নিশিডাক মেডিকেল

নিশিডাক মেডিকেল
#গল্প- #নিশিডাক_মেডিকেল'।
কলমেঃ-সাদিকুল ইসলাম
পর্ব-৪ (আগামী পর্বে সমাপ্ত)

বাবা অয়ন, 'একবার আমার দিকে তাকাও বাবা।'
(তিনবার বলার পর) ভয়ে ভয়ে হাঁটুর ভাজ থেকে মাথাটা বের করে তাকালাম।
-'আরে! খালুজান দেখছি। আপনি এত তাড়াতাড়ি কিভাবে আসলেন? আর আপনি এমন ভাবে ডাকছিলেন কেন আমায়? আপনার এমন কণ্ঠ শুনে আমি আরও ভয় পেয়ে গেছি।
-'প্রাইভেটকারে আসছি বাবা। তোমাকে এত ভয়ার্ত লাগছে কেন? এই ফলগুলো রাখো।'

আমি কোনো কথা বলছি না। ভয়ার্ত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন।

খালুজানের হাতেরফলগুলো দেখে বুকের ভেতরটায় লাফ দিয়ে উঠে আমার। যে রাতে খালার জন্য এম্বুল্যান্স আনতে বের হয়েছিলাম, সে রাতে আমার ছদ্মবেশ নিয়ে মা'কে ঠিক এমন ফল দিয়ে গেছিলো অশরীরী আত্মা।

মা চুপচাপ উঠে বসেছে খালার পাশে। খালার স্যালাইন চলতেছে। সন্ধ্যা গিয়ে অন্ধকার নেমে আসলো। হাসপাতালটা জঙ্গলের মত নিরব লাগছে। খালুজান ফলগুলো বেডের এক পাশে রেখে খালার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পুরো একটা দিন চলে গেল খালার জ্ঞান ফিরেনি। খালুর চোখ বেয়ে পানি পড়তেছে। মা'ও কান্না থামিয়ে রাখতে পারতেছে না। দুঃখের একটা আমেজ পড়ে গেল।

সারাদিন-রাত গেল হাসপাতাল থেকে দেওয়া কলা আর ডিম ছাড়া কিছুই খাইনি। চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে আমাদের।
খালু বললো,-'ফল গুলো খেয়ে নাও বাবা। খাবার পানি আছে এখানে?'
-'না, এখানের ট্যাপ কলের পানিতে দুর্গন্ধ অনেক, খাওয়া যায় না।'-আমি উত্তর দিলাম।

-'অয়ন, নিচের দোকান থেকে ফ্রেশ পানির একটা বোতল নিয়ে আসো বাবা। আর আপা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসেন। আমি আছি এখানে।'- খালু বললেন।

খালুকে পাশে পেয়ে একটু সাহস পেলাম মনে। খিদে লাগছে অনেক। না খেলে রাতে ঘুমাতে পারবো না। তাই পানি আনতে নিচে যাচ্ছি আমি। মা ওয়াশরুমে গেল।
খালু বসে আছে খালার পাশে।

ত্রিশ টাকায় দুই লিটার ফ্রেশ পানি নিলাম। পানি নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে যাবো তখনই একটা গাড়ি এসে থামলো মেডিকেলের সামনে। ভাবলাম-
'এখন আবার কে এলো?'
গাড়িটার দিকে তাকাচ্ছি আর সামনে হাঁটতেছি।
ড্রাইভার দরজা খুলে দিলেন, গাড়ি থেকে একটা লোক বেরিয়ে আসে। লোকটাকে দেখে আমার গায়ের পশম গুলো দাঁড়িয়ে মাথাটা ঘুরে যায়। আমি হতভম্ব হয়ে যাই।
উনি তো খালুজান আমার! তাহলে উপরে কাকে রেখে আসলাম?
আমি দৌড়ে খালুর কাছে যাই।
-'খালুজান, আপনাকে মাত্র উপরে রেখে আসলাম খালার কাছে, আপনি গাড়ির ভেতর কি করে আসলেন?'
-'আরে কি বলছো অয়ন, আমি তো কেবল আসলাম।'
আমি বললাম,-' তাহলে ঐ লোকটা কে?' উনি আর আপনার মাঝে তো কোনো পার্থক্য দেখছি না।
-'অয়ন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না তোমার কথায়। তাড়াতাড়ি উপরে চলো তো দেখি।'

সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উপরে উঠতেছি আমি। কে ছদ্মবেশি আর কে আসল, বুঝার কোনো কায়দা নেই।
এটা কেমন খেলা শুরু হলো আমার সাথে?

এক দৌড়ে পাঁচ তলায় মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে পৌঁছলাম। দরজার পর্দাটা সরিয়ে দেখি- 'খালার পাশে মাথা নিচু করে সাদা পোশাক পড়া কে যেন বসে আছে। ঝাপসা ঝাপসা লাগছে দেখতে, আমরা কাছে যেতে যেতে উনি আবার অন্ধকারে মিশে গেছে। এটা কি হলো? কিভাবে সম্ভব এটা? কি যে ভয় লাগছে আমার! আমি ছাড়া সবাইকে সন্দেহ লাগছে আমার। খালা একা একা বিছানায় পড়ে আছে, মা ওয়াশরুম থেকে এখনো বের হয়নি। খালার স্যালাইনের পাইপটা রক্তে ভরে গেছে। মনে হয় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া লোকটা খালার হাতের ক্যানুলাটায় কিছু করছে। খালার পাশে রাখা ফল-টল কিছুই নেই।
খালুজানও আমার সাথে সাথেই আসলো। উনি নিজেও একেবারে অবাক!
আসলে যখন ঐ লোকটা এসে 'বাবা অয়ন' বলে ডাকছিল আমাকে, তখনই আমার অত্যন্ত ভয় লেগেছিল। স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। কিন্তু খালুজানের মুখ দেখলাম যখন সব ভয় কেটে গেছিলো। এই মুখটার পিছনে যে এত রহস্য তা বুঝতে পারিনি।
খালার এই অবস্থা দেখে খালু একেবারে ভেংগে পড়েন। বিস্তারিত সব কথা শুনার পর উনার গায়ের পশমগুলো দাঁড়িয়ে উঠে। ঘেমে যান উনি।
ভর্তি ফাইলটা হাতে নিয়ে সরাসরী ডিউটি ডক্টরের রুমে চলে যায় খালু।

ওয়াশরুম থেকে মা বেরিয়ে এলো। এতকিছু হয়ে গেল মা কিছুই টের পায়নি। মা'কে এসব বলাও যাবে না।
মা বললো,-'ফলগুলো কইরে অয়ন? আমার খুব খিদে পেয়েছে। একটা কিছু খেতে দে আমায়।'
মায়ের কথা শুনে কষ্টে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে আমার। আমার পৃথিবীটা আমার মা। সেই মা আমার সামনে খিদের জ্বালায় ছটফট করতেছে।
সবকিছু বুকে চেপে রেখে বললাম,-'এসব ফলে ক্যামিকেল আছে মা, তাই ফেলে দিয়েছি।' মা চুপ করে বসে পড়ে। আর কিছুই বলেনি।

খালু ডিউটি ডক্টরের কাছ থেকে এসে বললো,-'ডক্টর খালার শরীরে তেমন কোনো অসুখ চিহ্নিত করতে পারেনি। উনারা আশা করছেন, শীঘ্রই জ্ঞান ফিরবে। রোগীর শরীর অত্যন্ত দুর্বল। মানসিক চাপ আছে। ভয় পেয়েও এমন হয়ে থাকে মাঝে মাঝে।'

খালুর কথায় সান্ত্বনা পেলেও খালার অবস্থা দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না,, উনার শীঘ্রই জ্ঞান ফিরবে।
খালুকে বললাম,-'আপনি নিচ থেকে মায়ের জন্য কিছু নিয়ে আসুন। মা দুই দিন যাবত না খেয়ে আছে।'
খালু খাবার আনতে চলে গেলেন।
আমি আর মা বসে আছি খালার দুই পাশে।৷ মা জানি কেমন বোবার মত হয়ে গেছে। বসে থাকলে বসেই বসে, শুয়ে থাকলে শুয়েই থাকে।

আজকে আবার এই ওয়ার্ডে অদ্ভুদ একটা নতুন মহিলা রোগী আসছে। রোগীটার মাথার চুলটানে সব সময়। হয়তো মানসিক সমস্যা।
আমার দিকে তাকিয়ে আছে এখন। পাশে একটা বৃদ্ধ মহিলা বসা। হাসে শুধু। হাসিটা অনেকটা ঐ অদৃশ্য হাসির মত শুনতে। খুব ভয় লাগে শুনতে আমার।
আমি অন্যমনস্ক হওয়ার চেষ্টা করি যখন হাসে। ভয় পেয়ে নয়তো আমি হঠাৎ হৃৎ ছিড়ে মরে যাবো। গভীর রাতে এই মেডিকেলে রোগী মারা যায় বেশি। রাত হলে সবাই আতংকে থাকে।

খালুজান খাবার নিয়ে আসলো। রুটি আর কলা। মা কোনো কথা না বলে পাগলের মত খাওয়া শুরু করলো। হয়তো খিদায় খাদ্য নালীটা শুকিয়ে গেছে মায়ের। মায়ের পাগলের মত খাওয়া দেখে আমার চোখ দিয়ে পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছে। খাবার আর গলা দিয়ে নামছে না আমার৷ মায়ের কষ্টটা সইতে পারছি না আর। হাসপাতালে আগে কখনো থাকিনি। মা'ও আসেনি। ভাগ্য আজ এই নির্মম পরিস্থিতির মাঝে ডুবিয়ে দিয়েছে আমাদের।

খাওয়া শেষ হলো। ডিউটি ডক্টর আসার সময় হয়ে গেছে। ডক্টর আসলে একজনের বেশি রোগীর কাছে থাকা যায় না।
মা আর খালুকে বের করে আমি রইলাম খালার কাছে। কেননা আমার চেয়ে বেশি খালার অসুখ সম্পর্কে কেউ জানে না।
ডাক্তার মিজানুর রহমান স্যার আসলেন। উনি এখানকার মেডিকেল অফিসার। খালাকে প্রায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে দেখলেন। দু'টো ইঞ্জেকশান দিলেন।
স্যালাইন খুলে নিলেন। কয়েকটা টেবলেটের নাম লিখে একটা টোকেন দিয়ে বল্লেন, এগুলো বাহিরের ফার্মেসি থেকে নিয়ে আসার জন্য( হাসপাতালে নেই)।
আরও বললেন- 'একঘন্টার মধ্যে রোগীর জ্ঞান ফিরবে আশাকরি। জ্ঞান ফিরার পর মাথার সিটিস্ক্যান করানোর কথাও বললেন ডক্টর।'

ডক্টরের কথা শুনে মনটায় অনেক খুশি লাগতেছে। মা'কে আর খালুকে ডেকে সব বললাম। আমার কথা শুনে মায়ের মনে অনেকটা শক্তি জুগিয়েছে।

খালাকে দেখা শেষ করে ডক্টর নতুন রোগীটার কাছে গেল। ডক্টরকে দেখে পেশেন্টা খিলখিল করে হাসতেছে। কি অদ্ভুত হাসি! এই নতুন রোগীটা আসার পর থেকে আমার কেমনজানি ভয় লাগে শুধু।
রোগীটা হাসতে হাসতে ডক্টরের জামার কলার ধরে ফেললো। কলার ধরে চোখগুলো বড় বড় করে বলতেছে,-'এই রোগীকে আর দেখবি না(খালার দিকে ইঙ্গিত করে)। ওর জ্ঞান ফিরলেই মরবে ও। পৃথিবীর সব ডাক্টার মিলেও এই রোগীকে ভালো করতে পারবি না, হিহিহি(ভয়ানক হাসি)।'

ডক্টর নরম স্বরে বললো ঠিক আছে। এবং নার্সের কাছ থেকে একটা ইঞ্জেকশান নিয়ে কাঁধের পাশে বসিয়ে দেয় ডক্টর, সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে মহিলা। আমি খুব খুশি হলাম মনে মনে। উনি জেগে থাকলে আমি ঘুমাতে পারতাম না।

সব রোগী দেখা শেষ। ডক্টর চলে যায় ডিউটি রুমে। মা ঘুমিয়ে গেছে পাশের একটা খালি বেডে। খালুজান বাহিরে গেছে সিগারেট খেতে মনে হয়। আমি একা খালার পাশে বসা। বড় লাইটটা নার্সে বন্ধ করে দিয়েছে।৷ এখন আর তেমন কিছু দেখা যায় না। ঝাপসা লাগে সবকিছু। আমি মাথা নিচু করে হাত পা আওজিয়ে বসে আছি।

কিছুক্ষণ পরেই খালার জ্ঞান ফিরে এলো। খালা আমার হাতটা ধরে। আমি বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি মা'কে ডেকে তুলি। মা খালাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেয়। খালা সুন্দর করে আগের মত কথা বলে। কি যে সুখ লাগছিল, বলার মত না। খালুকে ফোন দিলাম, উনিও এসে খালার সাথে কথা বললো। খালু বলতেছে,-'এই মেডিকেলটা ভালো না। কাল সিটিস্ক্যান করিয়ে ডক্টরের সাথে পরামর্শ করে ছুটি নিয়ে চলে যাবো। আমিও তাতে সহমত দেই। এই মেডিকেলে থাকতে থাকতে আমার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে।
খালাকে রুটি আর কলা দিলাম।৷ আস্তে আস্তে খাচ্ছে উনি। ভালো লাগছে আমার।

রাত সারে বারোটা বাজে তখন। পাশের ওয়ার্ডে কান্নাকাটির রোল পড়ে৷ যায়। বের হয়ে এক ওয়ার্ড বয়কে জিজ্ঞেস করলাম। ওয়ার্ড বয় বললো,-'একসাথে তিনটা রোগী মারা গেছে।' ভেতরে এসে দেখি আমাদের ওয়ার্ডের কর্নারেও একজন মহিলা কান্না করতেছে। আমি দৌড়ে গিয়ে ডিউটি ডক্টরকে আনলাম, উনি এসে এই পেশেন্টকেও মৃত ঘোষণা করলেন। আমি বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এ যে দেখছি মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে গেছে। রাতেই এসব রোগীকে বের করে দিচ্ছে ডক্টর। একটা মৃত লাশ বেশিক্ষণ থাকলে নাকি লাশের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি,-'নিশিডাক মেডিকেলে নিশিলগ্নের ডাকেই আজরাঈল আসে মনে হয়।' নিশি লাগার সাথে সাথে মৃত্যুর মিছিল চলতে থাকে। কোথায় যাবে মানুষ!

দৌড়ে খালার কাছে গেলাম। ভয় ডুকে গেছে ভেতরে আমার। এই মিছিলে যদি খালাও যোগ হয়ে পড়ে। খালাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম। খালা আমাকে সুন্দর করে বলতেছে,-'কিরে অয়ন, ভয় পাস না বাবা, আমি ভালো হয়ে গেছি, কিচ্ছু হবে না আর।'
আমি তো খুব খুশি। খালা দেখছি আগের মত সুস্থ। খালুও আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেছে,-'ভয় নেই বাবা অয়ন, আমরা কাল চলে যাবো বাড়িতে।'

চারপাশে এত মৃত্যু দেখে ভয়ে বুকটা ধড়-ফড় করছিল। খালা -খালুর কথায় মনটা একটু শান্ত হলো।
খালা, মা'কে বললো,-'আপা তুমি একটু ঘুমাও।' পাশের বেডটা খালি আছে, ওখানে শুয়ে পড়ো।'
মায়ের চোখেও ঘুম অনেক। মা শুয়ে পড়ে তখনই।

খালু বললো,-'আমি বাহিরে আছি। অয়ন, তুমি খালার পাশে শুয়ে থাকো।'
আমিও হেলান দিয়ে একটু শুইলাম খালার বেডে।
আমার চোখে এক পৃথিবীর ঘুম।
চোখটা শুয়ার সাথে সাথেই লেগে পড়ে আমার। খালাও ঘুমিয়ে পড়ে।

"বাতাসে দরজার মাঝখানে লাগানো সাদা পর্দাটা ঢেউ খেলতে থাকে। সব দিকে সবকিছু নিস্তব্ধ, শুধু দরজায় লাগানো পর্দাটাই এমন করে নড়তেছে। আমার ভয়ে শরীর কাঁপতেছে। আমি তবুও কেন জানি তাকিয়ে আছি পর্দাটার দিকে। মনে হচ্ছে পর্দাটা কেউ পেছন থেকে হাত দিয়ে নাড়াচ্ছে। সত্যিই তাই। পাঞ্জাবির হাতার মত সম্পূর্ণ হাতে সাদা কাপড়ে আবৃত একটা হাত পর্দাটার মাঝখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে। আস্তে আস্তে হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু হাত না। মৃত মানুষকে যেমন কাফনের কাপড়ে প্যাঁচিয়ে রাখা হয় তেমনই সাদা কাপড়ে প্যাঁচানো একটা মানুষ দাঁড়ানো দেখছি। মৃত মানুষের কাপড়টা গায়ের সাথে চাপ দিয়ে লেগে থাকে কিন্তু এই মানুষটার কাপড়টা অনেক ঢিলেঢালা মনে হচ্ছে। হাত পা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মুখটার সামনে লম্বা চুল দিয়ে আবৃত। সাদা একটা বিশাল আকৃতি। আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসতেছে। আজ আমার মৃত্যু নিশ্চিত, এটা ভেবে নিয়েছি আমি। ভয়ে 'ও-ও-ও' করতেছি। আমার অনেক কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বিশাল আকৃতির সাদা কাপড় পরিহিত ঝাপসা লোকটা। এতটা ভয়ানক যে ভালো করে যদি তাঁর দিকে তাকাই শ্বাসটা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে আমার।
চোখ দু'টো বন্ধ করে শরীরটা গোল করে মাথা গুঁজে শুয়ে আছি।
তখন,-
গম্ভীর কণ্ঠে-

-"অ-য়ন, তোর খালার মৃত্যু হবে আজ। পৃথিবীর কোনো শক্তিই ওকে বাঁচাতে পারবে না।
তদের বাড়ির সামনে গাব গাছটায় আমি আমার পরিবার নিয়ে থাকি। আমার চার সন্তান নিয়ে ঐ দিন রাতে তোদের উঠোনের পাশে সবুজ ঘাসে শুয়ে আছিলাম। কিন্তু তোর খালা আমার উপর এক বালতি ঝুটা পানি মেরে আমার ছোট সন্তানদের উপরে পা পিছলে পড়ে যায়। আমার দু'টো বাচ্চা সাথে সাথেই মারা যায়, আর দু'টো এখনো কোনো রকম বেঁচে আছে। একটা বাচ্চার হাত আর পা চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
এই প্রতিশোধ আমি তিলে তিলে নিচ্ছি। আমার প্রতিশোধের শেষ ধাপে তোর খালার মৃত শরীর দিয়ে ভোজন করবো।
যদি এই প্রতিশোধে তরা বাঁধা হয়ে দাঁড়াস, ভোজনে তদের শরীরকেও যোগ করবো। বাঁচতে চাইলে মৃত্যুর পর লাশটা আমার হাতে তুলে দিস।"

এই কথা শেষে ধীরে ধীরে মূর্তির মত দরজা দিয়ে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় লোকটা। বের হওয়ার পরপরই আমার ঘুম ভেংগে যায়। আমি সজাগ হয়ে ছটফট করতে থাকি। এ আমি কি স্বপ্ন দেখলাম!?

খালা ঘুমুচ্ছে। মা' পাশের বেডে শুয়ে আছে। খালুজান এখনো আসেনি। মা ঠিক আছে কিনা দেখতে মায়ের কাছে গেলাম। দেখি- মা শান্তিতেই ঘুমুচ্ছে। খালার কাছে গিয়ে বসলাম আবার। সবকিছু নিরব।
আস্তে আস্তে আমার কানে একটা বাতাসের শব্দ আসে। খেয়াল করে দেখলাম এটা খালার শ্বাস গ্রহণের শব্দ। আস্তে আস্তে শব্দটা বাড়তেছে। আমারো ভয় করতেছে। এমন করছে কেন খালা?
একি! শব্দটা বিকট হয়ে যাচ্ছে। আমি খালাকে ডাকলাম। খালার নাকে চাপ দিয়ে একটু ধরলাম। এতে শব্দটা একটু কমে আসে। ভয়ে মাথা দিয়ে ঘাম ছিটকে পড়তেছে আমার।

শব্দটা থামার সাথে সাথে খালার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করছে। আমার ডাকে খালা সাড়া দিচ্ছে না আর। হাত পা গুলোতে খিঁচুনি শুরু হয়ে গেছে। আমি ভয়ে হাউমাউ করে কাঁদতেছি। আমার কান্না দেখে ঐ লম্বা নার্সটা কোথা থেকে তখন আসলো। আমার পিঠে হাত দিয়ে বললো,-'কেঁদ না।'
নার্স কে দেখে উনার পা দু'টো জড়িয়ে ধরে বলি, সিস্টার, প্লীজ আমার খালাকে বাঁচান। খালা মরে যাচ্ছে। নার্সটা আমাকে তুলে একটা কাগজে কি যেন লিখলো এবং কাগজটা আমার হাতে দিয়ে বললো,-'এই ইঞ্জেকশানটা নিচের ফার্মেসি থেকে নিয়ে আসো।'
আমি দৌড়ে গেলাম ইঞ্জেকশান আনতাম।
পাঁচ তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে পাগলের মত নামতেছি আমি। তিন তলায় গিয়ে পা'টা স্লীপ কেটে পড়ে যাই। গড়াতে গড়াতে দু'তলায় গিয়ে আটকালাম। সিঁড়ির ঘর্ষণে অনেক জায়গায় ছাল উঠে পড়ে আমার।
এক তলায় নেমে দেখি কোনো ফার্মেসি'ই খোলা নেই। কয়েকটা ফার্মেসির শাটারে ধরে অনেক ডাকাডাকি করলাম কিন্তু ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিল না। মোবাইলে তাকিয়ে দেখি রাত দুইটা বাজে। এমন সময় এখানে ফার্মেসি খোলা থাকার কথা না। তাহলে নার্স আমাকে এখানে পাঠালো কেন? আমার মনে সন্দেহ ডুকে গেল। কাগজটা পকেটে রেখে দৌড়ে পাঁচ তলায় উঠতেছি আবার। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে এত কষ্ট হচ্ছিল আমার, পায়ের মাংস গুলো চাকা চাকা হয়ে যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি উঠতে চাচ্ছি তত দেরী হচ্ছে। অনেক কষ্টে হাঁপাতে হাঁপাতে পাঁচ তলায় গেলাম। কিন্তু ওয়ার্ডে ডুকে দেখি নার্স নেই খালার পাশে। সবাই ঘুমে। খালার হাত পায়ে খিঁচুনিও নেই। খালা সোজা চিত হয়ে শুয়ে আছে কিন্তু খালার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথার পেছনের চুলগুলো দেখা যাচ্ছে শুধু। আমি মাথাটা সোজা করতে চাইলাম, দেখি- খালার ঘারটা ভেংগে ঘুরিয়ে দিয়েছে কে যেন। মুখটা পেছনে চলে গেছে, আর মাথার পেছনের দিকটা সামনে চলে আসছে। আমি দেখে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা চিৎকার দেই- 'আম্মাগো তুমি দেখলানা খালারে মেরে ফেলছে।' এরপর আর আমি কিছু বলতে পারবো না। জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি।
আমার চিৎকার শুনে মা উঠে, নার্স আসে। মায়ের কাঁন্দনে পরে সবাই জাগ্রত হয়। পনেরো মিনিট পর নার্স পানি মেরে আমার জ্ঞান ফিরিয়ে আনে। দেখি লম্বা নার্সটা খালার লাশটা সোজা করতেছে। আমি চিৎকার করে বলতে লাগলাম,-'আপনি আমার খালাকে হত্যা করছেন। আমাকে নিচে পাঠিয়ে আপনি আমার খালাকে মারছেন।'
নার্স বললো,-'এই ছেলে কি বলো এসব?' আমি তোমার চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে আসলাম মাত্র।
-'মিথ্যা বলবেন না। আমি আপনাকে ডাকি নাই, আপনি নিজ থেকে এসে একটা কাগজ দিয়ে আমাকে নিচে পাঠালেন ইঞ্জেকশান আনার জন্য। এসে দেখি আপনি নাই, খালার ঘাড় ভেংগে মুড়িয়ে দিয়েছেন।'

-'কই কাগজ? দেখাও তো দেখি।'

-'এই যে পকেটে কাগজ, দাঁড়ান দিচ্ছি,(পকেটে হাত দিয়ে দেখি কাগজ নেই) ওমা! কাগজ কই গেল?'

আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না, আমার স্বপ্নটা সত্যি হচ্ছে। লম্বা নার্স সেজে খালাকে হত্যা করছে ওরা। আমার আর কি করার আছে! ছদ্মবেশ তো আমি বুঝতে পারিনা। সাথের নার্সটাও বলতেছে,-'উনি আমার সাথে ঘুম থেকে উঠে আসছে মাত্র।'

আমি এক রকম বোবা হয়ে গেছি। খালুজানকে ফোন দিবো, কিভাবে কল করা লাগে মাথায় ডুকতেছে না আমার। মস্তিষ্কটা আওলে গেছে আমার। নার্সকে বললাম,-'খালুজান নামে একটা নাম্বার সেভ করা আছে, উঠাতে কল দিয়ে বলেন, উনি আসার জন্য।'
নার্স, খালুজানকে ফোন করে।
মায়ের কয়েকবার দাঁতে খিল লেগে গেছে।

এরি মধ্যে বড় ডাক্তার আসলো। উনি এসে লাশ তাড়াতাড়ি হাসপাতাল ত্যাগ করানোর কথা বলতেছে। আমি কান্না স্বরে বল্লাম,-'স্যার, লাশ এখন এত রাতে কিভাবে নিয়ে যাবো আমি?' গাড়ি কোথায় পাবো?
উনি তিন তলা ২১৮ নাম্বার হলে যোগাযোগ করতে বললেন। ওখানে নাকি ইমার্জেন্সি এম্বুল্যান্স পাওয়া যায়।
এই কথা বলে উনি চলে যায়। ওয়ার্ড বয় লাশ ট্রলিতে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
এর মধ্যে খালুজান আসে কোথা থেকে। এসে উনিও কান্নায় ভেংগে পড়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে।
আমি কেঁদে কেঁদে বলতেছি,-'খালুজান, আপনি আগে আসলেন না কেন? আপনি থাকলে তো আমার খালাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে মারতে পারতো না। আমাকে ঔষধ আনতে পাঠিয়ে খালাকে মেরে ফেলছে, খালুজান। আপনি কোথায় গেছিলেন খালুজান? আমার খালা তো আর আমাদের বাড়ি আসবে না। আমাকে রান্না করে আর খাওয়াবে না। খালা মরে গেছে। অনেক কষ্ট দিয়ে মারছে ওরা।ঘাড় ভাংগার সময় আমার খালার কত কষ্টই না হয়েছে। আপনি থাকলে তো এইভাবে মরতে হতো না খালাকে।

আমার কান্নার সাথে খালুজানও হাউমাউ করে কান্না করতেছে।
খালা অনেক ভালো মানুষ ছিলেন।

২১৮ হলে গিয়ে সাত হাজার টাকায় একটা এম্বুল্যান্স ভারা নিলাম। খালাকে নিয়ে তিনটা পনেরো বাজে রওয়ানা হলাম।
লাশের গাড়ি, অনেক রাত, কান্নার আওয়াজ, সব মিলিয়ে ভয়ানক একটা অবস্থা।
দশ মিনিট গাড়ি চলার পর, হাওরের সরল রাস্তায় গাগি উঠলো।
দূর থেকে রাস্তার মাঝে কিছু একটা পড়ে আছে দেখা যাচ্ছিল। গাড়ি কাছে যাওয়ার পর ড্রাইভার গাড়িটা থামালো। একেবারে রাস্তার মাঝে বসে আছে। মানুষের মত লাগছে।
ড্রাইভার বললো, 'কে ওখানে?'
-একটা মহিলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। উঠে দাঁড়িয়ে মাথার চুল টানতেছে আর বলতেছে,-'বলে ছিলাম না রে, আজ রাতে মরবে ও। আমার কথা ঠিক হলো?'

আমি খেয়াল করে দেখলাম, উনি তো সেই হাসপাতালের চুলটানা নতুন রোগীটা।

আস্তে আস্তে গাড়ির দিকে আসতেছে মহিলাটা, অনেক ভয়ানক দেখতে, খিলখিলিয়ে হাসতেও আছে।

চলবে...

বিঃদ্রঃ একটি কমেন্ট করে রাখুন,
পরবর্তী পর্ব পোস্ট করা হলে
,কমেন্টে রিয়েক্ট দিলে নোটিফিকেশন পাবেন,
7 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব