আজ আমার ভাইপো তীর্থের জন্মদিন। আমাদের বাড়ির সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য, যার জন্য পুরো বাড়িটাই আনন্দে মেতে থাকে সবসময়। আর বাড়ির সবার আনন্দের কারণ যেই তীর্থ- তারই সবথেকে পছন্দের মানুষটি হলো ওর এই বড় কাকা;অর্থাৎ আমি। সেই ছোটবেলা থেকেই যত সব বায়না সবকিছুই ওর এই কাকার কাছে।
বাবা মায়ের কাছে সারাবছর থাকলেও বছরে যে সময়টা আমি গ্রামের বাড়িতে থাকি সেই পুরো সময়টাই ওর কাটবে কেবলই আমার সাথে। আমাদের কাকা ভাইপোর জুটিটাও জমতো বেশ। দারুন মজা আর খুনসুটির মধ্য দিয়েই আমাদের সময়টা কেটে যেতো।
তাইতো আমি এখনো যতই ব্যস্ত থাকি না কেন বছরের এই দিনটা অর্থাৎ তীর্থের জন্মদিনের দিন আমাকে ওর কাছে থাকতেই হবে। তাইতো গ্রামের বাড়িতে আবারো ছুটে আসা। আজ তীর্থ বছর ১৩ তে পা দিল। চোখের সামনেই দেখতে দেখতে ছেলেটা বড় হয়ে গেলো। তবে বয়সের তাগিদে বড় হলেও বেচারার মধ্যে এখনো সেই শিশু সুলভ আচরণটা বেশ প্রতীয়মান রয়েছে। এখনো সেই ছেলেবেলার মতোই কাকা ভাইপোর খুনসুটি লেগেই থাকে সবসময়। কোথাও ঘুরতে যাওয়া থেকে শুরু করে একটা চকলেট কেনার জন্যেও বায়না করবে ওর এই কাকার কাছেই।
আর আমিও ওর সকল আবদার রাখার মধ্যে এক আলাদাই মানসিক শান্তি খুঁজে পাই। তবে অন্যসব বায়না যেমন তেমন হলেও ওর একটা মারাত্মক আবদার হচ্ছে ভূতের গল্প শোনা। মানে যখনই ওর কাছে থাকবো তখনই ওকে ভূতের গল্প বলতে হবে আর এবার তো জন্মদিনের উপহার হিসেবে একটা ভূতের গল্পের বই ই আবদার করে রেখেছে।
তাইতো এবারে ওর ১৩ তম জন্মদিন উপলক্ষে বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায় রচিত " ভয় ও ভৌতিক সমগ্র" নামক বইটা উপহার হিসেবে দিয়েছি। বইটি পেয়ে বাবু আমার বেজায় খুশি।
এতদিন পর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সবার সাথে দেখা করে বেশ মানসিক শান্তি অনুভব করছি। শহরের একঘেঁয়েমি জীবন যাপনে যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠি তখনই যেন গ্রামের বাড়িতে এসে আবার নতুন করে বাঁচার উদ্দীপনা ফিরে পাই। বাড়িতে ঢুকেই দেখি এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
বাড়ির সকলেই তীর্থের জন্মদিনের আয়োজন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। তো আমি যাওয়াতে সবার আনন্দ বেড়ে আরো দ্বিগুন হয়ে গেছে। এদিকে তীর্থ তো আসার পর থেকেই আমার সাথে জোঁকের মতো লেগে আছে। ছেলে আমার কাকা অন্তে প্রাণ।
বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই প্রচণ্ড উৎসাহের সহিত আমাকে নিয়ে তার সমস্ত পরিকল্পনার কথা বলা শুরু করলো। আমিও বেশ মনোযোগ সহকারে তার কথাগুলো শুনতে লাগলাম। এদিকে তীর্থের জন্মদিনের অনুষ্ঠান যেহেতু রাতের বেলা, তাই সব আয়োজন করতে করতেই সারাটা দিন পার হয়ে গেলো।
রাতে জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে সকলের খাওয়া দাওয়ার পর তীর্থ এলো আমার রুমে। অনেকদিন পর আবার কাকা ভাইপো একসাথে ঘুমাবো। তবে আমরা কাকা ভাইপো একসাথে থাকলে রাতে ঘুম আর তেমন হয় না। কারণ গল্প বলতে বলতেই আমাদের রাত কেটে যায়। এদিকে এতদিন পর কাকাকে কাছে পেয়েই তীর্থের সেই পুরানো আবদার- ভূতের গল্প শোনা।
বললাম -" এবার তো তোকে গল্পের বই কিনে দিয়েছি তাহলে আবার গল্প বলতে হবে কেন?"
কিন্তু তীর্থের ঐ এক কথা যে, " গল্পের বই যতই পড়ি না কেন তোমার মুখে ভূতের গল্প শোনার মজাই আলাদা"। প্রথমে আমি ওকে এত রাতে ভূতের গল্প বলতে রাজি হই না।
কিন্তু কিই বা আর করার। অবশেষে নাছোড়বান্দা ভাইপোর আবদার রাখতেই হলো। তবে আমিও এবার ওকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলাম আমার জীবনের এক ভয়াবহ রাতের অভিজ্ঞতার কথা। যে ঘটনার রহস্য আজও আমার সমাধান করা হয়ে ওঠেনি।
আমি তীর্থের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে স্মরণ করতে লাগলাম আমার সেই পুরানো এক ভয়াবহ স্মৃতির কথা আর বলতে লাগলাম -
" শোন এটা কোনো গল্প নয়।এ হলো আমার জীবনের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। ঘটনাটা ঘটেছিলো অনেকদিন আগে।তখন আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।টার্ম ফাইনালের পর টার্ম ব্রেকের বন্ধ কাটাতে মামার বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম।
এমনিতেই শহরের রোজগার কোলাহল,একঘেঁয়েমি লেখাপড়ার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে আর হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যেই মূলত মামা বাড়ির পথে পাড়ি জমানো আর কি। যেই ভাবা সেই কাজ।
বেড়িয়ে পড়লাম মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে। ভাবলাম এবারের ছুটিটা মামাবাড়ির আদর আপ্যায়নেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে। এদিকে বহুদিন পর মামাবাড়ি যাওয়াতে সকলেই খুব খুশি। মামা-মামি বেশ খাতির যত্ন করতে লাগলো। এক কথায় বেশ আরাম আয়েশেই ছুটির দিনগুলো কাটছিলো।
কিন্তু হঠাৎ একদিন এলো যেই দিনটার কথা হয়তো স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করতে পারিনি। প্রতি দিনের মতোই সেদিনও বিকালে বের হলাম পুরানো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্য। অনেকদিন পর মামাবাড়ির পুরানো বন্ধুদের কাছে পেয়ে তাদের সাথে আড্ডাটা দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।
পুরানো বন্ধুদের কাছে পেতেই আড্ডা জমিয়ে দিলাম। পুরানো স্মৃতি আর হাসি ঠাট্টার মাঝে এতোটাই বিভোর হয়ে গেলাম যে আড্ডা দিতে দিতে কখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে সেটাই বুঝতে পারলাম না। এদিকে ফোনে চার্জ ছিল না বলে ফোনটা চার্জে বসিয়ে বাসাতেই রেখে এসেছিলাম তাই ফোনটাও তখন আমার সাথে ছিল না।
আরো গ্রামগঞ্জ বলে কথা- এখানে তো রাত হওয়ার আগেই রাস্তা ঘাট সব জনশূন্য হয়ে যায়। এখন এত রাতে একা একা বাড়ি কিভাবে ফিরবো সেটা নিয়েই চিন্তা করতে লাগলাম,তার থেকেও বড় চিন্তার বিষয় হলো মামা-মামি হয়তো এখনো বাড়ি ফিরছি না বলে দুশ্চিন্তা করছেন। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখন বাড়িতে ফিরতেই হবে। এই ভেবেই আড্ডার মাঝপথে আমি উঠে দাঁড়ালাম বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। তখন আমার দুই বন্ধু শুভ আর হৃদয় বললো ওরা প্রয়োজনে আমাকে আমার বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসবে। তাই আমার চিন্তা করার কারণ নেই। আমিও ওদের কথা শুনে একটু আস্বস্ত হলাম আর ভাবলাম এখন তো ফোনও নেই আর গ্রামের জনমানবহীন অন্ধকার রাস্তা একা একা পার হওয়াটাও নিরাপদ নয়। তার থেকে বরং ওদের সাথে যাওয়াটাই ভালো হবে আমার জন্য। এই ভেবেই আবার আড্ডায় বসে পড়লাম।এদিকে রাত আরো বাড়তে লাগলো। তো আড্ডা শেষ হতে হতে রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি ।এরপর আমি, শুভ আর হৃদয় মিলে রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে তখনকার নিস্তব্ধ গ্রাম্য রাস্তা রাতের অন্ধকারে আরো ভয়ানক হয়ে উঠলো। নিস্তব্ধ জনশূন্য রাস্তায় আমরা তিনজন ছাড়া দূর দূরান্তে কোনো প্রাণীর চিহ্নটুকুও পাওয়া যাচ্ছিলো না। এমন সময় হঠাৎ গ্রাম্য রাস্তার ঝোপের আড়াল থেকে জ্বল জ্বল করে ওঠা শিয়ালের চোখ দেখে এক মুহুর্তের জন্য আমার বুকের রক্ত জমে ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। জনমানবশূন্য নির্জন রাস্তায় যেন শ্মশানের মতো নীরবতা বিরাজ করছে। আর সেই নীরবতা ভেঙেই মাঝেমধ্যে শিয়ালের ডাক যেন ভয়টাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। এদিকে ভয় কাটানোর জন্য শুভ, হৃদয় আর আমি তিনজনে মিলে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলাম। তখন হঠাৎ করেই পদ্মপুকুর পাড়ে এসে শুভ হৃদয়কে বললো ওর হাতে থাকা টর্চ লাইটটা বন্ধ করতে। আমি কারণ জিজ্ঞেস করায় বললো ওকে খুব সিগারেটের নেশায় পেয়েছে। তাই এখন একটা সিগারেট ওকে ধরাতেই হবে। এদিকে যেন আবার গ্রামের কোনো মুরুব্বি আসলে ওকে সিগারেট হাতে দেখে না ফেলে তাই হৃদয়কে বললো টর্চ লাইট বন্ধ করে দিতে। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। এদিকে হৃদয়ও টর্চটা বন্ধ করে আমার পাশেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। তখন নিশি রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে। এমতাবস্থায় আমার শরীর হঠাৎ করেই ভার হয়ে উঠলো। কেন জানি না আমার বেশ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে লাগলো তখন। কিন্তু কিসের অনুভূতি সেটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। এদিকে শুভ মনের সুখে সিগারেট টেনেই যাচ্ছে আর নিথর মূর্তির মতো হৃদয় দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশে। ঠিক তখনই আমার মনে হচ্ছিলো কেউ যেন আমার ঘাড়ের কাছে তার গরম নিঃশ্বাস ফেলছে। ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হতেই পিছনে ফিরে তাকালাম। কিন্তু তখন আমরা তিনজন ছাড়া আর কারো উপস্থিতি অনুভব করতে পারলেও আবিষ্কার করতে পারলাম না। যাই হোক কিছু পরেই কারো যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটার আওয়াজ পেলাম। কিন্তু আশেপাশে তাকাতেই আমরা তিনজন ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলাম না।এবার আমার মনে ভয় লাগতে শুরু করলো। ভাবলাম এত রাতে যদি চোর ডাকাতের খপ্পরে পড়ি তাহলে তো আরেক বিপদ। এমনিতেই গ্রামে গঞ্জে তো চোর ডাকাতের উপদ্রব রয়েছে ।এসব ভাবছিলাম আর শুভকে বললাম তাড়াতাড়ি সিগারেট টা শেষ করে বাড়ির দিকে রওনা হতে। ততক্ষণে আমি যেন কোনো অশুভ ঘটনার ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই চারপাশের পরিবেশ যেন বদলাতে শুরু করলো। একটা দমকা বাতাসের সাথে সাথেই কেমন যেন একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে ভেসে আসতে শুরু করলো। আমি এবারে শুভ আর হৃদয় দুজনকেই বললাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। ওরাই আমার কথা মতো আবারো হাঁটা শুরু করলো। এবার আমরা দুয়েক কদম হাঁটতে না হাঁটতেই দেখি একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। লোকটা কে সেটা দেখার জন্য যখনই হৃদয় টর্চ মারলো লোকটার দিকে তখনই যেন সেই ছায়ামূর্তি হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেলো। এই অদ্ভুত দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমরা তিনজনেই।আমরা হতবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালাম।এবার আমাদের প্রত্যেকের মনেই যেন বিপদের আশঙ্কা জাগতে শুরু করলো। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আবারো দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আবারো দেখি সেই ছায়ামূর্তি আমাদের থেকে প্রায় দশ বারো হাত সামনে হাঁটছে। হঠাৎ করেই ঐ ছায়ামূর্তির আবির্ভাব আর প্রত্যাগমন দেখে আমরা তিনজনেই বেশ অবাক। কিন্তু তারপরেও সাহস করে শুভ জিজ্ঞেস করে উঠলো," এই ওখানে কে রে?" কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। তবুও আমরা এবারে ঐ ছায়ামূর্তির পিছু নিলাম। আর সেই ছায়ামূর্তিকে অনুসরণ করতে করতে তাল তলার মাঠে এসে উপস্থিত হলাম। বিস্তর ফাঁকা মাঠে কেবল তাল গাছের সারি দৃশ্যমান। রাতের আঁধারে তাল তলার মাঠটা যেন বেশ গা ছমছমে পরিবেশের রূপ ধারণ করলো।সেখানে দেখতে দেখতেই ঐ ছায়ামূর্তিটা আমাদের সামনেই একটা তাল গাছের আড়ালে চলে গেলো। আমরাও তৎক্ষণাৎ ঐ ছায়ামূর্তিকে পাকড়াও করার উদ্দেশ্যে ছুটে গিয়ে ঐ তালগাছের নিচে পৌঁছালে অবাক হয়ে যাই। কারণ একটু আগেই যেই ছায়ামূর্তি আমাদের চোখের সামনেই এই গাছটার আড়াল হলো মুহূর্তেই সেই ব্যক্তি কি করে কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেলো? এদিক ওদিক টর্চ মেরেও কারো কোনো উপস্থিতি চোখে পড়লো না। এসব দেখে আমাদের কারো মাথাতেই কিছু ঢুকছে না। ঠিক তখনই আমি অনুভব করলাম আমার ঘাড়ের কাছে জামাটা কেমন ভেজা ভেজা লাগছে। ঘাড়ে হাত দিতেই বুঝলাম জল জাতীয় কিছু হয়তো। কিন্তু যখন টর্চের আলোয় দেখলাম এটা জল নয় , এটা রক্ত তখন যেন আমাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। তিনজনেই হতবাক। এমন সময় হৃদয় তাল গাছের মাথায় টর্চ মারতেই যা দেখলো তা হয়তো দেখার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। এমন এক ভয়ানক দৃশ্য দেখলাম যা দেখার পর আমাদের তিনজনেরই বুকের রক্ত জমে গেলো। আমরা দেখলাম তালগাছের মাথায় উল্টো ভাবে ঝুলে আছে সেই ছায়ামূর্তিটা। তবে এটা কোনো মানুষ বা প্রাণী নয়। চোখ দুটো বেশ ভয়ানক ছিল যেখানে মণির বদলে ছিল কালো বড় বড় গর্ত আর মুখে লেগে ছিল তাজা রক্ত যার ফোঁটা পড়তেই আমার জামা ভিজে গেছে। এমন রক্ত হিম করা দৃশ্য দেখে আমরা তিনজনেই চিৎকার করতে করতে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম। ছুটতে ছুটতে হঠাৎই একদল জেলের সামনে এসে পড়লাম। দেখলাম প্রায় সাত আটজন জেলে তখন ঐ রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলো। আমাদের চিৎকার শুনে তারা দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাদের এরকম আতঙ্কিত অবস্থা দেখে তারা ছুটে এসে আমাদের জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। কিন্তু তখন আমরা কেউই কোনো কিছু বলার অবস্থাতে ছিলাম না। তখনও সবাই হাঁপাচ্ছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন একটু স্বাভাবিক হলাম তখন আমরা তাদের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। আমাদের মুখে এমন রোমহর্ষক ঘটনা শুনে সেখানে উপস্থিত সকলের চোখেই যেন আতঙ্ক ফুটে উঠলো। তারা সকলেই একসাথে উদ্যত হলো ঐ তালগাছের কাছে গিয়ে বর্ণিত ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে। প্রথমে তো আমরা কেউই যেতে রাজি হইনি। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের জোরাজুরিতে আমরা আবারো ঐ তাল গাছের গোড়ায় যেতে বাধ্য হই। কিন্তু যখন আমরা সবাই মিলে দ্বিতীয়বারের মতো ঐ তালগাছের কাছে যাই তখন গিয়ে দেখি যেই তাল গাছের চূড়ায় একটু আগেই সেই ভয়ানক ছায়ামূর্তিকে উল্টো হয়ে ঝুলতে দেখেছিলাম সেখানেই এখন তার কোনো চিহ্নটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও সেই অলৌকিক ছায়ামূর্তির কোনো হদিস পাওয়া গেল না ঐ রাতে। তবে যখনই সবাই মিলে ফিরে আসবো তখনই আমার চোখ পড়ে ঐ তাল গাছের গোড়ার দিকে। টর্চ মেরে ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখি গাছের গোড়ায় পড়ে আছে তাজা লাল রক্ত। এখনো রক্তে ভিজে আছে তাল গাছের গোড়ার মাটি। এমন একটা দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত সকলেরই মনে আর কোনো সন্দেহ রইলো না। তারা সকলেই বুঝতে পারলো আমরা এতক্ষণ কোনো বানিয়ে বানিয়ে গল্প শোনাই নি তাদের। এরপর সেই জেলেরা সবাই মিলে ঐ দিন রাতে আমাদের নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দিলো। এত রাত হয়ে যাওয়ায় গিয়ে দেখি মামা মামি বেশ দুশ্চিন্তা করছিলো। আমাকে দেখেই তারা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু এত রাত করে বাড়িতে ফেরায় আর আমাদের সাথে ঘটা এই ভয়ানক ঘটনা শোনার পর মামা আমাকে খুব বকাবকি করলেন। ঐ দিন রাতে আমি আর ঘুমাতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই সেই ভয়ঙ্কর ছায়ামূর্তির রক্তমাখা মুখটা ফুটে উঠছিলো বার বার। ঐদিন শেষ রাতেই আমার ধুমছে জ্বর আসে। এদিকে পরদিন সকাল হতে না হতেই আশেপাশের সমস্ত গ্রামে গতকাল রাতের সেই ভয়ানক ঘটনার কথা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়লো।সেই সাথে গ্রামবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো এক অজানা ভয়ের আতঙ্ক।ঐ দিনের পর থেকেই গ্রামবাসীরা বিকালের পর সেই পথে আর পা বাড়ানোর সাহস পায় না। গ্রামে গ্রামে রটে যায় ঐ পথে নাকি ডাকিনী-যোগিনী আর নরপিশাচদের যাতায়াত।তাই সকলে রাতের বেলা তো দূরের কথা দিনের বেলাতেও যথা সম্ভব ঐ ভয়ঙ্কর রাস্তা এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এদিকে আমিও জ্বর সেরে ওঠার পর পরই মামাবাড়ি থেকে চলে আসি। সেই যে মামাবাড়ি থেকে চলে আসলাম, তারপর এতোটা বছর কেটে গেলো আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি মামাবাড়ি। এই ঘটনা ঘটার পরেও বেশ কিছু দিন ধরে আমার ওপর তার একটা খারাপ প্রভাব ছিল। তবে আস্তে আস্তে সময়ের সাথে সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠি আর সেই ঘটানাটাও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ডাকিনী - যোগিনী বা নরপিশাচ যাই ই হোক না কেন ঐ দিন রাতে দেখা সেই ভয়ানক ছায়ামূর্তির রূপ আমি আজও ভুলতে পারিনি। এমনকি এখনো মাঝে মাঝে এটা ভাবলেই আমার গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে যদি কিনা ঐদিন রাতে আমি একা একাই বের হতাম ঐ রাস্তায় তাহলে না জানি কি ভয়ঙ্কর পরিণতিই লেখা থাকতো আমার কপালে। হয়তো শুভ আর হৃদয় আমার সাথে ছিল বলেই ঐ দিন রাতে ঐ ভয়ঙ্কর ছায়ামূর্তির থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছি।"
কথাগুলো বলা শেষ করতে না করতেই তীর্থ জিজ্ঞেস করে উঠলো," কাকু! পরে কি আর তোমার ইচ্ছা করেনি মামাবাড়ি যেতে? বা আর কি কোনো খোঁজ নাওনি ঐ ছায়ামূর্তির ব্যাপারে?"
তীর্থের এই প্রশ্ন শুনে আমি একটু হেসে বললাম," না বাবা, ঐ ঘটনার পর আর সাহস হয়ে ওঠেনি মামাবাড়ি যাওয়ার। আর তাছাড়াও কখনো আর ঐ ছায়ামূর্তির ব্যাপারে কোনো খোঁজখবরও নিতে চাইনি। কারণ জীবনে কিছু কিছু রহস্য অজানা থাকাই সকলের জন্য মঙ্গলজনক।"
একথা শোনার পর তীর্থ চুপ হয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। বুঝতে পারলাম নিশ্চয়ই ঐ অজানা ছায়ামূর্তির চিন্তায় বিভোর হয়ে গেছে ছেলেটা। তাই ঘোর কাটাতে বলে উঠলাম," অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘুমোও। আমি লাইটটা বন্ধ করে আসি।" লাইট বন্ধ করার কথা শুনেই তীর্থ বলে উঠলো," না, কাকু। লাইট টা বন্ধ কোরো না। আজ রাতে লাইটটা জ্বালানোই থাকুক।"
বুঝতে পারলাম বেচারা ভয় পেয়েছে। তাই আর ওর কথার প্রতিবাদ না করে ওকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম; যতক্ষণ না পর্যন্ত ও ঘুমিয়ে পড়ছে।
---------------------------------০---------------------------------
***( গল্পটা পড়ে আপনাদের কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না এবং সেই সাথে সাথে রেটিং দিয়ে গল্পটা মূল্যায়ন করার অনুরোধ রইলো)***
রহস্যময় ছায়ামূর্তি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
405
Views
12
Likes
4
Comments
4.8
Rating