অভিশপ্ত বাড়ি

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাত হলেই শুরু হয় যতসব তুলকালাম - কান্ড কারখানা। কখনো নাকে আসে পোড়া গন্ধ, কখনো বা পানির ট্যাপ থেকে পানি পড়ার শব্দ। মাঝে মাঝে তো দেখা যায় ছাদের উপর কিছু একটার অবয়ব হেঁটে চলেছে।

প্রায় প্রতি রাতেই এমন কান্ডে আমরা বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবে নিয়েছি এই পাড়ারই কোনো এক দুষ্টের দল হবে হয়তো। তারাই হয়তো এরুপ কান্ড ঘটাচ্ছে।

আমি মায়াবিনী। অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি। এই পাড়ায় আমরা নতুন এসেছি।
পরিবারে বাবা- মা আর আমরা চার ভাইবোন।
বাড়িটিতে আমরা নতুন উঠেছি। বাবার থেকে শুনলাম প্রায় জলের দামেই পেয়েছি আমরা বাড়িটি।
নতুন বাড়িতে আসার পর থেকেই প্রতিনিয়তই নানা ঘটনা ঘটেই চলেছে।
শুধু তাই নয়, বাড়িটিতে উঠার পর থেকে এই পাড়ার মানুষ- জন ও আমাদের দেখলে ভূত দেখার মতো দৌড়ে পালিয়ে বেড়ায়।
এমন কেনো করে তা আমরা চার- ভাইবোনের মধ্যে কেউই জানি না। বাবা- মা ও আমাদের তেমন কিছুই বলে নি বাড়িটি সম্পর্কে।

এক শুক্রবারে বাবাকে অনেক জুড়াজুড়ি করার পর বাবা আমাদের বললেন,

-- " আমি তো এতো কিছু জানি না। তবে আমি শুনেছি লোকে বলে এই বাড়িতে নাকি ভূত আছে। কিন্তু, আমি এসবে বিশ্বাস করি না। আরে ভূত বলে কিছু আছে নাকি আবার? পাড়াপড়শির যত সব আজগুবি কথাবার্তা।"

বাবার মুখে এসব শুনে আমরা চার ভাই-বোন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলাম।
মুখে যতই বলি ভূত বলে কিছু নেই কিন্তু দিনের আলো শেষে যখন রাত ঘনিয়ে আসে তখন কেনো জানি না ভূত আছে বলে বিশ্বাস হয়।
হ্যাঁ মানুষের মনেই ভূত বাস করে।

বাড়িটিতে আসার পর থেকে আমাদের কারো ঠিক মতো ঘুম হতো না। বাবা বললেন,

-- "নতুন বাড়ি তো তাই এমন হচ্ছে, কিছুদিন পরই সব ঠিক হয়ে যাবে।"

বাবার কথায় হয়তো ঠিক। কিন্তু রাত হলেই মনে হতো সারা বাড়িময় তীক্ষ্ণ আওয়াজ ঘুরে বেড়ায়। যার প্রতিধ্বনি হয় প্রতিটি দেয়ালে।

এতোসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটার পর ও আমরা বাড়িটিতে থাকি।

একদিন মা দুপুরে ঘুমাচ্ছিলেন। আমরা অন্য একটি রুমে বসে বসে তখন টিভি দেখছি।

হঠাৎ মায়ের চিৎকার শুনতে পায়। দৌড়ে গিয়ে দেখি, মা রুমের এক কোনায় দাড়িয়ে আছে।
জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে?
মা বললেন,
-- " আমাদের বাড়িটা ছাড়তে হবে। এই বাড়িতে থাকলে সে আমাকে মেরে ফেলবে।"

বলেই কান্না করতে শুরু করলো। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো ঘুমের মধ্যে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছে।

সেই রাতেই মায়ের জ্বর এলো। জ্বরের কারণে মায়ের শরীর পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
রাতে মায়ের কপালে জলপট্টি দিতে দিতে দিনের আলো ফুটলো। ততক্ষণে আমার চোখে রাজ্যের ঘুম এসে জড়ো হলো। তখন বাবা এসে বললেন,

-- " সারারাত ঘুমাসনি। যা এবার গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নে। আমি বসছি তুর মায়ের কাছে।"

-- "ঠিক আছে। "
বলেই আমি উঠে চলে আসলাম আমার রুমে। এসেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
সেদিনের খাবার বাবা বাইরে থেকে আনিয়েছিলো।

সকাল এগারোটার দিকেই বাড়িতে ডাক্তার আসলো। মায়ের জ্বরের তাপমাত্রা দেখে কিছু ঔষধ ও দিয়ে গেলো।

তারপরের রাতে মা আবার ও চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। আর বললেন,

-- " এই বাড়ি থেকে এক্ষুণি চলো। আমাকে মারার পর সে আমার মেয়েকে তার সাথে নিয়ে যাবে।" বলেই কাপঁতে লাগলো।

বাবা বললেন,
-- " জ্বরের ঘোরেই তোদের মা আবোলতাবোল বকছে। "
বলেই বাবা ডাক্তারকে কল দিলো। কারণ, জ্বরের সাথে সাথে মায়ের শরীর ও প্রচন্ড রকম কাপঁছিলো।

অনেকক্ষণ ছটফট করার পর হঠাৎ মা চুপ হয়ে গেলেন। মায়ের নিশ্বাস ও আমরা আর শুনতে পাচ্ছিলাম না।
ঠিক তখনি ডাক্তার আসলো। আর মায়ের হাতের নাড়ি দেখেই তিনি বললেন,

-- তিনি আর বেঁচে নেই। মারা গিয়েছেন।

তারপরের দিন মায়ের জানাজা পড়ানো হলো। সমস্ত কাজ সম্পন্ন করার পর যখন বাবা- আর ভাইয়েরা বাড়ি আসলো তখন আশেপাশের কিছু লোক বলাবলি করছিলো-- " আগেই বলেছিলাম আমরা, এই বাড়িতে অশরীরী আত্মা ঘুরে বেড়ায়। কে শুনে কার কথা। যদি শুনতো আজ ওদের বাড়ির মহিলাটি বেঁচে থাকতো। আহারে বেচারি!"

আগে থেকেই আমাদের ভাইবোনের কান্না করতে করতে অসুস্থ হওয়ার উপক্তম তার উপর এই সব কথা বার্তা কানে আসতেই আমাদের কান্নার বেগ বেড়ে দ্বিগুণ হলো।

রাতে আমার হাড় কাঁপানো জ্বর এলো। এমন সময় বাড়িতে বাবা ও নেই। অকস্মাৎ ছোট ভাই বলে উঠলো,
-- "আপু, আম্মুর পর তোমার ও জ্বর এলো। এবার কী তুমি ও আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?"
বলছে আর কান্না করছে সে।

সেদিন রাতে বাবা কোথা থেকে এসে মাত্র আমার জ্বরের খবর শুনেই ডাক্তারকে খবর দিলো। আর সবাইকে বললেন,
-- "আজ রাত টুকু তোরা সবাই মিলে বোনের খেয়াল রাখ। কাল সকাল হলেই আমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।"

রাতটা কোনোরকম পার হওয়ার পর সকালে দেখি বাবা একটি ট্রাক নিয়ে আসলো। আর আমাদের বললেন,
-- "কিছু জিনিসপত্র রাতে আমি গুছিয়ে নিয়েছি। বাকি জিনিস গুলো তোরা গুছিয়ে নে। আমরা তোদের জেঠোর বাসায় গিয়ে উঠবো। উনার সাথে আমার কথা হয়েছে।"

সেদিনই আমরা বাড়িটা ছাড়লাম। বাড়িটি ছাড়ার তিন দিনের মাথায় আমার জ্বর ও সেরে গেলো।

তার অনেকদিন পর একদিন বাবার কাছে শুনলাম, সেই বাড়ির নিচে একটি মেয়ের কবর ছিলো। কিন্তু তা কেউ জানতো না। কয়েক বছর আগে সেই মেয়েকে ধর্ষণ করার পর খুন করে কারা যেনো সেখানেই পুতে দিয়েছিলো। আর এসব কথা বাড়ির মালিক না জেনেই সে জায়াগায় বাড়িটি তৈরি করেছিলো।
তারা ও আমাদের মতো এই সব ঘটনার সম্মুখীন হয়ে বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছিলো।
আর তাই বাড়িটি তারা জলের দামেই বিক্রি করে দিলো।

বাবা এসব কথা জানতে পেরেছিলো সে পাড়ারই এক বুড়ো লোকের কাছে। তিনি এতো দিন এসব জেনে ও চুপ থাকলে ও পরবর্তীতে সবাইকে জানিয়ে দেন। কারণ তিনি অনুশোচনায় ভুগছিলেন।
তিনি ঐ খুনিদের দলেরই একজন ছিলেন।
সব জানার পর পুলিশ তদন্ত করে বুড়ো লোকটির জবানবন্দিতে আসামীদের ধরেছেন।

এতো কিছুর পর ও আমার শুধু একটাই আফসোস, সেদিন যদি মায়ের কথামতো আমরা বাড়িটি ছেড়ে চলে আসতাম তবে হয়তো আমাদের মা আজো বেঁচে থাকতো!

_______________________________________
সমাপ্ত
31 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: