সম্পর্কের মূল্য
✦ পর্ব – ২ : “ছোটনের ছোট্ট পৃথিবী”
সবাই বলে—
“বড়রা বোঝে, ছোটরা শুধু ভুল করে।”
কিন্তু কেউ কখনো ভাবে না—
ছোটদেরও একটা আলাদা মন থাকে,
যেখানে একটু আদরই সবচেয়ে বড় সম্পদ…
---
ছোটন আহমেদ হোসেন—
এই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য।
বয়স মাত্র ১২।
মুখে সবসময় হাসি, চোখে সরলতা।
সে এমন একটা ছেলে—
যে তাকে ডাকবে, সে তার সাথেই যাবে।
কেউ যদি একটু মায়া করে ডাকে,
একটু ভালোবাসা দেখায়—
ছোটন সব ভুলে তার কাছেই ছুটে যায়।
---
আর এই জায়গাটাতেই সমস্যা।
ফাজিল রাগ করে বলতো—
—“সবাইরে গিয়া ধরিস কেন? কেউ ডাকলেই যাবি?”
সাজ্জাদও মাঝে মাঝে বলতো—
—“তোর কোনো লজ্জা নাই? সবখানে যাইস!”
বাবা কড়া গলায়—
—“এইভাবে চললে মানুষ তোকে দাম দিবে না!”
মা কষ্ট নিয়ে—
—“বাবা, একটু বুঝে চল… সবাই নিজের না…”
---
কিন্তু ছোটন বুঝতো না।
না… সে বোকার মতো বুঝতো না—
সে বুঝতে চাইতো না।
কারণ তার ভিতরে একটা অভাব ছিল—
যেটা কেউ কোনোদিন খেয়াল করেনি।
সে খুঁজতো—
একটা বোনের আদর।
---
চাচাতো, ফুফাতো বোনেরা যখন ডাকতো—
—“এই ছোটন, ইদিকে আয়!”
তার চোখ ঝলমল করে উঠতো।
সে দৌড়ে যেত—
মনে হতো, এই তো তার আপন কেউ ডাকছে…
---
কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিত,
কেউ বলতো— “এইটা খা”,
কেউ হাসতো তার সাথে।
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই
ছোটন খুঁজে পেত—
তার না পাওয়া ভালোবাসা।
---
দূর থেকে ফাজিল সব দেখতো।
তার ভিতরে কেমন যেন লাগতো—
রাগ, কষ্ট, অসহায়ত্ব… সব একসাথে।
সে জানতো—
এই আদরগুলো স্থায়ী না।
এই ডাকা, এই ভালোবাসা—
সবই ক্ষণিকের…
---
একদিন বিকেলে—
ছোটন আবার দৌড়ে যাচ্ছিল পাশের বাড়িতে।
ফাজিল তাকে থামালো।
—“কোথায় যাস?”
—“ওরা ডাকছে ভাই…”
—“সবাই ডাকলেই যাইতে হয়?”
ছোটন মাথা নিচু করে—
—“ওরা ভালোবাসে তো…”
ফাজিল কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর ধীরে বললো—
—“ভালোবাসা আর সময় কাটানোর মধ্যে পার্থক্য বুঝিস?”
ছোটন চুপ…
সে বুঝলো না—
বা বুঝতে চাইল না।
---
সেদিন রাতে—
ছোটন একা বসে ছিল।
মা এসে জিজ্ঞেস করলেন—
—“কি রে, চুপ কেন?”
ছোটন ধীরে বললো—
—“আমাদের যদি একটা আপন বোন থাকতো…
তাহলে কি আমি এমন করতাম?”
মায়ের চোখ ভিজে উঠলো।
কিন্তু তিনি কিছু বললেন না…
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর থাকলেও—
সেগুলো বলা যায় না।
---
দিন যেতে লাগলো…
ছোটন প্রতিদিনই কারো না কারো ডাকে যায়,
আর প্রতিবারই একটু একটু করে
মায়া পেয়ে ফিরে আসে।
সে খুশি থাকে।
কারণ সে শিখে গেছে—
“এই মুহূর্তের ভালোবাসা নিয়েই বাঁচতে।”
---
কিন্তু…
ফাজিল জানে—
এই খুশি একদিন ভেঙে যাবে।
কারণ—
যে ভালোবাসার কোনো দায়িত্ব নেই,
সে ভালোবাসা একদিন হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়।
---
একদিন হঠাৎ—
ছোটন সারাদিন কারো ডাক পেল না।
না কোনো বোন,
না কোনো হাসি,
না কোনো “এই ছোটন…”
সে উঠোনে বসে থাকলো।
অপেক্ষা করলো…
---
সেদিন প্রথমবার—
সে বুঝতে পারলো—
সব সময় সবাই ডাকে না।
সব সময় ভালোবাসা থাকে না।
---
রাতে ফাজিল এসে পাশে বসল।
কিছু বললো না…
শুধু মাথায় হাত রাখলো।
ছোটন ধীরে বললো—
—“ভাই… সবাই কি একদিন এমন হয়ে যায়?”
ফাজিল আকাশের দিকে তাকিয়ে—
—“হয়… যখন প্রয়োজন ফুরায়…”
---
সেদিন ছোটনের ভিতরে কিছু একটা ভেঙে গেল…
পুরোটা না।
কারণ—
সে এখনো ছোট।
তার ভিতরে এখনো
আশা বেঁচে আছে…
চলবে.......!
সম্পর্কের মূল্য
43
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই