অভিশপ্ত ভবিষ্যদ্বাণী (পর্ব ০৩)

অভিশপ্ত ভবিষ্যদ্বাণী (পর্ব ০৩)
ঘটনাটি ছিল আমাদের বিচার বুদ্ধির অতীত। গতমাসে যখন কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ কারণে সিদ্ধার্থকে ওর মাসির বাড়ি যেতে হয়, তখন আমি আর অনির্বাণও ওর সাথে বেড়াতে যেতে চাইলাম। কিন্তু আমাদের প্র্যাকটিক্যাল আর এসাইনমেন্ট জমা দেয়ার তাড়াহুড়োয় সেই বার আর ওর পথের সঙ্গী হতে পারলাম না। তো যাই হোক, সেই যাত্রায় সিদ্ধার্থ একাই গেল ওর মাসি বাড়ি। প্রথম থেকেই শুনেছি ওর মুখে যে ওর মাসি- মেসো সিদ্ধার্থকে ভীষণ ভালোবাসে। তাদের কোনো সন্তান ছিল না; তাই সিদ্ধার্থকেই তারা সন্তানস্নেহে খুবই ভালোবাসে। বেশ কয়েকবার চিঠিতে বলেও পাঠিয়েছিলেন তাঁরা সিদ্ধার্থকে ওর মাসি বাড়ি যাওয়ার জন্য। তাই এ যাত্রায় সিদ্ধার্থ আর তাদের ডাক উপেক্ষা করতে পারেনি।



অনেক দিন পর সিদ্ধার্থ মাসি- মেসোর সঙ্গে দেখা করতে মাসি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু কে জানত যে এই যাত্রাই সিদ্ধার্থের জীবনের এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রচনা করবে। যাই হোক সকাল বেলায় রওনা দিয়েও সিদ্ধার্থের মাসি বাড়ি যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। একে গ্রামের পথ, কোনো ল্যাম্প পোস্ট বা কোনো বাতি নেই; তার ওপরে আবার অমাবস্যা তিথি, তাই অন্ধকারে পথ চলতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছিল সিদ্ধার্থের। যদিও মাসি বাড়ি পৌঁছাতে আর বেশি দূর নেই, মাত্র একটা মাঠ পেরোলেই ওর মাসি বাড়ি। তাই সে দ্রুত হাঁটা শুরু করলো।



হঠাৎ করেই পেছন থেকে এক ভারী গলায় সিদ্ধার্থকে কেউ নাম ধরে ডাকলো। সিদ্ধার্থ চমকে উঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখলো যে ওর মেসো মশাই হাতে লন্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এবার একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সিদ্ধার্থ ওর মেসো মশাই কে প্রণাম করলো। মেসো মশাই বললেন, "থাক, থাক। বেঁচে থাকো। কেমন আছো? পড়ালেখা কেমন চলছে তোমার? তোমার মাসি তো সেই কখন থেকে তোমার পথ চেয়ে বসে আছে।"



বাকি পথ সিদ্ধার্থ ওর মেসোর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মাসি বাড়ি পৌঁছে গেল। মাসি বাড়ি এলেই সিদ্ধার্থের মাসি এসে সিদ্ধার্থকে জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরার সাথে সাথে এক ঠাণ্ডা স্পর্শের‌ শিহরণ বয়ে গেল সিদ্ধার্থের শরীরে। সিদ্ধার্থ বলে উঠলো, "মাসি, তোমার শরীর এতো ঠাণ্ডা কেন?"



মাসি একটু অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলেন, "ঐ সন্ধ্যা বেলাতেই তো স্নান করে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালালাম। তাই শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে।"



তৎক্ষণাৎ সিদ্ধার্থের চোখ যায় তুলসী তলার দিকে যেখানে প্রদীপের চিহ্নমাত্র নেই। তখনই সিদ্ধার্থের মনে খটকা লাগে যে তার মাসি তাকে মিথ্যা কেন বললো? এই ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধার্থের মেসো বলে উঠলেন, "তোমরা মা - ছেলে কী দুয়ারে দাঁড়িয়েই সব কথা বলবে, নাকি ছেলেটাকে কিছু খেতে দেবে? কতদূর থেকে এসেছে ছেলেটা। ওকে একটু বিশ্রাম নিতে দাও।"



মেসোর কণ্ঠ শুনে সিদ্ধার্থের ঘোর কেটে গেল। তখন মাসি বললেন, "যা বাবা, তুই হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আয়। আমি তোর জন্য খাবার বাড়ছি।"



আধ ঘন্টা পর সিদ্ধার্থ খাবার টেবিলে এসে দেখে যে মাসি ওর সব পছন্দের খাবার তৈরি করেছেন। তখন খাবার টেবিলে বিভিন্ন কথার মাঝে এক পর্যায়ে মাসি বলে উঠলেন, "তোকে কতবার বলেছি একবার মাসি বাড়ি আয়। অন্তত দু এক দিনের জন্য এসে বেড়িয়ে যা। কিন্তু তুই আর এলি কই। তোর তো সময়ই হয় না।"



তখন সিদ্ধার্থ বললো, "কেনো মাসি এই যে এলাম। এবার‌ তুমি খুশি তো?"



মাসি বললেন, "হুম সেই তো এলি, কিন্তু আর সময় নেই যে!"



হঠাৎ সিদ্ধার্থ থমকে গেল। আর সময় নেই মানে কি? মাসি কী বলতে চাইলেন? অজানা প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে ওর মনে। খাওয়া দাওয়া শেষে মেসো মশাই এর ঘরে গিয়ে সিদ্ধার্থ তাঁর শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলো। তখন মেসো মশাই বললেন, "এখন খুব শান্তিতেই আছি। কোনো সর্দিকাশি বা বুকে ব্যথা নেই। যত সব জরা ব্যাধি তো কেবল দেহের। যতদিন শরীর ছিল, ততদিন অসুখ বিসুখ ছিল। এখন খুব শান্তিতেই আছি।"



এরকম অদ্ভুত কথা শুনে সিদ্ধার্থ মাটির মূর্তির মতো চুপ হয়ে গেল। মেসোর বলা সব কথাগুলো যেন ওর মাথার উপর দিয়ে গেল। মাসি, মেসোর বলা সব কথাগুলো যেন কেমন রহস্যময়। এ দিকে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিদ্ধার্থের মাসি ওর বিছানা‌- বালিশ গুছিয়ে দিয়ে বলে গেলেন, "যত শব্দই হোক রাতে আর ঘর থেকে বের হবি না। এখন ঘুমাতে যা।"



সারাদিনের ক্লান্তিতে বিছানায় শোয়ার সাথে সাথেই ঘুম চলে আসে সিদ্ধার্থের চোখে। তখন অনেক গভীর রাত । হঠাৎ করেই কোনো এক অজানা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় সিদ্ধার্থের। উঠে দেখলো ঘড়িতে তখন ২:৩৭ বাজে। কিসের শব্দ এটা জানার কৌতূহল বশত মাসির বারণ করা সত্ত্বেও সিদ্ধার্থ ওর রুম থেকে বেরিয়ে ঐ অজানা শব্দটাকে অনুসরণ করে রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হয়। তখন সিদ্ধার্থ যে দৃশ্য দেখলো তা‌‌ দেখার জন্য ও কখনোই প্রস্তুত ছিল না।



সিদ্ধার্থ দেখতে পেল এক মুণ্ডুহীন দেহ রান্না ঘরে পাইচারী করছে আর সমস্ত মেঝে রক্তে লাল। এ রকম বীভৎস দৃশ্য দেখে সিদ্ধার্থ আর স্থির থাকতে পারলো না। ও জ্ঞান হারালো। পরেরদিন সিদ্ধার্থ হাসপাতালের‌ বেডে নিজেকে আবিষ্কার করলো। তার গত রাতের সমস্ত কথা মনে পড়তেই সে তার সামনে থাকা লোকদের জিজ্ঞেস করল যে ও এখানে কীভাবে এলো। তখন সেখানে উপস্থিত এক বৃদ্ধ লোক ওকে জানান যে গতরাতে সিদ্ধার্থকে তারা অচেতন অবস্থায় এক বাড়ির সামনে থেকে উদ্ধার করেন। এ কথা শুনে সিদ্ধার্থ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। তখন সেই বৃদ্ধ সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা, তুমি কে? তোমাকে তো আগে এই অন্ঞ্চলে দেখি নি। আর গতকাল রাতে তুমি কীভাবে ঐ বাড়ির সামনে পৌঁছালে?"



তখন সিদ্ধার্থ সেই সকল কথা তাঁদের খুলে বললো যা ওর সাথে গতকাল রাতে ঘটেছিল। এ কথা শুনে সেখানে উপস্থিত সকলে তো হতবাক। তখন সেই বৃদ্ধ বললেন, "তুমি যে বাড়ি গতকাল রাতে ছিলে, সেই বাড়ির সকলের অর্থাৎ সিদ্ধার্থের মাসি আর মেসোর লাশ গতমাসে পুলিশ ও বাড়ির পেছন থেকে উদ্ধার করে। আর এখনও এই খুনের তদন্ত চলছে।"



এ কথা শোনার পর সিদ্ধার্থের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সে ভেবেই পাচ্ছে না যে গতকাল তার সাথে দেখা হওয়া মাসি- মেসো সকলেই মৃত ছিলেন। আর পরবর্তীতে সিদ্ধার্থের ফিরে আসার পর ওর মুখে এই রোমহর্ষক ঘটনার কথা জানতে পেরে আমরাও বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আর এই পর পর ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনাই যেন বার বার ইঙ্গিত দিচ্ছিলো যে এবার হয়তো আমার সাথেই খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে।



চলবে..........
2K Views
14 Likes
4 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(14)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (4)

Reader photo
MD.Shahajada
10-Sep-2024, 10:35 PM

💕💕

তমাল কৃষ্ণ মৃধা
তমাল কৃষ্ণ মৃধা
10-Sep-2024, 10:37 PM

💚💐

Reader photo
SUBORNA💝🌹
19-Aug-2024, 08:04 PM

তুলনামূলক এই পর্বটা বেশ ভয়ানক লাগলো

তমাল কৃষ্ণ মৃধা
তমাল কৃষ্ণ মৃধা
19-Aug-2024, 08:11 PM

ধন্যবাদ 🥰

Reader photo
Mahim Hasanat
19-Aug-2024, 01:55 PM

that is so beautiful

তমাল কৃষ্ণ মৃধা
তমাল কৃষ্ণ মৃধা
19-Aug-2024, 02:11 PM

অসংখ্য ধন্যবাদ 🥰

Reader photo
💖 SUBORNA 💖
19-Aug-2024, 12:50 AM

গল্পটা ক্রমশই বেশ ভালো লাগছে। পরবর্তী পর্বগুলোর জন্য বেশ আগ্রহী।

তমাল কৃষ্ণ মৃধা
তমাল কৃষ্ণ মৃধা
19-Aug-2024, 12:58 AM

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ 🥰 খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব আসছে।