""কিশোর জীবনে প্রেমনদী"" পর্ব-০৫

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
""কিশোর জীবনে প্রেমনদী"" পর্ব-৫

কক্ষের ভেতরে ভদ্রমহিলার আগমনে পুরো শ্রেণিটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলো এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ আসনে নড়েচড়ে ঠিকঠাক করে সংযত হয়ে বসলেন। দেখে মনে হলো মহিলাটি হয়তো শিক্ষিকা বা আমাদের ম্যাডাম হবে। কিন্তু এর আগে তো বিদ্যালয়ে ওনাকে কখনো দেখিনি। অথচ নতুন বছর আরম্ভ হয়ে পাঠদান চলতে চলতে প্রায় মাস দেড় এক হয়ে গেলো ইত্যাদি চিন্তাভাবনা করতে না করতেই দেখি শ্রেণির কক্ষের অভ্যন্তরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরও আগমন ঘটলো। ভদ্রমহিলা ও প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতিতে সকল শিক্ষার্থীরা নীরবতা পালনে সচেষ্ট হয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুনঃপুনঃ একে অপরের পাশের জনের দিকে কিঞ্চিত তাকিয়ে রইলাম এবং সম্মুখের দিকে চেয়ে ছিলাম। এবার প্রধান শিক্ষক সাহেব শ্রেণির কক্ষে উপবিষ্ট সকল শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, " আমার প্রাণপ্রিয় ছাত্রছাত্রীরা তোমরা সবাই কেমন আছো? শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীরা বলে উঠলাম যে, আমরা সবাই ভালো আছি স্যার! আপনি কেমন আছে? তখন তিনি অনর্গলভাবে বলে গেলেন, "হ্যাঁ, আমিও ভালো আছি। এই সবাই মনোযোগ সহকারে শোনো, ইনি হচ্ছেন মিস জোছনা চৌধুরী! তোমাদের সকলের নতুন ম্যাডাম। ইনি তোমাদেরকে ইংরেজি পাঠদান করবেন ইত্যাদি বলে সেই নতুন ম্যাডামকে শ্রেণিতে পাঠদানের জন্য নির্দেশনা দিয়ে জনাব প্রধান শিক্ষক সাহেব শ্রেণির কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

মিস জোছনা চৌধুরী নির্দিষ্ট কেদারায় আসন গ্রহণ করে সবার সাথে পরিচয় পর্ব আদান-প্রদান করে বললেন যে, "তোমরা সবাই আমাকে জোছনা ম্যাম" বলে সম্বোধন করবে। আর সবাই নিয়মিত ক্লাসে চলে আসবে প্রভৃতি বলে পাঠ্য বই নিয়ে সেখান থেকে শুরুর অধ্যায়ের একটা পাঠ পড়িয়ে ঘণ্টা খানেকের ব্যবধানে সে-ও শ্রেণি কক্ষ থেকে চলে গেলেন। এবার আগত নতুন শিক্ষিকা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ ছাত্র/ছাত্রীরা হইচই করে একে অন্যের সাথে নানা কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করেন। কেউ কেউ বিদ্যালয়ে সদ্য আগত উক্ত নতুন ম্যাডামকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনাও করে যাচ্ছেন। আমার পাশের আসনে উপবিষ্ট এক ছাত্র তাঁর সামনের জনকে সেই ম্যাডাম সম্পর্কে কি যেনো বলাবলি করতেছে দেখে গাঢ় ফিরিয়ে তাঁদের কিছু আলাপন কর্ণপাত হয়। তাঁদের একজনে বলে উঠলেন যে, এই ম্যাডামকে আমি মনে হয় আমাদের খালার গ্রামের একটি স্কুলে দেখেছি। এই ম্যাডাম সেদিন কিছু ছেলেকে স্কুল পালানোর কারণে অনেক পিটিয়েছেন। আমরাও যদি পালায়, তাহলে আমাদেরকেও সেরকম মাইর দিতে পারে। তাই সাবধান থাকতে হবে ইত্যাদি আরো অনেক কথা বলাবলি করে যাচ্ছিলেন। এদিকে তাঁদের সেই কথাবার্তায় বিরক্ত বোধ করে রিয়ার দিকে দু-একবার তাকিয়ে থাকলাম। রিয়া দেখি বই পড়তে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। তাই ওর দিকে বেশিক্ষণ আর না তাকিয়ে আপন আসনে একটু নড়ে বসলাম এবং ভাবতে ছিলাম যে, রিয়াকে যে কোনো উপায়ে আমার মনের কথাটা বলে দিতে হবে। আজকে রাতে ওর জন্য একটা চিঠি লেখে কাল সকালে ক্লাসে এসে আমার প্রেমের নিবেদন জানাবো। প্রস্তাব গ্রহণ করলে তো ভালোই। আর যদি গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দেয় কিংবা যা তা বলে দেয়, তখন কি হবে। আচ্ছা দেখা যাবে কালকে, রিয়া যদি আমাকে পছন্দ করে তাহলে প্রস্তাবে সে-ও রাজি হবে আর পছন্দ না করলেও কোন একটা কিছু তো বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি আনমনে আরো অনেক চিন্তা ভাবনা করতে করতে হঠাৎ বিদ্যালয় অবকাশ দিয়ে দেওয়া হলো।

সকল শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে শ্রেণির কক্ষ থেকে যে যাঁর যাঁর মতন করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমি খানিকক্ষণ বেঞ্চে বসে রইলাম এবং রিয়ার অবস্থা দেখতে ওর দিকে আপাতদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। সবার পিছনে পিছনে রিয়াও বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো দেখে স্বয়ং নিজেও বই খাতা কলম এসব গুছিয়ে নিয়ে থলিতে ঢুকিয়ে কক্ষের প্রধান প্রবেশপথের নিকটে গেলাম। রিয়া বেশ কয়েকবার চোখ রাঙিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে মৃদু হাসির আবাস দিয়ে আমার সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। আমিও পিছন পিছন হাঁটতে আরম্ভ করলাম। এভাবে মিনিট চারেক হাঁটার পরে উভয়ে বিদ্যালয়ের মূল অঙ্গন থেকে বের হয়ে প্রধান দরজা দিয়ে বেরিয়ে হাঁটার গতি কমিয়ে ধীর স্থিরভাবে পাশাপাশি চলতে শুরু করলাম। চলার পথে রিয়া একবার আমার দিকে দেখেন, আর আমি একবার রিয়ার দিকে তাকায়। এমনিভাবে কিছুদূর যেতে না যেতেই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলো। হঠাৎ করে একটা অপরিচিত ছেলে রিয়া আর আমার পিছু নিয়ে উভয়কে অনুসরণ করে হাঁটতে লাগলো। গাঢ় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি ছেলেটি চোখ লাল করে রিয়ার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটতেছে রিয়া এসব বুঝতে পারেনি বলে সে তাঁর মতো করে চলতে লাগলেন। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ছেলেটার দিকে গাঢ় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারবার দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে চেয়ে হাঁটার গতি বাড়াতে লাগলাম। বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে মাঝ রাস্তা বরাবর পৌঁছানো পর্যন্ত রিয়া আর আমার উভয়ের মাঝে কোনো প্রকার সংলাপ হয়নি। নিঃসন্দেহে রিয়া জানেন যে, আমি ওকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।

পথে অন্যান্য লোকেরা কথা বলতে দেখলে আপত্তি করবেন ভেবে উভয়ে চলার পথে তেমন একটা কথা বলিনি। মাঝপথ পেরিয়ে হঠাৎ রিয়া আমাকে বলে উঠলেন যে, "রিয়াদ তুমি কি পিঠা খেতে পছন্দ করো, কোন পিঠা তোমার বেশি পছন্দ?" রিয়ার কাছ থেকে এমন কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেও সেই পিছনে পিছনে ছুটে আসা ছেলেটাকে দেখে একপ্রকার ক্রোধে ভেতরে ভেতরে জ্বালাতন শুরু হচ্ছিলো। মনটা হালকা করে রিয়াকে উত্তরে বললাম, আমি তো নির্দিষ্ট কোনো পিঠা পছন্দ করি না। সামনে যে পিঠা পাই তাই খেতে অভ্যস্ত। তারপর রিয়া বলে উঠলেন যে, আচ্ছা ঠিক আছে, কালকে তাড়াতাড়ি ক্লাসে আসিও, আমিও আসবো" এই বলে গাঢ় ঘুরিয়ে রিয়া পিছনে তাকাতেই সেই ছেলেটাকে দেখে হতভম্ব হয়ে চেহারাটা পেঁচার মতো করে ফেললেন। এবং হাঁটার গতি বাড়িয়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। রিয়ার সাথে সাথে আমিও তাড়াতাড়ি হাঁটা শুরু করে দুজনেই চলে যাচ্ছিলাম একই গন্তব্যে। একটু পরে পিছনে ফিরে দেখি ছেলেটিকে আর পিছনে দেখা যাচ্ছে না, কিঞ্চিৎ দাঁড়িয়ে চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কোথাও কোনো খানেই তাকে তখন আর দেখা যায়নি হঠাৎ ছেলেটা উধাও হয়ে যাওয়ায় রিয়া কিছুটা স্বস্তি পেলেও আমার বুকের ভেতরে অস্থিরতা বিরাজ করতে ছিলো।

চলতে চলতে রিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা রিয়া, পিছনে একটা ছেলে ছিলো সেটা কে? তোমার পরিচিত কেউ না-কি? তখন রিয়া বলে উঠলেন কালকে বিস্তারিত বলবো। তুমি তাড়াতাড়ি স্কুলে আসিও। এই বলতে বলতে রিয়ার বাড়ির কাছাকাছি চলে এলাম এবং রিয়াকে বিদায় দিয়ে আপন বাড়ির দিকে ফিরে যাবো এমন সময় খানিক দূরে দেখি সেই ছেলেটা আবার দেখা গেলো। রিয়ার বাড়ির সামনের রাস্তার দিয়ে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ততক্ষণে রিয়া তাঁর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। এবার ছেলেটাকে দেখে একটু শঙ্কিত হয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। সামনে দাঁড়ানো সেই ছেললটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই সেই ছেলেটা আমার গতিপথ আটকে দেন এবং আমাকে থামতে বলেন...

চলবে কি.....

বিঃদ্রঃ গল্পের অবশিষ্ট কাহিনি ধারাবাহিক পর্বে পোস্ট করা হবে। কাজেই, সবুর করে "গল্প সমাহার" অ্যাপের সাথেই থাকুন। কাহিনীটা পছন্দ হলে প্রতিক্রিয়া জানতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ!
726 Views
6 Likes
3 Comments
4.6 Rating
Rate this: