একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। সেটা ছাপিয়ে কিছুক্ষণ পরপর আগরবাতির ঘ্রাণও নাকে আসছে।
কাছেই কোথাও শেয়াল ডাকছিলো। বাড়ির পিছনেই ঘন জঙ্গল। সেদিক থেকেই শেয়ালের হাঁক শোনা যায়। আগরবাতির ঘ্রাণের উৎস কোথায় তা পরিষ্কার নয়। মাঝারি এই গ্রামটাতে খবর খুব দ্রুতই ছড়িয়ে যায়। তাই কেও মারা গেলে অবশ্যই তা কানে আসার কথা।
- মাফি আছোস?
ঝিমুনিতে চোখ বুজে আসছিলো, তা সজাগ হয়ে গেলো। নিশুতিতে একবার ডাকে জবাব দিতে নেই। দ্বিতীয় ডাকের অপেক্ষা করলাম।
- ওই মাফি, বাড়ি আছোস?
হ্যা, এইবার নিশ্চিত হলাম। উত্তরপাড়ার সবুজ ডাকতে এসেছে। গ্রামের কবরস্থানে কবর খোড়ায় আমার সঙ্গী। কেও মারা গেলে সবার আগে সবুজই জানতে পারে।
এগিয়ে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিলাম। বাইরে সবুজ দাঁড়িয়ে আছে। হাতের টর্চের আলোতে মাথায় প্যাচানো গামছা আর কাধের কোদাল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। অন্ধকারে গায়ের সাদা গেঞ্জিটা স্পষ্ট ফুটে উঠছিলো বিধায় গেঞ্জির দিকে আলো না পরলেও চলতো।
- কি হইছে?
- কবর খোড়া লাগবে। তাড়াতাড়ি চল।
- কে মরছে?
- হাসান কাকার মাইয়াডা ফাস নিছে।
- কস কি?
- হ। লোকজন জানাজানির আগে কবর দিয়া দেওন লাগবো। টাকা পয়সা বেশি দিবোনে। চিন্তা করিস না।
এক মুহুর্ত ভেবে নিলাম। এই মুহুর্তে আসলেই টাকার অনেক দরকার। হাসান কাকা এলাকার সম্মানীয় ব্যাক্তি। তার সম্মান রক্ষা করলে অবশ্যই উপড়ি কিছু কামাই করা যাবে।
দ্রুত পায়ে গামছা গায়ে জড়িয়ে কোদাল কাধে বের হলাম। জঙ্গলের পাশ দিয়ে বাঁশঝাড় পেরিয়ে কবরস্থানে ছুটলাম দুজন। পথে যে দুইটা শিয়ালের চোখ চকচক করছিলো, তা গ্রাহ্যই করলাম না।
ফস করে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে বিড়ি ধরালাম। কবরস্থানে ধুমপান করা অনেক পাপ। তাই বাইরে থেকেই শরীর গরম করে নিতে হবে।
- সবুইজ্জ্যা নিবি একটা?
সবুজ কোন কথা না বলে কবরস্থানের ভিতরে ঢুকে পরলো। আমি নিশ্চিন্ত মনে বিড়িতে টান দিলাম।
- মাপ আনছোস সবুইজ্জ্যা?
সবুজ কথা না বলে পাশে ইশারা করে পাটের সোলাটা দেখালো।
- হাসান কাকার মাইয়া এত উচা?
সবুজ কিছু না বলে মুচকি হাসি দিলো।
- কিরে হাসোস ক্যান?
সবুজ আবারও জবাব না দিয়ে মাটিতে কোপ শুরু করলো। যাই হোক, সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তাড়াতাড়ি কবর খুড়ি। এরপর আবার বাঁশ কাটতে হবে।
কাজে ব্যাস্ত ছিলাম। টর্চটা জ্বালিয়ে রেখে দ্রুতই মাটি সরিয়ে ফেলছিলাম। টিপটিপ বৃষ্টি আবারও শুরু হয়েছে। কিছু একটা দিয়ে কবর ঢেকে ফেলতে হবে। না হলে পানি জমে যাবে।
- সবুইজ্জ্যা পেলাস্টিকের কাগজটা আন তো...
বলতে বলতে উপরে তাকালাম।
সবুজ নাই। মানে কি! মাত্রই না দেখলাম।
- সবুইজ্জ্যা কই গেলি রে?
কোনো আওয়াজ আসলো না। সম্পূর্ণ কবরস্থানের মধ্যে আমি একা দাঁড়িয়ে। টিপটিপ করে জ্বলতে থাকা টর্চ নিয়েও ভরসা পাচ্ছি না। যেকোন মুহুর্তে নিভে যেতে পারে।
লাফ দিয়ে কবর থেকে উঠে আশেপাশে খোজার চেস্টা করলাম। লাভ হলো না। কেও থাকলে তো খুজবো। বৃষ্টি ক্রমেই জোরে শুরু হচ্ছিলো। উত্তর সীমান্তে বাঁশের চাটাই এর পাশে প্লাস্টিকের কাগজ থাকে। সেটা দিয়ে ভালোভাবে কবরটা ঢেকে দিলাম।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই আবারও শিয়ালটার সাথে দেখা। আগের যায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে ঘোলাটে চোখ লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নাকি কে জানে? টর্চের আলো কম থাকায় বুঝতে পারলাম না। অকারণেই কোদাল তুলে ভয় দেখানোর চেস্টা করলাম। ভয় পেলো বলে মনে হলো না।
কাঠের দরজায় ঠকঠক ঠকঠক।
- মাফি ভাই, ও মাফি ভাই?
সবে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে বসেছি, এরই মাঝে কে ডাকতে এলো?
- ও মাফি ভাই? আমি সুজন। উত্তরপাড়ায়।
- কি হইছে? বলতে বলতে দরজা খুললাম।
- সবুজ ভাই মইরা গেছে। আইজকা সন্ধ্যায় বৃষ্টির সময়।
আমার মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেলো।
- মানে কি?
- তাড়াতাড়ি চলেন। বাজ পড়ছে মাথার উপরে।
কিছুই আর চিন্তা করতে পারছিলাম না। সবুজের সাথে তো একটু আগে আমি কবর খুড়লাম? তাহলে সন্ধ্যায় মারা গেলো কে?
- সুজন
- হুম্ম ভাই।
- হাসানা কাকার মাইয়া নাকি ফাস নিছে?
- ধুর ভাই, কি বলেন? হাসান কাকার তো মাইয়াই নাই। দুইটা পোলা আছে খালি।
সবুজের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার উপর থেকে কপালের ডান পাশ পর্যন্ত কালো কুচকুচে হয়ে আছে। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে মুখে মুচকি হাসি। যেন এইতো আছি আমি বেশ। আমার জন্য চিন্তা কিসের?
অথচ মুচকি হাসির আড়ালে ও নিজের কবর নিজে খুড়ে শুয়ে আছে।
আর বাকিটা কেবল ইতিহাস।
মুচকি হাসি, ভূতকে আমি ভালোবাসি।
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
280
Views
10
Likes
2
Comments
3.8
Rating