দ্য বয়

মানুষ যখন নিজের সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ।আরমানও এখন ঠিক সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।নীরাকে ভালোবাসা তার কাছে কোনো অপরাধ নয়।কিন্তু সমাজ এটাকে অপরাধ হিসেবেই দেখছে।

তবুও সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—
সে পিছিয়ে যাবে না। সেদিন সকালে আরমান খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠল।রাতটা তার প্রায় জেগেই কেটেছে। আজ সে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। আজ সে নীরার বাবার সাথে দেখা করবে।

মা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। আরমান নাস্তা করতে বসলে মা জিজ্ঞেস করলেন—

— “আজ এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?”

আরমান একটু হাসল।

— “কিছু না মা।”

কিন্তু মা বুঝতে পারলেন— ছেলের ভেতরে বড় কোনো ঝড় চলছে।

কলেজে যাওয়ার আগে আরমান তার বন্ধু সোহেল আর ইমরানের সাথে দেখা করল।সোহেল বলল—

— “তুই সত্যিই ওদের বাড়িতে যাবি?”

আরমান দৃঢ় গলায় বলল—

— “হ্যাঁ।”

ইমরান একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল—

— “ওরা আবার কিছু করে বসবে না তো?”

আরমান শান্ত গলায় বলল—

— “আমি কোনো ঝগড়া করতে যাচ্ছি না। আমি শুধু সম্মানের সাথে কথা বলতে চাই।”

সোহেল তার কাঁধে হাত রেখে বলল—

— “যাই হোক, সাহসী সিদ্ধান্ত।”

ওদিকে নীরা বাড়িতে অস্থির হয়ে ছিল।সে জানত আজ আরমান তার বাবার সাথে কথা বলতে আসবে। তার বুক ধুকপুক করছিল। সে বারবার ভাবছিল—

“বাবা কি শুনবেন?”

“না কি আবার রাগ করবেন?”

তার মনে ভয় আর আশা—দুটোই ছিল।বিকেলের দিকে আরমান নীরাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়িটা বেশ বড়। উঁচু গেট, সামনে বাগান।
আরমান গভীর শ্বাস নিল। তারপর দরজায় কড়া নাড়ল।কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল নীরার বড়দা রাজ।সে আরমানকে দেখে চোখ রাঙাল।

— “তুই এখানে কেন এসেছিস?”

আরমান শান্তভাবে বলল—

— “আমি আপনার বাবার সাথে কথা বলতে চাই।”

রাশেদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।

— “তোর সাহস তো কম না!”

শেষ পর্যন্ত তাকে ভেতরে নেওয়া হলো।ড্রয়িং রুমে বসে ছিলেন নীরার বাবা।তার চোখে কঠোর দৃষ্টি।
তিনি বললেন—

— “তুমি আরমান?”

— “জি।”

— “কি বলতে চাও?”

ঘরের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে।আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর শান্ত গলায় বলল—

— “আমি আপনার মেয়েকে অসম্মান করিনি।”

নীরার বাবা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন—

— “তাহলে কি করেছ?”

— “আমি তাকে সম্মান করি। আমি তাকে ভালোবাসি।”

এই কথা শুনে ঘরের সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠল। রাজ চিৎকার করে উঠল—

— “এই সাহস কোথা থেকে পেলি?”


নীরার বাবা ধীরে ধীরে বললেন—

— “তুমি কি জানো আমরা কারা?”

আরমান মাথা নিচু করে বলল—

— “আমি জানি আপনারা সম্মানিত পরিবার।”

— “আর তুমি?”

এই প্রশ্নে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আরমান বলল—

— “আমি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি। কিন্তু আমি সৎ।”

এই কথা শুনে তারা হাসতে লাগল।রাজ বলল—

— “সততা দিয়ে সংসার চলে?”
আরমান শেষবার বলল—

— “আমি আপনার মেয়েকে সম্মানের সাথে বিয়ে করতে চাই।”

এই কথা শুনে নীরার বাবা প্রচণ্ড রেগে গেলেন।

— “অসম্ভব!”

— “কেন?”

— “কারণ তুমি আমাদের সমান নও।”

এই কথাটা আরমানের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল।

ঠিক তখন সায়রা ঘরে ঢুকল।তার চোখে অশ্রু।

সে বলল—

— “বাবা, আরমান খারাপ মানুষ না।”

তার বাবা রেগে উঠলেন—

— “চুপ!”

— “আমি তাকে ভালোবাসি।”

এই কথা শুনে ঘরে আবার ঝড় উঠল।পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠল যে আরমান বুঝতে পারল— এখানে কথা বলে কিছু হবে না।

সে ধীরে বলল—

— “আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু আমি মিথ্যা বলব না।”

তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

আরমান চলে যাওয়ার পর নীরা কান্নায় ভেঙে পড়ল।সে বুঝতে পারল—

তার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেবে না।

কিন্তু তার মনেও তখন একটি সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে গেছে।

সে আর নিজের সত্য থেকে পিছিয়ে যাবে না।
সেদিন রাতে আরমান একা রাস্তায় হাঁটছিল।
তার মনে অনেক কষ্ট।কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও একটি দৃঢ়তা জন্ম নিয়েছে।সে মনে মনে বলল—

“যদি সত্যি ভালোবাসা থাকে, তাহলে আমরা একদিন এক হবো।”


আরমান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“হে স্রষ্টা,যদি এই পথ আমার জন্য ঠিক হয়,
তাহলে আমাকে শক্তি দাও।”

কারণ সে জানে— তার জীবনের লড়াই এখন আরও কঠিন হতে যাচ্ছে।


রাতটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব।আকাশে মেঘ ছিল, চাঁদের আলোও যেন লুকিয়ে পড়েছিল। চারদিকে এমন এক পরিবেশ—যেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে।সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিল নীরা।সে আর এই বন্দী জীবনে থাকবে না। সে ভালোবাসার পথে হাঁটবে—যে পথ কঠিন, কিন্তু সত্য। নীরা নিজের ঘরে বসে ছিল। তার চোখে অশ্রু, মনে ঝড়।
তার বাবার কথা বারবার কানে বাজছিল—
“এই সম্পর্ক কখনো মেনে নেব না।”
সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল— “আমি কি ভুল করছি?”
মনের ভেতর থেকে একটা উত্তর এলো—
“না। তুমি সত্যের পাশে দাঁড়াচ্ছ।”
সেই মুহূর্তেই সে সিদ্ধান্ত নিল— সে বেরিয়ে যাবে।
রাত প্রায় ১২টা।সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। নীরা ধীরে ধীরে দরজা খুলল। তার হাত কাঁপছিল। একটা ছোট ব্যাগে কিছু কাপড়, আর কিছু টাকা। সে শেষবার ঘরের চারদিকে তাকাল। এই ঘরেই তার শৈশব কেটেছে। তার চোখ ভিজে উঠল।কিন্তু সে থামল না। ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

ওদিকে আরমান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার বুক ধুকপুক করছিল। সে জানত—
আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত বাস্তব হতে যাচ্ছে। হঠাৎ দূরে সে একটা ছায়া দেখতে পেল।
নীরা।
সে দ্রুত এগিয়ে এল।
— “তুমি এসেছ?”
নীরা মাথা নেড়ে বলল—
— “হ্যাঁ।”
তার চোখে তখন ভয়, কিন্তু সেই ভয়কে ঢেকে রেখেছে এক দৃঢ়তা। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর আরমান বলল—
— “চলো।”
তারা রাতের অন্ধকারে হাঁটতে শুরু করল।
চারদিকে নিস্তব্ধতা।কেবল তাদের পদচারণার শব্দ।
এই পথ তাদের নিয়ে যাচ্ছে এক নতুন জীবনের দিকে।ভোর হওয়ার আগেই তারা শহরে পৌঁছাল।
একজন পরিচিত কাজীর সাহায্যে তারা বিয়ের ব্যবস্থা করল।ছোট্ট একটা ঘর। দুইজন সাক্ষী।
কাজী সাহেব বসে আছেন। সবকিছু খুব সাধারণ।
কিন্তু সেই সাধারণতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

কাজী সাহেব বললেন—
— “আপনি কি নীরাকে কবুল করেন?”
আরমান দৃঢ় গলায় বলল—
— “কবুল করি।”
তিনবার।
তারপর নীরার দিকে তাকানো হলো।
— “আপনি কি আরমানকে কবুল করেন?”
নীরার চোখে তখন অশ্রু।সে ধীরে বলল—
— “কবুল।”
তিনবার।

এক মুহূর্তেই তারা স্বামী-স্ত্রী হয়ে গেল।(বেদাতি মতে)।কিন্তু এই সম্পর্কের পেছনে কোনো জাঁকজমক নেই।নেই কোনো আনন্দের অনুষ্ঠান।
আছে শুধু বিশ্বাস, ভালোবাসা আর সংগ্রামের শুরু।

বিয়ের পর তারা একটা ছোট ভাড়া বাড়িতে উঠল।
একটি ছোট ঘর।একটা খাট। একটি ফ্যান ।এই ছিল তাদের নতুন সংসার।নীরা চারদিকে তাকিয়ে বলল—
— “এই আমাদের ঘর?”
আরমান একটু লজ্জা পেল।
— “হ্যাঁ… আপাতত।”
নীরা মৃদু হাসল।
— “খুব সুন্দর।”

আরমান এখন শুধু নিজের জন্য না।তার এখন একটি সংসার আছে। একজন স্ত্রী আছে।
সে আরও বেশি পরিশ্রম করতে শুরু করল।
সকালে ইউনিভার্সিটি । দুপুরে পড়াশোনা।
সন্ধ্যায় টিউশন।রাতে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরা।
নীরার মানিয়ে নেওয়া। তার জন্য এই জীবন সম্পূর্ণ নতুন। সে বড় হয়েছে স্বচ্ছল পরিবারে। কিন্তু এখানে— নিজেকে নিজেই সব কাজ করতে হয়।
রান্না, ঘর পরিষ্কার, সবকিছু। প্রথম প্রথম তার কষ্ট হতো। কিন্তু সে কিছু বলত না। কারণ সে জানে—
এই পথ সে নিজেই বেছে নিয়েছে।কষ্টের মাঝেও কিছু ছোট ছোট সুখ ছিল।একদিন আরমান বাসায় এসে বলল—
— “আজ টিউশন থেকে একটু বেশি টাকা পেয়েছি।”
নীরা হাসল।
— “তাহলে আজ ভালো কিছু রান্না করব।”
তারা একসাথে রান্না করল।এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের বাঁচিয়ে রাখছিল।কিন্তু সমাজ এত সহজে তাদের মেনে নেয়নি।  শহরের অলিতে-গলিতে  খবর ছড়িয়ে পড়েছে।মানুষ নানা কথা বলতে লাগল। কেউ বলল—
— “ছেলেটা মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে।”
কেউ বলল—
— “এই সম্পর্ক টিকবে না।”
এই কথাগুলো আরমান শুনত।কিন্তু সে কিছু বলত না।নীরার পরিবার তার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দিল। কোনো যোগাযোগ নেই।নীরা মাঝে মাঝে একা বসে কাঁদত। আরমান তাকে বলত—
— “একদিন সব ঠিক হবে।”
কিন্তু তার নিজেরও সেই বিশ্বাস সবসময় শক্ত থাকত না।একদিন রাতে তারা দুজন বসে কথা বলছিল।নীরা বলল—
— “আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
— “কষ্ট থাকবে। কিন্তু আমরা একসাথে থাকব।”
নীরা তার হাত ধরে বলল—
— “আমি সবসময় তোমার পাশে থাকব।”

সেই রাতে আকাশে তারা ছিল।তারা দুজন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের চোখে ছিল স্বপ্ন। কিন্তু তারা জানত না— এই স্বপ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে।ভালোবাসা তাদের এক করেছে।
কিন্তু জীবন এখন তাদের পরীক্ষা নেবে।রাত গভীর হলো।ছোট্ট ঘরের ভেতরে দুজন মানুষ নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।তারা জানে না সামনে কি আছে। কিন্তু তারা জানে— তারা একে অপরের পাশে আছে।আর সেই বিশ্বাসই তাদের শক্তি। এইভাবেই শুরু হলো একটি ভালোবাসার সংসার— যেখানে আছে কষ্ট, সংগ্রাম,আর অদম্য আশা।

চলবে..

40 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই