প্রতিদান (তৃতীয় পর্ব)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
কিন্তু বিধি বাম। হয়তো রূপা আর চিন্টুর প্রতি ভাগ্য বিধাতা সহায় ছিলেন না। যার পরিণাম স্বরূপ রূপা আর চিন্টুর বন্ধুতও পড়ে যায় সময়ের রোষানলে। সময় তাদের এমন এক পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করায় যার মুখোমুখি হওয়ার কথা হয়তো তারা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।


সেদিন রূপার বাড়িতে রূপার বাবা মায়ের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। সেই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং অতিথিবৃন্দের আপ্যায়ন করতে যখন একদিকে রূপার বাবা মা ছিলেন ব্যস্ত। অন্যদিকে তখন রূপা তার এক স্কুল বান্ধবীর সাথে বারান্দায় বসে গল্প করছিলো।

এমন সময় রূপারই এক বন্ধু রোহান যে কিনা ছিল রূপারই বাবার বিজনেস পার্টনারের ছেলে, চুপি চুপি একটা ভূতের মুখোশ পড়ে আর হাতে নকল খেলনা চাকু নিয়ে পা টিপে টিপে রূপার দিকে এগোতে লাগলো রূপাকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে।

কিন্তু এটা যে নিছক মজা ছিল সেটা তো আর বেচারা চিন্টু বুঝতে পারেনি। সে ভাবলো তার সবথেকে প্রিয় বন্ধু রূপার সমূহ বিপদ।তাই দূর থেকে রূপার পিছনে আসা রোহানের ভাবগতি দেখে চিন্টু কারো কোনো কিছু বোঝার আগেই রোহানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আর চিন্টুর মতে রোহান যেহেতু তার বন্ধু রূপার বিপদের কারণ ছিল তাই সে রোহানের ওপর হামলা করে কামড় বসিয়ে দিলো।

অতি অল্প সময়ের মধ্যে এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার জন্য হয়তো কেউই তখন প্রস্তুত ছিল না। রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেন সবটা ওর চোখের সামনে স্বপ্নের মতো ঘটে গেলো। রূপা আর তার বান্ধবী তখনো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।


এদিকে রোহানের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে রূপার বাবা মা সহ বাড়িতে থাকা সকল অতিথিবৃন্দ ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হয়‌। এমন একটা ঘটনা দেখে সকলেই বেশ অবাক‌ হয়ে যায়।

আহত অবস্থায় রোহানকে দেখতে পেয়ে তার বাবা মা এবার খুব রেগে যায় চিন্টু এবং রূপার বাবা মায়ের ওপর। রোহানের মা রেগেমেগে বলতে লাগলো-" নিজেদের বাড়ির কুকুরকে কোনো আদব কায়দা শিখাতেই পারেননি। এভাবে জংলী পশুর মতো কামড়ে ছিঁড়ে কি অবস্থা করেছে আমার ছেলেটার। এমন কুকুর তো যখন তখন যাকে খুশি খুনও করে ফেলতে পারে। অবশ্য বাড়ির কুকুরকে বলে কি হবে। বাড়ির লোকেরাই তো কোনো ম্যানার জানে না।"
এসব বলে রোহানের মা-বাবা রোহানকে তাদের গাড়িতে করে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন। আর যাওয়ার আগে রোহানের বাবা রূপার বাবাকে বলে গেলেন- "আপনাদের কাছ থেকে কখনো এমন ব্যবহার আশা করিনি। আর আমার ছেলের এমন করুণ অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের সাথে আমি কোনো রকম আত্মীয়তা বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক নই। তাই আপনার সাথে থাকা সব বিজনেস ডিল আমি এই মুহূর্তে ক্যান্সেল করছি।"
এটা বলেই রূপার বাবাকে কিছু বলতে দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে রোহানের বাবা তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।


এদিকে বাড়িতে উপস্থিত সকল অতিথির সামনে এমন একটা কেলেঙ্কারি ঘটার সব দায় যেন এসে পড়লো বেচারা চিন্টুর ওপরে। অবলা প্রাণী হওয়ায় বেচারা নিজের হয়ে কিছু বলতেও পারছিলো না তখন। রূপার মা রেগেমেগে চিৎকার করতে করতে বললেন -" দেখেছো রূপা আমি তোমাদের বাবা মেয়েকে আগেই বলেছিলাম ঐ কুকুর ছানাটিকে বাড়িতে না রাখতে। ঐ দিন যদি তোমরা আমার কথা শুনতে তাহলে আর আজ এই দিন দেখতে হতো না‌। কিন্তু তোমাদের জেদের পরিণাম পেলে তো আজ হাতেনাতে। রাস্তার কুকুর কখনো বাড়িতে শোভা পায় না। আজ এই কুকুরটার জন্যেই বাড়িভর্তি অতিথিদের সামনে আমাদের মান সম্মান হারাতে হলো। তাই এখনি ওকে এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের করে দাও। আর কখনো যেন ওকে এই বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখতে পাই।"

রূপার মায়ের বলা এই কথাগুলো রূপার আর তার বাবার মুখ বুজে শুনতে থাকা ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না। যখন রূপার মা চিন্টুর বিরুদ্ধে এতগুলো কথা বলছিলো তখন চিন্টু নিশ্চুপ হয়ে রূপার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো আর মাথা নিচু করে তার বিরুদ্ধে বলা সকল অভিযোগ যেন মাথা পেতে স্বীকার করে নিলো।

রূপা আর তার বাবা তখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। রূপার মা তখন বাড়ির দারোয়ানদের ডাকলো এবং কুকুরটিকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিল।

নির্দেশ মতো বাড়ির দারোয়ানরাও চিন্টুকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য চিন্টুর দিকে এগোতে লাগলো। কিন্তু কিছুক্ষণ আগের ঘটনার পর কারোরই আর চিন্টুর সামনে যাওয়ার সাহস হচ্ছিলো না‌।

এদিকে তখনও চিন্টু মাথা নত করে রূপার পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবারে রূপার মা স্বয়ং এসে চিন্টুর কান টেনে ধরে তাকে ঘর থেকে বের করে দিতে আসলে চিন্টুও তার সবথেকে কাছের বন্ধু রূপার দিকে তাকিয়ে ডাকাডাকি করতে শুরু করে। যখন চিন্টু ভাবছিলো তার বন্ধু রূপা তাকে নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বের করতে দেবে না ঠিক তখনই রূপাকে নিশ্চুপ দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখে চিন্টুও বুঝে যায় রূপা আজ হয়তো রূপাও তার পথ আগলে দাঁড়াবে না। এতদিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে যখন চিন্টুকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিলো তখনও চিন্টু কেবল জলভরা চোখে রূপার দিকেই তাকিয়ে ছিল আর এই আশাই করছিলো হয়তো এখনই তার বন্ধু তাকে দৌঁড়ে এসে কোলে তুলে নেবে।

কিন্তু আফসোস! আজ আর রূপা এসে তাকে কোলে তুলে নিলো না আর না তো তার পথ আগলে দাঁড়ালো। অভিমান আর কষ্টে চিন্টুর চোখ থেকে জল পড়তে লাগলো। আফসোস তো এটাই যে সেই চোখের জল হয়তো রূপা বা তার বাড়ির কোনো লোকের আর চোখেই পড়লো না। তাই হয়তো বেচারা চিন্টুর কপালে তার বন্ধু রূপাকে বাঁচানোর জন্য এই পুরস্কারই জুটেছে।

রূপার মা চিন্টুকে বাড়ির বাইরে বের করে দিয়ে গেট আটকে দেয়। চিন্টু তখনও রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাগলের মতো রূপার রুমের দিকে তাকিয়ে ডাকাডাকি করতে লাগলো। কিন্তু সেই ডাক হয়তো আজ আর রূপার কান অব্দি পৌঁছালো না। তাইতো আজ বারান্দায় এসে রূপা আর তাকে দেখা দিলো না‌। রাস্তায় বেশ কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পরেও যখন রূপার দেখা পেলো না তখন চিন্টুও মনের দুঃখে খোলা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেলো।



অন্যদিকে রূপা যদিও তখন তার মায়ের ওপরে আর কোনো কথা বলতে পারে নি তবুও চিন্টুকে সে কখনোই হারাতে চায়নি। তবে আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর আর কোন মুখেই বা সে তার মায়ের ওপর কথা বলতো। তাই তখন সে নিশ্চুপ থাকলেও চিন্টুকে হারানোর বেদনা অশ্রু ধারা হয়ে তার চোখ থেকে গড়াতে লাগলো। রূপা দৌঁড়ে রুমে চলে গেলো। ঐদিন রাতে আর দরজা খোলেনি রূপা। সারাটা রাত কেবল চিন্টুর কথাই ভেবেছে আর অঝোরে কেঁদে গেছে; যার সাক্ষী হয়ে ছিল তার ঘরের বদ্ধ দেয়াল আর চোখের জলে ভিজে থাকা মাথার বালিশ।

চিন্টু এখন এত রাতে কোথায় আছে, কি করছে এসব ভাবতে ভাবতেই রূপার আরো বেশি কষ্ট হচ্ছিলো চিন্টুর জন্য। কিন্তু বাইরে বের হয়ে এত রাতে যে চিন্টুকে খুঁজে আনবে তারও তো কোনো উপায় ছিল না তখন।


চলবে......

###
( আপনারা যারা আমার গল্পগুলো পড়ছেন তাদের সকলের প্রতি বিশেষ অনুরোধ আপনারা দয়া করে গল্পটা পড়ে গল্পটা কেমন লাগলো তা অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন। কারণ আপনাদের মূল্যবান মতামত আমার লেখার জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়। সেই সাথে সাথে গল্পটিকে রেটিং দিয়ে মূল্যায়ন করার অনুরোধ রইলো 💐। ধন্যবাদ)
350 Views
12 Likes
4 Comments
5.0 Rating
Rate this: