মুণ্ডুহীন নারী মূর্তি (শেষ পর্ব)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
এবার আমার হাতে কোনো উপায়ও ছিল না। তাই এক রকম নিরুপায় হয়েই ঐ মেয়ের পিছনে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতেই ঐ অন্ধকার জঙ্গলে হঠাৎ পায়ে কিছু একটা বেঁধে হোঁচট খেলাম। বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় হোঁচট খেয়ে কাঁদায় মাখামাখি অবস্থায় উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। হাত থেকে ছিটকে যাওয়া মোবাইল ফোন আর বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়েই ফোনের ফ্ল্যাশ রাস্তার দিকে ফেলতেই আমার যেন মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো।

ফোনের ফ্ল্যাশে আলো আঁধারের মাঝে দেখলাম আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা বাছুরের পঁচা-গলা মৃতদেহ। একটা বিশ্রী গন্ধে যেন গা গুলিয়ে উঠলো। আশেপাশের সমস্ত পরিবেশটা যেন বিদঘুটে হয়ে উঠলো। এরকম একটা পরিস্থিতির জন্য আমি কখনো প্রস্তুত ছিলাম না।

এসব দেখে আমার হুঁশ উড়ে যেতেই যেই না সামনে থাকা মেয়েটাকে ডাকার উদ্দেশ্যে সামনের দিকে তাকালাম তখন খেলাম আরেক ঝটকা। দেখি আবারো মেয়েটা গায়েব হয়ে গেছে। কোথাও কারো কোনো সারা শব্দ নেই। এরকম একটা পরিস্থিতিতে পড়ে নিজেকেই দোষারোপ করতে লাগলাম কেন এত রাতে এই জঙ্গলের রাস্তায় আসলাম। তবে এখন আর এসব ভেবে লাভ কি। এবার যেভাবেই হোক আমাকে এই জঙ্গলের পথ থেকে বের হতেই হবে‌। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি চেষ্টা করলাম জঙ্গলের রাস্তা পার করার। তাই গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে জোরে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম।


বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটির পর এসে একটা খাল পাড়ের সামনে দাঁড়ালাম। তখন দেখি খালের ওপর একটা সাঁকো। ভাবলাম খালের ওপারেই হয়তো লোকালয়। তাই কিছু না ভেবেই ঐ খাল পার করার জন্য খাল পাড়ের দিকে এগোতে লাগলাম। ঠিক তখনই পিছন থেকে আবার সেই নারী কণ্ঠ টের পেলাম। তবে এবার এটা কোনো স্বাভাবিক আওয়াজ ছিল না। বরং বেশ ভয়ানক আর বিকট একটা অট্টহাসি হেসে সেই মেয়ে আমাকে পিছন থেকে ডাকতে শুরু করলো। কিন্তু আমি এবার আর পিছনে ফিরে তাকানোর সাহস পেলাম না। আমি খাল পার হতে সাঁকোর ওপর উঠতে যাবো এমন সময়ই হঠাৎ আমার হাত টেনে ধরলো। এবার আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আমাকে ধরে রাখা ঐ হাতটা ছিল বেশ ঠান্ডা। যেন কোনো মৃত শরীরের স্পর্শে আমার শরীর শিহরিত হয়ে উঠলো।

সাহস করে পিছনে ফিরে তাকাতেই আমি যেই ভয়ানক দৃশ্য দেখলাম তা হয়তো স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি। এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল ‌। হৃদস্পন্দন বাড়তে লাগলো।

দেখলাম ঐ অজ্ঞাত নারী মূর্তি। তবে এ আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো নয়। কারণ তার মুণ্ডুহীন দেহ আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আর তার কাঁটা মাথাটা তারই ডান হাতে‌। এমন দৃশ্য দেখতেই ভয়ে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। আমি হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার পা যেন আটকে গেছে। এদিকে সেই ভয়াবহ মুণ্ডুহীন নারী দেহ আমার দিকেই ক্রমশ এগিয়ে আসছে‌ । আর সেই সাথে চারপাশে বাতাসে ভেসে আসছে তার পৈশাচিক হাসির শব্দ। এমনটা মনে হচ্ছিলো যেন আমার সামনেই সাক্ষাৎ আমার মৃত্যু দাঁড়িয়ে। কিছু মাত্র দূরত্ব রয়েছে আমার জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ‌। এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখার আর সাহস রইলো না আমার। হাত থেকে অজান্তেই ফোনটা পড়ে গেলো। সেই সাথেই সবটা অন্ধকার। তারপর আর কিছু মনে নেই।

পরেরদিন সকালে নিজেকে আবিষ্কার করলাম গ্রামের এক প্রতিবেশীর বাড়িতে। আশাপাশটা তাকিয়ে দেখলাম গ্রামের অনেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই সাথে আমার পাশে বসে রয়েছে গ্রামের মেম্বার। আমাকে চোখ খুলতে দেখে সকলেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। আর আমিও এটা ভেবে খুশি হলাম যে গত রাতে মৃত্যুর সাথে ভয়াবহ সাক্ষাৎকারের পরেও বেঁচে রইলাম।


এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মেম্বার জিজ্ঞেস করে উঠলেন -" মাস্টার মশাই, আপনি কেনই বা খামোখা অত রাতে ঐ জঙ্গলের রাস্তায় গিয়েছিলেন? আপনি কি জানেন না ঐ রাস্তা কতটা ভয়ানক। তার ওপরে যেখানে দিনের বেলাতেই মানুষ ঐ জঙ্গলের রাস্তায় যেতে ভয় পায় আর আপনি কিনা সেখানে অতো রাতে গিয়েছিলেন তাও আবার একা একা । আপনার তো ভাগ্য ভালো যে বেঁচে ফিরেছেন। নয়তো ভালো মন্দ কিছু হয়ে গেলে তখন?"

মেম্বারের প্রশ্নের উত্তরে আমি নিশ্চুপ হয়ে রইলাম।

এবার গ্রামের এক প্রবীণ লোক আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন গত রাতে আমার সাথে ঠিক কি কি ঘটেছিলো।

আমি সবটা তাদের খুলে বলতেই সেখানে উপস্থিত সবার মুখেই একটা আতঙ্কের ভাব স্পষ্ট ফুটে উঠতে দেখলাম।

এবারে সেই বৃদ্ধ লোককে আমি জিজ্ঞেস করলাম- "কেনই বা ঐ জঙ্গলের রাস্তা এতোটা ভয়ানক আর কেই বা ঐ মেয়ে। আর এর ইতিহাসটাই বা কি?"

তখন সেই বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেই অতীতের ঘটনা বলতে শুরু করলেন।
তিনি বললেন -" এটা এখন থেকে প্রায় দশ বছর আগের কথা। তখন গ্রামে রামু গোয়ালা তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এই গ্রামেই বাস করতো। বেশ ভালোই কাটছিলো সবকিছু। কিন্তু হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ঘটে যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বিকালে রামু গোয়ালার মেয়ে লক্ষ্মী জঙ্গলের কাছের মাঠটাতে গরুগুলো বেঁধে রেখেছিলো। রীতিমতো সন্ধ্যার সময় যখন গরুগুলোকে গোয়ালে ফিরিয়ে আনতে যায় তখন দেখতে পায় একটা বাছুর সেখানে নিখোঁজ। এই ভেবে মেয়েটি ঐ দিন সন্ধ্যায় মেয়েটিও বাছুরটাকে খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। আর ওটাই তার জীবনের কাল ছিল। এরপর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায় কিন্তু মেয়েকে আর বাড়ি ফিরতে না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ে রামু গোয়ালা। মেয়ের চিন্তায় গ্রামের আরো কিছু লোককে সাথে নিয়ে ঐ রাতেই জঙ্গলে মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু সারাটা রাত ধরে শত খোঁজাখুঁজির পরেও কোনো সন্ধান মিললো না লক্ষ্মী আর তার বাছুরের‌। এই ঘটনার ঠিক দুদিন বাদেই ঐ জঙ্গলের মাঝে থাকা একটা খাল পাড়ে সন্ধান মিললো লক্ষ্মী আর তার বাছুরের। তবে দুঃখের বিষয় তখন তারা কেউই বেঁচে ছিল না। হঠাৎ করেই এমন একটা ভয়াবহ রহস্যময় মৃত্যুতে সারাটা গ্রামে যেন অজানা আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে। এদিকে একমাত্র মেয়ের এমন রহস্যজনক নৃশংস মৃত্যুতে রামু দুঃখে অভিমানে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। কোথায় যায় কেউ জানে না। তবে সেই থেকে আজ অবধি কেউই জানতে পারেনি সেই রাতে ঠিক কি হয়েছিলো লক্ষ্মী আর তার বাছুরের সাথে। আর কে বা কারাই লক্ষ্মী আর তার বাছুরের এই অবস্থা করেছে। তবে লক্ষ্মীর সেই দিনের সেই রহস্যময় মৃত্যুর পরেই জঙ্গলের ঐ রাস্তা হয়ে ওঠে অভিশপ্ত ‌ । এমন অনেকেই রাতের বেলা জঙ্গলের ঐ রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের সময় সেই ভয়াবহ মুণ্ডুহীন নারী দেহের সম্মুখীন হয়েছে। তাই তো এখন ঐ জঙ্গলের রাস্তায় কেউ যাতায়াত করে না‌ । তুমি এলাকায় নতুন এসেছো তাই হয়তো না জেনেই এই ভুলটা করে ফেলেছো। তবে বড় কোনো বিপদ হয়নি এইই রক্ষে। "

সেই বৃদ্ধের মুখে এমন একটা রহস্যময় করুন ইতিহাস শুনে আমি নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। আর সেই অভাগা লক্ষ্মীর কথা ভাবতে লাগলাম - যে বেচারির মৃত্যুর এত বছর পরেও তার মৃত্যুর আসল কারনটাই এখনো সকলের কাছে অজানা। আর তাই এখনো হয়তো অতৃপ্ত আত্মা হয়েই জঙ্গলের পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার সাথে হওয়া অন্যায়ের ন্যায্য বিচার পেতে।


---------------------------------০---------------------------------

***(গল্পটা কেমন লাগলো অবশ্যই জানাতে ভুলবেন না। সেই সাথে আপনার মূল্যবান মতামত এবং রেটিংয়ের মাধ্যমে গল্পটি মূল্যায়ন করার অনুরোধ রইলো)**
365 Views
19 Likes
6 Comments
4.9 Rating
Rate this: