সারা দিন প্রচন্ড বৃষ্টি ছিলো । ডাটা তাও বন্দ একা ভালো লাগছে না। সন্ধ্যা থেকে আকাশ পরিষ্কার। রাতের আকাশে একটা চাঁদ উঠেছে। জানালার পাশে বসে বসে চাঁদ দেখি। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল একটা মিষ্টি মেয়ের কথা। জীবনে চলার পথে অনেক অচেনা মুখ চেনা হয়ে যায়। আবার সময়ের সাথে সাথে জীবন থেকে হারিয়ে যায়। শুধু কিছু স্মৃতি রেখে যায় যা সারাটি জীবন তাকে মনে রাখার জন্য।
তখন খুব ছোট ছিলাম বয়স মনে নেই। শৈশবের বেড়া ডিঙিয়ে কৌশরে পর্দাপণ।উর্তি বয়সে নতুন যৌবনের আবেগে, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। তখন বুঝতে পারলাম মানুষের মাঝে পুরুষ আর নারীর পার্থক্য। তখন শুধু প্রচন্ড আবেগ, ভালো লাগা নতুন করে হৃদয়ে বাসা বাঁধে। ভালোবাসা কি জিনিস তা বুঝতাম না। শুধু সুন্দর মেয়ে দেখলে তাকাতে, কথা বলতে, তার সাথে থাকতে প্রচন্ড ভালো লাগতো। সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে যদি ভোরে একটুখানি কথা বলতে পাড়লে মনে হত আমি স্বার্থক। তখন কষ্ট ভুলে যেতাম শুধু আনন্দে হৃদয়ে বন্যা বয়ে যেত। মনে হত এই পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশি সুখী মানুষটি আমি।
বসন্তের ছুটিতে নদীর পাড়ে ফুফুর বাড়ীতে বেড়াতে গেলাম। দুটো ফুফাতো ভাই আছে, একটা আমার বয়সী।
দরজা গিয়ে দেখি মিষ্টি একটা মেয়ে রাস্তায় বট গাছের ডালে বসে আছে।
আমাকে দেখে বললো- ওই ছেলে বাড়ি কোথায়?
আমি তাকিয়ে দেখি নায়িকা শাবানার মতো দেখতে। তখন বিটিভি তে সাপ্তাহিক ছায়া ছবি দেখতাম। প্রতি সপ্তাহে দুই টাকা করে নিতো পাশের বাড়ির চাচাতো ভাইয়ের ঘরে।জির-জিড় আর সাদা কালো হলেও জীবনটা রঙিন ছিল। তখন থেকেই শাবানার কে চিনতাম।
একদম ধবধবে সাদা মেয়েটি। জীবনে কখনো এতো সাদা মেয়ে দেখিনি। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। লম্বা চুল কোমরের নিচে পড়ে। কোন সাজ গোছ নেই পুরানো পোশাক গায়ে। আমার বয়সী হবে
মেয়েটি বলল:- ওই বোবা নাকি কথা বলতে পাড় না? বাড়ি কোথায়?
তার কথায় হুশ ফিরল কিছু না বলে ফুফুর ঘরে চলে আসলাম।
একটুখানি পড়ে দেখি সেই মেয়েটি কে তার মা অনেক মেরেছে গাছে উঠেছে তাই।
ফুফাতো ভাই রেজা কে বললাম - ওই মেয়েটি কে?
রেজা:- ও আমার চাচাতো বোন পরী।
আমার চাচী খুব ভয়ংকর মানুষ এই গ্রামের সবাই ভয় পায়।
আমি:- আপন চাচা?
রেজা:- না, চাচাতো চাচার মেয়ে।ওর বাবা মারা গেছে।
আমি আর কোন কথা বললাম না।রাতে ওর আরো একটি চাচাতো বোন লিমা আর আমরা তিন ভাই মিলে লুডু খেলছি।চার জনে অনেক গল্প করেছি।
পর দিন পরীর মা বাবার বাড়ি গেছে,পরী একা ঘরে। রাতে আমরা তিন ভাই ওর চাচাতো বোন লিমা পরীরদের ঘরে ঘুমাতে গেলাম। চৌউচালা টিনের ঘর মাচায়, এক পাশে আমরা তিন ভাই অন্য পাশে ওরা দুই বোন। মাঝখানে শুধু একটা বাঁশের চিকন বেতীর বেড়া। খোলা জানালা দিয়ে জোৎস্না প্লাবিত একটা চাঁদ উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আছে। ছেলেদের ভিতরে আমি একটু চালাক আর ওপাশে পরী।
পরী বললো আমার দুজন আর তোমরা তিন জনে ধাঁধা বলবো।দেখবো কারা জিতে ঠিক আছে।
আমি:- ঠিক আছে যদি আপনি হেরে যান তাহলে কি দিবা?
পরী:- আমাকে হারানো এতো সহজ না বুঝলা। যদি পারো তাহলে পুরুস্কার আছে।
আর হেরে গেলে কি দিবা?
আমি:- আগে হারিয়ে দেখাও।
রেজা শুনে ভয় পেয়ে গেল বললো ভাই আমি পারবো না। ওর সাথে ধাঁধায় কেউ পারে না। এমন ধাঁধা দিবে সারা জীবনে উত্তর পাবো না।
আমি:- চিন্তা করিস না, আমিও কম জানি না।
পরীর বলল:- "ঢাকায় আছে, টাকায় আছে বাংলাদেশে নাই" কি বলুন?
আমি:- "ক"
পরী:- কাঁচা থাকতে তুক তুক পাকিলে সিঁদুর
যে না বলতে পারবে সে ইঁদুর
আমি তো জানি না অনেক ভেবে বললাম:- দেখো এখন আমি বলবো তার পর তুমি।
পরী:- আগে উত্তর দাও? দুজনে শুধু হাসে আর ইঁদুর বলে ডাকে।
আমরা অনেক ভেবে পারলাম না।
আমি:-শুইতে গেলে দিতে হয় না দিলে ক্ষতি হয়?
পরী:- দুয়ারের খিল
আমি:- না,মশারি।
পরী:- দুটোই হবে।
আমি:- ঠিক আছে।দুল দুল দুলনী ছোট বেলায় খেলুনী।বড় হয়ে সুন্দরী হবো ন্যাংটা হয়ে বাজারে যাবো।
পরী:- কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল ইয়া আল্লাহ! আমি জানি না। ঠিক আছে তুমি বল:- তিনটা মহিলা এক রঙের শাড়ি পড়েছে।
এক জনে বললো শাড়ি দাম কত? আর তোমরা কি হও ?
মহিলা বললো:- আমরা তিন জনে যা হই শাড়ির দাম তাই। দাম কত হবে বলো?
আমি:- এটা কোন ধাঁধা হলো তিনশ তিন।
রাত দুপুর হয়ে গেছে আমি আর পরী ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। পুর্ব পাশে জানালার কাছে পরী একা বসে আছে।
পরী বললো:- বললো এখানে আসবেন।
আমি:- না,এখন আপনি ঘুমাবেন না?
পরী:- না, আপনার সাথে গল্প করবো? কি হলো আসো।
পরীর কাছে বসা সত্যি ভাগ্যের বিষয়ে। তাই চলে গেলাম।
পরী আর আমি জানালার পাশে বসে আছি।
চাঁদনী রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে পরীর সাথে গল্প করছি।
পরী বললো:- আচ্ছা আমি কিন্তু সবাই কে তুমি করে বলি।রাগ করেন নি তো?
আমি:- আপনার মতো এতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে কখনো দেখিনি।
পরীর হাসির শব্দ রাতে ভেসে উঠলো বলল:- কাউকে ভালোবাসেন?
আমি:- ভালোবাসা কি তাই তো জানি না।
বলে একটু হাসি দিলাম। তবে শুনেছি মানুষ ভালোবাসে।
পরী:- কাউকে পছন্দ করো তুমি?
আমি:- পছন্দ-টছন্দ বুঝি না, তবে আপনাকে দেখতে ভালো লাগে। আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে।
পরী:- ইস! এতো কিছু, পছন্দ করো বুঝি? আচ্ছা আর কাউকে ভালো লাগে না?
আমি:- একটা হাসি দিয়ে সত্যি বলতে সুন্দরী সব মেয়েদের ভালো লাগে। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে আপনাকে দেখতে।
পরী:- আমরা তো সমবয়সী হবো তুমি করে বলো। একটুখানি থেমে একটা হাসি দিয়ে বলল আমার মতো সুন্দরী কখনো দেখনি বুঝি?
আমি:- মানুষ এতো সুন্দর হয় জীবনে বুঝিনি। ওই চাঁদটা দেখেছেন?
পরী:- হুম, আজকের রাতটা অনেক সুন্দর ভরা পুর্ণিমা।
আমি:- ওই চাঁদের চেয়েও আপনি অনেক বেশি সুন্দর।
দুজনে গল্প করতে করতে রাত প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অথচ আমি ভাবছি বেশি রাত হয়নি।
পরী বললো-আপনার ঘুমাতে ইচ্ছে করে না?
আমি:- ঘুম তো আসে না। মনে হয় আমি না ঘুমিয়ে সারা জীবন আপনার সাথে কথা বলতে পারবো।
পরী:- আচ্ছা নদীতে মাছ ধরবেন?
আমি:- এই রাতে আপনি সাথে থাকলে ধরবো?
পরী সবাই কে ডেকে উঠলো কিছু লবণ মরিচের গুঁড়া,তেল নিলো। আমরা সবাই নদীতে ছৌলা,কেড়রা গাছের ভিতরে নৌকায় বসে ছৌলা খেলাম। নদীতে গড়া দিছে গ্রামের সবাই মিলে অনেক মাছ ধরলাম। কিছু মহিলা আর মেয়ে এবং অনেক পুরুষ ছিলো।
নদীর পাড়ের মানুষ একটু বোকা টাইপের হয়। লজ্জা শরম একটু কম থাকে মনে হয়।
লেখা পড়া তেমন নেই, শুধু নদীতে মাছ ধরে বিয়ে করে জীবন চালিয়ে নেয়।
নদীর ইলিশ খেয়ে পারফেক্ট একটা বডি তৈরি করে। তবে কোন হিংসা নেই, নেই রুপের অহংকার। একদম মাটির মানুষ।
অনেক মেয়ে নদীতে ডুবিয়ে গোসল করে।ঝোপ-জঙ্গলে লুকিয়ে পোশাক পরিধান করে।
পরের দিন ভোরে বাড়ীতে চলে আসলাম। কিন্তু পরীকে সারা দিন মিস করছি। প্রায় তিন মাস প্রতিটা মুহূর্তে মিস করেছি। জীবনে কখনো আর সম্পুর্ণ রাত জাগা হয়নি। তবে এমন একটা মিষ্টি রাত প্রতিটা সময় পেতে ইচ্ছে করে। মনে হয় জীবনে এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো রাত।
এই রাতটা আমার জীবন কে স্বার্থক করেছে। হৃদয়ে স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে।
সেই মেয়েটি, সেই রাতটা আজো মিস করি।
হয়তো সারা জীবন এই চাঁদের দিকে তাকালেই তাকে মনে পড়বে। দ্বিতীয় বার দেখা হয়েছিল পাঁচ বছর পড়ে। তখন তার একটা বাচ্চা কোলে ছিল। আমার দিকে তাকিয়ে রাইলো আমিও তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু কথা হয়নি কোন।
পরীর সাথে এক রাত
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
215
Views
2
Likes
0
Comments
5.0
Rating