কোটা আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনটি দেশের যুবসমাজের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, বিশেষ করে যারা সরকারি চাকরিতে কোটার অব্যবস্থা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল। তবে এই আন্দোলনের একটি অত্যন্ত করুণ ঘটনা হলো একটি ছোট শিশুর মৃত্যুর গল্প, যা গোটা জাতিকে কাঁদিয়েছিল।
ছেলেটির নাম ছিল তামীম। বয়স মাত্র সাত বছর। নিষ্পাপ মুখ আর উজ্জ্বল চোখের তামীম সবার প্রিয় ছিল। স্কুল থেকে ফিরে সে প্রতিদিন তার মায়ের সঙ্গে গল্প করত, নতুন কিছু শেখার প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তার মা রিনা বেগম এবং বাবা আবদুল হক তাদের সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং আশা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। তামীমের ভালোবাসায় তাদের জীবন আলোয় পূর্ণ ছিল।
২০১৮ সালের একটি দিন। ঢাকায় কোটা আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী রাস্তায় নেমেছিল। তাদের দাবি ছিল, চাকরির ক্ষেত্রে কোটার অব্যবস্থা বন্ধ করা এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। রিনা বেগম এবং আবদুল হক তাদের ছোট তামীমকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। রিনা বেগম তার সন্তানকে নিয়ে খুবই গর্বিত ছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন যে তামীম একদিন দেশের উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে। তবে, সেই দিনটিতে কিছু একটা তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল আন্দোলনের দিকে।
তামীমের মা তাকে বুকে ধরে রেখেছিলেন। রাস্তায় যাওয়া হয়নি, কিন্তু আওয়াজ শুনে তামীম জানতে চেয়েছিল, "মা, এখানে কী হচ্ছে?" রিনা বেগম তাকে বুঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তামীম নিজ চোখে দেখতে চেয়েছিল। ছোট্ট শিশুর কৌতূহল ছিল অপরিসীম, এবং মা-পিতা অবশেষে তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন আন্দোলনের এলাকায়। তারা দাঁড়িয়ে ছিলেন একটু দূরে, যেখানে তাদের ধারণা ছিল নিরাপদ।
তবে, সেদিনের বিক্ষোভ ছিল ভিন্ন। পুলিশের সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। ধোঁয়া আর শোরগোলের মধ্যে, হঠাৎ করে পুলিশের গুলি ছুটে গিয়েছিল। মানুষ ছুটতে শুরু করেছিল, সবাই নিরাপদে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু ছোট্ট তামীম হারিয়ে গিয়েছিল ভিড়ের মধ্যে। গুলি এসে লেগেছিল তার ছোট্ট শরীরে। রিনা বেগম চিৎকার করে ছুটে গিয়েছিলেন তার দিকে, কিন্তু তখন তামীমের প্রাণ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর, একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের সাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। রিনা বেগম তখনও তার সন্তানের নিথর দেহটি বুকে চেপে ধরে ছিলেন। সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি কী অনুভব করছেন। রিনা বেগম একটুখানি চুপ থেকে, তার সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বলেছিলেন, "আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। সে তো শুধু জানতে চেয়েছিল। আমার তামীম জানতে চেয়েছিল এই দেশের ভবিষ্যত কী হবে। ওর কৌতূহলই ওকে মেরে ফেলল। আমি কীভাবে বাঁচবো এখন?"
আবদুল হক তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে জল ছিল, কিন্তু মুখে কোনো কথা ছিল না। তার স্ত্রী তার সন্তানের প্রাণের মূল্য যে কী, তা সবাইকে বলতে চেয়েছিলেন। "এই আন্দোলন যদি সফলও হয়, আমি আর কিছু চাই না। আমি শুধু চাই আমার ছেলের মৃত্যু বৃথা না যাক। তামীম আর কখনও হাসবে না, আর কখনও খেলবে না। কিন্তু তার ছোট্ট প্রাণের বিনিময়ে যদি এই দেশ কিছু শেখে, তাহলে হয়তো আমি শান্তি পাবো।"
এই দুঃখজনক ঘটনা বাংলাদেশের কোটা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। তামীমের মৃত্যু দেশের লাখো মানুষের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। তার মায়ের দুঃখ আজও মানুষকে কাঁদায়। তামীমের নিথর দেহটি কাঁধে নিয়ে, আবদুল হক যখন সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন, তখন তারা জানতেন যে তাদের জীবনের আলো নিভে গিয়েছে। তবে তারা বিশ্বাস করতেন যে তাদের সন্তানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যতের আলো জ্বলবে।
এভাবে তামীমের ছোট্ট জীবন একটি মহত্তর লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়ে উঠেছিল। তার স্মৃতিতে দেশের যুবসমাজ এবং সবাই আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল যে, তারা এই দেশকে এমন একটি জায়গা করবে যেখানে কোনো শিশুর কৌতূহল তার মৃত্যুর কারণ হবে না।
কোটা আন্দোলন
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
371
Views
9
Likes
1
Comments
5.0
Rating