অজানা আশঙ্কা আর ঐ বৃদ্ধের সেই ভবিষ্যত বাণী যেন সারাক্ষণ আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমে অনির্বাণের মায়ের মৃত্যুর সংবাদ আর এবার সিদ্ধার্থের মাসি মেসোর এই ভৌতিক ঘটনা যেন আমাদের ৩ জনের জীবনে এক অভিশাপের কালো ছায়া হয়ে বিরাজ করছে। এসব দুশ্চিন্তা আর মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে আমি কিছু দিনের জন্য বাবা মায়ের কাছে অর্থাৎ আমার গ্রামের বাড়ি চলে আসি।
অনেকদিন পর আমি ফেরাতে বাবা-মা সহ সকলেই খুশি, সাথে পুরানো বন্ধু বান্ধবরাও। কিন্তু আমার মনে থাকা দুশ্চিন্তা গুলো যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো আমাকে। বার বার মনে থাকলো এই বুঝি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। আর মনের শঙ্কাই অবশেষে বাস্তবের রূপ নিলো।
কোনো এক সন্ধ্যায় আমি পুকুর পাড়ের বট গাছতলায় বসে ছিপ দিয়ে মাছ ধরছিলাম। তখনই আমার এক বন্ধু অনিরুদ্ধ এসে বললো যে আমাদের গ্রামের রবীন খুড়ো আজ বিকেলে গত হয়েছেন। এ কথা শুনে তো আমি হতবাক।
তখন অনিরুদ্ধ বললো যে, রবীন খুড়োর দেহ শশ্মানে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো লোক পাচ্ছে না। এই বলেই অনিরুদ্ধ চলে গেল। আর বললো এখনো অনেককে খবর দেওয়ার বাকি আছে। তখন আমি ভাবলাম যে আমি ও আমার কিছু বন্ধু মিলে রবীন খুড়োর দেহ শশ্মানে বয়ে নিয়ে যাবো আর মড়া পোড়ানোর কাজও করে আসবো।
তিন কূলে রবীন খুড়োর কেউ নেই। তাই আমরাই সব কাজ করে আসবো। তাতে কিছু পুন্য হবে আবার কাজটাও উদ্ধার হয়ে যাবে। যেই কথা সেই কাজ। আমি ও আমার কিছু বন্ধু মিলে রবীন খুড়োর দেহ শশ্মানে বয়ে নিয়ে গেলাম। কিন্তু শশ্মানে গিয়ে পড়ি আরেক ঝামেলায়। সেখানে মড়া পোড়ানোর কোনো লোক নেই। অগত্যা শবদাহ করার মতো লোক আর অন্যান্য সরঞ্জাম আনতে বাকি সবাই চলে গেল আমাকে ঐ মৃতদেহের কাছে একা রেখে।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসলো। শশ্মানের মতো নির্জন স্থানে আমারও যেন গা ভারী হয়ে আসলো। বেশ ভয় ভয় লাগছিল। হঠাৎ কোত্থেকে যেন অনিরুদ্ধ চলে আসলো শশ্মান ঘাটে। মনে হলো যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো। যাই হোক অন্তত একজনকে পাশে পেয়ে একটু সাহস হলো। দুজনে মিলে অনেকক্ষণ গল্প করার পর হঠাৎ অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম," কিরে, কোথায় যাচ্ছিস?"
অনিরুদ্ধ তেমন কিছুই বললো না। শুধু একটু মুচকি হাসি দিয়ে বললো," কি আর করবো বল? আমার কী আর বসার সময় আছে? সময় তো ফুরিয়ে গেছে। " আমি ওর কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এদিকে লোকজনের আওয়াজ পেয়ে বুঝলাম যে সবাই কাঠ সহ মড়া পোড়ানোর অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে। সেগুলো দেখার পর ফিরে এসে দেখি অনিরুদ্ধ আর নেই। কোথায় যেন চলে গেছে। যাই হোক এবার মড়া পোড়ানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম কিন্তু তখনও ভাবতে পারি নাই যে কি বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
মড়া পোড়ানোর সময় মৃতদেহের মুখের থেকে কাপড় তুলতেই যেন আমার মাথায় বাজ পড়লো। কারণ তখন আমি যা দেখলাম তা আমি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। তখন দেখি কোথায় রবীন খুড়োর দেহ এতো স্বরং অনিরুদ্ধের মৃতদেহ। যার সাথে আমি এতক্ষন একসাথে ছিলাম । আর এটাও বুঝতে পারলাম যে আমি এতক্ষণ অনিরুদ্ধের সাথে নয় বরং ওর আত্মার সাথে ছিলাম। এই দৃশ্য দেখার পর আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না।
তখন আকাশকে জিজ্ঞেস করলাম অনিরুদ্ধের মৃতদেহ এখানে কি করে? আকাশ বললো,"কেনো , তুই জানিস না আজ দুপুরেই তো অনিরুদ্ধকে সাপে কেটেছে। " একথা শোনার পর আমার আর কিছু বলার শক্তি নেই। সকলের সামনে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলাম। সকলের কাছে সব কথা চেপে গেলাম।
এদিকে শশ্মানের সব কাজ সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরলাম। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বললাম না। তখন আমার বার বার সিদ্ধার্থ আর অনিরুদ্ধের সাথে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগলো। ভাবছিলাম এই ৩ টি ঘটনার কোনো না কোনো যোগসূত্র তো নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু ব্যর্থ হলাম এই রহস্যের পর্দা উন্মোচনে।
অবশেষে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে যখন বিছানায় ঘুমাতে যাই তখন চোখ বুঝতেই বার বার অনিরুদ্ধের মুখটা ভেসে উঠছিল। কিছুতেই আর ঘুমাতে পারলাম না। তাই বাধ্য হয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়ি। সেদিন রাতেই আমি স্বপ্নে দেখতে পাই সেই বৃদ্ধ লোকটিকে যার সাথে এসব ঘটনা ঘটার পূর্বে ট্রেনের কামরায় দেখা হয়েছিল। হঠাৎ করেই আমি আতঙ্কে লাফিয়ে উঠি। ঐ দিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না।
চলবে..........
অভিশপ্ত ভবিষ্যদ্বাণী (পর্ব ০৪)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
1.59K
Views
16
Likes
3
Comments
4.9
Rating