অভাগীর ভাগ্য
পর্ব - ০১
হঠাৎ আবিরের চোখ দুটো আটকে গেল এক মহিলার দিকে। হাজার বিস্ময় আর অবিশ্বাস্যতা নিয়ে আবির দেখতে লাগল সেই মহিলাটিকে। মহিলাটি আর আবিরের দুরত্ব চৌরাস্তার এপাশ থেকে মাত্র ওপাশ পর্যন্ত। এই হেঁটে যদি যায় তাহলে মিনিট কয়েক লাগবে। ১৫ বা ২০ টা পা এগিয়ে গেলেই হবে।
আবির মহিলাটিকে দেখে যেন তার দুই চোখ জোড়া বিশ্বাস করতে পারছে না। তাই এটা তার চোখের ভুল হবে এটা ভেবে শার্টের হাতা দিয়ে চোখ জোড়া ভালো ভাবে কচলিয়ে নিল বেশ কয়েকবার। ফের তাকাল সেদিকে। নাহ! এটা তার চোখের ভুল না। মহিলাটি তার পরিচিত। খুব পরিচিত মহিলা। না মহিলা বলা ভুল হচ্ছে এটা তার জন্মদায়িনী মা! যাঁর গর্ভে দশমাস দশদিন থাকার পর এই পৃথিবীর আলো দেখে আবির। যার মায়া-মমতায় আর পরম আদর-স্নেহে বড় হয়েছে আবির। না আর ভাবতে পারছে না আবির এসব, তার জন্মদাতা জননীকে এই অবস্থায় দেখে সে যেন বেকুব বনে গেল! নিজের দুই চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। আবির কি করবে কি করবে একটা ধড়ফড়ানি শুরু করে দিল।
আবির এখনও রিকশায় বসে আছে। রিকশাওয়ালাকে চৌরাস্তার সেই মুখে নিয়ে যেতে বলল আবির, যেখানে তার মাকে দেখেছে আর তার মা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল তার মায়ের সামনে নিজের মুখ দেখানো যাবে না কোনোমতেই। কোনো অবস্থায় মায়ের সামনে খোলা মুখ নিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ মা শপথ করছিল আবিরের মুখ জীবনে আর কোনোদিন দেখবে না! কিন্তু এখন তার জন্মদাতা মায়ের এই রকম অবস্থা তাকে এতই ভাবিয়ে তুলছে যে, সেই কথা একদম ভুলে যেতে বসছিল! এদিক-সেদিক তাকিয়ে রিকশাওয়ালাকে থামতে বলে রিকশা থেকে নেমে গেল আবির। পাশে হকারের দোকান থেকে একটা মাস্ক নিয়ে আবার রিকশায় উঠে বসল। তারপর রিকশাওয়ালাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করল।
যতই রিকশা মায়ের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, ততই মায়ের পরিবর্তন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল। এই কয়েক বছরে আবির মাকে বাস্তবে চোখের দেখা দেখে নি ঠিক, কিন্তু মায়ের ছবি কখনো সে ভুলতে পারে নি। ভুলার ই তো নয়। তবুও তার বাড়ির শয়নকক্ষে মায়ের বেশ কয়েকটা ছবি বর্তমান। ঐসব ছবিতে মা আর এখন বাস্তবে মায়ের মধ্যে এ যেন বিশাল আকাশ-পাতাল তফাৎ দেখছে! আগের সে মা আর এখনের মায়ের মধ্যে অনেক অনেক পার্থক্য। চেনা যাচ্ছে না একদম মাকে। এমন অবস্থা যে মায়ের ছবিগুলো তার রুমের মধ্যে না থাকলে বুঝাই যেতো না এটা আবিরের মা। আর আবির হয়তো চিনতে ও পারতো না তাঁর নিজের জন্মদাতা মাকে।
বয়স নাকি বর্তমান পরিস্থিতি মায়ের এই অবস্থা করেছে সেটা বুঝা যাচ্ছে না। কপালে চিন্তার চাপ সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।
পুরাতন আর অত্যন্ত নিন্মমানের একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আছে। পায়ে কোন জুতা বা সেন্ডেল নাই। উদুম খালি পায়ে মাকে বড্ড বেমানান লাগছে! শাড়িটা দেখে আবির যেন ভেতরে মজে গেল। মুখটা দেখা না যায় মতো করে শাড়ির আঁচল টেনে দিয়ে মা একটি জুয়েলার্সের দোকানের দোকানদারের সাথে কথা বলছে। কী সব কথা বলছে হাত পা নেড়েছেড়ে। আবির ঐ দোকান থেকে ৮-১০ হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে সুতীক্ষ্ম নজরে সব খেয়াল করছে আর দেখে যাচ্ছে ব্যাপারটা কি? মা এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছে, আর জুয়েলার্সের দোকানদারের সাথে কী সব কথা বলছে? দোকানদারের সাথে মা কি কথা বলছে তা শোনার জন্য রিকশাওয়ালাকে আরেকটু সামনে আগাতে বলবে, ঠিক সেই মুহুর্তে আবিরের ফোনটা বেজে উঠল! তখন মায়ের দিক থেকে ধ্যান সরিয়ে ফোনের দিকে নজর দিল আবির।
আবিরের স্ত্রী শ্রুতির ফোন ছিল ওটা। প্রথমবার কেটে দিয়ে ফোনটা পকেটে রাখতে যাবে ঐ অবস্থায় আবার ফোন আসাতে রিসিভ করে পরে কথা বলবে বলে ফোনটা রেখে দিল। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল জুয়েলার্সের দোকানের দিকে। দোকানের দিকে তাকাতেই আবিরের কলিজার মধ্যে কেমন যেন ধক ধক করে শব্দ করে উঠল কয়েকটা! কারণ হলো মা! মাকে জুয়েলার্সের দোকানে দেখতে পেল না!
আবির সামনে থাকিয়ে দেখল সেখানে মা নেই! কোথায় যেনো চলে গেল মা! এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল কিন্তু দোকান থেকে বের হয়ে কোথায় যেন চলে গেল বুঝতেই পারল না আবির! তখন আপনা-আপনি শ্রুতির উপর রাগ হতে লাগল আবিরের। ওর ফোন না আসলে মা কোথায় যাচ্ছে সেটা দেখতে পারত। মা যেখানে যেখানে যাচ্ছে সেটা দেখতে পারত। কোথাও হারিয়ে যেতে দিত না। আবির তখন রিকশাওয়ালার দিকে তাকাল আর তাকে জিজ্ঞেস করাতে সে খেয়াল ই করেনি বলে জানিয়ে দিল।
তখন আর কিছু না ভেবে আবির সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে, ঐ জুয়েলার্সের দোকানে গিয়ে মায়ের কথা জিজ্ঞেস করবে এটা ভেবে নিল আবির। চিন্তা করতে লাগল কিভাবে বলবে মায়ের কথা দোকানদারকে। কারণ হুট করে তো আর একটা মানুষের কথা জিজ্ঞেস করা যায় না। তাই একটু বুদ্ধি খাটিয়ে অবশেষে চিন্তা-ভাবনার অবসান ঘটিয়ে রিকশা থেকে নেমে গেল আর ঐ জুয়েলার্সের দোকানে ঢুকে বলল,
- "আপনাদের দোকানে নতুন কালেকশনের ভারী গহনা কিছু আছে? অথবা নতুন ডিজাইনের কোনো গহনা আছে কি?"
- " হ্যাঁ। অনেক আছে নতুন নতুন মডেলের ভারী গহনা। আপনি বসুন দেখাচ্ছি আমরা।"
- "আপনাদের দোকানে আজকাল তো খুব বেশি ভিড় মনে হচ্ছে। আমি দোকানের সামনে অনেক্ষণ ধরে রিকশায় বসে অপেক্ষা করছিলাম। একটা মহিলাকে দেখলাম আপনাদের সাথে কথা বলছে। তাই আর ঢুকি নি। দাঁড়িয়েছিলাম কখন সে চলে যায়।"
- "আর বলবেন না ভাই। কোথায় থেকে যে আসে এরা কে জানে? শুধু শুধু মাথা খেতে আসে।"
- "কেন? কী হলো ভাই? এত রেগে আছেন কেন?"
- "মহিলাটির কিছু পুরনো গয়না আছে সেগুলো নাকি বিক্রি করবে। সেজন্য টাকা চাইতে এসেছে আমার কাছে।"
- "সেতো ভালো কথা। ওনার গয়না আছে বিক্রি করবে আপনি নিলে নিবেন না নিলে নাই, সেটা নিয়ে এত প্যারা নেওয়ার কি আছে ভাই?"
- "আরে মিয়া শুনেন, ওই মহিলা বলছে আগামীকাল সে গয়না গুলো আনবে, আর আজ নাকি তার আগাম টাকা লাগবে। ১০০০ টাকা দিতে বলছে এখন। আগামীকাল গয়নাগুলো এনে শোধ দিয়ে দিবে এরকমটা বলছে আমাকে।"
- "তো আপনি কী বললেন? টাকা দিয়েছেন?"
- "আরে ভাই, আমাকে কি পাগলা কুত্তা কামড় দিয়েছে নাকি যে, এতো বড় পাগলামি করব আমি? ঐ মহিলাটাকে সোজা বলে দিলাম আমি, যে গহনা ছাড়া টাকা পাবে না। গহনা আনলে তারপর সেটা দেখে যা টাকা আসে হিসাব করে দিয়ে দেব।"
- "তো ওনি কি বলল আপনার এইসব কথা শোনে?"
- "আগামীকাল গয়না নিয়ে আসবে এরকমটা বলছে আরকি। তারপর তো চলেই গেল এখান থেকে।"
- "আচ্ছা, আপনি কি ওনাকে চিনেন নাকি?"
- "আরে নাহ ভাই, কোথাকার কোন মেয়ে আমি চিনি না, জানি না। কোথায় থেকে হুট করে এসে টাকা চাইছে আমার থেকে! আমার মনে হয় এটা এক রকমের ধান্ধা করছে এভাবে এরা। নয়তো এরকম বেকুবগিরি কেউ করে নাকি?"
- "ওহহ ভালো কথা। কি হয় দেখেন। কাল গহনা আনলে টাকা দিয়ে দিবেন আরকি। মনে হয় কোনো সমস্যায় পড়েছে ওনি।"
আবিরের জন্য নতুন কালেকশনের আর ভারী গয়না বের করতে করতে উক্ত আলাপচারিতা করে নিল দুইজনে মিলে। এতে বরং আবিরের লাভ হলো। তার মাকে ফিরে পাওয়ার জন্য একটা উপায় খুঁজে পেল মনে হয়। তবে সেটা সিউর না এখনও। কারণ ওনি তো বলল কাল আসবেন আবার। যদি আসেন, তাহলে তো হলো।
ক্রমশ....
অভাগীর ভাগ্য
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
607
Views
15
Likes
3
Comments
2.8
Rating