অনুগল্প:স্নিগ্ধ কিরণ

কণ্যা সন্তান পিতা-মাতার জীবনের অতিথি স্বরূপ। নির্দিষ্ট একটা সময় এরা অবস্থান করে বাবার বাড়িতে। এর পরে চলে যেতে হয় অন্যের ঘরে। এই সমাজের বদৌলতে কন্যার পিতাকে অনেক কিছুই শুনতে হয়, সহ্য করতে হয়। শুধু করতে হয় না প্রতিবাদ। তার একমাত্র কারণ সন্তান হিসেবে কণ্যা জন্ম দেওয়া। অন্য কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তার সামনে দাড় করানো হয় “কণ্যাদায়গ্রস্থ পিতা-মাতাকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।” পিতা-মাতাদের সব কিছু সহ্য করতে হয় নিরবে। আমার বাবা-মাকেও সহ্য করতে হয়েছে যখন আমার বড় বোন নাসরার বিয়ে হয়। বিয়ের আগে আপুকে দেখতে এসেছিল দুজন বৃদ্ধা, হয়তো দাদি-নানি হবে। অনেক প্রশ্ন করেছিলো তারা আপুকে। তাদের প্রশ্নে আমরাও বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। রাগও হয়েছিলো কিছুটা। কিছু বলতে যাওয়ার মুহূর্তে বাবার রাগি দৃষ্টি আর মায়ের হাত ধরে নেওয়া আটকালো আমাদের। কিন্তু আমার আপুর ভাগ্য ভালো ছিল তাই তাকে বিব্রত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করলো সেই ছেলেটি যে তাকে দেখতে এসেছিলো। এতে বোঝা গেলো ছেলেটা মানুষ হিসাবে অনেক ভালো। পরবর্তীতে যার সাথে আপুর বিয়ে হয়েছিলো। তারা চলে যাওয়ার পর লাব্বাইক আর আদনান ভাইয়া বাবাকে ক্রদ্ধ কন্ঠে জিঙ্গাসা করেছিলো বাবা কেন আমাদের কিছু বলতে দেয়নি। বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেছিলো “মেয়ের বাবার প্রতিবাদ মানায় না”। আমি যখন বাবাকে জিঙ্গাসা করলাম কেন মানায় না। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন যখন মেয়ের মা হবি তখন বুজতে পারবি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কিছুতেই মেলাতে পারিনি মেয়ের বাবার কেন প্রতিবাদ করা বারণ।

এই মাত্রই মা জানিয়ে গেলো একটু পরে আমাকে দেখতে আসবে। মনের মধ্যে হাজার প্রশ্নের আনাগোনা করতে থাকলো আপুর মতো আমাকেও কি নানা প্রশ্ন করা হবে। বাবা ও কি সেদিনের মতো চুপ থাকবে। ভাইয়ারা কিছু বলতে গেলে সেদিনের মতোই আটকে দেবে, বলবে মেয়ের বাবার প্রতিবাদ করা নিষেধ। আমিও কি প্রতিবাদ করতে পারবো, নাকি মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে মেয়েদের প্রতিবাদ মানায় না। বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচাবে কি কেউ? এসব হাজার প্রশ্নের আনাগোনার মধ্যে আগমন ঘটলো মায়ের। নিয়ে গেলো পাত্রপক্ষের সামনে। যা ভাবছিলাম তা ই হলো শুরু হলো প্রশ্ন উত্তর। তাদের প্রশ্ন উত্তরে ক্লান্ত আমি অসহায় দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে ছিলাম বাবা-মায়ের দিকে। তাদের করূণ দৃষ্টি আমাকে আরো ব্যাথিত করলো। ভাইয়ারা কিছু বলতে গেলে থামিয়ে দিলো সেইদিনের মতো। একটা বিষয় আমার খুব অবাক লাগলো এতো প্রশ্নত্তোর হলো কিন্তু ছেলে একটা টু শব্দও করলো না। সব প্রশ্ন করলো তার বোন। শেষ হলো তাদের প্রশ্ন উত্তর। আমি গিয়ে দাড়ালাম মায়ের পাশে। মা আমার মাথায় হাত রাখলো। বাবার সাথে কথা-বার্তা বলে তারা জানালো আমাকে তাদের পছন্দ হয়েছে। আজকেই বিয়ের তারিখ ঠিক করা হবে কিনা তা নিয়ে কথা বলার সময় আমি বলে উঠলাম,
- থামুন।

আমি তাদের বাধা দেওয়ায় সবাই চকিতে তাকালো আমার দিকে। মা আমার হাত ধরে থামানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু আমি মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিলাম। আমাকে তাদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বাবা মুখে কাঠিন্যভাব এনে এগিয়ে এলেন আমার দিকে। পাত্রপক্ষ থেকে এক মিনিট সময় নিয়ে আমার হাত ধরে মায়ের কাছে নিয়ে এলেন।
- কি হচ্ছে লিয়ানা?
আমি দৃষ্টি নিম্ম করে সম্মানের সহিত বাবাকে বললাম,
- আমি একটু কথা বলতে চাই।
মা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
- উনারা খাওয়া-দাওয়া শেষ করুক তারপর তোমাদের কথা বলতে দেওয়া হবে।
আমি মায়ের দিকে অনুরোধের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
- আমি ওনার পুরো পরিবারের সাথে কথা বলতে চাই।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম পাত্রপক্ষের কাছে। পেছন থেকে ভাইয়ারা ডাক দিয়েছিলো দুই বার। কিন্তু আমি না শোনার ভান করে এগিয়ে গেলাম। ছেলের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে বললাম,
- এবার আপনার ভাইবা দেবার পালা।
কথাটা শোনা মাত্রই উপস্থিত সবাই আমার দিকে চকিতে তাকালো।
- তোমার মেয়ে কি বলছে ফারদিনা? সামলাও ওকে।
মা আমাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসলে মাকে থামিয়ে দিয়ে, “আমকে বলতে দাও” বলে সামনের চেয়ারে বসে পড়লাম।
- আপনি বিয়ে করবেন?
ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো।
- তাহলে আপনার বাবা, কাকা, মামাকে নিয়ে এসেছেন কেন?
ছেলের বোন প্রতিত্তোর করতে চাইলে আমি ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম,
- থামুন আপনি, আপনার ভাইকি উত্তর দিতে পারে না। যাকে জিঙ্গাসা করা হয়েছে তাকে উত্তর দিতে দিন।
দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের দিকে তাকাতেই সে নরম সূরে বললো,
- উনাদেরও তো একটা পছন্দ অপছন্দ আছে।
- আচ্ছা তাহলে আপনার পরিবার যাকে আপনার জন্য ঠিক করবে তাকেই বিয়ে করবেন আপনি?
ছেলেটি আবার মাথা নেড়ে হ্যাঁ উত্তর দিলো।
- এতোক্ষন তো আপনার বোন অনেক প্রশ্ন করলো। আপনার কোনো প্রশ্ন ছিলো না?
- আপুতো প্রশ্ন করলোই। আমার আর কি প্রশ্ন থাকতে পারে?
আমি একটা অবজ্ঞাপূণ হাঁসি দিয়ে বললাম,
- আপনি বিয়ে করছেন কেন? পাত্রী পছন্দ করবে আপনার পরিবার, প্রশ্ন করবে আপনার আপু। আপনি বিয়ে করে কি করবেন? কাকে বিয়ে করবেন এই সিদ্ধান্তটাই যদি নিতে না পারেন তাহলে বিয়ের পর স্ত্রীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন কিভাবে? নাকি সেটা আপনার পরিবার আর বোন নিবে।
আমার কথায় একটা লোক উঠে দাড়িয়ে কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো,
- নিজাম উদ্দিন তোমার বাড়িতে কি আমরা অপমানিত হতে এসেছি? মেয়ের বিয়েই যখন দিবে না আমাদের ডেকে এনেছো কেন? তোমার মেয়ের অপমান সহ্য করার জন্য।
লোকটির কথায় আমিও উঠে দাড়ালাম,
- কেন বিয়ে দিলে কি অপমান সহ্য করতেন?
লোকটা কিছু বলার আগেই কেউ আমাকে হেচকা টান দিয়ে তার দিকে ঘুরালো। ঘুরে বাবাকে দেখতে পেলাম। বাবা আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে গেলো।
- তোমার মেয়েকে সামলাও ফারদিনা, কি বলছে এসব। আমার মান-সম্মান ধূলোই মিশিয়ে দিচ্ছে।
- তোমার মান-সম্মান বাঁচানোর জন্য বলছি বাবা।
বাবা হতভম্বের মতো আমার দিকে তাকালো।
- তুমি ওদের অন্যায় দেখেও ওদের কিছু বলছো না। তাই আমি বললাম।
বাবা একটা তপ্তশ্বাস ফেলে বললেন,
¬- মেয়ের বাবাকে এতো কথা বলতে হয় না।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম,
- কেন হয় না বাবা। তুমি জানো শতকরা ১০০ভাগের ২০ভাগ মেয়ে জীবনে সুখী হয়। ৩০ভাগ নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দেয়। আর বাকি ৫০ভাগ তাদের জীবনের অশান্তির মূল কারণ মেয়ের বাবার চুপ করে থাকা।
বাবা কিছু বলতে চাইলে আমি দুহাতে বাবার হাত আগলে নিয়ে বাবার হাতের উল্টে পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,
- বাবা তুমি জানো মেয়ের বাবাকে কতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তিরমিজি হাদিস ১১০২ এ রাসূল(সাঃ) মেয়েদের অভিবাবক ব্যতিত বিয়ে বিয়েকে বাতিল বলেছেন। শুধু একবার নয় তিনবার। আর বিয়েতে তো মেয়ের মতকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাহলে কোথায় মেয়ের বাবাকে সব মুখ বুজে সহ্য করতে বলা হয়েছে। বল আমাকে। বাবা জানো বিয়ের আগ পর্যন্ত মেয়েরা তার বাবার দায়িত্ব। বাবার অবর্তমানে ভাই/চাচা/দাদা/নানা/মামার। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে তাদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে। আচ্ছা বাবা বিয়ের পর মেয়ের একমাত্র অভিভাবক তো তার স্বামী। আমি যদি বিয়ের পরে সুখী না হই তোমরা কি তখন আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? পারবে না। যেখানে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবার বাড়িতেও আসতে পারে না সেখানে বাবা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিবে। জানো বাবা চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে। আর পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু সূর্য। সূর্যের তেজ যেমন চাঁদকে আলো ছড়াতে সাহায্যে করে তেমনি তুমি যদি আমাকে আগলে না রাখো যদি না হও সূর্য তেজ তাহলে আমি কিভাবে ছড়াবো স্নিগ্ধ কিরণ। মেয়ের কথায় নিজাম উদ্দিন অশ্রুশিক্ত নয়নে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। দুফোঁটা নোনা পানি গড়িয়ে পড়লো ফারদিনার কপোল বেড়ে। পাত্রপক্ষ ক্ষোপ প্রকাশ করতে চাইলে লাব্বাইক আর আদনান তাদের বেড়িয়ে যেতে বললেন।
- উনারতো খেয়ে গেলো না।
মায়ের কথায় বাবা কিছুটা বিরক্ত হলেন। কঠোর গলায় বললেন,
- যারা আমার মেয়েকে কথা শুনিয়েছে তাদের না খেয়ে যাওয়ার জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করছো।
আজকে অনেকদিন পর আমার খুব ভালো লাগছে। বাবার কাছে করা প্রশ্নে উত্তর নিজের বের করলাম যে। সত্যি মেয়ের বাবার চুপ করে থাকতে নেই। তারা যে মেয়ের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মেয়ে নামক চন্দ্রের সূর্য। যার তেজে আমরা ছড়াবো স্নিগ্ধ কিরণ।
337 Views
8 Likes
2 Comments
4.9 Rating
Rate this:
(8)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (2)

Reader photo
SP.Provash
22-May-2024, 02:58 PM

একদম ঠিক বলেছেন।

Reader photo
Shafiqul Islam
10-May-2024, 10:55 AM

মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে