প্রেম আমার সিজন-২ (পর্ব-১১)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
কেউ পিছন থেকে মাইশা কে জড়িয়ে ধরে। মাইশা একটু কেঁপে উঠে। মাইশার মনের ভিতর চলা গভীর ভাবনার ছেদ ঘটে মানুষ টার ছোঁয়ায়। মাইশা বুঝতে পারে এ তার চিরচেনা সেই মানুষটা।কারণ তার প্রত্যেকটা ছোঁয়ার সাথে মাইশা এখন পরিচিত।

আরিয়ান মাইশার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে চুলের ঘ্রান নিয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে মাইশা কে বলল,
"উফ জান তোমার চুলে ঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দেয়। কি এমন জাদু আছে তোমার চুলে বল তো যে আমাকে বারবার আকর্ষণ করে।

মাইশা নিশ্চুপ হয়ে আছে। আরিয়ানের প্রত্যেকটা ছোঁয়া আর কথা মাইশা খুব গভীরভাবে অনুভব করছে। আজ কেন যেন মাইশার আরিয়ানার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে মন চাইছে না।

মাইশাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আরিয়ান মাইশার কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল,
" কি হলো আমার মিষ্টি বউটা কথা বলছে না কেন।

মাইশা এখনো নিশ্চুপ। আজ মাইশার কথা বলতে ভালো লাগছে না আরিয়ানের ছোঁয়া পেতে আর ওর ভালোবাসা নিজেকে ডুবিয়ে নিতে কেন যেন মাইশার খুব ইচ্ছে করছে।

আরিয়ান পিঠ থেকে মাইশার চুল গুলো এক পাশে সরিয়ে দিয়ে ওর পিঠে ছোট একটা চুমু দিল। মাইশা একটু কেঁপে উঠল। মাইশা চোখ বন্ধ করে বড় বড় করে নিশ্বাস নিচ্ছে। যেন অজানা এক তরঙ্গ লীলা তার পুরো শরীরে বয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ মাইশার চোখের সামনে কারো একজনের মুখ স্পষ্ট ভাবে ভেসে উঠলো। মাইশা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠা সেই মুখটাকে বারবার ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। সঙ্গে সঙ্গে মাইশা চোখ মেলে তাকালো। মাইশা নিজেকে আরিয়ানার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। আরিয়ান তাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। যেখান থেকে মাইশার নিজেকে ছাড়ানোর কোন উপায় নেই।

মাইশা আস্তে করে আরিয়ানকে বলল,
"কি করছো কি ছাড়ো।

" না ছাড়বো না।

" দেখো এটা কিন্তু ঠিক না।

" কোনটা ঠিক না।

" এই যে এভাবে যখন তখন আমার রুমে চলে আসা আমাকে হঠাৎ করে এভাবে জড়িয়ে ধরা কেউ দেখে ফেললে কিন্তু কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

আরিয়ান মাইশাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললো,
" আরে আমার পিচ্চি বউটা মনে হয় ভুলে গেছে কাগজে কলমে সে আমার কাবিন করা বউ। সুতরাং আমি আমার বউয়ের ঘরে যখন খুশি আসতে পারি তাকে যেভাবে খুশি জড়িয়ে ধরতে পারি এখানে কোন বাঁধা নিষেধ নেই। আর থাকলেও সেটা এই আরিয়ান চৌধুরী শুনবে না।

মাইশা কিছু বলতে চাচ্ছিল তখনই আরিয়ান মাইশার ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলল,
" এই রাতের অন্ধকারে খোলা চুলে আমার বউটাকে কি সুন্দর লাগছে দেখতে আমি যে পাগল হয়ে যাচ্ছি।

মাইশা লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে ফেলল। আরিয়ান ওর থুটনিতে ধরে মুখটা উঁচু করে বলল,
" বাবা আমার লজ্জাবতী লজ্জা পেয়েছে।তা লজ্জাবতীর কি শুধু লজ্জাই পায় খিদে পায় না।

"হঠাৎ খিদে কেন পাবে।

আরিয়ান মাইশার কথার কোন উত্তর না দিয়ে ওকে ঘরে নিয়ে এসে খাটে বসালো।

একটা প্লেট মাইশার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,
" তখন তো তেমন কিছু খেতে পারো নি অবশ্য ক্ষুধা পেয়েছে খাবারটা খেয়ে নাও।

মাইশা তাকিয়ে আছে আরিয়ানের দিকে। মাইশা যে রাত্রে তেমন একটা খেতে পারে নি সেটা কেউ ভালোভাবে লক্ষ্য না করলেও আরিয়ান এত নিখুত ভাবে খেয়াল করে রেখেছে তা মাইশা বুঝতে পারে নি। এই আরিয়ান যদি মাইশার জীবনের ডাল হয়ে না থাকতো তাহলে কবেই মাইশা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত।মাইশার খুব ইচ্ছে করে আরিয়ানের ভালবাসার পরশে নিজেকে জড়িয়ে নিতে। কিন্তু অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও উপায় হয় না। মাইশার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।

আরিয়ান মাইশা কে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে সুন্দর করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর কপালে একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে চলে গেল।

মাইশার চোখের কর্নার বেয়ে দুই ফোটা চোখের পানি টুপ করে গড়িয়ে পড়ল। অনেক ভাগ্য করলে এইরকম ভালোবাসা পাওয়া যায়। ছেলেদের ভালোবাসা খুব কঠিন ওরা যাকে একবার মন থেকে ভালবাসে তাকে পাওয়ার জন্য সব করতে পারে হয়তো বা আরিয়ান ও তাই।

_______________________

এদিকে সীমা সেই সকাল থেকে রিয়াদের কেবিনের সামনে বসে আছে। এখনো রিয়াদের জ্ঞান ফিরে নি। কিছুক্ষণ আগে ডক্টরের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে হয়তোবা ঘন্টাখানেক এর মধ্যে রিয়াদের জ্ঞান ফিরতে পারে। রিয়াদের বাড়ি থেকে এখনো লোকজন এসে পৌঁছায়নি তাই সীমা কোথাও যেতে পারছে না যদি রিয়াদের কোন কিছুর প্রয়োজন হয়।সীমা আজকে অফিসে যায়নি তেমন কোন খাওয়া দাওয়া ও করতে পারে নি এক নাগারে ঠাঁই রিয়াদের কেবিনের সামনে বসে আছে। সীমার মাথায় অনেকক্ষণ যাবৎ একটা কথা ঘুরঘুর করছে। রিয়াদকে কে অ্যালকোহল মিশ্রিত এতগুলো কফি খাওয়ালো। রিয়াদের সাথে কার এমন শত্রুতা যে রিয়াদকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। হয়তো রিয়াদ সুস্থ হয়ে উঠলে ওর কাছ থেকে কিছু না কিছু জানতে পারবে। কিন্তু সীমার কোনরকম ইচ্ছা নিয়ে রিয়াদের সামনে যাবার। কারণ যেখানে মূল্যায়ন থাকে না সেখানে না যাওয়া টাই ভালো। কিছু মানুষ কখনো কারো আপন হয় না। শুধু আপন হবার নাটক করে যায়। আর সে সকল মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে চাই সীমা।কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কিছুটা চোখ লেগে আসে সীমার। চেয়ারে কোনুইটা দিয়ে হাতের উপর মাথাটা হেলিয়ে চোখটা বন্ধ করে ফেলে সীমা।

________________________________

মাঝরাতে কোন কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দে আরিয়ানের ঘুম ভেঙে গেল।আরিয়ানের মনে হলো কেউ যেন ওদের বাড়ির পিছন দিকে দেয়াল টপকে লাফ দিচ্ছে। আরিয়ান তার মোবাইলের স্ক্রিন টা অন করে দেখলো রাত দুই টা বাজে।

আরিয়ান ভাবছে,
"অবশ্যই তাদের বাড়িতে চোর ঢোকার চেষ্টা করছে। আরিয়ান বারান্দা গিয়ে গ্রিল দিয়ে নীচের দিকে তাকালো দারোয়ানকে ডাক দেবার জন্য। কিন্তু দারোয়ান কে দেখা যাচ্ছে না। আরিয়ান চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক অনেকক্ষণ তাকালো কিন্তু দারোয়ান কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

আরিয়ান ভাবলো,
" হয়তো ওয়াশ রুমে গিয়েছে। কিন্তু প্রায় বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাবার পরও দারোয়ানের কোন পাত্তা পেল না আরিয়ান।

আরিয়ান এবার চোখে মুখে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
" দারোয়ান নির্ঘাত ঘুমাচ্ছে। ওর রিলাক্স এর জন্য আমি দুইজন দারোয়ান রাখলাম তারপরও এতো ফাঁকি বাজি করছে। আজকে তো ওর খবর আছে।

আরিয়ার প্রচন্ড রাগ নিয়ে নিচে নেমে গেল। আরিয়ান দারোয়ান
কে খুঁজতে খুঁজতে এক কোনায় গিয়ে দেখলো দারোয়ান মতিন কার সঙ্গে জানি ফোনে কথা বলছে। আরিয়ান কিছুটা এগিয়ে গেল দারোয়ানের দিকে। লিখ দারোয়ান মতিন আড়ালে দাঁড়িয়ে কারো একজনের সাথে ফোনে কথা বলছে।

" ও জানু ও সোনা তোমার সাথে কথা না বললে আমার মোটেও ভালো লাগে না। এই বাড়ির মালিক টা তো এক নম্বরের বজ্জাত এই জন্যই তো তোমার সাথে দিনে কথা বলতে পারি না।তাইতো সবাই ঘুমিয়ে যাবার পরে তোমার সাথে আমি ভালো মতো প্রেম করতে পারি

আরিয়ান পিছনে দাঁড়িয়ে দারোয়ান মতিনের কথা সব শুনছিল। আরিয়ান রাগে তার ঠোঁট দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে আছে।

রাগের ফুঁসতে ফুঁসতে মনে মনে বলল,
" তার চাকরি করে তাকে কিনা বজ্জাত বলা শালার দারোয়ান ব্যাটা তোকে প্রেম করাচ্ছি দাঁড়া।

" আমি বজ্জাত না। ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রেম করা হচ্ছে তাই না।

মতিন তার ফোনটা কান থেকে নামিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকালো। তারপর ফোনটা আবার কানে নিয়ে বলল,
" এই জানু তোমার গলার কন্ঠ টা এমন পুরুষের মতো হয়ে গেল কেন।

" তোরে দেখাচ্ছি কেন পুরুষের মতো হয়ে গেল।

আরিয়ান মতিনের মাথায় একটা গাট্টা মারল। মতিন রেগে মেগে বলল,
" কোন শালা রে এই মতিনের পাতায় গাট্টা মারিস আজকের তোর খবর আছে।

কথাটা বলেই মতন পিছনে দাঁড়িয়ে দেখল আরিয়ান তার দিকে চোখ গরম করে দাঁড়িয়ে আছে। মতিন সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা পকেটে রেখে দিলো। মতিন শুকনো একটা ঢোক গিলল।

মতিন নিজেই নিজেকে বলল,
" কাম সারছে আজকে আমার খবর আছে।

মতিন কিছুটা কাঁপা কাঁপা গলায় আরিয়ান কে বলল,
" স---স্যার আপনি।

আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত গলায় বলল,
" আমি বজ্জাত না।রাত্রের বেলা ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রেম করার জন্য তোমাকে চাকরিতে রাখা হয়েছে তাই না।

মতিন সঙ্গে সঙ্গে কান ধরে উঠবস করা শুরু করল।
" আমি বজ্জাত আমার চৌদ্দ গুষ্টি বজ্জাত।এই যে স্যার দেখুন কান ধরে উঠছি। আর বসছি এমন ভুল আর কখনো হবে না।

মতিন একনাগাড়ে কান ধরে উঠবস করছে। আরিয়ান মতিন কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
" last warning for you. যাও বাড়ির পিছনে গিয়ে দেখো মনে হয় কারো পড়ার আওয়াজ পেলাম কোন চোর টোর এসেছে কিনা দেখো।

মতিন হাতে একটা টর্চ লাইট নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেল।

আরিয়ান নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিল আলিয়ার রুমের সামনে দিয়ে যাবার সময় আরিয়ানের মনে হলো আলিয়া কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। আরিয়ান মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় রাত আড়াইটা বাজে।আরিয়ান আলিয়ার ঘরের সামনে কিছুতে এগিয়ে গেল তার ধারণা ঠিক কিনা তা বোঝার জন্য। আরিয়ার দরজার কিছুটা সামনে যেতেই আরিয়ান বুঝতে পারল সত্যি আলিয়া কারো সাথে কথা বলছে। আরিয়ান অফিসিয়াল কাজের চাপে বেশ কিছুদিন যাবত আলিয়ার দিকে সেরকম নজর দিতে পারছে না। তাই আলিয়া যা ইচ্ছা তাই করছে। কিন্তু তার মা কি করছে বাসায় আলিয়া কি করছে না করছে সেই দিক থেকে খেয়াল রাখতে পারছে না।এ বিষয়ে সকালে আলিয়ার সাথে এবং তার বাবা-মার সাথে কথা বলতে হবে প্রয়োজন হলে আলিয়াকে কড়া শাসন করতে হবে।

অনেকক্ষণ যাবৎ বাড়ির পেছনে এপাশ ওপাশ টর্চ লাইট মেরে দেখল কিন্তু এমন কিছুই চোখে পড়ল না। পরে সে ভাবলো,
'''' হয়তো এটা তার স্যারের মনের ভুল হবে'''।

মতিন সেখান থেকে চলে গেল। মতিন ওখান থেকে চলে যেতেই কালো হুড্ডি আর মুখোশ পরা একজন বেরিয়ে এলো আড়াল থেকে। তারপর ধীর পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল।

রাত প্রায় চারটা,
বারে একটা পার্টি চলছে সেখানে বসে কিছু ছেলে ড্রিংকস করছে।আর ওদের মনোরঞ্জনের জন্য দুইটা মেয়ে ডান্স করছে। ডান্স করতে করতে একটা মেয়ে একটা ওয়াইন এর গ্লাস এনে হাতে দিল রনক নামের একটা ছেলের। রনক মেয়েটার হাত থেকে ড্রিংকস এর গ্লাস টা নিয়ে ড্রিংকস করা শুরু করল। ড্রিংস টা খেয়ে রনকের নেশা যেন মাথায় চড়ে গেল। সে চোখ মেলে যেন তাকাতেই পারছে না। সেই মেয়েটা রণক কে হাতের ইশারায় তার কাছে ডাকলো। রনকের ঢুলুঢুলু অবস্থা। কোনরকমে এলোমেলো পায়ে সে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল।রনক কে একটা অন্ধকার রুমে নিয়ে গেলো সে।রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে আছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।রনক ওর পিছনে কারো উপস্থিতি অনুভব করলো। পিছনে ঘুরে তেই কেউ ওকে একটা ধারালো ছুরি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে লাগলো।

রক্তে পুরো ফ্লোর লালা হয়ে গেছে।রনক তার সামনে থাকা মানুষ টার কাছে বাঁচার জন্য আকুতি মিনতি করছে।

সে রনকের দিকে একটু ঝুঁকে খুব বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো,
"খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না। খুব বাঁচতে ইচ্ছা হচ্ছে না রে।ঐ দিন ওর ও না এর থেকেও বেশি কষ্ট হয়েছিল।বাঁচার জন্য তোদের কাছে ও জানে টা ভিক্ষা চেয়ে ছিল।তোরা তো ওকে এতো টুকু দয়া করিস নি। অনেক যন্ত্রণা আর কষ্ট দিয়ে মেরে ছিলি ওকে।তার থেকেও দ্বিগুন কষ্ট তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

কথা বলেই ছুরি দিয়ে কয়েক টা পোছ দিলো রনকের গলায়। রনক কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করছে তা দেখে সে আনন্দের হাসি হাসছে।

রাত সাড়ে ৪ টা,
পার্টি প্রায় শেষ পর্যায়ে।সবাই পার্টি শেষ করে বের হয়ে যাবে তখন তাদের মধ্যে একজন চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো সবাই আছে শুধু রনক নেই। রনকের বন্ধুরা মিলে রনক কে খুঁজতে লাগলো। রনকের এক বন্ধু সিয়াম দেখল বাড়ির পিছনের এক জায়গা থেকে ধোঁয়া আসছে। সিয়াম সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল কি হলো রনকের গাঁয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। রনক বাঁচার জন্য ছটফট করছে।সামনে দাঁড়িয়ে একজন হো হো শব্দে হাসছে।

রিমন চিৎকার দিয়ে উঠলো। পালাতে যাবে তখনই রিমন তাকে পিছন থেকে জাপটে ধরল। সে তার হাতে খামচি মেরে জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে ওখান থেকে চলে গেল।

সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯ এ ফোন দিলো।

উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সাব্বির।ওর মনের মন পাখি টা বেজায় রাগ করেছে সাব্বিরের সাথে। সাব্বির কিছু তেই তার মন‌টাকে মানাতে পারছে না। কষ্টে তার বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সাব্বিরের ফোন বেজে উঠলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কর্তব্যের খাতিরে ফোনটা রিসিভ করল সাব্বির।ফোনে কথা বলা শেষে রেডি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।

আধঘন্টা পর,
একটা টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালো। লাশে
টা কে ভালো পর্যবেক্ষণ করে দেখল খুনের প্যাটার্ন টা ঠিক একই রকম। শুধু এই বার জায়গাটা ভিন্ন। গত তিন টা মার্ডার করা হয়েছিল লেকের পারে আর এইবার বারের পেছনে। হয়তো খুনি তাকে লেকের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় পাইনি তাই এখানেই খুন করেছে।

রিমন সাব্বিরকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলল।

" তুমি তার মুখ দেখতে পেয়ে ছিলে।

" স্যার আমি ওই খুনি টাকে ধরার অনেক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি সে আমাকে খামচি মেরে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে।

রিমন সাব্বিরের হাতে খামচির দাগ দেখে বুঝতে পারল এটা কোন মেয়ের নখের আঁচড়।

হঠাৎ রিমন বলে উঠলো,
" তবে তার সেটা কিন্তু কোন পুরুষ ছিল না একটা মেয়ে ছিল।

সাব্বির এবার সম্পূর্ণরূপের শিওর হয়ে গেল সে যা সন্দেহ করেছিল সেটাই ঠিক খুনগুলো কোন একটা মেয়ে করছে।

হঠাৎ সাব্বিরের সঙ্গে আসা এক কনস্টেবল আজাদ সাব্বিরকে কিছু একটা হাতে দিয়ে বলল,
" স্যার এটা ওই লাশের থেকে কিছুটা দূরে পাওয়া গিয়েছে।

সাব্বির সেই জিনিসটা সুন্দর করে এভিডেন্স হিসাবে রেখে দিল।

সাব্বির ভাবছে,
"কালকেই এটাকে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে হবে তারপর আশা করি অনেকগুলো ক্লু পাওয়া যাবে এর মাধ্যমে। তার আগে আমাকে ওদের সবগুলো ডিটেইলস নিয়ে একটা প্যাটার্ন তৈরি করতে হবে হয়তোবা এই প্যাটার্নের মধ্যে আমার খোঁজা প্রশ্নের উত্তর গুলো রয়েছে।

___________________________

পরদিন সকালে খুব ফুরফুরে মেজাজে ঘুম থেকে উঠলো মাইশা। আজকে মাইশার মনটা যেন অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ভালো। ওর মনের মধ্যে যেন এক রকমের আনন্দ বিরাজ করছে। মাইশা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাইশা নিজেকে দেখলো আর প্রশান্তির একটা হাসি দিয়ে নিজে নিজে বলল,
" আজ অনেকগুলো দিন পরে আমার নিজেকে একটু হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে আমার উপর থেকে অনেক বড় একটা বোঝা কিছুটা হলেও হালকা হল।

হঠাৎ মাইশার চোখ পড়লো ওর চোখের দিকে। মাইশা ঘরের এখানে-ওখানে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। কিন্তু তার কাঙ্খিত জিনিসটা খুঁজে পেল না। মাইশা তার খাটের ওপর থেকে তোষক টা একটু সরিয়ে খাটের ওপর থেকে একটা কাঠ সরিয়ে দিয়ে তার ভিতর থেকে একটা বক্স বের করল। বক্স টা নিয়ে মাইশা ওয়াশ রুমের দিকে চলে গেল।

মাইশা ফ্রেশ হয়ে সবার জন্য নাস্তা বানাতে গেল। কিছুক্ষণ পর মাইশার মামি রেহানা বেগম কিচেনে এসে দেখল মাইশা প্রায় অর্ধেক নাস্তা বানিয়ে ফেলেছে। রেহানা বেগম তো সম্পূর্ণ অবাক হয়ে গেল।

রেহানা বেগম ভাবছে,
" যে মেয়ে কখনো রান্নাঘরের কাছে তেমন একটা আসেনি সে আজ নাস্তা বানাচ্ছে সবার জন্য। আসলে মেয়েদের বিয়ের ফুল ফুটলে মনে হয় মেয়েরা সত্যি চেঞ্জ হয়ে যায়।

কথাগুলো ভেবে রেহেনা বেগম কিছুটা মুচকি হেসে চলে গেলেন। সবাই নাস্তা খেতে বসে আজকে নাস্তার স্বাদ যেন একটু অন্যরকম পেল।

আরিয়ান তার মাকে বলে উঠলো,
"মা আজকে মনে হচ্ছে নাস্তা টা একটু অন্যরকম করে বানিয়েছ।

রেহেনা বেগম মাইশার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে বললেন,
" অন্যরকম তো লাগবেই কারণ আজকে যে স্পেশাল একটা মানুষ নাস্তা বানিয়েছে তাই।

" মানে!

"মানে আজকে সকল নাস্তা মাইশা বানিয়েছে।

কথাটা শুনে আরিয়ান তো হা হয়ে তাকিয়ে আছে মাইশার দিকে। আরিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
" কি বলছো মা? আজকে মাইশা নাস্তা বানিয়েছে।

" এত অবাক হবার কি আছে ভাইয়া।

আরিয়ান মাইশাকে একটা চোখ টিপ মেরে আস্তে করে বিড়বিড় করে মাইশাকে বলল,
"বাবা আমার পিচ্চি বউটা দেখি খুব এক্সপার্ট হয়ে গেছে। তা আমাকে কবে এত এক্সপার্ট ভাবে ভালবাসবো বলতো।

মাইশা আরিয়ানের হাতে একটা চিমটি কেটে বলল,
"এই কি বলছো তুমি এইসব।

"কেন এটা তো আমার অধিকার।

আলিয়া ওদের ফিসফিসানি কথা বলা দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। আলিয়া কিছুটা দুষ্টামির ছলে বলল,
"ভাইয়া তোরা এত ফিসফিসিয়ে কথা না বলে একটু জোরে জোরে বলনা আমরাও শুনি।

আরিয়ান আলিয়াকে ধমকের স্বরে বলল,
"তুই দিন দিন খুব পেকে যাচ্ছিস আলিয়া। আর তুই কি ভেবেছিস তুই কি করছিস না করছিস তার কোন খবর আমার কাছে নেই।

আরিয়ানের মুখে এমন কথা শুনে আলিয়া কিছুটা ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
"মানে তুই হঠাৎ এমন কথা বললি কেন ভাইয়া।

আরিয়ান আলিয়ার কথার কোন উত্তর না দিয়ে তার বাবা আর মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"মা আমার বিয়েটা হয়ে যাবার পরেই আমি ওর বিয়ের ব্যবস্থা করব।

কথাটা শুনে আলিয়ার মুখটা একদম চুপসে গেল। আলিয়া বুঝতে পারছে না হঠাৎ তার ভাইয়ের কি হল কেন আলিয়ার পিছনে এমন উঠে পড়ে লাগলো।

" আমি এখন বিয়ে করব না ভাইয়া।

" আমি কি তোর মতামত জানতে চেয়েছি আমি তোর বড় আমি যা সিদ্ধান্ত নিব তাই হবে এখানে তোর কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ যোগ্য নয়।

আলিয়া আর কোন কথা না বলে নাস্তা শেষ না করে রাগ দেখিয়ে ওখান থেকে চলে গেল। কেউ তেমন কিছু বুঝতে না পারলেও মাইশা সবটাই বুঝলো। তাই আর দেরি করা যাবে না যত দ্রুত সম্ভব আলিয়া আর রাফাতের সম্পর্কের ব্যাপারটা আরিয়ান কে বলতে হবে। তাই মাইশা সিদ্ধান্ত নিল আজকে আরিয়ান অফিস থেকে এলেই ওদের সম্পর্কে সবটা আরিয়ানকে বুঝিয়ে বলবে মাইশা।

সবার নাস্তা শেষ হয়ে যাবার পর মাইশা সব কিছু গুছিয়ে রাখছিল। আরিয়ান বের হয়ে যেতে নিয়ে আবার ফিরে আসলো। আশেপাশে চোখ বুলিয়া নিয়ে হঠাৎ করে মাইশার গালে একটা কিস করে বসলো।

মাইশা গালে হাত দিয়ে চোখ মুখ খিঁচে তাকিয়ে আছে আরিয়ানের দিকে।
"এটা কি হলো।

"আমার বউটা আজকে এত কষ্ট করে সকাল থেকে এই গরমের মধ্যে ঘাম ঝরিয়ে নাস্তা বানিয়েছে তাই তাকে একটু আদর করলাম।

"তুমি কি বলতো আরিয়ান ভা----

ভাইয়া কথাটা বলার আগেই আরিয়ান মাইশার মুখ চেপে ধরল।
"চুপ একদম চুপ আর একবার যদি ভাইয়া বলো তাহলে কিন্তু আজকে রাতে খবর আছে।

"উম উম

আরিয়ান মাইশার মুখ থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
" আমাকে আরিয়ান সোনা বলে ডাকো। তা না হলে কিন্তু আজকে রাত্রে।

" বলবো না।

" ঠিক আছে আজকে রাতে আমিও দেখাবো।

" কি দেখাবে।

"‌ রাত্রে বুঝতে পারবে।

" ধ্যাত তোমার মুখে কোন কথা আটকায় না।

" বউয়ের কাছে আবার লজ্জা কিসের। আমি কিন্তু এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনবো এর আগে যদি আমাকে আরিয়ান সোনা বলে না ডাকো তাহলে কিন্তু বুঝবে মজা।

আরিয়ান কাউন্ট করা শুরু করলো,
এক, দুই

আরিয়ান তিন বলতে যাবে তখনই মাইশা বলে উঠলো,
" ব---বলছি বলছি।

" বল মিষ্টি করে বলবে।

" মাইশা এদিক ওদিক দেখে নিয়ে আস্তে করে বলল,
"আ----আরিয়ান

বলে থেমে গেল।

" কি হলো বাকিটা বলবে কে।

" ছেড়ে দাও না প্লিজ।

" ঠিক আছে রাত্রে তাহলে রেডি থেকো।

মাইশার চোখ বন্ধ করে আরিয়ান সোনা বলে দৌড় দিয়ে পালালো। মাইশার এমন কান্ড দেখে আরিয়ান হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। আরিয়ান আস্তে করে বলল,
"পাগলি একটা। এই পাগলীর প্রেমই তো পাগল হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।

আরিয়ান টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলো মাইশা যে গ্লাস টাতে পানি খেয়েছিল সে গ্লাসটা টেবিলের উপর পড়ে আছে। আরিয়ান গ্লাসটা হাতে নিয়ে গ্লাসে একটা চুমু খেলো। একটা মুচকি হাসি দিয়ে আরিয়ান বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। আড়ালে দাঁড়িয়ে সব টা দেখল রেহানা বেগম।

একটু মুচকি হেসে নিজে নিজে বলল,
" দুইটাই পাগল। কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। আমি ভুল ভেবেছিলাম আমার মাইশা আগের মাইশা ই আছে ও চেঞ্জ হয়নি।

_______________________________

রিয়াদের কিছুক্ষণ আগেই জ্ঞান ফিরেছে। রিয়াদের মা রিয়াদকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে।

ডক্টর এসে সবাইকে অভয় দিয়ে বলল,
" এত টেনশন করার কিছু নেই। উনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে সঠিক সময়ে ওনার ট্রিটমেন্ট শুরু না হলে ওনার লাইফ ফিক্স হতে পারতো। ওই মেয়েটা সত্যি উনার জন্য অনেক করেছে।

ডক্টর কেবিনের আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল কিন্তু সীমাকে কোথাও দেখতে পেল না। ডক্টর একটা নার্স কে জিজ্ঞেস করল,
" আচ্ছা ওই মেয়েটা কোথায় যে উনাকে হসপিটালে এডমিন করেছিল।

" স্যার ওনার জ্ঞান ফেরার পর থেকে আমি ওনাকে দেখিনি।

রিয়াদ ডক্টর আর নার্সের কথোপকথন শুনে আস্তে করে ডক্টর কে জিজ্ঞেস করল,
" আমাকে এখানে যে নিয়ে এসেছিল সে কোথায়।

" সঠিক বলতে পারছি না আপনার জ্ঞান ফেরার পর থেকে তাকে আমরা কেউ আর দেখিনি। হয়তো সে আপনার সামনে আসতে চাচ্ছে না।

" কিন্তু কেন।

" তা তো বলতে পারব না।

" আপনি কি তার নাম জানেন।

" আসলে উনার নামটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। শুধু উনি বলেছিল আপনার পরিচিত।

রিয়াদ বসে বসে ভাবছে কে তাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে তাকে এতটা পরিমাণ দেখাশোনা করেছে কিন্তু তাকে দেখা না দিয়েই চলে গেল তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় রিয়াদের মনটা ভরে উঠলো। তবে সে যেই হোক না কেন তাকে তো রিয়াদের খুঁজে বের করতেই হবে কারণ রিয়াদ তার প্রতি চির কৃতজ্ঞ। আর তাকেও খুঁজে বের করতে হবে যে রিয়াদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। তবে রিয়াদ যাকে সন্দেহ করছে যদি সে হয়ে থাকে তাহলে তার সাথে অনেক বড় একটা বোঝাপড়া আছে রিয়াদের।

চলবে.....

817 Views
14 Likes
6 Comments
4.8 Rating
Rate this: