কিশোর জীবনে প্রেমনদী (পর্ব-২)
পূর্বের মতন আপন শ্রেণির নিকটস্থে গিয়ে কক্ষে ঢুকে শেষতম বেঞ্চের এক বেঞ্চ আগে বসে পড়লাম। সেদিনটাও বিগত দিনগুলোর মতো অভিন্ন অবস্থায় লক্ষিত হলো। নিজ অবস্থার বাঁদিকে দর্শন করতেই দৃষ্টিগোচরে দেখি যে, সব ছাত্রীরাও যে যাঁর মতো করে বেঞ্চে বসে আছে। কেউ কেউ নিকটজনের সঙ্গে গালগল্পে নিমগ্ন আছেন। আবার কেউ দেখি বই পাঠে মত্ত। তবে এক মেয়ে অনাথের ন্যায় ভান ধরে শেষে বেঞ্চের মাঝখানের আসনে আনমনে উদাস হয়ে বসে আছে। মেয়েটির দিকে দৃষ্টিপাত হওয়া মাত্রাই বুঝতে পারলাম যে, মেয়েটিকে প্রথম দিন থেকে পুরো এক সপ্তাহ অবধি কোথাও শ্রেণির কক্ষে এবং বিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো স্থানে দেখা যায়নি। হয়তো সে নতুন ছাত্রী হবে, নতুবা আজকেই বোধহয় শ্রেণিতে প্রথম এসেছে ইত্যাদি এসব ভাবতে ভাবতেই ওর দিকে আপাতদৃষ্টিতে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে রইলাম। সহসা মেয়েটির মাঝে চেতনা ফিরে এলেই বাঁদিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকানো মাত্রই আমাকে দেখতে পেলো। মেয়েটির পহেলা চাহনির প্রদর্শনে আত্মহারা না হওয়ার কোন উপায়ান্তর নেই বলা যায়। মেয়েটির বদনকান্তি দৃষ্টিপাতে আপন বুকে অস্থিরতা তৈরি হতে লাগলো। মনে হচ্ছিলো যেনো প্রথম দেখায় মেয়েটির মায়ায় আটকে গেলাম।
মেয়েটির মোহমুগ্ধ রূপসি আকৃতির মায়াবী মুখটার প্রতি কেন যেন বারবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে নিজের হৃদয়ও আগ্রহাতিশয্য ছিলো। তৎক্ষণাৎ কোনপ্রকার এদিক সেদিক না চেয়ে স্ব-চেতের অস্থিরতার প্রবল চাপে খানিকক্ষণ মেয়েটির দিকে বেহায়ার মতো আনমনে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে নিশ্চেষ্ট রূপে বসে রইলাম। বাঁদিকে চোখ বুলিয়ে নড়েচড়ে বসতেই সে-ও আমায় দেখতে পেলেন। চোখে চোখ পড়ার সাথে সাথেই তাঁর বিবেকে হয়তো নাড়া দিলো। প্রথম দেখায় চোখে চোখ পড়ার সাথে সাথে সেও আমার প্রতি তাঁর রমণীয় মায়াবী বদনখানির মনকাড়া নজর দিয়ে বোকার মতো তাকিয়ে ছিলেন। একে অপরের দিকে এমনভাবে চেয়ে আছি যেনো বোধহয় দু'জন দু'জনার পূর্ব পরিচিত ছিলাম। একদিকে নয়নে নয়ন রেখে আপাতদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি অন্যদিকে ততক্ষণে বুকের গহিনে একধরনের কম্পন অনুভব হলো। এতে কিঞ্চিৎ পরিমাণ স্তম্ভিত হয়ে নিজ আসনে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলাম। উভয়ে চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পুনঃপুন একে অন্যের দিকে চেয়ে চেয়ে ঐভাবে কিছু মুহূর্ত পার করে দিলাম। ততক্ষণে হয়তো দু'জনার মনে প্রীতির বাতি জ্বলে উঠলো। এর অল্পক্ষণ পশ্চাতে অনুভব করলাম যে, মেয়েটির প্রথম চাহনির দৃশ্যটি বারবার আমার চক্ষুর সম্মুখে ভাসতে লাগলো।
নিজ আসনে ঠিকঠাক করে বসার একটু পরে কর্ণপাত হয় যে, ছুটির সংকেত শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজলির গতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দপ্তরি সাহেব প্রতিদিনের মতো টুনটুন করে ঘণ্টা-ধ্বনি দিলেন। সমস্ত শ্রেণি থেকে একে একে সব শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে পড়লো। সেই মেয়েটিও শ্রেণিকক্ষ হতে বেরিয়ে গেলেন এবং একাকিভাবে চুপিচুপি করে হাঁটতে শুরু করলেন। এই সুযোগে ধীরগতিতে কক্ষ থেকে বাহির হয়ে তাঁর পিছু পিছু হাঁটতে আরম্ভ করলাম। ততক্ষণে হয়তো মেয়েটি তা টের পেয়ে হতভম্ব হয়ে আমার পিছু নেওয়াটা আমলে নিলেন যে আমি নিশ্চয়ই তাঁর পিছু নিচ্ছি। চুপিচুপি করে সে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে বেরিয়ে কিছুদূর গেলেন। কত দূর যেতে না যেতেই সে তাঁর মুখচন্দ্র দিয়ে পিছনে ফিরে দেখলেন এবং আমায় দেখে একদৃষ্টিতে সামান্য পরিমাণ মৃদু হাসি দিয়ে পুনরায় সম্মুখে মুখমণ্ডল ঘুরিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। মেয়েটির মৃদু হাসি উপলব্ধি করে বৃহৎ এক মোহযুক্ত সুখের শ্বাস ছেড়ে দিলাম। সুখের শ্বাস ছাড়বো নাইবা কেনো? কারণ তখন যে বয়ঃসন্ধির আগমনে নবযৌবনের প্রভাবে মন-মানসিকতার এলোমেলো অবস্থা। মেয়েটিরও একই দশা হয়েছে হয়তো। ধীরগতিতে হেঁটে চলতে চলতে মেয়েটি দ্বিতীয়বারের মতো পুনরায় পিছনে ঘুরে এক মুচকি হাসি নিক্ষিপ করলেন।
মেয়েটির অদ্ভুতদর্শনের ঢং করা দেখে নিজেও তা সাদরে বরণ করে নিচ্ছিলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে মেয়েটি কাছাকাছি বিপরীতমুখী হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। সে অবশ্য তা খেয়াল করে মনে মনে কি যেনো ভাবতেছিলো এবং হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে দিলো। এভাবে মিনিট খানেক হাঁটার পরে মেয়েটি এক ক্ষুদ্রতম সংকীর্ণ রাস্তায় প্রস্থান করে একটা পাকা বাড়ির সম্মুখীন হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষা দিয়ে কি যেনো বলতে ছিলেন। তৎক্ষণাৎ মেয়েটির চোখের ভাষা যথাযথ মর্মে বুঝতে পারিনি বলে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। এভাবে মিনিট দু-এক যাওয়ার পরপরই মেয়েটি সেই পাকা বাড়ির দরজাটি আলগোছে ঠেলে অভ্যন্তরে ডুকে পড়লেন। তা দেখে সাথে সাথে বুঝতে বাকি রইলো না যে, এটা নিশ্চয়ই তাঁর বাড়ি। এসব ভেবে আমিও আপন আলয়ে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্য রওনা দিবো এমন সময়ে মেয়েটির বাড়ির সামনের পথের দু'পাশে প্রচুর উদ্ভিদের প্রজাত চোখে পড়ে, যা দেখতে কিছুটা অগভীর ক্ষুদ্র বনের মতন ছিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঐসব কিছুক্ষণ দেখার পরে নিজ বাড়ির দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। বিদ্যালয়ের পরিবেশ থেকে মদীয় আবাসস্থল বেশি দূর ছিলো না বিধায় কিছুক্ষণের রথযাত্রায় বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। পরদিন বিদ্যাপীঠে গিয়ে দেখলাম যে............
........চলবে কী?
বিঃদ্রঃ গল্পের অবশিষ্ট কাহিনি ধারাবাহিক পর্বে প্রকাশিত হবে। এই কাহিনিতে শিক্ষণীয় অনেক বিষয়াদি পরিলক্ষিত হবে। কাহিনীর শুরুটা দারুণ হলেও মধ্যাংশের কাহিনী হবে করুণ এবং শেষাংশটা হতে পারে নিদারুণ। কাজেই সাময়িক প্রতীক্ষা করে "গল্প সমাহার" অ্যাপে চোখ রাখুন এবং কাহিনিটা পড়ে ভালো লাগলে প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও অন্যদের সাথে ভাগ করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ!
"কিশোর জীবনে প্রেমনদী" পর্ব-০২
815
Views
9
Likes
2
Comments
5.0
Rating

সকল মন্তব্যগুলো (2)
দারুণ গল্প
চমৎকার একটা কাহিনী। পরের পর্ব পড়তে অপেক্ষা রইলাম!