Whispers of Midnight
সারসংক্ষেপ
কিছু খুন থাকে, যেগুলো মানুষকে ভয় দেখায়।
আর কিছু খুন থাকে, যেগুলো মানুষকে ভাবতে শেখায়—ভুলভাবে।
এই উপন্যাস শুরু হয় একটি শহর থেকে, যেখানে হঠাৎ করে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। খুনগুলো এলোমেলো নয়—প্রতিটিতে থাকে নির্দিষ্ট ছক, সময়ের নিখুঁত হিসাব, আর এমন কিছু ভুল, যেগুলো ইচ্ছাকৃত বলেই মনে হয়।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন বর্ণনাকারী—যিনি এই ঘটনাগুলোর সাক্ষী, বিশ্লেষক এবং ধীরে ধীরে একজন জড়িত মানুষ হয়ে ওঠেন। তদন্ত যত এগোয়, ততই সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে একাধিক চরিত্রের উপর। কেউ সন্দেহভাজন হয়, কেউ আবার প্রমাণের অভাবে মুক্তি পায়।
এই অস্থিরতার ভেতর গল্পে প্রবেশ করে কয়েকজন মানুষ—কেউ তদন্তের অংশ, কেউ আবেগের, কেউ নিছক উপস্থিতির। সম্পর্ক তৈরি হয়, বিশ্বাস গড়ে ওঠে, আর কিছু মানুষ হয়ে ওঠে নিরাপত্তার অনুভূতির প্রতীক।
কিন্তু খুন থামে না।
প্রতিটি নতুন হত্যাকাণ্ড আগের ব্যাখ্যাকে ভেঙে দেয়। যে সত্য একসময় পরিষ্কার মনে হয়েছিল, সেটাই ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। শহর চায় একজন অপরাধী, তদন্ত চায় একটি নাম—কিন্তু ঘটনাগুলো যেন বারবার ভুল দিকে ইশারা করে।
উপন্যাসটি প্রশ্ন তোলে—
সব খুন কি একই হাতে হয়?
নাকি কিছু অপরাধ ঘটে, যেখানে হাত দেখা যায়, কিন্তু নির্দেশ আসে অন্য কোথা থেকে?
এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার—যেখানে ভয় আসে রক্ত থেকে নয়, আসে বিশ্বাস থেকে।
যেখানে সবচেয়ে নিরাপদ মুখটাই হতে পারে সবচেয়ে গভীর মুখোশ।
ACT 1 : Where The Mask Begins
Episode 1: শুরু
শহর, মুখোশ আর নীরবতা
এই শহরের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে।
এখানে মানুষ কথা বলার সময় চোখে চোখ রাখে না।
সবাই যেন একটু নিচু হয়ে হাঁটে—যেন ছাদ থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার ভয় আছে।
আমি বহু শহর দেখেছি।
কিন্তু এই শহরটাকে প্রথম দিন থেকেই আমার চেনা লাগেনি—
বরং মনে হয়েছিল, শহরটা আমাকে চিনে ফেলেছে।
শহরের নাম খুব সাধারণ।
নাম বলার দরকার নেই।
নামের চেয়ে এখানে মানুষের পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খুনটা হয়েছিল ভোরে।
সকাল পাঁচটা পঁচিশ।
রাস্তায় তখনো আলো পুরো ওঠেনি।
শীতের কুয়াশা গায়ে লেগে ছিল।
লোকটা ছিল স্কুলের শিক্ষক—নাম অমল সেন।
শহরের সবাই চিনত।
ভদ্র, শান্ত, কোনো ঝামেলায় নেই।
তার লাশ পাওয়া যায় স্কুলের লাইব্রেরির পেছনে।
রক্ত খুব বেশি ছিল না।
খুনটা যেন তাড়াহুড়ো করে করা নয়—
বরং খুব ভেবে করা।
সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা ছিল তার বুকের ওপর রাখা একটা ছোট কাগজ।
সেখানে লেখা ছিল—
“তুমি আমায় চিনেছিলে, কিন্তু দেখোনি।”
কাগজটা খুব সাধারণ।
কিন্তু হাতের লেখাটা…
খুব যত্নের।
পুলিশ আসে।
লোকজন জড়ো হয়।
শহরটা একটু নড়ে ওঠে, আবার চুপ করে যায়।
এই শহর খুব বেশি প্রশ্ন করতে পছন্দ করে না।
আমি ঘটনাটা প্রথম শুনি দুপুরে।
একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে—রুদ্র।
রুদ্র কথা বলার সময় সবসময় তাড়া থাকে।
যেন সে নিজেও জানে, সময় তার পক্ষে না।
“তুই জানিস?”
“কি?”
“শহরে খুন হয়েছে।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ ছিলাম।
এই শহরে খুন নতুন কিছু না—
কিন্তু এই প্রথম বার আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়।
লাইব্রেরিটা আমি আগেও গিয়েছি।
পুরনো বিল্ডিং।
কাঠের তাক।
ধুলোর গন্ধ।
সেদিন বিকেলে আমি সেখানে যাই।
লাইব্রেরির ভেতরে তখন খুব বেশি মানুষ ছিল না।
একটা কোণায় বসে ছিল এক নারী।
চুল গোছানো।
চোখে চশমা।
মুখে এমন একটা শান্ত ভাব,
যেন এই শহরের কোনো কিছুর সাথেই তার ঝগড়া নেই।
সে বই সাজাচ্ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“আপনি এখানকার…?”
সে হালকা হাসল।
“আমি এখানে অনেক বছর ধরে আছি।”
তার কণ্ঠে কোনো কৌতূহল ছিল না।
যেন আমার আসা-যাওয়া তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না।
আমি নাম জিজ্ঞেস করিনি।
সেও বলেনি।
পরের দুই সপ্তাহে শহরে আরেকটা খুন হয়।
এইবার একজন ডাক্তারের ছেলে।
তার বাড়ির ভেতরেই।
তার পাশেও একটা কাগজ।
“ভয় পেয়েছিলে, তাই চুপ ছিলে।”
এখন শহরটা আর চুপ করে থাকে না।
ফিসফাস শুরু হয়।
কেউ বলছে—
খুনি নিশ্চয়ই খুব কাছের কেউ।
কেউ বলছে—
এই শহরের পুরনো পাপ ফিরে এসেছে।
আর কেউ কেউ শুধু দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।
আমি আবার লাইব্রেরিতে যাই।
এইবার সেই নারী আমাকে দেখে চিনতে পারে।
নিজে থেকেই বলে—
“শহরটা বদলে যাচ্ছে, তাই না?”
আমি মাথা নাড়ি।
সে জানালার বাইরে তাকায়।
বলে—
“মানুষ ভাবে খুনি আলাদা কেউ।
কিন্তু খুনি সবসময় ভেতরেই থাকে।”
এই কথাটা সে খুব সাধারণভাবে বলেছিল।
কোনো নাটক না।
কোনো ইঙ্গিত না।
আমি তখনো জানতাম না—
এই শহরে সবচেয়ে ভয়ংকর কথাগুলো
সবচেয়ে শান্ত কণ্ঠেই বলা হয়।
সেই রাতেই আমি প্রথমবার স্বপ্ন দেখি।
স্বপ্নে দেখি—
আমি একটা ঘরে দাঁড়িয়ে আছি।
চারপাশে অনেক মানুষ।
সবাই পরিচিত।
কিন্তু কারো মুখ পরিষ্কার না।
শুধু এক জোড়া চোখ স্পষ্ট।
চোখ দুটো আমাকে দেখছে।
চুপচাপ।
দীর্ঘ সময় ধরে।
আমি ঘেমে উঠে বসি।
জানালার বাইরে শহরটা নিঃশব্দ।
কিন্তু আমি জানি—
এই নীরবতা
শুরু।
Episode 2 — মুখোশের নিচে মুখ
শহরটা এখন আর আগের মতো ঘুমায় না।
রাত হলেই জানালায় আলো জ্বলে থাকে।
কুকুরগুলো অকারণে ডাকে।
আর মানুষ—
মানুষ দরজা বন্ধ করার আগে একটু বেশি সময় তালায় হাত রাখে।
দুইটা খুনের পর শহর বুঝে গিয়েছিল,
এটা কোনো দুর্ঘটনা না।
এটা কাউকে লক্ষ্য করে করা।
তৃতীয় খুনটা হয় শনিবার রাতে।
লোকটার নাম ছিল নীলয় দত্ত।
স্থানীয় সাংবাদিক।
রুদ্রের খুব কাছের বন্ধু।
লাশ পাওয়া যায় নদীর ধারে—
একটা পরিত্যক্ত ঘাটে।
এবার রক্ত ছিল বেশি।
কিন্তু তবুও খুনটা এলোমেলো না।
পকেটে পাওয়া যায় ভাঁজ করা কাগজ।
“তুমি সত্য জানাতে পারতে।
কিন্তু চুপ থেকেছিলে।”
এইবার শহরটা ভেঙে পড়ে।
কারণ নীলয় এমন একজন ছিল—
যে সত্য খুঁজত।
অন্তত সবাই তাই ভাবত।
রুদ্র আমাকে সেদিন রাতে ডাকে।
তার গলায় ভাঙা ভাব।
সে কাঁদছিল না,
কিন্তু কণ্ঠের ভেতরে কিছু ধসে পড়েছিল।
“এইটা সিরিয়াল,” সে বলে।
“একজন না। কেউ একটা গল্প লিখছে… মানুষ মেরে।”
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
বাইরে রাস্তার বাতি জ্বলছিল।
আমি বলেছিলাম,
“তাহলে খুনি আমাদের চেনা।”
রুদ্র চুপ করেছিল।
পরদিন পুলিশ একটা তালিকা বানায়।
সন্দেহভাজন।
সেই তালিকায় অনেক নাম।
কিন্তু একটা নাম সবার আগে।
শম্ভু ঘোষ।
শহরের একাকী বৃদ্ধ।
পুরনো কেসে একসময় জড়িয়েছিল।
মানুষের সাথে কম কথা বলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
তিনজন মৃত মানুষকেই সে চিনত।
লোকজন গল্প বানাতে ভালোবাসে।
শম্ভু ঘোষ তাদের জন্য পারফেক্ট গল্প।
আমি শম্ভু ঘোষের বাড়িতে যাই।
একতলা ছোট ঘর।
ভেতরে পুরনো খবরের কাগজ, বই।
সে দরজা খুলে আমাকে দেখে অবাক হয় না।
আমি জিজ্ঞেস করি,
“আপনি কি অমল সেনকে চিনতেন?”
সে মাথা নাড়ে।
“সবাই চিনত।”
“নীলয় দত্ত?”
এইবার সে একটু দেরিতে উত্তর দেয়।
“হ্যাঁ।”
আমি কিছু বলিনি।
সে নিজেই বলে—
“তুমি আমাকে খুনি ভাবছো।”
আমি বলি,
“আমি কাউকে কিছু ভাবছি না।”
সে হাসে।
একটা ক্লান্ত হাসি।
“এই শহর কাউকে বুঝতে চায় না।
শুধু কাউকে দোষ দিতে চায়।”
আমি বেরিয়ে আসি।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর কিছু আটকে যায়।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি আবার লাইব্রেরিতে যাই।
সেই নারী আগের জায়গাতেই।
বই সাজাচ্ছে।
সে আমাকে দেখে বলে,
“আপনি শম্ভু ঘোষের বাড়ি গিয়েছিলেন, তাই না?”
আমি থমকে যাই।
“আপনি জানলেন কীভাবে?”
সে শান্তভাবে বলে,
“এই শহরে কিছুই লুকানো থাকে না।”
আমি হেসে ফেলি।
আমার অস্বস্তি ঢাকতে।
সে বলে,
“আপনি কি মনে করেন, সে খুনি?”
আমি বলি,
“আপনি কী মনে করেন?”
সে একটু ভেবে বলে—
“খুনিরা সাধারণত খুব ক্লান্ত থাকে।
কারণ তারা অনেকদিন ধরে একটা বোঝা বয়ে বেড়ায়।”
আমি জিজ্ঞেস করি,
“আপনি তাকে ক্লান্ত মনে করেছেন?”
সে আমার দিকে তাকায়।
“না।”
চতুর্থ খুনটা হয় এক সপ্তাহ পর।
এইবার একজন পুলিশ অফিসার—
সাব-ইন্সপেক্টর কুণাল মিত্র।
তার নিজের কোয়ার্টারে।
এই খুনের পর শহরটা পুরোপুরি বদলে যায়।
কাগজে লেখা ছিল—
“তুমি জানতেও চাওনি।”
এখন আর কেউ সন্দেহ করে না।
সবাই নিশ্চিত—
খুনি শহরের ভেতরেই।
শম্ভু ঘোষকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রমাণ খুব শক্ত না।
কিন্তু শহরের দরকার ছিল একজন অপরাধী।
লাইব্রেরিতে গিয়ে আমি সেই নারীকে পাই না।
তার টেবিল ফাঁকা।
আমি কাউন্টার থেকে জানতে চাই।
একজন মেয়ে বলে,
“ও আজ আসেনি।”
“কবে আসবে?”
সে কাঁধ ঝাঁকায়।
“ও নিয়মিত না। আসে… আবার চলে যায়।”
এই প্রথমবার
আমি তার অনুপস্থিতি খেয়াল করি।
সেই রাতে আমি আরেকটা স্বপ্ন দেখি।
এইবার ঘরটা পরিষ্কার।
আলো জ্বলছে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
আমার পেছনে কেউ আছে।
আমি মুখ ফিরাই—
কিন্তু কাউকে দেখি না।
শুধু আয়নায়
একজন নারীর প্রতিফলন।
সে হাসছে।
কিন্তু চোখে কোনো আনন্দ নেই।
Episode 3 : সন্দেহের প্রথম দাগ
শহরের মানুষ একসাথে ভয় পেলে একটা অদ্ভুত কাজ করে—
তারা আগে একজনকে আলাদা করে।
ভয়টা তখন আর অজানা থাকে না।
তার একটা মুখ হয়ে যায়।
শম্ভু ঘোষের নামটা প্রথম আসে চায়ের দোকানে।
কেউ জোরে বলেনি।
ফিসফিস করে।
এই শহরে ফিসফিসই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
শম্ভু ঘোষ সম্পর্কে আমার ধারণা খুব পরিষ্কার ছিল না।
সে শহরের প্রান্তে থাকে।
স্ত্রী বহু বছর আগে মারা গেছে।
ছেলে শহর ছেড়ে গেছে।
লোকজন বলে—
সে খুব বেশি কথা বলে না।
এই শহরে কম কথা বলা মানেই
মানুষের চোখে কিছু লুকোনো।
আমি জানতাম,
এইটাই যথেষ্ট।
পুলিশ যখন প্রথমবার তার নাম প্রকাশ করে,
শহরটা যেন হালকা নিঃশ্বাস ফেলে।
মানুষ অপরাধী চায়—
ন্যায়বিচার চায় না।
শম্ভু ঘোষের বাড়ির সামনে ভিড় জমে।
কেউ ছবি তোলে।
কেউ গালি দেয়।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখি।
শম্ভু ঘোষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখে কোনো ভয় ছিল না।
শুধু ক্লান্তি।
এমন ক্লান্তি,
যেটা অনেকদিন ধরে ব্যাখ্যা দিতে দিতে জমে।
সেদিন বিকেলে আমি আবার লাইব্রেরিতে যাই।
ভেতরে ঢুকেই দেখি—
সে নারী একটা বই পড়ছে।
আমি জানি না কেন,
কিন্তু তাকে দেখলেই আমার মাথার ভেতর আওয়াজ কমে যায়।
আমি বসি তার সামনে।
সে বই বন্ধ করে বলে,
“আজ লাইব্রেরি খুব ফাঁকা।”
আমি বলি,
“মানুষ এখন বই পড়ে না।
তারা মানুষ পড়ে।”
সে হালকা হাসে।
“শম্ভু ঘোষ?”
সে নিজেই নামটা বলে।
আমি চমকে উঠি না এইবার।
“আপনিও শুনেছেন?”
সে মাথা নাড়ে।
“এই শহরে না শুনে থাকা কঠিন।”
আমি জিজ্ঞেস করি,
“আপনি তাকে চেনেন?”
সে একটু ভাবে।
“চেনা বলতে…
সে এখানে মাঝেমধ্যে আসে।
খবরের কাগজ পড়ে।
কখনো বই ছোঁয় না।”
আমি বলি,
“খুন হওয়া তিনজনকেই সে চিনত।”
সে আমার দিকে তাকায়।
তার চোখে প্রশ্ন না।
বরং একটা স্থিরতা।
“এই শহরে সবাই সবাইকে চিনত,”
সে বলে।
“এটা কি প্রমাণ?”
আমি কিছু বলি না।
সে উঠে জানালার কাছে যায়।
বাইরে রাস্তা দেখা যায়।
মানুষ চলাচল করছে—
কিন্তু চোখে চোখ পড়ছে না।
সে বলে,
“আপনি কি জানেন,
মানুষ কখন সবচেয়ে বেশি ভুল করে?”
আমি জিজ্ঞেস করি,
“কখন?”
“যখন তারা খুব তাড়াতাড়ি নিশ্চিত হয়ে যায়।”
এই কথাটা সে কাউকে বোঝানোর জন্য বলেনি।
নিজের জন্য বলেছিল।
সন্ধ্যায় আমি রুদ্রর সাথে বসি।
সে সিগারেট ধরায়।
একটার পর একটা।
“শম্ভু ঘোষই,”
সে বলে।
“সব ফিট করে।”
আমি জিজ্ঞেস করি,
“সব?”
সে একটু থামে।
তারপর বলে—
“অমল সেনের সাথে তার পুরনো ঝামেলা ছিল।
নীলয় দত্ত ওকে নিয়ে একবার কিছু লিখতে চেয়েছিল।
আর সেই পুলিশ অফিসার—
ওই কেসটাই আবার খোলার চেষ্টা করছিল।”
সবকিছু খুব সুন্দরভাবে বসে যায়।
এইটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
রাতে বাড়ি ফিরে আমি ঘুমোতে পারি না।
মাথার ভেতর শুধু একটা বাক্য ঘুরতে থাকে—
“সব ফিট করে।”
জানালার বাইরে কুকুর ডাকে।
হঠাৎ আমার মনে পড়ে—
লাইব্রেরির সেই নারী একটা কথাও বলেনি
এই নিয়ে—
শম্ভু ঘোষ কেন এখনো বেঁচে আছে।
পরদিন সকালে খবর আসে—
শম্ভু ঘোষকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।
শহরটা আবার নিঃশ্বাস ফেলে।
আমি লাইব্রেরিতে যাই।
সে নারী নেই।
তার টেবিল খালি।
চেয়ারটা একটু পেছানো।
যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে উঠেছে।
আমি কাউন্টারে জিজ্ঞেস করি।
“ও আজ আসেনি,”
মেয়েটা বলে।
আমি জানি না কেন,
কিন্তু এই প্রথমবার
তার না থাকাটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
সেই রাতে আমি আবার স্বপ্ন দেখি।
এইবার আমি একটা দীর্ঘ করিডোরে হাঁটছি।
দুই পাশে দরজা।
সব দরজায় নাম লেখা।
আমি একটা একটা করে পড়ছি।
সব নাম পরিচিত।
শেষ দরজায় কোনো নাম নেই।
আমি হাত বাড়াই।
ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলে—
“তুমি খুব কাছেই ছিলে।”
আমি ঘেমে উঠে বসি।
ঘড়ির দিকে তাকাই।
ঠিক রাত বারোটা।
এই শহরে কিছু জিনিস
সময় মেনে চলে।
Episode 4 : রক্তের দায়িত্ব
শহরটা এইবার সত্যিই জেগে উঠেছিল।
রাস্তায় মাইক বেঁধে ঘোষণা চলছিল—
সাবধান থাকুন।
অপ্রয়োজনীয় বাইরে বেরোবেন না।
কাগজের শিরোনামে বড় বড় অক্ষরে একটাই নাম—
শম্ভু ঘোষ।
মানুষ নাম চায়।
নাম পেলেই ভয়টা একটু সহনীয় হয়।
শম্ভু ঘোষকে থানায় রাখা হয়।
অভিযোগ এখনো প্রমাণ না।
কিন্তু শহরের চোখে সে খুনি।
আমি থানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ।
ভেতরে ঢুকিনি।
কিছু সত্য
দেখার চেয়ে দূরে থাকলে
বেশি স্পষ্ট লাগে।
বিকেলে লাইব্রেরিতে যাই।
সে সেখানে ছিল।
আগের মতোই।
একই টেবিল।
একই শান্ত মুখ।
আমি জানি না কেন,
কিন্তু তাকে দেখেই মনে হলো—
আজকের দিনটা আমি একটু সামলাতে পারবো।
আমি বসি।
সে জিজ্ঞেস করে,
“আজ শহর খুব চেঁচাচ্ছে, তাই না?”
আমি মাথা নাড়ি।
“মানুষ ভয় পেলে
চেঁচায়,”
সে বলে।
“নইলে চুপ করে থাকে।”
এই কথার ভেতরে কোনো রহস্য ছিল না।
শুধু অভিজ্ঞতা।
আমি বলি,
“শম্ভু ঘোষ ধরা পড়েছে।”
সে চোখ তোলে।
এক সেকেন্ড।
তারপর আবার বইয়ের দিকে।
“সবাই কি নিশ্চিত?”
সে জিজ্ঞেস করে।
“না,”
আমি বলি।
“কিন্তু সবাই বিশ্বাস করতে চায়।”
সে আর কিছু বলে না।
এই নীরবতাটা আমাকে ভালো লাগে।
প্রশ্ন না করে পাশে থাকা—
এই শহরে এটা বিরল।
আমি লক্ষ্য করি,
সে আমার কফির কাপটা সরিয়ে দেয়—
আমি স্পর্শ করিনি।
“ঠান্ডা হয়ে গেছে,”
সে বলে।
এই ছোট ছোট জিনিসগুলো
আমি সাধারণত খেয়াল করি না।
কিন্তু সেদিন করছিলাম।
বেরোনোর সময় সে বলে,
“আপনি রাতে ঘুমাতে পারেন?”
আমি হেসে ফেলি।
“না।”
সে বলে,
“আমি পারি।”
এই কথাটা সে গর্ব করে বলেনি।
যেন ঘুমানো একটা দায়িত্ব।
পরের কয়েকদিন
আমরা প্রায়ই কথা বলি।
খুন নিয়ে না।
শহর নিয়ে।
মানুষ নিয়ে।
সে কখনো প্রশ্ন করে না,
শুধু শোনে।
আর আমি—
আমি কথা বলতে শুরু করি।
এই সময়েই আরেকটা খুন হয়।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী।
তার নামও তালিকায় ছিল—
যারা শম্ভু ঘোষের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল।
এইবার নোটে লেখা—
“তুমি সবসময় অন্যের রক্তে হাত ধুয়েছো।”
শহরটা উল্লাস করে।
“দেখলে!”
মানুষ বলে।
“শম্ভু ঘোষই।”
আমি লাইব্রেরিতে যাই।
সে সেখানে।
আমি বলি,
“আরেকটা খুন হয়েছে।”
সে আমার দিকে তাকায়।
“আপনি কি স্বস্তি পাচ্ছেন?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
সে বলে,
“স্বস্তি মানেই সত্য না।”
এইটাই সে খুন নিয়ে শেষ কথা বলে।
আর কিছু না।
সেদিন সন্ধ্যায় আমরা একসাথে হাঁটি।
কথা কম।
পা চলার শব্দ।
হঠাৎ সে বলে,
“আপনি মানুষকে খুব সহজে বিশ্বাস করেন।”
আমি থেমে যাই।
“খারাপ?”
সে মাথা নাড়ে।
“মানবিক।”
আমি জানি না কেন,
কিন্তু এই কথাটা আমার গায়ে লাগে।
হাঁটা শেষ হলে
সে নিজে থেকেই বলে—
“কাল আবার লাইব্রেরিতে আসবেন?”
আমি বলি,
“আসবো।”
এই কথার মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।
তবুও আমার মনে হলো—
আমি কিছু ধরে রাখছি।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে
আমি জানালার দিকে তাকাই।
শহরটা নিঃশব্দ।
আমার মনে হয়—
যদি এই শহরে কোনো ভালো মানুষ থাকে,
তাহলে সে এই শহরের শব্দের মাঝেই
চুপচাপ বেঁচে থাকে।
আমি তখনো জানতাম না—
ভালো মানুষ হওয়াটা
সবচেয়ে নিখুঁত ছদ্মবেশ।
চলবে,,,
64
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই