অভিশপ্ত ভবিষ্যদ্বাণী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
হোস্টেলে ফিরে ৩ জনই এই ব্যাপারে কথা বলতে বলতে আলোচনার এক পর্যায়ে অনির্বাণ বলে উঠলো, "আরে এসব আষাঢ়ে গল্প মাত্র। ঐ বৃদ্ধটি নিশ্চয়ই পাগল, আর না হলে আমাদের শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিল। তাই এসব বাজে চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।" সবাই ওর কথাই মেনে নিলাম আর এসব দুশ্চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলতে চাইলাম ।কিন্তু ঐ বৃদ্ধের আকস্মিক ভাবে আগমন ও প্রত্যাবর্তন এর ব্যাপারটা কিছুতেই যেন মাথা থেকে বের হতে চাইছে না। তবে দৈনন্দিন ব্যস্ততায় আর লেখাপড়ার চাপে ওসব প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম, ঠিক তখনই অনির্বাণের জীবনে ঘটে গেল এক চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। অবশ্য তখন আমি বাড়িতে গিয়েছিলাম গ্রীষ্মের ছুটিতে। তখন অনির্বাণ হোস্টেলে একাই ছিল। অনির্বাণ ছিল বরাবরই একটু একগুঁয়ে স্বভাবের। তাই হোস্টেলে একদিন রাতে বাকি বন্ধুরা যখন আড্ডা মারছিলো তখন সেখানে অনির্বাণ ভূতের অস্তিত্বের প্রমাণ স্বরূপ সকলকে প্ল্যানচেট খেলার আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমে সকলেই অনির্বাণকে নিষেধ করলো কিন্তু অনির্বাণের জেদের কাছে হার মেনে এক পর্যায়ে বাকি বন্ধুরা ওর সাথে প্ল্যানচেট খেলতে রাজি হলো। পরেরদিন রাতেই অনির্বাণ খেলার যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হয়ে গেল। তখন হোস্টেলের এক বন্ধ ঘরে অনির্বাণ সহ বেশ কয়েকজন বন্ধু বান্ধব প্ল্যানচেট খেলার আসরে যোগদান করে। যদিও সকলেই অনির্বাণকে আরেকবার ভেবে দেখতে বললো। কিন্তু অনির্বাণ তার সিদ্ধান্তে অটল। প্ল্যানচেট সে খেলবেই। খেলার নিয়মানুযায়ী বন্ধ ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে সকল দরজা, জানালা বন্ধ করে দিল। সকলে এবার প্ল্যানচেট এর বোর্ড ঘিরে বসে রইল। কিন্তু কারো আত্মাকে ডাকার পর ঐ আত্মা কার শরীরে প্রবেশ করবে, অর্থাৎ এই প্ল্যানচেট খেলায় কে মিডিয়াম(মাধ্যম) হবে সেটা নিয়েই সকলের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল। অবশেষে অনির্বাণ নিজেই মিডিয়াম হতে রাজি হলো। তখন সকলে এক হয়ে বসে জ্বালানো মোমবাতি প্ল্যানচেট বোর্ডের মাঝে রেখে এক মনে কোনো মৃত মানুষের আত্মাকে স্মরণের উদ্যোগ নিল। এমতাবস্থায় অনির্বাণ চালাকি করে ওর মায়ের আত্মাকে স্মরণ করলো এটা জানা সত্ত্বেও যে ওর মা এখনও জীবিত। কারণ অনির্বাণ এটা প্রমাণ করতে ব্যাকুল হয়ে ছিল যে এই প্ল্যানচেট খেলা একটা ভূজরুকি মাত্র আর ভূত-প্রেতের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তাই মৃত মানুষের আত্মার জায়গায় অনির্বাণ তার জীবিত মায়ের আত্মাকে স্মরণ করলো। কিছু সময় পর হঠাৎ করেই ঐ বদ্ধ ঘরের জানালা খুলে একটা দমকা হাওয়া এসে ঘরে থাকা মোমবাতি টা নিভিয়ে দিল এবং অনির্বাণের মায়ের কণ্ঠস্বরে অনির্বাণের কাছে তার মাকে স্মরণ করার কারণ জানতে চাইলো। ঠিক তখনই অনির্বাণ চমকে উঠে বললো," কে আপনি? আপনি কেন আমার মায়ের কণ্ঠস্বরে কথা বলছেন?"তখন সেই অজ্ঞাত কণ্ঠস্বর বলে উঠলো," আমি তোর মা,অনির্বাণ।" এ কথা শুনে অনির্বাণের যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। অনির্বাণ বলে উঠলো,"এ কি করে সম্ভব? আমার মা তো এখনও জীবিত।" তখন এক অট্টহাসি হেসে ঐ অজ্ঞাত কণ্ঠস্বর বলে উঠলো," বেঁচে ছিলাম। কিন্তু তুই স্মরণ করায় আমাকে যে দেহত্ম্যাগ করতে হল"। এ কথা শুনে অনির্বাণ আর কিছু বলতে পারে না, ও সাথে সাথে বেহুঁশ হয়ে যায়। আর বাকিরাও জ্ঞান হারালো। পরেরদিন অনির্বাণের জ্ঞান ফেরার পর অনির্বাণের বাড়ি থেকে ফোন আসে যে গতকাল রাতে অনির্বাণের মা ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ সংবাদ শোনার পর অনির্বাণ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে এবং নিজেকেই ওর মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী ভাবে। এ ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে হোস্টেলেও এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এদিকে আমি অনির্বাণের মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর হোস্টেলে পরেরদিন ফিরে আসি।‌তখন আমি আর সিদ্ধার্থ অনির্বাণকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করি আর অনির্বাণকে গ্রামের বাড়িতে ওর মায়ের শেষকৃত্যের জন্য পাঠিয়ে দেই। কিন্তু এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের ৩ জনের মনেই এক গভীর দাগ কেটে গেল। তৎক্ষণাৎ আমার মনে আবার সেই পুরনো ভয়টা মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। ভাবলাম অনির্বাণের জীবনে ঘটে যাওয়া এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবার হয়তো আমার আর সিদ্ধার্থের জীবনেও ঘটতে চলেছে। আর এমন ভাবনা ভাবতে না ভাবতেই ঠিক দু মাসের মাথায় সিদ্ধার্থের সাথেও ঘটে গেল এক ভয়ংকর ঘটনা।

চলবে......
1.83K Views
17 Likes
5 Comments
4.6 Rating
Rate this: