১ম পর্ব
📖 গল্প: সম্পর্কের মূল্য
“কখনো কি ভেবেছেন, যাদের জন্য এত কিছু করেন—একটা সময় প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই তারাই আপনাকে ভুলে যাবে?”
শুনতে অবাস্তব লাগে, তাই না?
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে নির্লজ্জ সত্যগুলোর একটা এটাই।
মানুষ অদ্ভুত—
যা তার কাছে থাকে, তার মূল্য সে বোঝে না।
আর যখন সেটা হারিয়ে যায়, তখন বুক ভরে আফসোস করে।
গ্রামের একটা পুরোনো কথা আছে—
“থাকতে ধন হারাইলে কান্না করে মন।”
এই গল্পটাও তেমনই এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
---
একটা শহরতলির ছোট্ট গ্রাম। চারপাশে সবুজ, কাঁচা রাস্তা, সন্ধ্যার পর হালকা বাতাসে গাছের পাতা নড়ে ওঠে।
সেই গ্রামেই বাস করতো একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার।
পরিবারে পাঁচজন সদস্য—
বাবা, মা, আর তিন ভাই।
বাবার নাম দেলোয়ার হোসেন।
মা—নাজিয়া আক্তার।
তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়—ফাজিল আহমেদ হোসেন।
মাঝে সাজ্জাদ হোসেন।
সবচেয়ে ছোট—ছোটন আহমেদ।
তাদের সংসারে তেমন অভাব ছিল না, আবার খুব বেশি প্রাচুর্যও না।
চলতো—সাদামাটা, কিন্তু শান্ত।
তবে একটা আক্ষেপ ছিল সবসময়—
তাদের কোনো আপন বোন ছিল না।
---
চাচাতো, ফুফাতো—অনেক বোন ছিল ঠিকই,
কিন্তু “আপন” আর “পর”—এই দুইয়ের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল থাকে।
ফাজিল মাঝে মাঝে চুপচাপ বসে থাকতো।
কেউ বুঝতো না, তার ভিতরে কী চলতো।
সে বাইরে থেকে রাগি, একটু কড়া স্বভাবের।
গ্রামের অনেকেই তাকে “বেয়াদব” বলতো।
কিন্তু আসল সত্যটা ছিল অন্যরকম।
সে ভুলকে ভুল বলতো—
মানুষ সেটা সহ্য করতে পারতো না।
তাই “সোজা কথা” বলার জন্যই সে “বেয়াদব” হয়ে গেল। তবুও একটা জিনিস কেউ অস্বীকার করতে পারতো না—ছেলেটার মনটা ছিল একদম নরম।
চাচাতো মামাতো খালাতো ভাই বোনদের কারো বিপদ হলেই,,,সবচেয়ে আগে ছুটে যেত ফাজিল । রাত হোক, দিন হোক—কোনো হিসাব ছিল না।
কারো ঘরে অসুস্থ মানুষ,,,কারো জমিতে সমস্যা,,,কারো ঝামেলা—সব জায়গায় সেই “রাগি” ছেলেটাই আগে দাঁড়াতো।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো— বিপদ শেষ হলেই, সেই মানুষগুলোই তাকে ভুলে যেত । কেউ একটা ধন্যবাদও দিত না ঠিকমতো।
---
গ্রামের ভাষায় একটা কথা আছে—
“গাঙ পার হলেই মাঝি কিসের ভাই ।”
ফাজিলের জীবনটা যেন সেই কথারই উদাহরণ।
---
তার চাচাতো বোনেরা ছিল,
তাদের বিয়ে হয়ে গেছে অনেকের । যখনই তাদের স্বামীরা আসতো,,,ছোটনকে ডেকে নিয়ে হাসি-তামাশা, গল্প।
ফাজিলও যেত মাঝে মাঝে,
কারণ সে ভিতরে ভিতরে বোনের আদর খুঁজতো।
কিন্তু…
কেউ তাকে কখনো “আপন ভাই” হিসেবে দেখে নি।
সবসময় একটা দূরত্ব—
একটা অচেনা দেয়াল।
---
একদিন সন্ধ্যায়,
ফাজিল চুপচাপ বসে ছিল উঠোনে।
ছোটন এসে বললো,
—“ভাই, তুই এত চুপ কেন?”
ফাজিল একটু হেসে বললো,
—“কিছু না রে… ভাবতেছিলাম, যদি একটা আপন বোন থাকতো…”
ছোটন কিছু বললো না।
কারণ সে জানতো—এই কথার কোনো উত্তর হয় না।
---
দিন যেতে লাগলো।
একদিন হঠাৎ খবর এলো—
ফাজিলের এক চাচাতো বোনের স্বামী মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে।
জমি নিয়ে ঝামেলা, মামলা, মারামারি—
পরিস্থিতি খুব খারাপ।
সবাই দূরে সরে গেছে।
তখন সেই বোনের মুখে একটাই নাম—
“ফাজিল ভাই…”
---
ফাজিল দেরি করে নি।
সে গিয়ে সব সামলালো—
মানুষ জোগাড় করলো, কথা বললো, সমস্যা মিটালো।
দিনের পর দিন দৌড়াদৌড়ি করলো।
শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হলো।
---
কিন্তু…
সমস্যা মিটে যাওয়ার কিছুদিন পর—
সব আগের মতো।
না কোনো খোঁজ,
না কোনো সম্পর্কের টান।
ফাজিল আবার “পর” হয়ে গেল।
---
সেই রাতে ফাজিল অনেকক্ষণ চুপ ছিল।
তার মা এসে জিজ্ঞেস করলেন,
—“কি হইছে বাবা?”
ফাজিল ধীরে বললো,
—“মানুষ শুধু প্রয়োজনে আপন হয়, মা… প্রয়োজন শেষ, সম্পর্ক শেষ…”
তার চোখে পানি ছিল,
কিন্তু সে কাঁদলো না।
---
সেদিন থেকে ফাজিল বদলাতে শুরু করলো।
সে আর আগের মতো সবার ডাকে ছুটে যেত না।
কারো বিপদে গেলে,
নিজেকে একটু আটকে রাখতো।
কারণ সে বুঝে গেছে—
নিজেকে সবার জন্য উজাড় করে দিলে,
শেষে নিজের জন্য কিছুই থাকে না।
---
কিন্তু তবুও…
তার ভিতরের সেই নরম মনটা পুরোপুরি মরেনি।
কারণ সত্যিকারের ভালো মানুষরা
চাইলেও পুরোপুরি বদলাতে পারে না।
---
(চলবে…)
সম্পর্কের মূল্য
41
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই