প্রতিদান ( শেষ পর্ব)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
তাইতো নরপিশাচ দুটো যখন নিজেদের লালসা মিটানোর জন্য রূপার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলো ঠিক তখনই না জানি কোথা থেকে দেবদূত হয়ে চিন্টু এসে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়লো ঐ নরপিশাচ দুটোর ওপরে।


মুহূর্তের মধ্যে রূপার চোখের সামনেই চিন্টু ঐ দুটো নরপিশাচকে আঁচড়ে কামড়ে একেবারে আধমরা করে ফেললো। চিন্টু আজ যেন রূপার ভাই হয়ে এসে নিজের বোনের সম্ভ্রম রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঐ ছিনতাইকারী দুটোর সাথে চিন্টুর যুদ্ধ চললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিন্টু ওদের দুটোকেই ধরাশায়ী করে ফেললো। আর এই যুদ্ধ করার সময়েই চিন্টু যখন একটা ছিনতাইকারীর হাত কামড়ে ধরেছিলো ঠিক তখনই আরেকটা ছিনতাইকারী এসে তার হাতে থাকা ছুরিটা চিন্টুর পেটে ঢুকিয়ে দিলো।

এটা দেখেই রূপা চিৎকার করে উঠলো। আর চিন্টুও তৎক্ষণাৎ ব্যথায় কাতরে উঠলো।

এদিকে চিন্টুর পেটে ছুরি ঢুকিয়ে চিন্টুকে কোনোমতে কাবু করতে না করতেই ছিনতাইকারী দুটোও তাদের প্রাণ হাতে করে কোনো মতে সেখান থেকে ছুটে পালালো।


চিন্টু তখন রাস্তায় শুয়ে পেটে ঢুকানো ছুরির আঘাতে কষ্ট পেয়ে গোঙাতে লাগলো। রূপা দৌঁড়ে গেলো চিন্টুর কাছে। গিয়ে দেখলো চিন্টু খুব খারাপভাবে জখম হয়েছে। অনেকটা রক্ত বেরিয়েছে। এমনকি এখনো রক্ত বের হচ্ছে চিন্টুর পেট থেকে। রূপা তৎক্ষণাৎ তার বাড়িতে ফোন করে এবং তার সাথে সাথে অ্যাম্বুলেন্সকেও খবর দেয়। এবার চিন্টুর মাথা কোলে নিয়ে মাঝ রাস্তায় বসে আছে রূপা। আর কাঁদতে কাঁদতে চিন্টুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে-" কোথায় গিয়েছিলি রে চিন্টু আমাকে ছেড়ে? একয়দিন কত্ত খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পাই নি তোকে। আর আজ যখন তোকে কাছে পেলাম তখন দেখ কি অবস্থা হয়েছে তোর। চিন্টু তুই চিন্তা করিস না। আর একটু কষ্ট কর। অ্যাম্বুলেন্স এক্ষুনি আসছে। তুই আবার সুস্থ হয়ে যাবি। কিচ্ছু হতে দেবো না আমি তোর। দেখবি তুই আবার আগের মতো হয়ে যাবি। তারপর আমরা সবাই মিলে আবার একসাথে থাকবো ঠিক যেমনটা আগে ছিলাম। আমি তোকে আর কখনো আমার থেকে আলাদা হতে দেবো না।"

চিন্টুও তখন রূপার মুখের দিকে চেয়ে নীরবে রূপার বলা প্রত্যেকটা কথা শুনছিলো। এদিকে চিন্টুর শরীর থেকে বেশ খানিকটা রক্ত বেরিয়ে যাওয়ায় তার শরীরটাও ক্রমশই দুর্বল হয়ে আসছে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু তখনো কান খাড়া করে শুনছিলো রূপার বলা প্রতিটা কথা।

যখন রূপা তার চিন্টুকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো তখন ভাগ্য বিধাতার হয়তো অন্য কোনো ইচ্ছা ছিল। তাই হয়তো চিন্টুও তখন বুঝতে পেরে গিয়েছিলো যে তার হাতে আর বেশি সময় নেই‌ । খুব শীঘ্রই তার সময় শেষ হয়ে আসছে ।

তবুও যেন‌ রূপার দেওয়া মিথ্যা সান্ত্বনাগুলোই তার বিশ্বাস করতে মন চাইছিলো। ফিরে যেতে চাইছিলো রূপার সাথে সেই অতীতের সময় গুলোতে যখন রূপাই ছিল তার সবথেকে বড় আশ্রয়।

কিন্তু হয়তো আর সেই উপায় নেই। তাই আসন্ন সময় উপলব্ধি করতে পেরেই চিন্টু শেষ বারের মতো তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে একবার রূপার দিকে মাথা উঁচু করে তুললো আর তারপর পরম স্নেহের সহিত তার হাতটা চেটে দিয়ে তার প্রতি শেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। রূপাকে হয়তো এটাই বোঝাতে চাইলো যে সে এখন তার জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে উপস্থিত। কিন্তু রূপার প্রতি সে আজীবন কৃতজ্ঞ।


হঠাৎই তখন দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ পাওয়া যায়‌‌। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটা দেরী হয়ে যায়। চিন্টু তার সবথেকে প্রিয় বন্ধু রূপার কোলের ওপরে মাথা রেখেই পরম নিশ্চিন্তে জীবনের শেষ ঘুমটা ঘুমিয়ে পড়েছিলো।

রূপাও এতক্ষণে বুঝতে পেরে গেছিলো যে তার সবথেকে কাছের বন্ধুটা এখন সমস্ত সম্পর্কের বন্ধনের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে। যেখানে থেকে আর চাইলেও কখনো চিন্টুকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

এদিকে রূপার বাবা মা ততক্ষণে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হয়‌। কিন্তু পরিস্থিতি তখন হাতের বাইরে। মেয়েকে ওভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে দৌঁড়ে যখন রূপার বাবা মা তার কাছে যায়। তখন রূপা সবটা তার বাবা মায়ের কাছে খুলে বললো। মেয়ের মুখ থেকে সমস্ত ঘটনা শোনার পর রূপার মা নিজের কাছেই নিজে খুব ছোট হয়ে যায়। আর ভাবতে থাকে তিনি যেই রাস্তার কুকুর ছানাটির সাথে এত অন্যায় করেছে আজ সেই প্রাণীটিই তাদের মেয়ে রূপার সাথে হওয়া অন্যায়ের হাত থেকে রূপাকে উদ্ধার করেছে।

এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে সেখানে উপস্থিত সকলেরই চোখ জলে ভরে উঠলো। কেউই আর চোখের জলকে আটকে রাখতে পারলো না‌ । এদিকে রূপাও তার এতদিনের বন্ধু চিন্টুকে হারানোর কষ্টে অঝোরে কেঁদেই চলেছে।

এমন সময় রূপা জল ভরা চোখে ঝাঁপসা দৃষ্টিতেই লক্ষ্য করলো অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে তার সবথেকে কাছের বন্ধু চিন্টু। আর তারই পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে চিন্টুর মা । চিন্টু যেন রূপার দিকে তাকিয়ে এটাই বোঝতে চাইলো - এই জগতে যে চিন্টু তার মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলো হয়তো পরোলোকে গিয়ে নিশ্চয়ই তার মায়ের কোলেই সেই নিরাপদ আশ্রয়টুকু খুঁজে পাবে। যে আশ্রয় সে এতদিন খুঁজে পেতো শুধুমাত্র রূপার কোলেই।

আর সেই আশ্রয়দানেরই প্রতিদান স্বরূপ আজ চিন্টু নিজের জীবনের বিনিময়ে রূপার সম্মান বাঁচিয়ে চলে গেলো এক গন্তব্যহীন ঠিকানার পথে।

------------------০-----------------

সত্যি বলতে তো এমন হাজারো রাস্তায় পড়ে থাকা চিন্টু রয়েছে যাদের গল্প না বলাই থেকে যায়। বেঁচে থাকার জন্য তাদের নিরন্তর সংগ্রাম করে থাকার পরেও মানুষের থেকে সহানুভূতি তো দূরের কথা বিনিময়ে কেবলই আঘাত পেয়ে থাকে যেটা কখনোই তাদের প্রাপ্য নয়। আমরা মানুষেরা এটা ভুলে যাই এই পৃথিবীতে তাদেরও ভালোভাবে বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই অধিকারের পথে আমরাই সবথেকে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াই।

আজকাল মানুষ যেখানে মনুষ্যত্ব আর কৃতজ্ঞতাবোধ ভুলতে বসেছে সেখানে রাস্তার প্রাণীগুলোই যেন তাদের জীবনের বিনিময়ে ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই। আমরা মানুষেরা আর কয়টা চিন্টুরই বা খোঁজ রাখি।

তাই সকলের প্রতি অনুরোধ আমরা যেন এমন রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায় চিন্টুদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। তাদের খাবার দিতে না পারলেও অন্তত যেন আঘাত না করে বসি। কারণ তারাও বাঁচতে চায় এই সুন্দর পৃথিবীতে।


###
( গল্পটি পড়ে আপনাদের মূল্যবান মতামত জানানোর জন্য অনুরোধ রইলো। সেই সাথে সাথে গল্পটিকে রেটিং দিয়ে মূল্যায়ন করারও বিশেষ অনুরোধ রইলো। আপনাদের মতামত আর উৎসাহই আমার লেখালেখির অনুপ্রেরণা। তাই আপনাদের শুভকামনা একান্তই কাম্য। ধন্যবাদ 🥰)
236 Views
9 Likes
3 Comments
4.8 Rating
Rate this: