সকাল আটটা বাজে। এই দিনটি ছিল শাকিলার এসএসসি রেজাল্ট প্রকাশের দিন। শাকিলা মোবাইল কয়েকবার চেক করল, কিন্তু রেজাল্ট এখনো প্রকাশিত হয়নি। সে তার বন্ধুদের কাছে ফোন করে জিজ্ঞেস করল।
ফোনটি রিং…
শায়লা ফোন রিসিভ করে বলল,
— "আসসালামু আলাইকুম।"
শাকিলা সহজভাবে জিজ্ঞেস করল,
— "ওয়ালাইকুম আসসালাম। আচ্ছা, বান্ধবী, শুন, এসএসসি রেজাল্ট প্রকাশিত হবে কয়টা বাজে? তুই জানিস?"
শায়লা উত্তর দিলো,
— "সম্ভবত সকাল দশটায়। আমি গতকাল অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে শিডিউল দেখে নিয়েছি।"
শাকিলা জানতে চাইল রেজাল্ট ঠিক কতটায় প্রকাশিত হবে। তার বান্ধবী সেই তথ্য জানালে, শাকিলা ফোন কেটে দিল। এখন আটটা বাজেছে, আর মাত্র দুই ঘন্টা বাকি।
সে ঘরে কিছু কাজ বাকি ছিল, তাই সেগুলো করতে লাগল। তারপর ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। রেজাল্ট দেওয়ার আগে শাকিলা মাথায় হিজাব পরে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ল। এরপর আল্লাহর কাছে দুই হাত বাড়িয়ে মোনাজাত করতে করতে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল এবং বলল,
— "হে আল্লাহ, গত কয়েক বছরের সব পরিশ্রম যেন আজ সার্থক হয়। শুধু একটি ভালো জিপিএ নয়, বরং আমি চাই আমার বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। তারা আমার জন্য কত কষ্ট করেছেন, আজ যেন তাদের মাথা নিচু না হয়। ভুলের কারণে রেজাল্ট যেন খারাপ না আসে। আল্লাহ, আমি যেন আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি এবং আজকের দিনটি যেন আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন হয়ে থাকে। আমার সব ভয় দূর করে দাও, আমাকে ধৈর্য ধরার শক্তি দাও।"
নামাজ শেষ হয়েছে ঠিক এসএসসি রেজাল্ট প্রকাশের মাত্র পাঁচ মিনিট আগে। শাকিলা নিজের মোবাইলে ওয়েবসাইট খুললেন, কিন্তু সেখানে ঢুকতে পারছিলেন না; শুধু লোড হচ্ছে। মনের ভিতরে অশান্তি বেজে উঠল। তার একটাই চিন্তা,
— "আমি কি এসএসসি রেজাল্টে পাশ করবো নাকি ফেল করবো?"
এই চিন্তা এবং মানসিক উদ্বেগে দ্রুত সে পিতামাতার কাছে চলে গেল। সেখানে গিয়ে কান্না শুরু করল এবং বাবাকে জড়িয়ে ধরল। শাকিলা যখন কাঁদছিল, তখন তার বাবা বললেন,
— "কিরে মা, কাঁদছিস কেন? তোর এসএসসি রেজাল্ট কি খারাপ হয়েছে নাকি?"
বাবার এই কথায় শাকিলার মন আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। বাবার মুখ দেখে শাকিলা বলল,
— "বাবা, এখন সকাল দশটা। আমি ওয়েবসাইটে ঢুকার চেষ্টা করছি, কিন্তু ওপেন হচ্ছে না। তাই বুঝতে পারছিনা আমি পাস করেছি নাকি ফেল। এখন আমি কিভাবে রেজাল্ট দেখব?"
শাকিলার বাবা তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে শান্ত স্বরে বললেন,
— "আরে পাগলী মা, এর জন্য কাঁদার কিছু নেই। শোন, রেজাল্ট প্রকাশের সময় সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ একসাথে ইন্টারনেটে ঢোকার চেষ্টা করে, তাই ওয়েবসাইট একটু জ্যাম হয়েছে—এটা একদম স্বাভাবিক। তুই কেন পাস-ফেল নিয়ে ভয় পাচ্ছিস? আমরা জানি তুই কতটা পরিশ্রম করেছিস এবং তোর নামাজ-দোয়া আল্লাহ নিশ্চয়ই কবুল করবেন। ওয়েবসাইট না খুললে কী হয়েছে, তুই মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়ে দেখ, ওটাতেই দ্রুত রেজাল্ট চলে আসে। আয় মা, চোখের পানি মোছ, রেজাল্ট যা-ই হোক, তুই আমাদের গর্ব এবং আমরা সবসময় তোর পাশে আছি।"
শাকিলার বাবা শান্তভাবে কথা বলার পর শাকিলার মন একটু সান্ত্বনা পেল। সে ঠিক করল, এবার ওয়েবসাইটের বদলে মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে রেজাল্ট দেখবে। কিন্তু শাকিলা জানত না এসএমএসের মাধ্যমে কিভাবে ডায়াল করতে হয়। তাই সে তার বান্ধবী শায়লাকে ফোন দিল।
শায়লা ফোন ধরলেই শাকিলা উত্তেজিত কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করল।
শাকিলা বলল,
— "হ্যালো শায়লা, দোস্ত, আমি তো টেনশনে শেষ হয়ে যাচ্ছি! দশটা বেজে গেছে, কিন্তু কোনোভাবেই রেজাল্টের ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারছি না। শুধু লোড হচ্ছে। এখন আমি কী করব? আমি কি ফেল করব নাকি, বুঝতে পারছি না!"
শায়লা বলল,
— "আরে শান্ত হ শাকিলা, একদম ঘাবড়াস না। রেজাল্ট এখন প্রকাশিত হয়েছে, তাই সারা দেশের মানুষ একসাথে চেষ্টা করছে। সেই কারণে সার্ভার ডাউন হয়েছে—এটা একদম স্বাভাবিক। ওয়েবসাইট না খুললে তুই এসএমএস-এর মাধ্যমে রেজাল্ট দেখ। ওটাই এখন সবচেয়ে সহজ এবং দ্রুত উপায়।"
শাকিলা বলল,
— "কিন্তু দোস্ত, এসএমএস কীভাবে পাঠাতে হয় সেটা তো আমি জানি না। একটু বলে দিবি প্লিজ?"
শায়লা বলল,
— "হ্যাঁ, অবশ্যই। শোন, তোর মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ কর:
SSC (একটা স্পেস) তোর বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর (যেমন ঢাকা বোর্ডের জন্য DHA) (স্পেস) তোর রোল নম্বর (স্পেস) 2026 (তোর পরীক্ষার সাল)।
এরপর মেসেজটা পাঠিয়ে দে 16222 নাম্বারে। ফিরতি মেসেজে তোর রেজাল্ট চলে আসবে।"
শাকিলা বলল,
— "আচ্ছা, আমি এখনই চেষ্টা করছি। দোয়া করিস দোস্ত, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।"
শায়লা বলল,
— "ভয় পাস না, ইনশাআল্লাহ তোর রেজাল্ট খুব ভালো হবে। তুই তো অনেক পরিশ্রম করেছিস, আল্লাহ তোর দোয়া অবশ্যই কবুল করবেন। রেজাল্ট পেয়েই আমাকে জানাস!"
শায়লা যে পদ্ধতি দেখিয়েছে, সেই অনুসারে শাকিলা নিজের মোবাইলে এসএমএস পাঠাল। রোল ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে বসিয়ে সেন্ড করলেন। প্রায় ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ফলাফল এল—A গ্রেড।
শাকিলা ফলাফল দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে চিৎকার করে বলল,
— "মা, বাবা! দ্রুত সোফায় রুমে চলে এসো!"
এদিকে শাকিলা তার মোবাইলে এসএমএস-এর স্ক্রিনশট তুলে ইনবক্সের মাধ্যমে ছবি পাঠাল। তারপর নিজে সোফার রুমে গেল। তার পিতামাতা এবং ছোট ভাইও উপস্থিত হলেন। বাবা বললেন,
— "কিরে শাকিলা, তুই হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলে কেন? পরীক্ষা কি ফেল হয়েছে নাকি?"
শাকিলা বলল,
— "আরো বাবা, ফেল হয়নি। আমি পরীক্ষা এ A গ্রেড পেয়েছি!"
মা বললেন,
— "তুই তো ভালো ফলাফল পেয়েছিস, কিন্তু চিৎকার দেওয়ার কী আছে? এখানে তোর ছোট ভাইও আছে। কেউ কারো কাছ থেকে চিৎকার শুনলে ধৈর্য রাখতে পারে না। একটু কন্ট্রোল করতে হবে।"
শাকিলা বলল,
— "আব্বা, আম্মা, আমি ইচ্ছা করে চিৎকার করিনি। আমার এসএসসি রেজাল্ট দেখে স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে এসেছে। আন্তরিকভাবে দুঃখিত।"
বাবা বললেন,
— "তুই এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেছিস, কিন্তু আমি পরীক্ষায় মাত্র B গ্রেড পেয়েছিলাম। সেই ফলাফলের কারণে আমি ভালো কলেজে পড়তে পারিনি। সেই কলেজে পড়াশোনা মানতো ভালো ছিল না, তাই আমি এইচএসসি-তে বেশি ভালো করতে পারিনি এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফল ভালো হয়নি। তারপর চাকরি করেও সংসার চালাতে যথেষ্ট সুবিধা পাইনি। আমি চাই, তুই একটি ভালো কলেজে ভর্তি হও এবং এসএসসিতে ভালো ফলাফল পাও। যাতে পরে কখনো আমার মতো হতাশ হতে না হয়। এটাই আমার তোর প্রতি অনুরোধ।"
শাকিলা তার বাবার কথা শুনে কিছুটা মন ভেঙে পড়ল। সে সোফায় বসে ভাবতে লাগল—কিভাবে বাবাকে সান্তনা দেবে। শাকিলা আগেই জানে যে তার বাবা দিনমজুরি করে সংসার চালান। নিজের প্রিয় বাবা এই পরিস্থিতিতেও পরিশ্রম করেন, যাতে পরিবারের পেটে ভাত থাকে। শাকিলা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করল এবং ঠিক করল, কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত সে টিউশনি করে নিজের খরচের কিছু অংশ চালাবে। কারণ তার বাবা যে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করেন, সেই টাকার উপর তার সন্তানকে ভরসা করতে হবে না।
শাকিলা তার বাবা, মা এবং ছোট ভাইয়ের সামনে গভীর গুরত্বশ্বরী কণ্ঠে বলল,
— "আব্বা, তুমি কেন মন খারাপ করছো? তুমি বি গ্রেড পেয়েছিলে বলে আজ তুমি ছোট হয়ে যাওনি। যদি তুমি সেই কষ্ট না করতেন, যদি দিনরাত পরিশ্রম না করতেন, আমি আজ এই ফলাফল পেতাম না। তোমার ব্যর্থতা নয়, তোমার ত্যাগই আমার সাফল্যের কারণ।"
সে একটু থেমে আবার বলল,
— "আব্বা, তুমি বলছো যেন আমি তোমার মতো পস্তাতে না হই। আমি কথা দিচ্ছি, শুধু ভালো কলেজে পড়ব না—আমি এমন কিছু করব যাতে তোমাকে আর কষ্ট করতে না হয়। আমি সাধারণ পড়াশোনা না করে সরকারি কলেজের কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হব। এখন প্রযুক্তির যুগ, এই লাইনে ভালো সুযোগ আছে। আমি ভালো করে পড়াশোনা করব, পাশাপাশি টিউশনি করব যাতে তোমার উপর চাপ কমে। তুমি সারাজীবন আমাদের জন্য ঘাম ঝরিয়েছো। এবার আমার পালা, আব্বা। তুমি শুধু পাশে থাকো, দোয়া করো। ইনশাআল্লাহ, একদিন তোমাকে আর দিনমজুরের কাজ করতে হবে না।"
শাকিলার কথা শুনে তার বাবার চোখ ভিজে উঠল। তিনি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
— "মা, তুই শুধু মানুষ না, তোর এই কথাগুলোই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।"
প্রায় এক ঘণ্টা পর, শায়লা মেসেজ না করে সরাসরি কল দিল।
রিঙ্গিং……
শাকিলা তখন মায়ের সঙ্গে রান্না করছিল। সে মায়েকে সাহায্য করছিল এবং খাবারের মালামাল সাজাচ্ছিল। হঠাৎ মোবাইলে দেখল শায়লার কল আসছে। শাকিলা কল ধরল।
শায়লা বলল,
— "হ্যালো শাকিলা! তুমি একটা অসাধারণ ফলাফল পেয়েছ, এটাই আমাদের গর্ব। এখন আমার কথাও শুনো—আমিও A গ্রেড পেয়েছি, কিন্তু তোমার জিপিএ অনুসারে আমার জিপিএ কিছুটা কম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা এবার একই কলেজে ভর্তি হব। আমরা তো বেস্ট ফ্রেন্ড!"
শাকিলা শায়লার কথাটি সহ্য করতে পারেনি। সে বলল,
— "আমি কলেজ ভর্তি হব না। আমি সরকারি ডিপ্লোমা ভর্তি হব। তুমি যদি ডিপ্লোমা করতে চাও, তবে তাও ভালো হবে।"
শায়লা জিজ্ঞেস করল,
— "কলেজ ভর্তি না হয়ে তুই ডিপ্লোমা যাবে কেন?"
শাকিলা বলল,
— "দোস্ত, তুমি জানো না আমাদের ফ্যামিলির পরিস্থিতি কেমন। আব্বা সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে আমাদের জন্য পরিশ্রম করেন। আমি চাই না যে তার উপর আর চাপ পড়ুক। তাই আমি কলেজের সাধারণ পড়াশোনা না করে সরকারি ডিপ্লোমা করব, কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হব। এতে আমি পড়াশোনা করতে পারব এবং পরিবারের পাশে থাকতে পারব, পাশাপাশি টিউশনি করে আব্বার খরচের কিছুটা হালকা করতে পারব। আমার জন্য এটা সেরা সিদ্ধান্ত। তুমি চাইলে তুমি নিজের পছন্দের কলেজে পড়ো, আর আমরা বন্ধু হিসেবে একসাথে থাকব। ফ্রেন্ডশিপ তো থাকবেই, কলেজ না মিললেও।"
শায়লা শাকিলার এই উত্তর শুনে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল,
— "ঠিক আছে, আমি বুঝতে পারছি। তুমি তোমার পরিবারের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছ, এটা খুবই সম্মানজনক। আমি তোমার পাশে আছি। একসাথে আমরা নতুনভাবে চেষ্টা করব।"
শাকিলা খুশি হয়ে হাসল এবং বলল,
— "ঠিক আছে, বন্ধু। এখন আমরা উভয়েই আমাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোব।"
এরপর শাকিলা ফোন কেটে দিয়ে রান্নাঘরে আম্মুর পাশে আবারো সাহায্য করতে লাগল।
কাজ করার মাঝখানে শায়লা শাকিলার কাছে একটি মেসেজ পাঠাল। মেসেজে লেখা ছিল:
— "শাকিলা, শুনো, আজকে বিকেলে আসতে পারবা? যদি পারো, তাহলে আমার পুরনো স্কুলের পিছনের দীঘির পাশে চলে আসো।"
শাকিলা মায়ের সঙ্গে কাজ শেষ করে নিচে এসে মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে মেসেজটি দেখল। তখন ঘড়িতে বাজছিল সাড়ে তিনটা। সে একটু বিশ্রাম নিল। আসরের নামাজের সময় নামাজ পড়ে সে বাইরের দিকে বের হল। শায়লা যেভাবে ঠিকানা দিয়েছিল, সেই ঠিকানায় চলে গেল।
দীঘির পাড়ে পৌঁছে শাকিলা দেখল তার বন্ধু সায়মা, তানভীর, মিম এবং রাফি বসে আড্ডা দিচ্ছে। মিম এবং রাফি শহরের বড় কলেজে ভর্তি হওয়ার গল্প শোনাচ্ছিল। শাকিলা পৌঁছাতেই সায়মা তাকে অভিনন্দন জানাল।
কথার মাঝখানে রাফি জিজ্ঞেস করল,
— "আচ্ছা, নীলয় আসেনি কেন? ওর খবর কী?"
সায়মা নিচু স্বরে জানাল,
— "নীলয় অংকে ফেল করেছে, তাই লজ্জায় কারো সামনে আসছে না।"
নীলয়ের নাম শুনে শাকিলার বুক ধক করে উঠল। সে মনে মনে নীলয়কে পছন্দ করত, আর নীলয়ও তাকে ভালোবাসত। শাকিলা খুব ইচ্ছে করছিল এখনই নীলয়ের কাছে ছুটে যেতে, কিন্তু বন্ধুদের সামনে নিজেকে সামলে নিয়ে সে সকলকে জানাল যে সে সরকারি ডিপ্লোমায় ভর্তি হবে। তানভীর শাকিলার এই দায়িত্ববোধের প্রশংসা করল।
আড্ডা শেষে শাকিলা সায়মাকে আড়ালে ডেকে বলল,
— "সায়মা, নীলয়ের ফোন তো বন্ধ। ও কি খুব ভেঙে পড়েছে?"
সায়মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "হয়তো। তুই একটু তার বাড়িতে যাও, গিয়ে দেখো সে আছে কিনা।"
ধীরে ধীরে সবাই নিজ বাড়িতে চলে গেল। শাকিলা সায়লার কথার পর নীলয়ের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে দ্রুত হাঁটছিল যেন তার কষ্ট কিছুটা কমানো যায়। প্রায় ছয় মিনিটের মধ্যে সে নীলয়ের বাড়িতে পৌঁছাল।
শাকিলা দরজায় এসে ডাকল,
— "নীলয়, নীলয়! তুমি কোথায়?"
নীলয়ের মা দরজার সামনে এসে বললেন,
— "কে? আমার বাড়িতে কে এসেছে? আমার ছেলেকে নাম ধরে ডাকছে কে?"
শাকিলা একটু অন্যরকম স্বরে বলল,
— "আন্টি, আমি নীলয়ের সহপাঠী। আমি শুধু ওর সাথে একটু কথা বলতে এসেছি।"
নীলয়ের মা বললেন,
— "নীলয় এখন বাসায় নেই, বাইরে খেলতে গেছে। আমি ওর জন্য দুশ্চিন্তা করছি।"
শাকিলা বলল,
— "কেন, আন্টি, আপনার ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা? সে কি করেছে?"
নীলয়ের মা বললেন,
— "কিছুই না, শুধু নীলয় গণিতে ফেল করেছে। এসএসসি রেজাল্ট ভালো আসে নি।"
নীলয়ের মায়ের কথা শুনে শাকিলা কেঁদে ফেলল। তারপর বলল,
— "আন্টি, দয়া করে খুব দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি জানি আপনার ছেলে কতটা চেষ্টা করেছে। ফলাফল হয়তো আপনার আশা অনুযায়ী হয়নি, কিন্তু ব্যর্থতা শেষ নয়। সে আবার চেষ্টা করবে, ইনশাআল্লাহ সফল হবে। আপনার ছেলের প্রতি বিশ্বাস রাখুন, তাকে ধৈর্য ধরে সাহস দিন। আমি তার পাশে আছি, এবং আমরা সবাই চাই সে শক্ত হয়ে নতুন করে চেষ্টা করুক।"
নীলয়ের মা বললেন,
— "তোমার কথা বোঝা যায়। আরেকটা কথা—তুমি নীলয়কে পছন্দ করো, আর নীলয়ও তোমাকে পছন্দ করে। এটা সে সবসময় বলে।"
শাকিলা বলল,
— "আন্টি, আমি নীলয়কে ভালোবাসি, আর সে আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ পড়াশোনা এবং নিজের ভবিষ্যত গড়া। আমি চাই আপনি ওর পাশে থাকুন, তাকে সমর্থন দিন। ইনশাআল্লাহ, সে শক্ত হয়ে উঠবে।"
শাকিলা শেষ করল,
— "ঠিক আছে, আন্টি, আমি চলে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর মাগরিব নামাজের আজান হবে। পরে নীলয়ের সঙ্গে কথা বলব।"
নীলয়-এর মা সব ঘটনা বুঝে শাকিলাকে বিদায় দিলেন। কয়েক মিনিট পর শাকিলা নিজের বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করল। মাগরিবের নামাজও খুব শীঘ্রই শুরু হবে। পথ চলার সময় নীলয় নিজের উঠানে চলে এল। সে শাকিলা-কে দেখল, কিন্তু ডাক দিল না। নীলয় খেলা শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে চলে গেল।
শাকিলা এক দৌড়ে নিজের বাড়িতে পৌঁছাল। কে পাস করেছে, কে ফেল করেছে—এই সব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই, কিন্তু স্কুললাইফে তার প্রিয় নীলয়কে নিয়ে কিছুটা মন খারাপ লাগছিল।
বাসায় ঢুকে শাকিলা বাবাকে বলল,
— "আরে বাবা, অনেক মানুষ ফেল করেছে। তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে বা কী হতে যাচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে একটু বোঝান।"
শাকিলার বাবা মমতাভরা কণ্ঠে বললেন,
— "মা, একবার ফেল করলেই কারো জীবন শেষ হয় না। অনেক বড় মানুষও জীবনে কোনো না কোনো সময় ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু হাল ছাড়েনি। চেষ্টা করলে আবার পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফলাফল করা যায়, অথবা অন্য পথে সফল হওয়া যায়। আসল কথা হলো মনোবল আর পরিশ্রম। যার এটা আছে, তার ভবিষ্যৎ কখনো অন্ধকার হয় না।"
কয়েক মাস পর শাকিলা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। তার বাবা ডিপ্লোমা এপ্লাই করছিলেন। এপ্লাই শেষ হলে বাবা শাকিলাকে বললেন,
— "তোমার ডিপ্লোমা এপ্লাই সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন তোমার কাজ হলো ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। কয়েক দিনের মধ্যে আমি ভর্তি পরীক্ষার গাইড নিয়ে আসব। আপাতত মোবাইলে ইংরেজি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান—এই বইগুলো নিয়ে চর্চা করো। তোমাদের পরীক্ষা আর মাত্র ১৬ দিন পর, পঁচিশ তারিখে।"
শাকিলা বাবার কথা মন দিয়ে শুনল। চোখে ভয়ের চেয়ে এবার দৃঢ়তা বেশি। সে একটু হাসল, তারপর শান্ত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল,
— "আব্বা, আলহামদুলিল্লাহ। তুমি আমার জন্য এত কষ্ট করে আবেদন করেছো, আমি জানি এটা কত বড় দায়িত্ব। আমি কথা দিচ্ছি, এই ১৬ দিন একদম মন দিয়ে প্রস্তুতি নেব। ইংরেজি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান—সব বিষয় নিয়ম করে পড়ব। শুধু পাশ করার জন্য নয়, ভালোভাবে টিকে থাকার জন্য পড়ব।"
সে একটু থেমে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আব্বা, তুমি ভর্তি গাইড আনলে ভালো হবে, কিন্তু তার আগেই আমি সিলেবাস জোগাড় করে রুটিন বানাবো। প্রতিদিন ফজরের পর দুই ঘণ্টা পড়ব, দুপুরে রিভিশন করব, এবং রাতে আবার অনুশীলন করব। এই ১৬ দিনে মোবাইল কম ব্যবহার করব। এখন সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।"
তার বাবা গর্বভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন।
শাকিলা আবার বলল,
— "তুমি শুধু দোয়া করো, আব্বা। আমি চাই এই ডিপ্লোমা শুধু আমার স্বপ্ন নয়, আমাদের পরিবারের স্বপ্ন পূরণের পথ হোক। আমি আর আপনাদের কষ্ট দিতে চাই না। আমি প্রমাণ করব, তোমার মেয়েও পারে।"
তার বাবা মৃদু হাসলেন,
— "আমার মেয়ের এই আত্মবিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।"
সেদিন রাতেই শাকিলা একটি খাতা বের করল এবং বড় করে লিখল—
— "লক্ষ্য: ডিপ্লোমা ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল"
এর নিচে লিখল—
— "প্রতিদিন ৬–৮ ঘণ্টা পড়াশোনা
— আগের বছরের প্রশ্ন সমাধান
— দুর্বল বিষয় বেশি অনুশীলন
— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও দোয়া"
এবার তার মনে আর ভয় নেই। এসএসসি রেজাল্টের দিনে যে কান্নাকাটি করা মেয়েটি ছিল, সে এখন অনেক বেশি পরিণত। তার মনে একটাই কথা—
— "ব্যর্থতা হোক বা সাফল্য, আমি থামব না।"
কিন্তু হঠাৎ তার ছোট ভাই শাকিব প্রচণ্ড জ্বর ও পেট ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ল। পুরো পরিবার দিশেহারা হয়ে গেল। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানালেন, শাকিবের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। দিনমজুর বাবার পক্ষে এমন সময় বড় অংকের টাকা জোগাড় করা যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। তবুও তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ছোটাছুটি শুরু করলেন।
শাকিলা নিজের ভর্তি পরীক্ষার মাত্র দশ দিন বাকি থাকা সত্ত্বেও ছোট ভাইয়ের এই মরণাপন্ন অবস্থায় পড়াশোনায় মন বসাতে পারছিল না। সে একদিকে শাকিবের ব্যথায় কাতর হয়ে তার পাশে বসে সেবা করছিল, অন্যদিকে মহান আল্লাহর কাছে ভাইয়ের সুস্থতা এবং বাবার সামর্থ্যের জন্য চোখের জল ফেলছিল।
শাকিলা বুঝল, জীবনের পরীক্ষা শুধু খাতা-কলমে নয়। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে পরিবারের শক্তি হয়ে দাঁড়ানো—এটাই এক বড় পরীক্ষা।
শাকিলার বাবা তার কক্ষে গিয়ে শাকিলার অবস্থা দেখলেন। কিছুটা মন খারাপ বোধ করলেন।
শাকিলার বাবা বললেন,
— "তুমি কেন মন খারাপ করে বসে আছো? তোমার সামনে পরীক্ষা, বই নিয়ে পড়াশোনা করো।"
শাকিলা বলল,
— "কিভাবে পড়াশোনা করব, বাবা? আমার ছোট ভাই এমন অসুস্থ, তার জন্য আমার অনেক মায়া। ছোট ভাইয়ের অবস্থা কিছু হলে আমি শান্ত থাকতে পারি না, মন বসে না।"
শাকিলার বাবা মৃদু হাসলেন,
— "আমি জানি তুমি কেন এমন করছ। তোমার ছোট ভাই এখন হাসপাতালে ভর্তি, কিন্তু সে ভালো আছে। এখন তোমার এই বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তুমি বাসায় গিয়ে নিজের পড়াশোনায় মন দাও। এই দশ দিন তোমার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য। ছোট ভাইয়ের যত্ন আমাদের।"
শাকিলা বলল,
— "বাবা, আমার গাইড এখনো আসে নি। সেটা কি হবে?"
শাকিলার বাবা বললেন,
— "গাইড না থাকলেও ভয় পাবি না। আগে বোর্ডের বই ভালো করে পড়, বেসিক শক্ত কর। আমি কালই কারো কাছ থেকে পুরনো গাইড বা প্রশ্নপত্র জোগাড় করার চেষ্টা করব। এই দশ দিন মন দিয়ে পড়ো। ভাইয়ের দায়িত্ব আমাদের। তুই শুধু ভেঙে পড়বি না। এই পরীক্ষা তোমার ভবিষ্যতের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।"
শাকিলা বাবার কথায় স্বস্তি পেল এবং নিজের ঘরে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। ছোট ভাই এখনও কষ্ট পাচ্ছিল, তাই শাকিলা অন্তরে তার জন্য দোয়া করছিল—
— "আমার পলিটেকনিক ভর্তি পরীক্ষা আর মাত্র ১০ দিন পর। ভালো ফলাফল করার জন্য আমাকে নিয়মিত মডেল টেস্ট ও অনুশীলন করতে হবে। পাশাপাশি ভাইয়ের জন্য অযথা দুশ্চিন্তা না করে নিজের প্রস্তুতিতে মনোযোগী থাকতে হবে।"
পড়াশোনার মাঝখানে শাকিলা মাঝে মাঝে ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, কিছু টপিক ভুলে যায়, তবে সে ধৈর্য ধরে অনুশীলন চালিয়ে যায়।
শাকিলার বাবা আত্মীয়দের কাছে ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করালেন। প্রায় ৩০,০০০ টাকা খরচ হয়ে হাসপাতাল থেকে শাকিলা ভাইকে বাসায় ফিরিয়ে আনলেন। ভাই এখন প্রায় সুস্থ, শুধু ওষুধ চলমান। শাকিলা ভাইয়ের অবস্থা দেখে একটু স্বস্তি পেল।
পরের দিন পলিটেকনিক ভর্তি পরীক্ষা। সকালবেলায় শাকিলা ব্যাগ গোছাতে লাগল। বাবা উদ্দেশ্যে বললেন,
— "আজ আমাদের পলিটেকনিক ভর্তি পরীক্ষা। দোয়া করো যেন ভালো ফলাফল করতে পারো এবং সরকারি পলিটেকনিক সহজে টিকে পারো।"
শাকিলার বাবা-মা গভীর মমতা ও উৎসাহ দিয়ে বললেন,
— "শাকিলা, আল্লাহর কাছে দু’হাত বাড়িয়ে দোয়া করো, মন শান্ত রাখো, আত্মবিশ্বাস রাখো, এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করো। আমরা জানি তুমি পরিশ্রম করেছো, তাই ইনশাআল্লাহ ফলাফল ভালো হবে। ভয় বা দুশ্চিন্তা তোমাকে দুর্বল করবে। শুধু নিজের পড়াশোনায় মনোযোগ দাও। আমরা সবসময় তোমার পাশে আছি।"
দুপুরে শাকিলা ঢাকা যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল। ব্যাগে কাপড়, এডমিট কার্ড, ফাইল—all সাজানো। সে একা যাচ্ছিল না, সাথে ছিল কাকাতো বোন সুরাইয়া।
মাঝপথে হাঁটতে হাঁটতে তারা কথা বলল।
সুরাইয়া বলল,
— "শাকিলা, তুমি কি প্রস্তুত? ব্যাগে সব জিনিস আছে তো?"
শাকিলা বলল,
— "হ্যাঁ আপু, সব ঠিক আছে। এডমিট কার্ড, পেন, নোটস—all ব্যাগে। আমি একটু নার্ভাস, দিদি।"
সুরাইয়া বলল,
— "চিন্তা কোরো না। তুমি অনেক পরিশ্রম করেছ। এবার শুধু শান্ত মনের সঙ্গে পরীক্ষা দাও। আত্মবিশ্বাস রাখলে সব ঠিক হবে।"
শাকিলা বলল,
— "আপু, আপনার সাহসিকতা আমাকে শক্তি দিচ্ছে। কিন্তু ছোট ভাইয়ের কথা ভেবে মনটা ভারি হয়ে যাচ্ছে।"
সুরাইয়া বলল,
— "শাকিলা, সেটা স্বাভাবিক। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা কর, আর আমি পাশে আছি। ভাইয়ের যতটা করা দরকার, করেছি। এখন শুধু নিজের লক্ষ্য পূরণে মনোযোগ দাও।"
শাকিলা বলল,
— "ঠিক আছে, আপু। আপনার দোয়া থাকলে আমি ভয় পাব না। আশা করি, ভালো করতে পারব।"
সুরাইয়া বলল,
— "তুই পারবি, শাকিলা। ইনশাআল্লাহ আজকের দিনটা শুভ হবে। চেষ্টা আর ধৈর্যই মূল।"
ঠিক এরকম কথাবার্তা বলতেই তারা বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছালো এবং ঢাকায় যাত্রা শুরু করল। ঢাকায় এসে সুরাইয়া তার বান্ধবীর বাসায় উঠল; তারা এক রাত সেখানে থাকল।
পরের দিন সকালবেলায় শাকিলা ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার এক ঘন্টা বাকি। শাকিলা হাত-পা কেঁপে উঠল, মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করল—
— “হে আল্লাহ, তুমি তো জানো আমার মনের সব কথা। আমি শুধু নিজের জন্য নয়, আমার আব্বা–আম্মু আর ছোট ভাইয়ের জন্য আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি আমার ভয় দূর করে দাও। আমি যা পড়েছি, তা যেন পরিষ্কারভাবে মনে থাকে। কোনো প্রশ্ন দেখে যেন আমি ঘাবড়ে না যাই।
হে আল্লাহ, আমার ভাইকে দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ করে দাও। আব্বার কষ্ট তুমি দেখেছো—তার ঘামের প্রতিটি ফোঁটার প্রতিদান তুমি দাও। আজকের এই পরীক্ষাটা যেন আমাদের পরিবারের জন্য নতুন আশার দরজা খুলে দেয়।
আমি চেষ্টা করেছি, এখন ফলাফল তোমার হাতে। তুমি আমার জন্য যা উত্তম, সেটাই নির্ধারণ করো। আমাকে ধৈর্য দাও, মনোযোগ দাও, আর সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দাও। আমি ভাঙব না, হাল ছাড়ব না—তুমি শুধু আমার সাথে থেকো।”
এ কথা বলে শাকিলা দু’হাত মুঠো করে শক্ত করল। তার কাঁপুনি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। ভয়টা জায়গা ছাড়ল, এবং আত্মবিশ্বাস জায়গা নিল।
ঘণ্টার কাঁটা চলতে চলতে সে মনে মনে বলল—
— “বিসমিল্লাহ।”
বিসমিল্লাহ উচ্চারণ করে শাকিলা হাতে কলম নিয়ে MCQ লেখা শুরু করল। প্রায় এক ঘন্টা ধরে ভর্তি পরীক্ষা শেষ করল। প্রশ্নগুলো মোটামুটি ছিল—ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান সহজ, আর গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের কিছু এমসিকিউ কঠিন। বিশেষ করে দুটি গণিতের প্রশ্নে সে সামান্য কনফিউশনে পড়েছিল।
পরীক্ষা শেষ করে শাকিলা ও সুরাইয়া ঢাকা শহরের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালো। বাসে উঠে তারা একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করল।
সুরাইয়া হাসিমুখে বলল,
— “তাহলে বল তো, পরীক্ষা কেমন হয়েছে? খুব কঠিন লেগেছে নাকি?”
শাকিলা উত্তর দিল,
— “পুরোটা কঠিন ছিল না, আপু। ইংরেজি আর সাধারণ জ্ঞান সহজ ছিল। কিন্তু গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানের কিছু এমসিকিউ মাথা ঘুরিয়েছে। বিশেষ করে দুটি অংক নিয়ে সামান্য কনফিউশনে পড়েছিলাম।”
সুরাইয়া বলল,
— “কনফিউশন হলেও তো চেষ্টা করেছিস, তাই না? সময় ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পেরেছিস?”
শাকিলা বলল,
— “হ্যাঁ, আপু, আলহামদুলিল্লাহ। প্রথমে সহজগুলো শেষ করেছি, তারপর কঠিনগুলিতে সময় দিয়েছি। শেষ পাঁচ মিনিটে পুরোটা আবার রিভিউ করেছি। তবে দুই-একটা প্রশ্নে ১০০% নিশ্চিত নই।”
সুরাইয়া বলল,
— “ওটা স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সবাই সব প্রশ্ন পারে না। তুই যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিস, তাতে ইনশাআল্লাহ ভালোই হবে। তোর আত্মবিশ্বাসটাই দেখাচ্ছে।”
শাকিলা বলল,
— “আপু, ঢোকার আগে হাত-পা কেঁপছিল। কিন্তু দোয়া পড়ার পর মনটা শান্ত হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, আমি পারব।”
সুরাইয়া বলল,
— “ঠিক এইটাই মূল কথা! ভয়কে জয় করাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। এখন ফলাফলের চিন্তা না করে একটু বিশ্রাম নে। যা হওয়ার, ভালোই হবে।”
শাকিলা জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে হাসল। তার মনে এক ধরনের শান্তি। সে জানে, সে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এখন বাকিটা আল্লাহর হাতে।
গ্রামে ফেরার পথে শাকিলা এবং সুরাইয়া যাচ্ছিল। হঠাৎ শাকিলা নীলয়কে দেখে। তিনি দ্রুত সুরাইয়ার দিকে তাকালেন এবং বললেন,
— “আপু, এখানে একটু অপেক্ষা করো। আমি নীলয়ের সঙ্গে কথা বলে আসছি।”
শাকিলার ব্যাগগুলো সুরাইয়া হাতে নিল, আর শাকিলা নীলয়ের সামনে চলে গেল। সেদিনের এই সংক্ষিপ্ত মূহূর্তেই শাকিলা মনে মনে শান্তি ও দৃঢ়তা পেল।
শাকিলা:
— “নীলয়… তুমি এড়াচ্ছ কেন? আমি তোমার বাসায় গিয়েছিলাম। আন্টির সঙ্গে কথা হয়েছে, উনি তোমার জন্য কেঁদেছেন।”
নীলয়:
— “তুমি গিয়েছিলে? কেন? আমি তো… কারো সামনে দাঁড়ানোর মতো মুখ রাখিনি। আমি ফেল করেছি, শাকিলা… আমি ব্যর্থ।”
শাকিলা:
— “ফেল করেছ বলে তুমি ব্যর্থ নও। একটা পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে মানুষকে মাপা যায় না। তুমি চেষ্টা করেছ, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
নীলয়:
— “কিন্তু সবাই পাস করেছে, কেউ কেউ A পেয়েছে… আর আমি? অংকে ফেল! তোমার সামনে দাঁড়াতেও লজ্জা লাগে।”
শাকিলা:
— “লজ্জা কেন? তুমি জানো, তোমার নাম শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল। আমি চাই তুমি আবার চেষ্টা করো, নতুন করে শুরু করো।”
নীলয়:
— “আমি পারব তো? আবার যদি না পারি?”
শাকিলা:
— “পারবে। ইনশাআল্লাহ পারবে। আমি পাশে আছি। আবার পরীক্ষা দাও, দুর্বল জায়গাগুলো ঠিক করো। ব্যর্থতা মানে শেষ নয়—এটা নতুন শুরু।”
নীলয়: (চোখ ভিজে)
— “তুমি আমার ওপর এত বিশ্বাস রাখো?”
শাকিলা:
— “হ্যাঁ, কারণ আমি জানি তুমি হাল ছাড়ার মানুষ নও। মনে রাখো—আজ তুমি পড়ে গেছ, কাল তুমি সবার চেয়ে শক্তিশালী হতে পারো।”
নীলয়:
— “ধন্যবাদ, শাকিলা। তোমার কথা না শুনলে হয়তো আমি আরও ভেঙে পড়তাম। আমি চেষ্টা করব।”
শাকিলা:
— “চেষ্টা করো নিজের জন্য, আম্মুর জন্য, আর তোমার স্বপ্নের জন্য। আমি চাই তোমাকে আবার হাসতে দেখি।”
(দূরে সুরাইয়া অপেক্ষা করছে। শাকিলা ধীরে ধীরে পা বাড়াচ্ছে)
নীলয়:
— “তুমি কোথায় গিয়েছিলে? বোরকা আর ফাইল নিয়ে এত সকালে?”
শাকিলা:
— “আমি আজ পলিটেকনিক ভর্তি পরীক্ষায় গিয়েছিলাম, কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে। প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম।”
নীলয়:
— “ওহ… তাই! কেমন লাগল?”
শাকিলা:
— “পরীক্ষা কঠিন ছিল, তবে চেষ্টা করেছি। এখন শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি। চিন্তা করো না, সব ঠিক হবে।”
নীলয়:
— “আমি সত্যিই ভয় পাচ্ছি… ফেল করেছি।”
শাকিলা:
— “ফেল হওয়া শেষ নয়। তুমি চেষ্টা করেছো, আবার পরীক্ষা দিতে পারো। ধৈর্য ধরো, মনোবল রাখো—তুমি আবার সফল হবে।”
নীলয়: (হালকা হাসি দিয়ে)
— “শাকিলা… তুমি সত্যিই আমার মন শান্ত করছ।”
শাকিলা:
— “এই জন্যই এসেছি। আমি চাই তুমি ভেঙে পড়ো না। একদিন আবার শক্ত হয়ে উঠবে, আর আমি পাশে থাকব।”
তাদের সংলাপ শেষ করে শাকিলা ধীরে ধীরে নীলয়কে ছেড়ে দিল এবং সুরাইয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের গ্রামের পথে চলল।
গ্রামে ফিরে শাকিলা নিচের বাড়িতে গেল। বাবা রোদে বসে ফুয়াচ্ছেন, আর ছোট ভাই সুস্থ হয়ে খেলা করছে। ছোট ভাইকে দেখে শাকিলার মুখে অপ্রকাশিত খুশির আলো ফুটে উঠল।
শাকিলার বাবা জিজ্ঞেস করলেন—
— “মা, আজ তোর পরীক্ষা ছিল তো? কিরকম হয়েছে?”
শাকিলা একটু ক্লান্ত, তবে চোখে আত্মবিশ্বাসের এক আলোকছটা ধরে রেখে ব্যাগ নামিয়ে বাবার সামনে এসে শান্ত গলায় বলল—
— “আব্বা, আলহামদুলিল্লাহ, পরীক্ষা খারাপ হয়নি। পুরোটা সহজ ছিল না, বিশেষ করে গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানের কয়েকটা প্রশ্ন কঠিন ছিল। কিন্তু আমি সময় ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পেরেছি। আগে সহজগুলো শেষ করেছি, তারপর কঠিনগুলিতে চেষ্টা করেছি। শেষেও পুরো রিভিউ দিয়েছি।”
তার বাবা মন দিয়ে শুনছেন।
শাকিলা আবার বলল—
— “আব্বা, ঢোকার আগে খুব ভয় লাগছিল। হাত-পা কাঁপছিল। কিন্তু দোয়া পড়ার পর মন শান্ত হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল—আমি চেষ্টা করেছি, এখন ফলাফল আল্লাহর হাতে। আমি আমার সেরাটা দিয়েছি।”
বাবা জিজ্ঞেস করলেন—
— “তাহলে তুই কি মনে করিস, সরকারি পলিটেকনিকে টিকতে পারবি?”
শাকিলা হালকা হাসল—
— “আব্বা, আমি জানি প্রতিযোগিতা কঠিন। সবাই ভালো ছাত্র-ছাত্রী এসেছে। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি না। টিকব কি না সেটা এখন আল্লাহ জানেন। তবে একটি কথা নিশ্চিত—আমি চেষ্টা কম করি নি। যদি টিকে যাই, সেটা হবে আমাদের পরিবারের জন্য নতুন শুরু। আর যদি না-ও টিকি, আবার প্রস্তুতি নেব। আমি হাল ছাড়ব না।”
তার বাবা গর্বভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন।
শাকিলা ধীরে বাবার পাশে বসে বলল—
— “আব্বা, আজ আমি বুঝেছি—সবচেয়ে বড় জিনিস হলো সাহস। ভয়কে জয় করতে পারাই আসল সাফল্য। আমি ভেঙে পড়িনি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
বাবা তার মাথায় হাত রেখে বললেন—
— “মা, তুই আজ আমার চেয়েও বড় মানুষ হয়ে গেছিস। ফলাফল যা-ই হোক, তুই আমাদের গর্ব।”
দূরে ছোট ভাই শাকিব হাসতে হাসতে খেলছিল।
শাকিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
— “আমি আমার দায়িত্ব থেকে পিছু হটব না। এই পথেই এগিয়ে যাব।”
রাতের অন্ধকারে ঘুম থেকে উঠে শাকিলা মোবাইল হাতে নিয়ে ম্যাসেজ চেক করল। একটিমাত্র মেসেজ চোখে পড়ল—নীলয় পাঠিয়েছে।
নীলয়ের মেসেজটি ছিল—
— "আচ্ছা, ২০২২ সালে আমরা গণিতে ফেল করেছিলাম। এখন ২০২৩ সালে কি সব বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে নাকি শুধু গণিতের পরীক্ষা দিতে হবে?"
শাকিলা মেসেজ পড়ে উত্তর দিল—
— "ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যেহেতু ২০২২ সালে শুধু গণিতে ফেল হয়েছ, তাই সম্ভবত শুধু গণিতই আবার দিতে হবে, সব বিষয় না। তবে নিয়মটা অফিসিয়ালি নিশ্চিত করে দেখে নেওয়া ভালো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আত্মবিশ্বাস হারাবি না। মন দিয়ে প্রস্তুতি নিলে এবার অবশ্যই ভালো করবে। আমি জানি তুমি পারবে।"
নীলয় মেসেজটি পড়ে অনুশোচনা আর ভয়ের মাঝখান থেকে হঠাৎ সাহস পেল। পরদিন সে এই বিষয়টি মায়ের সঙ্গে আলোচনা করল।
নীলয় বলল—
— “আম্মু, আমি শাকিলার সাথে কথা বলেছি। ও বলেছে, যেহেতু আমি ২০২২ সালে শুধু গণিতে ফেল করেছি, তাই হয়তো শুধু গণিত পরীক্ষা দিতে হবে, সব বিষয় না।”
নীলয় মা খুশিতে বললেন—
— “সত্যি? তাহলে তো আল্লাহর রহমত! তবে নিশ্চিত খবর নিয়েছিস তো? নিয়ম বদলালে সমস্যা হতে পারে।”
নীলয় উত্তর দিল—
— “ও বলেছে অফিসিয়ালভাবে স্কুল বা বোর্ড থেকে নিশ্চিত করে দেখব। আমি আর ভেঙে পড়তে চাই না, আম্মু। এবার মন দিয়ে শুধু গণিত পড়ব।”
নীলয় মায়ের মুখে হাসি ফোটে—
— “এই তো আমার ছেলে! একবার ব্যর্থ হলেই মানুষ শেষ হয়ে যায় না। তুই যদি মন দিয়ে চেষ্টা করিস, আমি জানি তুই পারবি। আমি তোর পাশে আছি।”
নীলয় গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলল—
— “আম্মু, আমি সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল সবাই আমাকে নিয়ে হাসবে। কিন্তু আজ শাকিলা বলেছে—‘ব্যর্থতা মানে নতুন শুরু।’ ওর কথা শুনে সাহস পেলাম।”
নীলয় মা কোমলভাবে বললেন—
— “ভালো বন্ধু জীবনে অনেক বড় নিয়ামত। তবে মনে রাখিস, তোর সফলতা আসবে তোর নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে। কাল থেকেই পড়া শুরু কর, আমি তোর জন্য সময় দেব।”
নীলয় মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। চোখে লজ্জা নেই—সত্যিকারের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাসের আলো ফুটে উঠেছে। সে মনে মনে বলল—
— “এইবার আমি প্রমাণ করব, আমি পারি।”
শাকিলার ডিপ্লোমা ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো—আলহামদুলিল্লাহ, সে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সুযোগ পেয়েছে। গ্রামের থেকে ফেনীর দূরত্ব অনেক হলেও, শাকিলা জানতো এখানে হোস্টেলে থাকতে হবে যেন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে। প্রথম ক্লাসে ঢোকার সময় সে একেবারে নতুন পরিবেশে—অপরিচিত মানুষ, নতুন নিয়ম, হোস্টেলের জীবন—সবকিছুই ভিন্ন।
প্রথম এক মাস কঠিন ছিল। একা থাকা, সবকিছু নিজে সামলানো—কখনো মন খারাপ হতো। কিন্তু শাকিলা হাল ছাড়েনি। ধীরে ধীরে সে হোস্টেলের সবাইকে চিনে নিলো, বন্ধুত্ব তৈরি করল। কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে সে তার পরিশ্রম, মনোযোগ আর সদাচরণের জন্য ধীরে ধীরে সবার প্রিয় হয়ে উঠল।
প্রোগ্রামিং, নেটওয়ার্কিং, হার্ডওয়্যার—সবকিছু মন দিয়ে শিখল। দ্বিতীয় বর্ষে এসে শাকিলা ছোটখাটো ফ্রিল্যান্স কাজও শুরু করল—ওয়েবসাইট বানানো, ডাটা এন্ট্রি, অনলাইন সাপোর্ট। এই আয় দিয়ে সে নিজের খরচ চালাল, মাঝে মাঝে বাড়িতেও কিছু টাকা পাঠাল।
তার বাবা ফোনে বলতেন—
— “মা, তুই নিজের খরচ চালা আগে, আমাদের জন্য ভাবিস না।”
কিন্তু শাকিলা জানতো, বাবার কণ্ঠে শক্তি থাকলেও শরীরে আগের মতো জোর নেই। সে ঠিক জানতো, পরিবারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হবে।
ডিপ্লোমার শেষ সেমিস্টারের ফলাফল প্রকাশের দিন শাকিলার মনে আবার সেই এসএসসি রেজাল্টের উত্তেজনা ফিরে এলো। আলহামদুলিল্লাহ—সে ভালো ফলাফল নিয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করল।
এবার নতুন যুদ্ধ—চাকরি। ঢাকাসহ ফেনী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আইটি কোম্পানিতে সিভি পাঠাতে লাগল। কয়েকটি ইন্টারভিউ কল এলো। প্রথম ইন্টারভিউতে নার্ভাস ছিল, দ্বিতীয়টিতে আত্মবিশ্বাস বাড়ল, আর তৃতীয়টিতে পুরোপুরি নিজের মতো করে উত্তর দিল।
একদিন দুপুরে হঠাৎ ফোন এলো—
— “হ্যালো, মিস শাকিলা? আমরা আপনার ইন্টারভিউতে সন্তুষ্ট হয়েছি। আপনি নির্বাচিত হয়েছেন।”
শাকিলার হাত কেঁপে উঠল। চোখ ভিজে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ফোন দিল।
— “আব্বা… একটা খবর আছে।”
বাবা বললেন—
— “কি রে মা? সব ঠিক তো?”
শাকিলা কণ্ঠে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল—
— “আব্বা… আমার চাকরি হয়ে গেছে।”
কিছু সেকেন্ড নীরবতা। বাবার কাঁপা কণ্ঠ—
— “সত্যি মা?”
শাকিলা হাসতে হাসতে বলল—
— “হ্যাঁ আব্বা। আলহামদুলিল্লাহ। আমি আগামী মাস থেকে যোগ দেব।”
তার বাবা চুপচাপ। হয়তো চোখের পানি লুকাচ্ছিলেন।
শাকিলা দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— “আব্বা, তোমার আর দিনমজুর কাজ করতে হবে না। এতদিন তুমি আমাদের জন্য ঘাম ঝরিয়েছো। এবার আমার পালা। আমি যা উপার্জন করব, তা তোমাদের জন্য পাঠাবো। এই কষ্ট, এই দুঃখ—আমি আর দেখতে চাই না।”
তার বাবা ধীরে বললেন—
— “মা, আমি কখনোই কাজকে কষ্ট মনে করি না। তোর এই কথাগুলোই আমার সব কষ্ট দূর করেছে।”
শাকিলার চোখে সেই আনন্দ আর সন্তুষ্টির আলো—পরিশ্রম, ধৈর্য, এবং বিশ্বাস—সব মিলিয়ে সে পরিবারের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলেছে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই শাকিলা সবার আগে টাকা পাঠাল বাড়িতে।
মা ফোনে বললেন—
— “মা, তোর পাঠানো টাকায় আমরা শাকিবের কোচিং ভর্তি করিয়েছি।”
শাকিলা মনে মনে হাসল। সেই ছোট ভাই, যে একসময় হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য কাতরাচ্ছিল, আজ সে সুস্থ এবং ভালোভাবে পড়াশোনা করছে।
নীলয়ও এবার গণিতে পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। মাঝে মাঝে তারা ফোনে কথা বলে, কিন্তু দুজনেরই অগ্রাধিকার এখন তাদের নিজস্ব ক্যারিয়ার।
এক সন্ধ্যায় শাকিলা অফিস থেকে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মনে পড়ল—
সেই এসএসসি রেজাল্টের দিনের কান্না…
ভর্তি পরীক্ষার আগের ভয়…
ভাইয়ের অপারেশনের দুশ্চিন্তা…
হোস্টেলের একাকিত্ব…
সবকিছু মিলিয়ে আজকের এই অবস্থান। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে মনে মনে বলল—
— “ব্যর্থতা আমাকে থামাতে পারেনি। কষ্ট আমাকে ভাঙতে পারেনি। আমি পেরেছি—কারণ আমি হাল ছাড়িনি।”
দূরে কোথাও আজান ভেসে আসছিল। শাকিলা জানল—
এটাই শেষ নয়। এটি কেবল শুরু।

কোন মন্তব্য নেই