আমরা সাহিত্য কেন পড়ি?
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
বর্তমান যুগে বিজ্ঞান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে সাহিত্যচর্চা কে সময়ের অপচয় বলে মনে হতে পারে। সাহিত্য নিয়ে যারা পড়াশোনা করে তাদের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে সাহিত্য কি সংসারে খাবার জোগাতে পারবে, দারিদ্রতা দূর করতে পারবে ? কোনো গল্প বা উপন্যাস পড়ে কি দেশের বেকারত্ব দূর করা যাবে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব? যদি না পারে তাহলে এর প্রয়োজন কি?
আসুন আমরা সাহিত্য (গল্প, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদি )কে বিশ্লেষণ করে উপরে উল্লেখিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখি।
প্রথমেই জানা দরকার সাহিত্য কাকে বলে?
দুই রকম ভাবে এর উত্তর দেওয়া যায়।
১. বৃহত্তর অর্থে : খাতা -কলম ব্যবহার করে লেখা হয় এমন প্রত্যেক লেখায় সাহিত্য। ভাষার লিপি ব্যবহার হয়েছে মানেই ওটা সাহিত্য। ইতিহাস, খবরের কাগজ, ডাক্তারির বই, ওকালতির বই, ভূগোল, যাবতীয় লেখা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত।
২. নির্দিষ্ট অর্থে : যে লেখার মাধ্যমে সাবলীল ভাবে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, মনের অনুভূতি, নিজস্ব মানসিকতার প্রকাশ করা যায় সেটাই সাহিত্য। এখানে নিজের মনের কথা, দুঃখ, আবেগ, ভালো লাগা, খারাপ লাগা সব কিছু মন খুলে বলা যায়।
আসুন এবার আমরা সাহিত্যের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি।
১. সমাজদর্পন অর্থাৎ সমাজের আয়না : গল্প -কবিতার মাধ্যমে নিজের কথা, মানুষের কথা, ক্ষুদ্র থেকে অতি ক্ষুদ্র জীবের কথাকেও খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। নিজের কথা, মানুষের দুঃখ -কষ্টের কথা, আনন্দ -ভালোবাসার কথা অতি সহজেই বহু দিন পরেও মানুষ কে স্মরণ করানো যায়। কোনো সভ্যতার আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার কথা জানতে হলে সেযুগে রচিত সাহিত্যকর্ম ও ভাস্কর্য, মুদ্রার উপর নির্ভরশীল হতে হবে। উদাহরণ হিসাবে "চর্যাপদ" এর কথা বলা যেতে পারে। হাজার বছর আগের বাংলার কথা জানতে হলে অবশ্যই "চর্যাপদ " খুলে দেখতে হবে।
প্রাচীন ভারতের কথা জানতে হলে চাণক্য রচিত "অর্থশাস্ত্র ",বাণভট্ট রচিত "হর্ষচরিত", জয়দেব রচিত "গীত গোবিন্দ ",এছাড়াও সেযুগে রচিত গ্রন্থগুলোর শরণাপন্ন হতে হয়।
সাহিত্য যতটা অকপট ভাবে স্বমহিমায় সত্যকে প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে অন্য শিল্প, বিজ্ঞান এতটা করার ক্ষমতা রাখে না। দীনবন্ধু মিত্র " নীলদর্পন " নাটকের মাধ্যমে নীল চাষীদের দুঃখ -কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন। শুধু মাত্র একটা মানুষকে সামনে রেখে সমগ্র সমাজের চিত্র তুলে ধরা সাহিত্যের মাধ্যমেই সম্ভব।
২. সৃজনশীলতা : সাহিত্য একটা আর্ট। এই আর্ট মানুষের বাহ্যিক ও আন্তরিক উভয় দিক নিয়ে আলোচনা করার ক্ষমতা রাখে। এটা এমন একটা আর্ট যার মাধ্যমে শত বছরের দূরত্বে থেকেও আপনার চোখে অশ্রু এনে দেওয়া সম্ভব। পাঁচশো বছর আগের উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের লেখা "ওথেলো " আজও মনকে ব্যাথিত করে। সমাজের চিত্র কে যেন জ্যান্ত অবস্থায় চোখের সামনে উপস্থিত করে। কাজী নজরুলের "বিদ্রোহী " কবিতা আজও মনে ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখে। শত বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা গুলো যেন আজও নতুন।
ছন্দ, অলংকার, অর্থ, লয় সব কিছু ঠিক রাখতে হয়।লেখকের লেখনীর নিপুনতাই শব্দগুলো যেন কথা বলতে শুরু করে।
৩. নিজস্বতা : বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ভূগোল এগুলো মানুষের বাহ্যিক আরাম খোঁজার কাজে ব্যস্ত। মনের সাথে এদের কোনো কারবার নাই। মনের শান্তি এরা দিতে পারে না। মজার বিষয় হলো সাহিত্য মন নিয়েই কারবার করে। মন ভালো রাখা, মন কে আনন্দ দেওয়ার জন্যই সাহিত্য লেখা ও পড়া হয়।
গল্প,কবিতার ক্ষেত্রে "ভুল"বলে তেমন কিছু নাই। এজন্য দেখা যায় একেক জন কবি, লেখকের একেক রকম লেখন প্রণালী। সব টাই ঠিক। রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন, কাজী নজরুল, জীবনানন্দ, নিজস্ব লেখন প্রণালীতে লিখেছেন। কারোর টাই ভুল নয়। Expire বলে কিছু নাই। সাহিত্য কখনো expire হয় না।
একটু ভালো করে দেখলে দেখা যায় সায়েন্স এর তথ্য, তত্ত্ব দিনের পর দিন পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ নতুন তথ্য সামনে এলেই আগের টা বাতিল।
বিজ্ঞান বা অর্থনীতির ক্ষেত্রে নিজস্ব অনুভূতি, আবেগ, এসব আলোচনার কোনো জায়গায় নাই, নিজস্বতা এখানে ভিত্তিহীন। নিজের দুঃখ, কষ্ট, আবেগ প্রকাশের জায়গায় নাই।
সাহিত্যের পুরোটাই আবেগে ভরপুর। এখানে তো মনটাই আসল। আবেগ তো থাকবেই।
৪. স্থায়িত্ব : সাহিত্যের স্থায়িত্বের কথা বলতে হলে উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের একটা "সনেট" এর কথা উল্লেখ করতেই হয়। "Shall I Compare thee to a summer's day" - এটি একটি বিখ্যাত কবিতা। এখানে বলা হয়েছে কবির একজন যুবক বন্ধু মারা গেছেন। কিন্তু কবি শেক্সপীয়ার চান তাঁর বন্ধু অমর হয়ে থাক। তাই তিনি বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলছেন তোমাকে আমি কিসের সাথে তুলনা করবো। যদি গরম কালের কালের সাথে তুলনা করি তাহলে গরমকাল একদিন শেষ হয়ে যাবে। সূর্যের সাথে তুলনা করলে তাও একসময় ডুবে যাবে। শেষে তিনি বলেন তোমাকে আমি আমার কবিতার মধ্যে ঢুকিয়ে দিবো যাতে মৃত্যু তোমার স্মৃতিকে নষ্ট করতে না পারে। তিনি বলেন "যত দিন মানুষ বাঁচবে ততো দিন তারা পড়বে, তুমিও আমার কবিতার মধ্যে বেচে থাকবে "।
পৃথিবীর কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। মানুষ হারিয়ে যাবে কিন্তু তার সৃষ্টি বেচে থাকবে। তার স্মৃতি বেচে থাকবে। আরবি ভাষার বিখ্যাত কবি ইমরুল কায়েস, সংস্কৃত ভাষার কবি কালিদাস, হিন্দির লেখক প্ৰেমচাঁদ, এঁরা অনেক দিন আগেই হারিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁদের সাহিত্য তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আজ অচল, তখন কার মুদ্রা আজ অচল। সে সময়ের রাজনীতি আজ নিষ্প্রয়োজন।
সব কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। অর্থনীতি,সামাজিক অবস্থা, রাজনীতি, ভূগোল সব পাল্টে গিয়েছে। সব থেকে বেশি পাল্টেছে বিজ্ঞান। কোনো কিছুই আগের মতো আর নাই। শুধু একই অবস্থায় আছে সাহিত্য।
হাজার বছর আগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আজ অর্থহীন। কিন্তু হাজার বছর আগের সাহিত্য আজ অমূল্য রত্ন। সাহিত্য যত পুরাতন হতে থাকে এর উপযোগীতা ততো বাড়তে থাকে। এটাই তো পার্থক্য।
এখন একটু ভেবে দেখুন তো অস্থায়ীর সাথে থাকার চেয়ে কি স্থায়ীর সাথে থাকা বেশি ভালো নয়?
শেষে বলা যেতে পারে "Nothing is permanent but poetry is relatively permanent."
242
Views
4
Likes
1
Comments
5.0
Rating