""কিশোর জীবনে প্রেমনদী"" পর্ব-১
জন্মলগ্ন হতে শৈশব অবধি মোটেও শান্ত ছিলাম না। হাতকে পা বানিয়ে প্রাণীর মতন এদিক-সেদিক বিচরণ করে ছুটে যেতাম নিজ জননীর নিকটস্থে। তখনকার সময়ে তথা জন্মের পর থেকে দু-তিন বৎসর বয়স হওয়া অবধি হাঁটাহাঁটি করতে কোনো মানব সন্তানই অভ্যস্ত নয়, তবে ধীরে ধীরে হাঁটা শেখার অভ্যাস হয়। শৈশব কালে প্রতিটি শিশুই আপন মায়ের নৈকট্যে বেশিরভাগই রয়। আমারও তাঁর বিপরীতে কিছু নয়। শৈশবের অবসান ঘটার পরে বাল্য বয়সের সূচনা ঘটে। বাল্যকালে পা রেখে নানা রকমের দুষ্টুমি ও দুরন্তপনা করতে করতে ভাগ্যের বদল ঘটে যে, কোনো প্রকার শয়তানি বা ইতরামি করলে বাবা-মায়ের হস্ত থেকে ফলাফল স্বরূপ প্রাত্যহিক অল্প পরিমাণের স্বল্প বেত্রাঘাত খাওয়ার লায়েক হতাম। বাল্যবেলায় পাড়াপড়শি ছেলেপিলেদের সঙ্গে কত রকমের কর্মকাণ্ড করা হতো তা এখনো আপন নয়নের অভিমুখে ভেসে ওঠে। কত খেলাধুলায়, কত দৌড়াদৌড়িতে, কত বিনোদনে, কত ফাজলামিতে, কত বাবুগিরিতে, কত ভণ্ডামিতে, কত গুণ্ডামিতে, কত আদর-স্নেহে, কত ভালোবাসায়, কত খাওয়া-দাওয়ায়, কত উৎসবে, কত ভ্রমণে, কত আরামে-আয়েশে ও কত বেলায় কেটেছে তা হিসাব করে প্রকাশ করা আসলেই অসম্ভব। বাল্যবেলা শেষ হতে না হতেই কৈশোর বয়সের যাত্রা আরম্ভ হলো।
কিশোর কালের পহেলা দিকে শিক্ষা জীবনের অষ্ট বৎসরে কদম রাখলাম। তখনকার দিনে যেনো অষ্টম শ্রেণিতে সদ্য উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থী। স্বীয় বয়স তখন চতুর্দশ কিংবা পঞ্চদশের কাছাকাছি হবে, নতুবা এর চেয়ে আরো কম বয়সী হিসেবে কল্পনায় ধরে নেওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে নববর্ষের আগমনে নতুন শ্রেণির নয়া পাঠে যোগদান করতে নিজ বিদ্যালয়ের নির্ধারিত শ্রেণির কক্ষে গমন করলাম একা একা। শ্রেণি কক্ষের নিকটে যেতে না যেতেই হইচইপূর্ণ কিছু ধ্বনি কর্ণপাত হলো। মুহূর্ত বিলম্ব না হতে বুঝতে বাকি ছিলো না যে, নিশ্চয়ই নতুন শ্রেণিতে সদ্য কৃতকার্য হওয়া বিদ্যার্থীগণ দ্বারা পুরো কক্ষ ভরাট হয়ে গেছে। সকলের আনন্দঘন হইচইপূর্ণ শব্দে কক্ষটা মুরগির খামার হিসেবে স্বীকৃত দেওয়ার উপযুক্ত মনে হচ্ছিল। তৎক্ষনাৎ শান্ত মনে ধীরগতিতে শ্রেণির কক্ষে প্রবেশ করা কালে আপন চরণ রাখতে প্রদর্শিত হয় যে, শিক্ষক/শিক্ষিকা বিহীন গোটা কক্ষটা ছাত্রছাত্রীতে ভরপুর। ভেতরে অবস্থানরত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কেউ নয়া পুস্তক খুলে অত্যন্ত নিবিড় নজরের সাথে মনোনিবেশ দিয়ে কি যেন পড়ছে। আবার কেউ নিশ্চেষ্ট মনে যে যাঁর আসনে নীরবতা পালনে ধ্যানমগ্ন আছেন। কেউবা পাশের জনের সাথে আলাপসালাপে যেনো মত্ত বোধহয়। তখনি এদিক-ওদিক আর না তাকিয়ে একদম শেষের বেঞ্চে গিয়ে সাদামাঠা মনে নিস্তব্ধ হয়ে একলা বসে পড়লাম।
বেঞ্চের একপাশে উপবিষ্ট করার পর দু'পাশে যথেষ্ট আসন খালি থাকার সত্বেও কোনো ছাত্র সেদিন স্বীয় বেঞ্চের কোনো পার্শ্বে এসে নিজেকে সঙ্গ দেয়নি। ফলে একদিকে মনে খানিক বিষাদ লাগলেও অন্যদিকে সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট ছিলাম। কারণ দু'পাশে তো আর কেউ ছিল না, ফলে কারো সাথে অহেতুক বাচালতা করার চেয়ে নিঃশব্দে সম্মুখে বিশেষভাবে লক্ষ্য করার স্বাদই অন্যরকম। এর খানিকক্ষণ পরে খেয়াল করলাম যে, চোখে চশমাপরা মোটাসোটা আকৃতির দেহ নিয়ে একজন ভদ্র স্বভাবী লোক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন। ব্যাপারটা অনায়াসে চেতনায় অবগত হয়ে গেলে যে, কক্ষে প্রবেশ কৃত ভদ্রলোকটা নিঃসন্দেহে শ্রেণিশিক্ষক হতে পারে। কক্ষে উপস্থিত থাকা সব শিষ্যরা তাঁকে সালাম নামক সম্মান প্রদর্শন করে দাঁড়িয়ে রইলো। স্বয়ং নিজেও এর বৈপরীত্য কিছু না করে আগত শিক্ষক সাহেবকে সবার ন্যায় সম্মান স্বরূপ সালাম অর্পণ করলাম। সাথে সাথেই জনাব শিক্ষক সাহেব উপস্থিত সকলের প্রদত্ত সালামের জবাব মুহূর্তেই একবাক্যে দিয়ে সবাইকে নিজ নিজ আসনে বসার নির্দেশ করলেন। জনাবের আজ্ঞা পেয়ে দণ্ডায়মান সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা বসে পড়লাম।
ঘণ্টাখানেক ধরে আগত শিক্ষাগুরু প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কিছুক্ষণ যাবৎ ধরে নতুন করে পরিচয় আদান-প্রদানের মাধ্যমে পাঠদান সমাপন করে ফিরে গেলেন তাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষে। জনাবের চলে যাওয়াতে শ্রেণির কক্ষে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কোলাহলময় শব্দ করতে ছিলো, কেউ নূতন বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে ছিলো, কেউ কক্ষ হতে তাড়া-হুড়া করে বের হয়ে দিক-বেদিক কোথা যেনো যাচ্ছিলো, কেউবা পার্শ্ববর্তী জনের সাথে গল্পসল্প করতে ছিলো, আবার কেউ অভিনব কায়দায় বন্ধুবান্ধন তৈরি করার প্রচেষ্টায় ছিল। স্বীয় আঁখিদুটি দিয়ে শ্রেণি কক্ষের চতুর্দিকে সবকিছু কয়েকবার অবেক্ষণ করলাম। আপন হৃৎ এ বোধ হলো যে, প্রত্যেকে যে যাঁর মতনই ব্যস্ত। সেই সুবাদে স্বয়ং নিজেও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম একা একা নীরবতা পালনে। এর ঠিক আনুমানিক দশ-বারো মিনিট পরপরই অন্য এক শিক্ষক এসে নতুনত্ব পাঠ্যবই হতে তাঁর নিজস্ব মতিগতিতে অল্প সময়ে কিছু পাঠদান করে তিনিও চলে গেলেন তাঁদের আড্ডা দেওয়ার কামরায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক/শিক্ষিকার অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা বিশেষত যা যা করে থাকেন সেই সবই উক্ত প্রথমে দিনে দেখতে পেলাম। তবে মাঝেমধ্যে স্বয়ং নিজেও তাতে অংশগ্রহণ করে মনোমতো আকাঙ্ক্ষা পূরণে সচেষ্ট হতাম।
ঘন্টা তিন-এক শিক্ষাদান শেষে বিদ্যালয়ের কার্যালয় কর্তৃক অবকাশ দিয়ে দেওয়া হলো। দপ্তরি সাহেব টুনটুন করে ঘন্টা ধ্বনি দিয়ে ইঙ্গিত করে ঘোষণা দিলেন যে, বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া হয়েছে, কাজেই সবাই যে যাঁর ঘরে চলে যেত পারো। দপ্তরির টুনটুন দেওয়া ঘন্টার ধ্বনি পেয়ে গোটা বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যেকের নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষ হতে বের হয়ে যে যাঁর যাঁর মতো করে আপন গন্তব্যের দিকে রওনা দিলো। নিজেও তাড়াহুড়া করে কক্ষ হতে বের হয়ে আপন আবাসে ছুটে আসার লক্ষ্যে বিদ্যালয় থেকে প্রস্থান করলাম। নতুন শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে পহেলা পাঠদানের দিনটা মোটামুটি অগোছালো রূপে সেভাবে পার হয়ে গেলো। পরদিনও একই পরিস্থিতির কবলে পতিত হয়ে নিজেকে কোনরকম সামলে নিলাম। এর পরের দিন থেকে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যায়লে পৌঁছে কখনো শেষের বেঞ্চে, কখনো মাঝ বরাবর বেঞ্চে, আবার কখনো প্রথম বেঞ্চে বসে শিক্ষক/শিক্ষিকাদের নিয়মিত অল্পস্বল্প পাঠদানে অংশ নিয়ে দু'চার দিনের মতন পার হয়ে যায়। এভাবে প্রথম সপ্তাহ শেষে দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুর দিনে অন্য দিনের চেয়ে খানিক বিলম্ব করে বিদ্যাপীঠে পৌঁছালাম। বিদ্যালয়ের চারদিকের বৈচিত্র্যময় এলাকা থেকে শিক্ষাদীক্ষা নিতে আসা বহুল ছাত্রছাত্রীদের আগমনে সেদিনও পুরা শিক্ষালয়ের সমস্ত শ্রেণি হট্টগোলে মগ্নপ্রায়। পূর্বের মতন আপন শ্রেণির নিকটস্থে গিয়ে কক্ষে ঢুকে শেষতম বেঞ্চের এক বেঞ্চ আগে বসে পড়লাম। সেদিনটাও বিগত দিনগুলোর মতো অভিন্ন অবস্থায় লক্ষিত হলো। নিজ অবস্থার বাঁদিকে দর্শন করতেই দৃষ্টিগোচরে দেখি যে, সব ছাত্রীরাও যে যাঁর মতো করে বেঞ্চে বসে আছে। কেউ কেউ নিকটজনের সঙ্গে গালগল্পে নিমগ্ন আছেন। আবার কেউ দেখি বই পাঠে মত্ত। তবে এক মেয়ে...........
চলবে কী..?
বিঃদ্রঃ কাল্পনিক দৃষ্টিতে লেখা হলেও কাহিনীটা সত্য ঘটনা অবলম্বনের ন্যায়। পরের পর্ব পাঠে চোখ রাখুন "গল্প সমাহার" অ্যাপে।
"কিশোর জীবনে প্রেমনদী"
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
1.73K
Views
13
Likes
4
Comments
5.0
Rating