো এই ভেবে যে আমি না চাইতেই তাকে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। যার কারণে অয়ন্তি হয়তো আমাকে আর কখনোই ক্ষমা করবে না।
চলবে......
###
( গল্পটা পড়ে আপনাদের মূল্যবান মতামত এবং রেটিংয়ের মাধ্যমে গল্পটিকে মূল্যায়ন করার অনুরোধ রইলো। খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব আসছে। ধন্যবাদ 🥰)
বাক্সবন্দী স্মৃতি (নবম পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
337
Views
10
Likes
3
Comments
5.0
Rating