জীবন মাঝে মাঝে মানুষকে আশার আলো দেখায়,
তারপর সেই আলো নিভিয়ে দেয় এক মুহূর্তে আরমানের জীবনেও ঠিক তেমনটাই ঘটতে চলেছে।নীরাকে হারানোর পর প্রথম কয়েক মাস ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।সে যেন ভিতর থেকে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সে থামেনি।
কারণ তার সামনে এখন একটা লক্ষ্য—
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।সে দিন-রাত পরিশ্রম করতে শুরু করল। টিউশন বাড়াল, পড়াশোনায় মন দিল, বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করল।অনেক ব্যর্থতার পর একদিন অবশেষে সে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি পেল।
চাকরিটা খুব বড় না হলেও সম্মানজনক।মাস শেষে ভালো স্যালারি। প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার দিনটা আরমানের জীবনে এক বিশেষ দিন।সে টাকাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল—
“আজ যদি নীরা পাশে থাকত…”
সে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনল।বাবার জন্য একটি পাঞ্জাবি।কিন্তু নিজের জন্য কিছু কিনল না।
ধীরে ধীরে তার জীবন আবার গুছিয়ে উঠতে লাগল। সে শহরে একটা ছোট রুম ভাড়া নিল।
নিজের খরচ নিজেই চালাতে লাগল। তার চোখে আবার স্বপ্ন ফিরে আসতে শুরু করল। সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—
নীরাকে ফিরিয়ে আনা।
অপেক্ষার দশ মাস। সময় কেটে গেল।
এক মাস, দুই মাস… ধীরে ধীরে দশ মাস।
এই দশ মাসে আরমান অনেক বদলে গেছে।
সে এখন আরও পরিণত। আরও শক্ত।কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরে একটাই আকাঙ্ক্ষা—
একদিন সে তার পরিবারকে ফিরিয়ে আনবে।
একদিন সে ঠিক করল— এবার সে যাবে। সে এখন কিছুটা প্রতিষ্ঠিত।সে নীরার বাবার সামনে দাঁড়াতে পারবে।সে নিজের পরিবারকে ফিরিয়ে আনবে।সকালে সে খুব ভোরে বের হলো।তার হাতে ছিল কিছু উপহার। নীরার জন্য একটি শাড়ি।তার মুখে ছিল হালকা হাসি। তার মনে হচ্ছিল—
আজ তার জীবনের নতুন শুরু হবে।
নীরাদের বাড়ির সামনে এসে সে থমকে গেল। বাড়িটা অদ্ভুতভাবে চুপচাপ।না কোনো কথা, না কোনো হাসির শব্দ। এক ধরনের ভারী নীরবতা চারদিকে।তার বুক ধুকপুক করতে লাগল।
সে দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল।ভেতরে ঢুকতেই সে অনুভব করল—
পরিবেশটা ঠিক স্বাভাবিক না। সবাই যেন চুপ।
কারো মুখে হাসি নেই। হঠাৎ নীরার ভাই রাজ এগিয়ে এল।কোনো কথা না বলে সে আরমানকে ধাক্কা দিল।
— “তুই এখানে কেন এসেছিস?”
আরমান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে মারতে শুরু করল।ঘুষি, লাথি—একটার পর একটা।আরমান হতভম্ব হয়ে গেল।সে বুঝতে পারছিল না—
কি হচ্ছে!
কিছুক্ষণ পর কেউ একজন এসে রাজকে থামাল।
আরমান তখন মাটিতে পড়ে। তার মাথা ঘুরছে।সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।ঠিক তখন একজন বয়স্ক মানুষ—সম্ভবত আত্মীয়— আরমানের কাঁধে হাত রাখলেন।তাকে দাঁড় করালেন।তারপর ধীরে বললেন—
— “তুমি এখনই এখান থেকে চলে যাও।”
আরমান কাঁপা গলায় বলল—
— “কেন? কি হয়েছে?”
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
— “নীরা আর বেঁচে নেই।”
এই কথাটা শুনে যেন সবকিছু থেমে গেল।আরমান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তার চোখ বড় হয়ে গেল।
সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
— “কি বলছেন…?”
আরও ভয়ংকর সত্যলোকটি ধীরে বললেন—
— “তোমার মেয়ে… সেও নেই।”
এই কথাটা শুনে আরমানের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে গেল।সে কিছু বলতে পারছিল না।শুধু তাকিয়ে ছিল।তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।সে চিৎকার করতে পারল না। কাঁদতেও পারল না ঠিকমতো।তার ভেতরটা যেন পাথর হয়ে গেছে।
লোকটি আবার বললেন—
— “আমরা তোমাকে খবর দিতে চাইনি।”
— “কেন…?”
— “কারণ এতে সমস্যা বাড়বে।”
— “তুমি এখন চুপচাপ চলে যাও।”
— “না হলে অনেক ঝামেলা হবে।”
আরমান কিছু বলল না।সে শুধু ধীরে ধীরে পেছনে হাঁটতে লাগল।তার পা কাঁপছিল।তার চোখে কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না।বাড়ি থেকে বের হয়ে সে রাস্তায় বসে পড়ল।চারদিকে মানুষ চলাফেরা করছে।কিন্তু তার কাছে সবকিছু অস্পষ্ট।তার মনে হচ্ছিল— তার জীবন শেষ হয়ে গেছে।
তার মনে পড়ছিল— নীরার হাসি। তার কথা।
তাদের ছোট সংসার। সবকিছু। আর এখন—
সব শেষ।সে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে অশ্রু।সে ধীরে বলল—
“হে স্রষ্টা…
আমার সবকিছু কেড়ে নিলে কেন?”
সেদিনের পর আরমান আর আগের মতো থাকল না।তার ভেতরের কিছু একটা চিরতরে বদলে গেল।
সে শিখে গেল— কষ্ট লুকিয়ে রাখতে। চোখের পানি চাপা দিতে। রাতের অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে ছিল আরমান।তার পাশে কেউ নেই। তার সামনে কেউ নেই।কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন মানুষ— যে আর কাঁদবে না। যে আর কাউকে বিশ্বাস করবে না।যে শুধু নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
এইভাবেই এক প্রেমিক, এক স্বামী, বাবা—
সব হারিয়ে হয়ে উঠছে। মানুষ যখন সবকিছু হারিয়ে ফেলে,তখন সে কোথায় ফিরে যায়?
যেখানে তার শিকড়— যেখানে তার শুরু।
আরমানের জন্য সেই জায়গা ছিল— তার গ্রাম।
নীরা আর তার সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার পর শহরটা আরমানের কাছে অচেনা হয়ে গেল।
যে শহর তাকে স্বপ্ন দিয়েছিল, আজ সেই শহরই তাকে শূন্য করে দিয়েছে।তার ছোট্ট ভাড়া করা ঘরে ঢুকলেই সে অনুভব করত— সবকিছু যেন ফাঁকা।
টেবিলের ওপর রাখা শিশুর কাপড়,নীরার জন্য কেনা শাড়ি— সবই এখন শুধু স্মৃতি।
রাতগুলো সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠল।ঘুম আসত না।চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠত— নীরার মুখ,
তার হাসি, আর সেই ভয়ংকর খবর, “সে আর নেই…”
এই শব্দগুলো যেন বারবার তার কানে বাজত।
একদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরমান নিজেকে দেখল। চোখের নিচে কালো দাগ।মুখে ক্লান্তি। সে নিজেকে বলল— “এভাবে বাঁচা যায় না।” তার মনে হলো—
এই শহর তাকে শুধু কষ্ট দিচ্ছে। সে সিদ্ধান্ত নিল—
সে শহর ছেড়ে যাবে। সে খুব বেশি কিছু গুছাল না।
কিছু কাপড়, কয়েকটা বই, আর কিছু স্মৃতি।বাকিটা ফেলে দিল। কারণ সে জানে— সবকিছু নিয়ে যাওয়া যায় না। কিছু কষ্ট এখানেই রেখে যেতে হয়।শহর ছাড়ার আগে সে একবার সেই রাস্তার দিকে গেল— যেখানে সে প্রথম নীরার সাথে হাঁটছিল। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে জল চলে এল। সে ধীরে বলল—
“বিদায়…”
বাসে উঠে সে জানালার পাশে বসে রইল।রাস্তা পিছিয়ে যাচ্ছে।শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।তার জায়গায় আসছে— নিঃশব্দতা।
গ্রামে পৌঁছানোর সাথে সাথেই সে অনুভব করল—
একটা আলাদা শান্তি। সবকিছু আগের মতোই আছে— রাস্তার ধারে গাছ ,ধানের ক্ষেত, পাখির ডাক।কিন্তু বদলে গেছে সে নিজে।বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ থেমে রইল আরমান।তারপর ধীরে দরজা ঠেলল।মা দরজা খুলে তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
— “তুই হঠাৎ…?”
আরমান কিছু বলল না। সে শুধু মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল।মা তার মাথায় হাত রাখলেন।
— “কি হয়েছে বাবা?”
আরমান অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
— “সব শেষ হয়ে গেছে মা…আমি রেজাল্ট ভালো করতে পারিনি,”
এই কথাটা বলেই সে কেঁদে ফেলল।সেই সঙ্গে সত্যটা লুকিয়ে ফেলল।
বাবা দূর থেকে সব দেখছিলেন।তিনি কিছু বললেন না।কিন্তু তার চোখেও জল ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন— ছেলেটা ভেঙে গেছে।
আরমান ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে লাগল। সে খুব কম কথা বলত। বেশিরভাগ সময় একা থাকত। রাতে উঠোনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। একদিন গ্রামের এক ছোট ছেলে তার কাছে এসে বলল—
— “ভাইয়া, তুমি কি আমাকে পড়াতে পারবে?”
আরমান একটু অবাক হলো।
তারপর বলল—
— “পারব।”
এই ছোট্ট ঘটনাটা তার জীবনে নতুন কিছু শুরু করল।ধীরে ধীরে গ্রামের আরও কয়েকজন ছাত্র তার কাছে পড়তে আসতে লাগল। সে তাদের মন দিয়ে পড়াতে শুরু করল। এই পড়ানোর মধ্যেই সে নিজের কষ্ট কিছুটা ভুলে থাকত।
একদিন সে দেখল গ্রামের একজন বৃদ্ধ অসুস্থ।
কেউ তাকে ঠিকমতো দেখাশোনা করছে না।
আরমান নিজে গিয়ে তাকে সাহায্য করল।
ওষুধ এনে দিল। খাবার দিল।ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ তাকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করল।
— “ছেলেটা ভালো।”
— “মানুষের জন্য ভাবে।”
এই কথাগুলো ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
কিন্তু এইসবের মাঝেও তার ভেতরের কষ্ট কমেনি।
নীরার স্মৃতি,—
সবকিছু এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
একদিন গভীর রাতে সে একা বসে ছিল।
তার চোখে অশ্রু।সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“হে রব,
আমি সব হারিয়েছি।
এখন তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।”
সেই রাত থেকেই তার জীবনে আরেকটা পরিবর্তন শুরু হলো।সে ধীরে ধীরে স্রষ্টার দিকে ঝুঁকতে লাগল।
সে বুঝতে পারল— মানুষ সবসময় তার পাশে থাকে না। কিন্তু স্রষ্টা সবসময় থাকে। এই বিশ্বাস তাকে শক্তি দিল।সেদিন ভোরে সূর্য উঠছিল।
আকাশে নতুন আলো। আরমান উঠোনে দাঁড়িয়ে সেই আলো দেখছিল।তার জীবনে এখনও অন্ধকার।কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতরেই জ্বলছে একটুকরো আলো— নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা।
এইভাবেই শহরের এক ভাঙা মানুষ গ্রামের মাটিতে ফিরে, নতুন করে নিজেকে গড়তে শুরু করল।
কষ্ট আছে, অভাব আছে, কিন্তু হার মানার ইচ্ছা নেই। কারণ সে এখন জানে— জীবন তাকে যতই ভাঙুক, সে আবার উঠে দাঁড়াবে।আর সেই পথেই তৈরি হবে— একজন মানুষের অদম্য জীবনের কাহিনি।
চলবে..
দ্য বয়
40
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই