নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রাসাদ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পলাশীর যুদ্ধ একটি আবেগ ! এই যুদ্ধের সাথেই ভারত উপমহাদেশের মানুষের স্বাধীনতার সূর্য ডুবে গিয়েছিল। এই যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুর্শিদাবাদ। হারিয়েগেছে মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্য ,গুরুত্বহীন হয়েছে নবাবি, ধ্বংস হয়েছে নবাবের রাজপ্রাসাদ।

হীরাঝিল নবাব সিরাজ উদ দৌলার প্রাসাদ। ভাগীরথী নদীর পশ্চিমতীরে এই প্রাসাদটি অবস্থিত ছিল। আজকে সেই হীরাঝিল প্রাসাদ ভ্রমণের গল্পই বলবো।

মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক স্থান গুলির সাথে এক রকম ভালোই পরিচয় আছে । হীরাঝিলের সাথে পরিচিতি তেমন ছিল না, শুধু নামটাই জানা ছিল। যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়ে উঠেনি। ইতিহাসের একটা আকর্ষণ আছে। এটা মানুষকে কাছে টানে। এই টান টা নিজের মধ্যেও অনুভব করতাম। এখনো করি। অজানা কে জানবার, অদেখা কে দেখবার টান।

কিছুদিন আগে একটা সুযোগ হাতে এলো। কলকাতা থেকে একজন মেহমান আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেন । তিনি কিছুদিন থাকবেন। মুর্শিদাবাদ ঘুরে দেখবেন। নিজেও একটা সুযোগ পেলাম নতুন করে দেখার ।

দু -একদিন পর গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হলাম। মুর্শিদাবাদের বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থান গুলো ভাগীরথী নদীর পূর্ব পাড়ে মুর্শিদাবাদ শহরে অবস্থিত। সেগুলো আগেই দেখা হয়ে গিয়েছিলো। তাই আমরা পশ্চিম তীরে যাওয়ার জন্য নদীর ঘাটে গেলাম। পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাবো। লালবাগ সদর ঘাট। এই ফেরি ঘাট টি খুবই ব্যস্ত। প্রচুর লোক এটা দিয়ে পারাপার করে শহরে আসে। ফিরে যায়। গাড়ি নিয়ে ফেরি নৌকায় উঠলাম। নৌকা চলতে শুরু করলে মনের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করছিলো। নদীর মৃদু মৃদু বাতাস মন কে ভরিয়ে দিচ্ছিলো।

ডাঙায় নেমে আবার চলতে শুরু করলাম। দূরত্ব বেশি ছিল না। মাত্র ৪/৫ কিমি রাস্তা। অল্প সময়েই পৌঁছে যাবো। কিন্তু তখনো জানা ছিল না আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে! প্রথম ধাক্কা টা খেলাম সেখানে পৌঁছানোর পরেই। মেইন রাস্তা থেকে প্রাসাদের কাছে যাওয়ার কোনো পরিষ্কার রাস্তায় নেই! এমন কি রাস্তাতেও কোনো নির্দেশিকা বোর্ডও চোখে পড়ছেনা। গাড়ি থেকে নেমে স্থানীয় দু একজন কে জিজ্ঞাসা করায় তারা একটি পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা দেখিয়ে দিলো। আমরা পায়ে হেটে কিছু দূর গিয়ে বাঁশগাছের জঙ্গলের মধ্যে একটি প্রস্তরফলক দেখতে পেলাম। মাত্র দুই বছর আগে ২৩ জুন ২০২২ এটি স্থাপন করা হয়েছে। সেটাই লেখা ছিল "নবাব মনসুর -উল -মূলক মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলি খান সিরাজ -উদ -দৌলা হজরত জঙ্গ বাহাদুর" একদম নিচে লেখা "ইতিহাসে গরমিল, জেগে ওঠো হীরাঝিল "।

ফলকের লেখাটা পড়াশেষ হলে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম পুরো জায়গাটা আগাছায় ভরে আছে। বাঁশগাছের জঙ্গল। সরু সরু পায়ে হাঁটা পথ দেখা গেলো। কিছুটা এগোলাম। জায়গায় জায়গায় পুরোনো আমলের ইটের টুকরো, সুরকি ইত্যাদি চোখে পড়তে লাগলো। পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখলাম সর্বত্র একই অবস্থা। একদম শেষ প্রান্তে প্রসাদের সামান্য একটা অংশ নদীর দিকে ঝুলে রয়েছে। এটাও যেন নিজের বিলীন হওয়ার অপেক্ষা করছে। যে কোনো সময় নদীতে পড়ে তলিয়ে যেতে পারে। সামান্য কিছু অংশ হাটু পর্যন্ত আছে।
প্রাসাদের কোনো অংশই ধ্বংস হতে বাকি নাই!

মনটা খারাপ হয়ে গেলো। অন্তরের মধ্যে একটা ব্যথা অনুভব করলাম। বিষণ্ণ মনে কিছুক্ষন এদিক ওদিক দেখলাম। ভাবতে লাগলাম কোথায় দাড়িয়ে আমি। এটা কি বাংলা - বিহার - উড়িষ্যার রাজধানী শহরের রাজপ্রাসাদ ছিল না! বর্তমান বাংলাদেশ,পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা কি এর অধীন ছিল না! আজ তার এই করুণ পরিণতি!

বাংলার শেষ স্বাধীন শাসক নবাব সিরাজ-উদ -দৌলা। তিনিই স্বাধীনতার প্রথম শহীদ। ইতিহাস এতটাই বিকৃত হয়েছে যে শহীদ আজ অবহেলিত, কুঁচক্রি -ষড়যন্ত্রকারীরা সম্মানীত। গাদ্দার জগৎ শেঠের বাড়ি আজ সুরক্ষিত, মীরজাফরের সমাধি সুরক্ষিত,মীরজাফরের বংশধরদের প্রাসাদগুলো সংরক্ষিত, অত্যাচারী দেবী সিংহের প্রাসাদ সংরক্ষিত,এই রকম হাজারো গাদ্দার আজ সম্মানিত কিন্তু নবাব সিরাজ -উদ -দৌলা অবহেলিত!

যে জাতি ২০০ বছর দেশ কে শোষণ করলো, নিংড়িয়ে রস বের করে নিয়ে নিয়ে গেলো, দেশের জন্য রেখে গেলো শুধু ছোবড়া, তারাও আজ সম্মানিত! ইংরেজদের তৈরী ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ব্যান্ডেল চার্চ, বিভিন্ন সৌধ, হাজারো প্রতিষ্ঠান এগুলো সব সংরক্ষিত। যারা সব দিয়ে শেষ হলো তারা অবহেলিত!

ব্যথা ভরা মন নিয়ে উঠে এলাম। ভাবতে থাকলাম অনেক কথা । এটাকে কি সংরক্ষণ করা যেত না? স্বাধীনতার এতো দিন পরেও কি এটা কে মেরামত করা সম্ভব হয় নি? সত্তর বছরেও সম্ভব হয় নি?

চলে এলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো। মনে একটা দাগ রয়ে গেলো।
165 Views
5 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: