মমতা বর্ম

মমতা বর্ম
আসিমপুর গ্রাম একটি ছোট গ্রাম। সেখানে একজন লোক বসবাস করত, তার নাম রাহাত। সে বর্তমানে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে একটি ভালো কলেজে পড়াশোনা করছে। তার ইচ্ছা ছিল বিকেলবেলায় আসরের নামাজের সময় পাশের গ্রাম, মিয়াজিবাড়ি গ্রামে হাঁটতে যাওয়া। আসিমপুর গ্রাম থেকে মিয়াজিবাড়ি গ্রামের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। এটি তার কাছে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল।
সেদিন বিকেলে রাহাত ঘরের ভেতরে প্যান্ট-শার্ট পরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল বাইরে হাঁটতে যাওয়ার জন্য। এমন সময় রাহাতের মা এই দৃশ্য দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছিস বাবা?”
রাহাত মায়ের প্রশ্নের উত্তরে বলল, “এই তো বাইরে হাঁটতে যাচ্ছি। মা, বাজার থেকে কিছু লাগবে?”
মা বললেন, “হ্যাঁ।”
রাহাত জিজ্ঞেস করল, “বলো মা, বাজার থেকে কী কী আনতে হবে? আর বাজার করার জন্য আমাকে টাকা দাও।”
মা তার ব্যাগ থেকে ধীরে ধীরে পাঁচশত টাকা বের করে রাহাতের হাতে দিলেন এবং বললেন, “শোন বাবা, এই টাকায় বাজার করিস। এক কেজি চাল, আধা কেজি ডাল, এক কেজি আলু, কিছু সবজি যেমন বেগুন আর লাউ, আধা কেজি পেঁয়াজ এবং এক প্যাকেট লবণ নিয়ে আসবি। যদি টাকা বাঁচে, তাহলে সামান্য মরিচ আর হলুদও নিয়ে আসিস।”
মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে রাহাত টাকা ও বাজারের তালিকা ভালোভাবে গুছিয়ে নিল। তারপর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিকেলের হাঁটার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
ঘর থেকে বের হয়ে রাহাত মিয়াজিবাড়ী গ্রামের মসজিদে আসরের নামাজ পড়লেন। নামাজের পর সেখানে দশ মিনিট সময় নষ্ট হয়ে গেল। নামাজ শেষ করার পরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে মিয়াজিবাড়ী গ্রামের কাছে পৌঁছলেন, যেখানে তিনি বিশ মিনিট ধরে চললেন।
এরপর রাহাত মিয়াজিবাড়ী থেকে বাজারের উদ্দেশ্যে চললেন, যা তার মা আগে থেকে লিস্টে দিয়েছিলেন। পথে কিছু বখাটে ছেলেরা রাস্তায় বসে আড্ডা দিচ্ছিল। রাহাত সাধারণভাবে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাহাতের পথ আটকে দিল।
রাহাত শান্তভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাই, আপনারা কারা? আর আপনি অপরিচিত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও রাস্তাটি কেন আটকে রেখেছেন?”
সামনের বখাটে ছেলেটি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তার নাম ছিল সজিব।
সজিব রুক্ষ স্বরে বলল, “আমরা কারা, তা জানতে হবে না। যা আছে চুপচাপ দাও, তাহলে ভালোভাবে যেতে পারবে।”
রাহাত কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “ভাই, আমার কাছে তেমন কিছু নেই। শুধু মা দিয়েছে বাজার করার জন্য টাকা।”
এরপর আরেকজন, যার নাম রিফাত, এগিয়ে এসে বলল, “এই সব গল্প আর শোনাবি না। পকেটের সব বের কর!”
রাহাত শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললেন, “দেখুন ভাই, এটা আমার মায়ের বাজারের টাকা, দয়া করে—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সজিব হঠাৎ রাহাতকে ধাক্কা দিল। “বেশি কথা বলিস না!”
এরপর তারা সবাই মিলিয়ে রাহাতকে ঘিরে ফেলল। রিফাত তার শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, “টাকা বের কর, না হলে খারাপ হবে!”
রাহাত ভয় পেয়ে গেলেও বলল, “ভাই, মারবেন না… আমি দিচ্ছি…”
কিন্তু তারা থামল না। একজন পেছন থেকে ঘুষি মারল, আরেকজন লাথি দিল। রাহাত মাটিতে পড়ে গেল।
সজিব চিৎকার করে বলল, “মোবাইলও দাও!”
রাহাত কষ্ট করে বলল, “ভাই, এটা আমার খুব দরকার…”
রিফাত জোর করে তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে নিল। “এখন দরকার নেই!”
এরপর তারা তার হাত থেকে টাকা ছিনিয়ে নিল এবং আরও কিছুক্ষণ মারধর করল। পরে রাহাতকে ঠোটে মারতে লাগল যাতে সে চিৎকার করতে না পারে এবং বখাটেরা ফাঁস না হয়ে যায়।
বখাটে ভাইয়া যখন রাহাতকে মারধর করছিল, ঠিক তখনই দশ সেকেন্ড আগে একটি মহিলা তার বান্ধবীর সঙ্গে রাস্তায় হাঁটছিলেন। মহিলার নাম ছিল তাসফিয়া। তাসফিয়া রাহাতের এক বছরের ছোট চাচাতো বোন।
তাসফিয়া এবং তার বান্ধবী শায়লা বিকেলের হালকা হাওয়ায় রাস্তায় হাঁটছিলেন। তাদের মধ্যে চলছিল খোশগল্প।
তাসফিয়া বললেন, "জানিস শায়লা, এই গ্রামের রাস্তাগুলো বিকেলে কত শান্ত! শ্বশুরবাড়িতে আসার পর থেকে এই সময়টার জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি।"
শায়লা হেসে উত্তর দিলেন, "ঠিক বলেছিস। তবে মাঝে মাঝে কিছু বখাটে ছেলের আড্ডা পরিবেশটা নষ্ট করে। ও দেখ, সামনে ওটা কী হচ্ছে?"
কথাটা শেষ হতেই তাসফিয়ার নজর গেল সামনের মোড়ে। কয়েকজন যুবক এক যুবককে ঘিরে ধরে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করছে। ছেলেটি মাটিতে পড়ে আছে, আর তারা লাথি মারছে।
দৃশ্যটি দেখে তাসফিয়া আঁতকে উঠলেন। বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল। অস্ফুটভাবে বললেন, "ওহ খোদা! মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে?"
তাসফিয়া দ্রুত এগিয়ে গেলেন। লোকদের মাঝখানে পড়ে থাকা রক্তাক্ত মুখটি স্পষ্ট হলো। মুহূর্তের মধ্যেই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।
চিৎকার করে বললেন, "এ তো রাহাত! আমার বড় ভাই!" শান্ত স্বভাবের চাচাতো ভাইটির এই অবস্থা দেখে রাগে তার শরীর রি-রি করে উঠল।
রাহাতকে বাঁচাতে তাসফিয়া রাস্তার পাশে থেকে একটি পড়ে থাকা শক্ত লাঠি তুলে নিলেন। বখাটেদের দিকে দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিতেই শায়লা তার হাত চেপে ধরল।
ভয়ের কণ্ঠে শায়লা বললেন, "তাসফিয়া, পাগল হয়েছিস? ওখানে যাস না! ওরা বখাটে, তাদের হাতে অস্ত্র থাকতে পারে। তুমি একা মেয়ে হয়ে কী করতে পারবে? বরং লোক ডাকি।"
তাসফিয়া তার বান্ধবীর দিকে আগুনের মতো দৃষ্টিতে তাকালেন। রাগে কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
চিৎকার করে বললেন, "ছাড় বলছিস! আমার ভাই এখানে মরছে, আর তুই বলছিস আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখব? নিজের চোখের সামনে ভাইকে শেষ হতে দেব? না, আমি তা পারব না!"
বান্ধবীর কোনো বারণ না শুনেই তাসফিয়া লাঠি হাতে নিয়ে সজিব আর রিফাতদের দিকে দৌড়ালেন। তার চোখে তখন কোনো ভয় নেই, শুধু ভাইকে বাঁচানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
বখাটেরা যখন রাহাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই তাসফিয়া অতর্কিতে সজিবের পিঠে লাঠি দিয়ে জোরে আঘাত করলেন।
তাসফিয়ার লাঠির আঘাতে সজিব যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। আচমকা এই আক্রমণে বখাটেরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তাসফিয়া এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে লাঠি ঘোরাতে লাগলেন।
তাসফিয়া চিৎকার করে বলল "খবরদার! আর একটা পা এগোবি না! সাহস কত তোদের? দিনের আলোতে ডাকাতি করছিস? আমার ভাইকে মারছিস?"
সজিব আর রিফাত প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও তাসফিয়ার এই আক্রমণাত্মক রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেল। বিশেষ করে তাসফিয়ার চিৎকারে আশেপাশের দু-একজন মানুষ উঁকি দিতে শুরু করায় তারা প্রমাদ গুনল।
সজিব পিঠ ডলতে ডলতে বললো "আরে আরে! আপা থামেন! আমরা তো… আমরা তো জাস্ট…"
তাসফিয়া "চুপ কর, হারামি! জাস্ট কী? ছেলেটাকে মেরে রক্ত বের করে দিয়েছিস! যা টাকা-মোবাইল নিয়েছ, সব এখনই ফেরত দে, নইলে আজ তোদের হাড় আস্ত রাখব না!"
তাসফিয়ার রণচণ্ডী মূর্তিতে বখাটেরা বুঝল পরিস্থিতি বেগতিক। রিফাত ভয়ে রাহাতের পকেট থেকে নেওয়া টাকা আর মোবাইল সজিবের হাতে দিল। সজিব সেগুলো রাহাতের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, "এই নে, তোর আপদ! আর বলিস না আমরা কিছু নিয়েছি।"
বখাটেরা দ্রুত সেখান থেকে চম্পট দিল। তারা চলে যাওয়ার পর তাসফিয়া দ্রুত রাহাতের কাছে ছুটে গেলেন। রাহাত তখন মাটিতে পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, মুখে টেপ বাঁধা, যাতে চিৎকার করতে না পারেন।
তাসফিয়া ব্যাকুল হয়ে বললো "রাহাত ভাই! ওহ খোদা, একি হাল করেছে তোমার!"
তিনি দ্রুত রাহাতের মুখের টেপ খুলে দিলেন। রাহাত দীর্ঘ শ্বাস নিলেন, কিন্তু চোখ দিয়ে জল ঝরছে, ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বেরোচ্ছিল। তাসফিয়া ওড়নার আঁচল দিয়ে তার মুখের রক্ত মুছে দিলেন।
রাহাত অস্ফুট স্বরে বললো "চাচাতো বোন… আপনি এখানে? ওরা… ওরা আমার মায়ের বাজারের টাকাটা নিতে চেয়েছিল…"
তাসফিয়া "কিচ্ছু বলার দরকার নেই, ভাই। আগে উঠে দাঁড়াও। শরীর কেঁপে যাচ্ছে। একা থাকতে পারবে না।"
রাহাত কোনোমতে উঠে দাঁড়ালেন। তার প্যান্ট-শার্ট ধুলোয় মাখা, শরীর ব্যথায় নীলচে।
তাসফিয়া বলল "চলো, শ্বশুরবাড়ি কাছেই। আগে সেখানে গিয়ে একটু সুস্থ হও, তারপর বাড়ি ফিরব।"
রাহাত "না বোন, মা বাড়িতে অপেক্ষা করছে। দেরি হলে চিন্তা করবেন। আমি বরং আসিমপুরেই ফিরে যাই।"
তাসফিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বললো "একদম না! তোমার এই রক্তাক্ত মুখ দেখলে খালাম্মা হার্ট অ্যাটাক দেবেন। আগে আমার বাসায় চলো, সেখানে মুখ-হাত ধুয়ে বিশ্রাম নাও। আমি কাউকে দিয়ে আসিমপুরে খবর পাঠাবো যে তুমি আমার কাছে আছো। কোনো কথা শুনব না, চলো আমার সাথে!"
রাহাত আর আপত্তি করার শক্তি পেলেন না। তাসফিয়া বড় ভাইয়ের মতো আগলে ধরে তাকে শ্বশুরবাড়ির দিকে নিয়ে চললেন।
অবশেষে তাসফিয়া রাহাতকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। এদিকে তার স্বামী রোশিকুল ইসলাম বিছানায় শুয়ে ইউটিউবে নাটক দেখছিল। তাসফিয়া বাসায় পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর রাহাতও সেখানে আসে। তখন রোশিক তাসফিয়াকে জিজ্ঞেস করল, “তাসফিয়া, এই ভাইয়া কে? তোমার কী সম্পর্ক?”
তাসফিয়া প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, “রাহাত, তুমি আমার স্বামীর সামনে বিছানায় বসো, আমি আসছি।” রাহাত বিছানায় বসে পড়ল। এরপর তাসফিয়া বায়োডিন ও মলম নিয়ে রাহাতের কাছে গেল। পুরো ঘটনাটি রোশিক নীরবে লক্ষ্য করছিল।
তাসফিয়া ধীরে ধীরে রাহাতের কপালে ও ঠোঁটের পাশে বায়োডিন লাগাচ্ছিলেন। রাহাত ব্যথায় মাঝে মাঝে মুখ কুঁচকে নিচ্ছিল, কিন্তু কিছু বলছিল না। ঘরের ভেতরে এক ধরনের ভারী নীরবতা নেমে এসেছিল। সেই নীরবতা ভাঙলেন রোশিকুল ইসলাম।
রোশিক একটু কৌতূহলী আর উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “তাসফিয়া, কিছু মনে করো না… এই ভাইয়া কে? তোমার সাথে কী সম্পর্ক? আর তার এই অবস্থা হলো কীভাবে?”
তাসফিয়া হাতের কাজ থামালেন না, তবে তার চোখে একটা কষ্টের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি একটু গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, “ও আমার চাচাতো বড় ভাই, নাম রাহাত… ছোটবেলা থেকে একসাথেই বড় হয়েছি আমরা।”
কথা বলতে বলতে তার গলাটা একটু ভারী হয়ে এলো।
“আজ বিকেলে রাস্তায় দেখলাম কয়েকটা বখাটে ওকে ঘিরে ধরে মারধর করছে… টাকা আর মোবাইল ছিনিয়ে নিচ্ছিল। আমি… আমি না গেলে ওরা হয়তো আরও খারাপ কিছু করে ফেলত…”
রোশিক অবাক হয়ে রাহাতের দিকে তাকালেন। তার চোখে এখন সহানুভূতি। “ইন্নালিল্লাহ… এত খারাপ অবস্থা! ভাই, আপনি কিছু বলেননি কাউকে?”
রাহাত হালকা হাসার চেষ্টা করে বললেন, “বলবার মতো অবস্থা ছিল না, ভাই… ওরা হঠাৎ করেই আক্রমণ করল।”
তাসফিয়া এবার রাহাতের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ভাই, তুমি মিয়াজিবাড়ি গ্রামে গেলে কেন? কী দরকার ছিল?”
রাহাত একটু সোজা হয়ে বসে ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করলেন— “আসলে বিকেলে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ভাবলাম মসজিদে গিয়ে আসরের নামাজ পড়ব। তারপর মা কিছু বাজারের জিনিস আনতে বলেছিল—চাল, ডাল, আলু… এসব। তাই নামাজ শেষে বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম…”
একটু থেমে আবার বললেন, “পথে ওদের সামনে পড়ে গেলাম। তারপর যা হলো… তোমরা তো দেখেছই।”
ঘরের ভেতরে আবার কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। বাইরে তখন মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
রাহাত ধীরে ধীরে উঠে বসে বললেন, “মাগরিবের আজান হয়ে গেছে… আমি আর বেশি সময় থাকতে পারব না। আগে নামাজ পড়ব, তারপর বাজারটা করে সোজা বাড়ি চলে যাব। মা নিশ্চয়ই চিন্তা করছে।”
তাসফিয়া একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “এই অবস্থায় তুমি একা যাবে? শরীর তো ঠিক নেই তোমার!”
রাহাত শান্তভাবে উত্তর দিল, “চিন্তা করো না বোন, এখন অনেকটাই ভালো লাগছে। তুমিই তো বাঁচালে আমাকে। আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক।”
রোশিক এগিয়ে এসে বললেন, “তবুও সাবধানে যাবেন ভাই। দরকার হলে আমি কিছুদূর এগিয়ে দিই।”
রাহাত হালকা মাথা নেড়ে বললেন, “না ভাই, কষ্ট করবেন না। আমি ঠিকই চলে যেতে পারব।”
তাসফিয়া শেষবারের মতো তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক আছে… কিন্তু বাড়ি পৌঁছে আমাকে খবর দিও। না দিলে আমি কিন্তু চিন্তায় থাকব।”
রাহাত মৃদু হাসলেন। “ঠিক আছে, জানাবো।”
এরপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। বাইরে মাগরিবের আজানের ধ্বনি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জীবনের একটা কঠিন অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে, নতুন সাহস নিয়ে তিনি আবার পথ চলা শুরু করলেন—বাজারের দিকে, তারপর নিজের বাড়ির পথে।
এরপর রাহাত বাজারসদাই নিয়ে নিজের গ্রাম আসিমপুরে ফিরে গেল। মাগরিবের নামাজের প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর সে বাসায় পৌঁছাল। এত দেরি হওয়ায় তার মা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন।
বাসায় ঢুকেই রাহাত দেখল, তার মা মাথা নিচু করে গম্ভীর মুখে বসে আছেন।
দরজার কাছে দাঁড়িয়েই সে আস্তে করে ডাক দিল, “মা…”
মা ধীরে মাথা তুলে তাকালেন। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। “বাপজান, তোর এত দেরি হলো কেন? বাইরে এতক্ষণ কী করছিস?”
রাহাত একটু থেমে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। “কিছু না মা… বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দিচ্ছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেল। এই নাও, বাজারসদাই।”
সে মায়ের হাতে জিনিসগুলো তুলে দিল।
মা কিছু না বলে চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টিতে ছিল সন্দেহ, আবার গভীর মায়াও।
একটু পর ধীরে প্রশ্ন করলেন, “তোর ঠোঁটটা এমন ফুলে গেছে কেন? আর গালে এই দাগটা?”
রাহাতের বুক কেঁপে উঠল, তবে মুখে হাসি আনার চেষ্টা করল। “ও কিছু না… দুষ্টুমি করতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।”
মা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। “পড়ে গিয়েছিলি? কোথায়? তোর কাপড়ও তো ধুলায় ভরা!”
রাহাত মাথা চুলকে এড়িয়ে যেতে চাইল। “রাস্তার পাশে একটা গর্ত ছিল… খেয়াল করিনি। দৌড়াতে গিয়ে পা পিছলে গেল।”
মা এবার আর কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে উঠে এসে ছেলের মুখটা নিজের হাতে ঘুরিয়ে দেখলেন।
কণ্ঠটা নরম হয়ে গেল, কিন্তু ভেতরে চাপা উদ্বেগ— “সত্যি করে বল, কেউ কিছু করেছে?”
এই প্রশ্নে রাহাতের চোখের সামনে হঠাৎ সবকিছু ভেসে উঠল—মারধর, লাথি, আর তাসফিয়ার ছুটে আসা…
এক মুহূর্তের জন্য সে চুপ করে রইল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে একটু জোর করেই বলল, “না মা! তুমি এত চিন্তা করো কেন? আমি কি ছোট নাকি?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুই যত বড়ই হ, আমার কাছে তো সেই ছোট্টই আছিস… তুই দেরি করলেই আমার বুকটা কেঁপে ওঠে।”
রাহাতের মন নরম হয়ে গেল। “ঠিক আছে মা… আর দেরি করব না।”
মা ধীরে বললেন, “আগে হাত-মুখ ধুয়ে আয়। তারপর কিছু খেয়ে নে।”
রাহাত বলল “হ্যাঁ, এখনই যাচ্ছি।”
হাত-মুখ ধুতে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সে নিজের মুখটা দেখে থমকে গেল—ঠোঁট ফাটা, গালে দাগ, চোখে ক্লান্তি।
নিচু স্বরে নিজের সাথেই যেন কথা বলল,“সবটা বলা ঠিক হতো না… মা সহ্য করতে পারত না…”
একটু থেমে আবার ফিসফিস করে উঠল,“তাসফিয়া না থাকলে আজ কী হতো…”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মায়ের ডাক— “রাহাত, তাড়াতাড়ি আয়!”
সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। “আসছি মা!”
মনে মনে সে বুঝল—আজ সে সত্যটা লুকিয়েছে, কিন্তু সেই সত্য তার ভেতরেই রয়ে গেছে।
55 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই