চোখের প্রেমে পড়েছি



গভীর রাত। আনুমানিক তখন ৩ টা বেজেছে। মিতাদের বাসার সবাই তখন ঘুমে অচেতন। শুধু জেগে আছে মিতার একজোড়া ছলছল চোখ। ঘরের সবার কোলাহল থেমে গিয়েছে আগেই।তবু দরজাটা খুলে একবারের মতো ঘরের পরিবেশটা দেখে নিলো মিতা। এরপরেই খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা ব্যাগটা বের করে চুপচাপ দরজা খুলে বাসা থেকে বের হয়ে যায় মিতা।অতঃপর ভোর পাচটার রাজশাহী টু ঢাকা-এর ট্রেনে উঠে পড়ে মিতা।

ট্রেনটা ঝকঝক করে নিজগতিতে চলছে। মিতা মাঝদিকের একটা বগিতে উঠে চাদর গায়ে দিয়ে বসে থাকে। হঠাত মিতার ফোনের রিং বাজলো। ফোনটা রিসিভ করলো ও। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন বলতে লাগলো-
>বের হয়েছেন?
>হ্যা।
>ট্রেন কখন ছাড়লো?
>১৫ মিনিট আগে।আপনি এখনো সজাগ যে?
>প্রতিদিনই এইসময় উঠি,তাই জেগে আছি।
>আচ্ছা রাখি এখন।
>ওকে।পৌঁছে মিস দিবেন।আর একদম টেনশন নিবেন না।আমি কখনো আপনার ক্ষতি চাইনা।
>হু।
মিতা ফোনটা কেটে দেয়।
.
.
সকাল হয়ে এসেছে। রাতে মেয়েটা একদম ঘুমায় নি।কেঁদেকেটে একাকার করে ফেলেছে সব।ঘুম পাচ্ছেনা মিতার।

3 month ago- কলেজে এডমিট হয় মিতা।মিতা শুধু যে লেখাপড়া বা চেহারায় ভালো ছিলো তেমনটি না।অনেক ভালো গান জানতো সে,সেই সাথে নাচও। নতুন ভর্তি হলেও মিতা ওর ফ্রেন্ডদের রিকোয়েস্টে কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান ও নাচে অংশগ্রহণ করে। রাতে খুব জমজমাটভাবে কলেজের অনুষ্ঠান চলতে থাকে। মিতাকে অনুষ্ঠান শেষে কেউ একজন ডাক দেয়।
>এইযে শুনুন।
>জ্বী।
>আমি অভি।এই এলাকায় আসলাম অনুষ্ঠান দেখতে। দারুণ নাচেন আপনি।অসাধারণ। (অভি)
>জ্বী,থ্যাংকস।
>আপনার নামটা? (অভি)
>মিতা।
>নামটাও দারুণ, আর আপনি মানুষটাও দারুণ। (অভি)
অভির কথা শুনে মিতা লজ্জা পায়। মেয়েটি এর আগে কখনো ছেলেদের সামনে দাঁড়িয়ে এত কথা বলেনি।তার ওপর নিজের এতো প্রশংসা শুনে মোমের মতো গলে যায় ওর নরম মন।
>আচ্ছা ভাইয়া আমি এখন আসি।
>আপনার ফোন নম্বরটা দেওয়া যাবে মিস? (অভি)
>আমি ফোন ব্যবহার করিনা।
>ওহ আচ্ছা।এটা রেখে দাও।এতে আমার নম্বর আছে।
এই বলে অভি নিজের অফিসিয়াল একটা কার্ড তুলে দেয় ওকে।
.
অভি যথেষ্ট স্মার্ট ছেলে।আর ভালো জব করে সেটা তার কার্ড দেখে কিছুটা বুঝতে পারে ও।
২দিন পরে মিতা অভিকে ছোট্ট একটা মিস দেয়। অভি সাথেসাথেই কল ব্যাক করে।
>মিস মিতা,এতদিন পর মনে পড়লো আমাকে? (অভি)
>কিভাবে বুঝলেন মিসকলটা আমি দিয়েছি! (মিতা অবাক হয়)
>বুঝি তো!মনের টান থাকলেই বোঝা যায় সব।তো কেমন আছো মিস? (অভি)
>ভালো.....
এভাবে শুরু হয় অভি ও মিতার।
.
অভি মোটামুটি ভালো একটা জব করতো।আর মিতাকে প্রায়ই ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়াতে পারতো। প্রিয়ন্তী হুট করে লাইফে এতকিছু পেয়ে সবকিছু স্বপ্নের মতো ভাবতে লাগলো। চলতে থাকলো দিন।এগোতে থাকলো ওদের সম্পর্ক।
.
এদিকে মিতা ফেসবুকে নিয়মিত থাকতো।আর নিজের ফিলিংস গুলো সবার সাথে শেয়ার করতো।
মাঝেমাঝে পরিচিত কয়েকজনার সাথে টুকটাক কথা বলতো। একদিন অচেনা SP.PROVASH নামে কেউ একজন রিকু পাঠালো মিতাকে। মিতা কি ভেবে যেনো এক্সেপ্ট করে রিকুটা। এরপর নিজেই মেসেজ করে ছেলেটিকে।
>কে আপনি?
>আমি প্রভাশ।আপনার প্রোফাইলে চোখের পিকটা দেখে ভালো লাগলো তাই রিকু দিলাম।
>ওহ আচ্ছা।
>একটা কথা জানতে পারি?
>জ্বী,বলুন।
>চোখটা কি আপনার?
>হ্যা।কেনো?
>কিছুনা।এমনি।
>ওকে।বায়।
.
এরপর মাঝেমাঝে দুজনার ভিতর টুকটাক কথা হত। অভি অবশ্য নিজের ব্যস্ততার কারণে মিতার ফেসবুক চালানোর ব্যাপারে তেমন নিষেধ করতোনা। একসময় ওদের ভিতরে ঝগড়া চলতে থাকে।অভি কারণে অকারণে মিতার দোষ খুঁজতো। মিতা অভির ভিতরে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করে।
.
.
ইতোমধ্যে মিতার পরিবার অভির সাথে মিতার সম্পর্কের ব্যাপারে জেনে যায়। তারা এ সম্পর্ক মেনে নেননি।
হঠাৎ একদিন,,
>আজ তোমার একটু সময় হবে?
>না আজ অনেক ব্যস্ত থাকবো।কিছু বলবে? (অভি)
>থাক।এমনি।
অভির ব্যস্ততার কথা শুনে মিতা একাই মার্কেটে চলে যায়। কিন্তু সেখানে হঠাত একটা জিনিস দেখে থমকে দাড়ায় সে।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনা
মিতা। অভিকে সেখানে আরেকটা মেয়ের সাথে শপিং করতে দেখে ও।হাত ধরে চলছিলো দুজনেই।
.
মিতা দূর থেকেই কল দেয় অভিকে।
>কোথায় তুমি?
>অফিসের কাজে অনেক ব্যস্ত। পরে কল দিবো। এই বলে অভি কল কেটে দেয়। মিতা যা বোঝার বুঝে ফেলে।
.
এদিকে বাড়িতে মিতাকে জিজ্ঞাসা করে তার পরিবার অভিকে সে ভালোবাসে কিনা। নয়তো আরেকটা ভালো পাত্র আছে।তার সাথে বিয়ে ঠিক করবে। মিতা অভিকে ভালোবাসে না জানায় তার পরিবারকে। মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়ে ও। রাতে ফেসবুকে প্রভাশ নক দেয়
>কেমন আছেন?
>(No reply)
>Busy?
>(No reply)
>মন খারাপ?
মিতা রোজ প্রভাশে মেসেজ সিন করে রেখে দেয়।কিন্তু প্রভাশকেও তার ভালো লাগে।
.
মিতার পরিবার মিতার আরেক জায়গায় বিয়ে ঠিক করে ফেলে প্রায়। তার কিছু বলার থাকেনা।
নম্বরটা অনেক আগেই পাল্টে ফেলেছে। অভি মিতার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলো দুয়েকবার।এখন আর তাও করেনা।
.
এদিকে ভালোবাসায় হেরে গিয়ে মিতা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ের আগে সুইসাইড করার। কিছু অবুঝ মেয়েরা হয়তো এমনই হয়।আবেগকে সহজে আটকে রাখতে জানেনা এরা।একটু কিছু হলেই নিজের ক্ষতি করার কথা ভাবে। শেষবারের মতো ফেসবুকে ঢুকে মিতা।
হঠাত ইচ্ছা হলো প্রভাশ নামের ছেলেটাকে শেষবারের মতো মেসেজ দেয়ার। ছেলেটা অধিকাংশ সময়ই অনলাইনে থাকতো।আর টুকটাক কবিতা বা গল্প লিখতো।
>চলে যাচ্ছি চিরদিনের জন্য। ভালো থাকবেন। (মিতা)
>একদম চুপ। উল্টাপাল্টা কোনো কথা বলবেন না।আপনার নম্বরটা দিন কুইক। (প্রভাশ)
>সম্ভব না। (মিতা)
>প্লিজ একবার।জাস্ট কিছু কথা বলবো।(প্রভাশ)
মিতা নম্বর দেয়। প্রভাশ সাথেসাথে কল করে মিতাকে।
>কি হয়েছে আপনার?
>বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করছে।
>আর বয়ফ্রেন্ড?
>অন্যের সাথে সম্পর্ক করেছে।
>দেখেন আপনাকে চিনিনা,জানিনা কিন্তু আপনার খারাপ কিছু হবে সেটাও ভাবতে পারছিনা।আপনি এভাবে জীবনটাকে নষ্ট করে দিতে পারেন না।আপনি বাসায় বুঝান।কিংবা বিয়েটা করে ফেলুন। (প্রভাশ)
>সম্ভব না।এই লোকটাও ভালোনা।টাকাপয়সা দেখে বিয়ে দিচ্ছে। (মিতা)
>ওহ তবে আপনি ঢাকায় চলে আসেন। পরে আপনার পরিবারকে আমি বুঝাবো।আমায় বিশ্বাস করতে পারেন প্লিজ। (প্রভাশ)
>অসম্ভব ব্যাপার। (মিতা)
>অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কোনোকিছু নেই।আমি আপনার ব্যাপারটা দেখবো।ভোরের ট্রেনে চলে আসুন। (প্রভাশ)

মিতার যেহেতু প্রভাশকে ভালো লাগে তাই রাজি হয়ে গেল।
এরপরেই মিতা সুযোগ বুঝে রাতের আধারে চলে যায় বাড়ি থেকে।
.
-----
ট্রেন থেমে যায়। আর মিতার ঘুমটাও হঠাত ভেঙে যায়। পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো তা নিজেও বুঝতে পারেনি। ফোন হাতে নিয়ে দেখে ৭টা মিসকল প্রভাশের নম্বর থেকে।
কলব্যাক করে মিতা।
>কোথায় আপনি? (প্রভাশ)
>ট্রেনে।এসে গিয়েছি সম্ভবত। (মিতা)
>নামুন।আমি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি।
>ওকে।
প্রিয়ন্তী ভয়েভয়ে ট্রেন থেকে নামে। একটা ছেলে এগিয়ে আসে মিতার দিকে।
>চলুন ম্যাডাম।আপনার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি ১ঘন্টা থেকে।
>আপনি প্রভাশ?(মিতা হা করে তাকিয়ে আছে প্রভাশের দিকে)
>হ্যা।কোনো সন্দেহ আছে?
>না মানে আমায় চিনলেন কিভাবে? (মিতা)
>চোখ দেখে। (প্রভাশ)
>চোখ দেখে মানুষ চেনা যায়? (মিতা)
>আমিতো চিনলাম।আমি যে তোমার চোখের প্রেমে পড়েছি।আমায় বিশ্বাস করতে পারো মিতা।কখনো ঠকাবোনা তোমাকে। (প্রভাশ)
>এসব কি বলছেন আপনি? (মিতা বিশ্বাসই করতে পারছে না)
>অল্পদিনের পরিচয়ে তোমায় অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।আর সেটা তোমার চোখ দেখে।কি হয়েছে অতীতে সব ভুলে যাও।তোমার মনের কর্ণারে একটু ঠাই কি দেওয়া যাবেনা আমাকে? (প্রভাশ)
কেঁদে ফেলে মিতা।
>এই মেয়ে!কাঁদছো কেনো হ্যা?মাকে বলে এসেছি কালো,ফরসা দেখার বিষয় না।বাসায় আজ সুন্দর চোখওয়ালী বৌ নিয়ে ফিরবো। তাড়াতাড়ি চলোতো এখন।সবাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য । প্রভাশের দুষ্টু কথা আর হাসি দেখে মিতা কিছু বলার ভাষা খুজে পায়না। আত্মহত্যার থেকে নতুনভাবে জীবন গড়ে তোলার কাছে কেনো যেন মিতার কাছে সেই মুহূর্তে খুব ভালো মনে হচ্ছিলো। তাই অবাক দৃষ্টিতে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে প্রভাশে দিকে মিতা। হয়তো প্রভাশের চোখে দেখতে পেয়েছিলো নিজের পরবর্তী সুখের ঠিকানা ।

জীবনে সঠিক মানুষকে পেতে চাইলে একটুতো ধৈর্য্য ধারণ করতেই হবে। কারণ জীবন গল্পেই সুন্দর, বাস্তবে নয়।

#আপনারা গল্প পরেন ঠিকই,কিন্তু একটা লাইক দেওয়ার সময় পান না।একটা রিয়েক্ট দিলে কি হয়?
আপনাদের রিয়েক্ট দেখে আমরা গল্প লেখতে উৎসাহ পাই।
17 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই