""কিশোর জীবনে প্রেমনদী"" পর্ব-৩
পরদিন সাতসকালে বিদ্যাপীঠে গিয়ে দেখলাম যে, শ্রেণির কক্ষে কেবল ডজনখানেক ছাত্রছাত্রী ব্যতীত কাউকে দেখা যায়নি। চুপিচুপি করে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, শান্তস্বভাবের লাজুক জাতের ভদ্র ছেলে বলে স্বজন পরিজন কিংবা পড়শিরা অত্যন্ত স্নেহের চোখে দেখেন। অপরিচিত কারো সাথে সহজে মিশার অভ্যাসও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝে ছিলো না। কিন্তু সেদিন মেয়েটিকে প্রথমবার দেখেই লাজলজ্জা যেনো অলৌকিকভাবে হারিয়ে গিয়ে মুহূর্তেই মেয়েটির দিকে লজ্জাশরম ফেলে বেহায়ার মতো চেয়ে ছিলাম কেনো? ইত্যাদি এসব মনে মনে বলতে বলতে চলতে চলতে মেয়েটির কথা স্মরণ করে ধীরগতিতে কক্ষের অভ্যন্তরে গমন করে পূর্বের ন্যায় শেষের এক বেঞ্চে বসে নীরবতা পালনে সচেষ্ট হয়ে এক বাতায়নের দিকে আনমনে আপাতদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। সহসা কর্ণগোচর হলো যে, একাধিক ছাত্রী কি যেনো বলাবলি করে শ্রেণির কক্ষে প্রবেশ করছে। ছাত্রীগুলোর কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই চেতনায় বোধহয় সেই মেয়েটিও থাকতে পারে, এ ভেবে তড়বড় করে দাঁড়িয়ে শ্রেণির কক্ষের প্রধান প্রবেশপথের দিকে ছুটে গেলাম। দরজার সান্নিধ্যে গিয়ে খানিকক্ষণ দণ্ডায়মান অবস্থায় ডানে বাঁয়ে এদিক ওদিক ঘুরেফিরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালাম। ততক্ষণে কি যেনো বলাবলি করে আগত বালিকাগুলো শ্রেণির ভেতরে ঢুকে যাওয়ার সময় তাঁদের মাঝে উক্ত মেয়েটিকে দৃষ্টিগোচর হয়নি। সাথে সাথে মনটা বিষন্ন হয়ে গেলো বিদায় মিনিট দশেক শ্রেণির কক্ষের মূল দরজার নৈকট্যে পেঁচার মতো বোবা রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আচমকা দেখি দু'জন ছাত্রী হাসাহাসি করতে করতে আমাদের শ্রেণির কাছাকাছি চলে এলো। নিকটে পৌঁছাতে দেখা মাত্রই বুঝতে বিলম্ব হয়নি যে, দুজনের মধ্যে আমায় পহেলা চাহনি দিয়ে মায়ার ফাঁদে বন্দী করে ফেলা সেই মেয়েটিও ছিলো। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খানিকক্ষণ নির্বোধের মতো চেয়ে রইলাম। শ্রেণি কক্ষের প্রধান প্রবেশপথের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতেই মেয়েটি তাঁর কাজল মাখা মায়াবী বদনখানি দিয়ে আমার প্রতি আলতো করে মুচকি নিক্ষেপ করে কক্ষের অভ্যন্তরে গমন করে শুরু দ্বিতীয় বেঞ্চের মাঝামাঝি আসন গ্রহণ করলেন। তাঁদের পিছু পিছু গিয়ে শ্রেণির ভেতরে প্রবেশ করে আপন বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লাম এবং আনমনে ভাবলাম যে, সপ্তাহ খানেক পার হয়ে গেলো অথচ মেয়েটির সাথে কথা বলা তো দূরের কথা বরং এখন অবধি তাঁর নামটি জানতে পারলাম। যেভাবেই হউক তাঁর সাথে কথা বলতেই হবে এসব চিন্তাভাবনা করে মেয়েটির দিকে তাকাতেই দেখি সে-ও আমার প্রতি কবে থেকে জানি তাকিয়ে রইলাম বুঝতে পারিনি। মেয়েটির প্রতি আমার দৃষ্টি পড়তেই দু'জন দু'জনের দিকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম। হঠাৎ কানে শব্দ এলো যে, এক দল ছাত্র তাড়াহুড়া করে ক্ষিপ্রগামী রূপে শ্রেণির কক্ষের ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং তাঁদের পেছনে পেছনে শ্রেণি শিক্ষকেরও আগমন ঘটলো।
শিক্ষকের সাহেবের উপস্থিতি টের পেয়ে মেয়েটি আমার দিক থেকে দৃষ্টি উঠিয়ে সম্মুখের দিকে চেয়ে নিজ আসনে শান্ত মনে নড়েচড়ে বসলেন। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহোদয় পূর্বের ন্যায় তাঁর পাঠদান দিয়ে যাচ্ছেন এবং সবাই মনোযোগ সহকারে তা গ্রহণ করছে। শিক্ষক সাহেবের পাঠদানের সময় খানিক পর পর মেয়েটি ও আমি উভয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষা দিয়ে নীরবে প্রীতির তির আদান-প্রদান করতাম। প্রতিদিন মেয়েটি বিদ্যালয়ে আসতো এবং আমিও যেতাম। দু'জন দু'জনার দিকে শ্রেণিতে পাঠদানের সময় চেয়ে চেয়ে থাকতাম এবং বিদ্যাপীঠ থেকে অবকাশ পেলে যাত্রা পথে মেয়েটির পিছু পিছু চলে তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে পরে নিজের আলয়ে ফিরে যেতাম। মেয়েটি ঐসব বুঝতে পেরে ওর জাদুকরী চেহারা দিয়ে মৃদু হাসি প্রদান করে আমাকে পুরস্কৃত করতেন। তখনো কেউ কারো নাম পর্যন্ত জানতে পারিনি এবং কোনো কথাবার্তা একে অপরের সাথে বলিনি। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতাম এবং চোখের ভাষা দিয়ে নীরবে প্রেমের ধনুক নিক্ষেপ করতাম। এভাবে আরো সপ্তাহ দু-এক পার হয়ে গেলো। তবে এর মাঝে শ্রেণির কক্ষে একদিন এক শিক্ষকের কারণে মেয়েটির নাম জানতে পারি এবং মেয়েটিও আমার নাম জানতে পারেন।
সেদিন উক্ত শিক্ষক সাহেব শ্রেণির কক্ষে এসে গল্প করতে ছিলেন এবং গল্পের ফাঁকে ফাঁকে সবার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। একে একে সব শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয় প্রদান করলেন। আমার হৃদয়ে প্রীতির কম্পন সৃষ্ট করা সেই মেয়েটির যখন পালা এলো, তখন সে তাঁর ঠোঁট বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে বলতে ছিলেন যে, "আমার নাম রিয়া" এ কথা শুনে এদিকে আমার হৃদে অদ্ভুত এক তীব্র জোয়ারের জল পৌঁছালো বোধহয়। তখন "রিয়া" নামটা বারবার মনে মনে বলতে লাগলাম এবং হঠাৎ আধটু চমকে গিয়ে আনমনে বললাম যে রিয়া নামটা তো একেবারে আমার নামের সাথে মিল। এর খানিকক্ষণ পরে আমার যখন পালা এলো, তখন শিক্ষকের প্রশ্নের জবাবে বললাম, "স্যার আমার নাম রিয়াদ"। আমার নাম বলার সাথে সাথে সেই মেয়েটির অর্থাৎ রিয়ার দিকে তাকলাম। আমার নাম রিয়াদ শুনে সে-ও দেখি চোখ রাঙিয়ে মুচকি হেসে নিজে নিজের সাথে কি যেনো আনমনে ভাবনায় পড়ে গেলেন। দু'জন দু'জনার নাম জানতে পেরে মনে মনে উভয়ে সীমাহীন খুশিতে মেতে উঠলাম। সেদিনের পর থেকে একে অপরের দিকে আসা-যাওয়াতে বারংবার লজ্জাশূন্য রূপে তাকিয়ে থাকতাম। তবে উভয়ের মাঝে তখন পর্যন্ত কোনো প্রকার বাক্যালাপ হয়নি। এমনিভাবে চলে গেলো সপ্তাহে চারেক। এভাবে আনুমানিক এক মাসের মাথায় গিয়ে একদিন পাঠশালায় শ্রেণির কক্ষে সকাল সকাল ছুটে যাচ্ছিলাম। পাঠশালার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখি রিয়া একা-একা চুপিচুপি করে আমার বিপরীতের এক পথ দিয়ে ছুটে আসতে ছিলেন। মেয়েটি রিয়া বুঝতে পেরে দ্রুত গতিতে ওর কাছাকাছি ছুটে গেলাম। তখন........
চলবে না-কি..........
বিঃদ্রঃ কাহিনি অবশিষ্টাংশ ধারাবাহিক পর্বে দু-এক দিনের ব্যবধানে প্রকাশিত হবে। অতএব, সাময়িক প্রতীক্ষা করে "গল্প সমাহার" অ্যাপে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ!
"কিশোর জীবনে প্রেমনদী" পর্ব-০৩
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
729
Views
7
Likes
2
Comments
5.0
Rating