এতিম শিশু
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
জীবনটা যেন এক অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়ার মতো। মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছোট্ট মেয়েটি প্রতিদিন এক নতুন লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়। তার জীবনের প্রতিটি দিনই যেন এক দীর্ঘ দুঃখের যাত্রা, যেখানে কোনো আনন্দ নেই, নেই কোনো হাসির আলো।
**অধ্যায় ১: হারানোর প্রথম অনুভূতি**
আসমার বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। বাবা-মা তাকে ছেড়ে অন্য জগতে চলে গেলেন, এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। সেই দিনটির কথা আজও তার স্মৃতিতে অমলিন। মা যখন তাকে শেষবারের মতো বুকে টেনে নিয়েছিলেন, সেই উষ্ণতা, সেই ভালোবাসার আশ্রয়, সেগুলো যেন এক মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল। আসমার মনে হল যেন তার চারপাশের পৃথিবীটা থমকে গেছে। চারপাশের মানুষগুলো কেমন যেন হঠাৎ করে অপরিচিত হয়ে উঠল। যে ঘর ছিল তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেটাও এখন ভীতিকর এক জায়গায় পরিণত হয়েছে।
**অধ্যায় ২: এতিমখানার জীবন**
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আসমাকে পাঠানো হলো এতিমখানায়। এতিমখানার পরিবেশটা ছিল আসমার জন্য একেবারে নতুন। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছু যেন তাকে আরও বেশি অসহায় করে তুলল। সেখানে থাকা অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে আসমা সহজে মিশতে পারছিল না। তাদের কেউ কেউ দুষ্টুমি করত, কেউ কেউ মজা করত, কিন্তু আসমা যেন সেই সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে গেল। তার মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে নিজের মধ্যে আরো গুটিয়ে গেল, বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলল।
প্রতিদিন আসমার চোখে অশ্রু ভরে উঠত। এতিমখানার খাটে শুয়ে সে তার মায়ের কথা ভাবত। মায়ের মুখটা তার মনে পড়ত, মায়ের হাতের স্পর্শ, মায়ের কণ্ঠস্বর। এতিমখানার খাবারগুলো তার মুখে রোচেনি, সে প্রায়ই না খেয়েই শুয়ে পড়ত। অভিভাবকদের সান্ত্বনা তার মনে কোনো স্বস্তি এনে দিতে পারত না।
**অধ্যায় ৩: হারানো স্বপ্নের সন্ধানে**
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসমার মধ্যে এক ধরনের কঠোরতা আসতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, তাকে এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের জন্য লড়াই করতে হবে। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল পড়াশোনা করে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিন্তু এতিমখানায় পড়াশোনার সুযোগ খুব কম ছিল। শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছিল খুব কঠিন, কারণ আসমার মতো আরো অনেক শিশু ছিল যারা একইভাবে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখত।
তবুও আসমা হাল ছাড়ল না। সে প্রতিদিন রাতে জেগে পড়াশোনা করত। বইয়ের পাতায় সে তার ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো আঁকতে শুরু করল। সে জানত, যদি তাকে এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হয়, তাহলে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া।
**অধ্যায় ৪: জীবনের নতুন মোড়**
আসমার বয়স যখন পনেরো হলো, তখন তার জীবনে এক নতুন মোড় এলো। এতিমখানার এক শিক্ষিকা, মিসেস রফিক, আসমার প্রতিভা এবং অধ্যবসায় দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি আসমার জন্য একটি বৃত্তির ব্যবস্থা করলেন, যাতে আসমা শহরের একটি ভালো স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে। আসমার জীবনে এটি ছিল এক নতুন আশার আলো। এতদিনের কষ্টের মধ্যে এই প্রথমবার সে নিজের জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পেল।
নতুন স্কুলে এসে আসমার জীবন নতুন করে শুরু হলো। প্রথম দিকে সে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, কারণ নতুন পরিবেশ, নতুন সহপাঠীরা তাকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু আসমার একাগ্রতা এবং পরিশ্রম তাকে ধীরে ধীরে সকলের মাঝে গ্রহণযোগ্য করে তুলল। সে ক্লাসে প্রথম হতে শুরু করল এবং শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে গর্বিত বোধ করল।
**অধ্যায় ৫: নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন**
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে আসমা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। সেখানে সে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। আসমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, সে যেন নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সে তার জীবনের সকল দুঃখ, সকল কষ্টকে পেছনে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারে। আসমার মনে ছিল একটাই কথা—সে নিজের জন্য একটি সুখী এবং স্বাধীন জীবন গড়ে তুলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আসমা অনেক বন্ধু পেল, যারা তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারা তার কষ্টগুলো ভাগাভাগি করেছিল, তাকে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। আসমা অনুভব করল, জীবনটা শুধু দুঃখের নয়, এখানে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, এবং সাফল্যেরও জায়গা আছে। আসমা নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করল—একটি সুন্দর ভবিষ্যতের, যেখানে তার দুঃখের কোনো স্থান নেই।
**উপসংহার: দুঃখের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া সুখ**
আসমার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল দুঃখে মোড়ানো, কিন্তু সেই দুঃখগুলোই তাকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। এতিমখানার ছোট্ট মেয়েটি, যে একসময় তার দুঃখের ভারে নুইয়ে পড়েছিল, আজ সে তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—দুঃখের মধ্যেও সুখ খুঁজে পাওয়া যায়, যদি কেউ সেই সুখের সন্ধান করতে চায়।
138
Views
2
Likes
1
Comments
5.0
Rating