হাতে তালের পাখা আর এক ঝুড়ি দেশি ফল নিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন রহিম শেখ। কপালে ঘামের ফোঁটা, পরনে সাধারণ ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি। আজ তাঁর আদরের মেয়ে মিতুর শ্বশুরবাড়িতে বিশেষ দাওয়াত। মধ্যবিত্ত হলেও রহিম শেখ কখনও মেয়েকে অসম্মানিত হতে দেননি। কিন্তু শহরের এই আলিশান ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে কেন জানি আজ তাঁর নিজের অস্তিত্বকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল।
ভেতরে ঢোকার পর থেকেই পরিবেশটা ছিল গুমোট। মিতুর শাশুড়ি সোফায় বসে উচ্চৈঃস্বরে তাঁর কোনো এক আত্মীয়ের সাথে লন্ডনের গল্প করছিলেন। রহিম শেখকে দেখে তিনি কেবল একবার অবহেলার চোখে তাকালেন। কুশল বিনিময় দূরে থাক, পাশের পরিচারিকাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "ওই ঝুড়িটা রান্নাঘরে রেখে দাও, ঘরটা নোংরা হচ্ছে।" মিতু ছুটে এসে বাবার পাশে দাঁড়াল, তার চোখেমুখে লজ্জার আভা। সে জানত তার শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলো তার বাবার সাধারণ জীবনযাপনকে খুব একটা সম্মানের চোখে দেখে না। মধ্যাহ্নভোজের সময় অপমানটা চরমে পৌঁছাল। মিতুর শ্বশুর ড্রয়িংরুমে বসে থাকা তাঁর উচ্চবিত্ত বন্ধুদের সামনেই উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, "বেয়াই সাহেব, আপনাদের গ্রামের মানুষগুলো এখনো সেকেলে। মিতুকে যখন বিয়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম আমাদের আভিজাত্য দেখে আপনাদের রুচি অন্তত কিছুটা বদলাবে। কিন্তু আপনি সেই একই রকম গেঁয়ো রয়ে গেলেন।" চারপাশের মানুষগুলোর মৃদু হাসির শব্দে রহিম শেখের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মিতু প্রতিবাদ করতে গিয়েও শাশুড়ির চোখের ইশারায় দমে গেল।
খাবারের টেবিলে রহিম শেখের পাতে সব থেকে সাধারণ খাবারটুকু দেওয়া হলো, অথচ অন্যদের জন্য ছিল রাজকীয় আয়োজন। মিতুর শাশুড়ি টিপ্পনি কেটে বললেন, "আপনাদের তো আবার হজমের সমস্যা, তাই হালকা ঝোলই আপনার জন্য ভালো।" রহিম শেখ এক দলা ভাত মুখে দিতে গিয়ে বুঝলেন, অপমান কেবল শব্দে নয়, আচরণেও বিষ ঢালতে পারে। নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি শুধু মাথা নিচু করে নীরবে অপমান হজম করলেন।
বিকেলের দিকে বিদায় নেওয়ার সময় রহিম শেখ মিতুকে আড়ালে ডেকে নিলেন। মিতুর চোখের জল দেখে তিনি মৃদু হাসলেন এবং পকেট থেকে একজোড়া সোনার দুল বের করে বললেন, "মা, তোর জন্য অনেক কষ্টে বানিয়েছিলাম। কোনোদিন যদি নিজেকে একা মনে হয়, মনে রাখিস তোর বাবা আজীবন তোর সাথে আছে।" এই সাধারণ মানুষের বড় হৃদয়ের সামনে ওই আভিজাত্যের দম্ভ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে রহিম শেখ বুঝলেন, টাকা-পয়সা দিয়ে মানুষের চামড়া চকচকে করা যায়, কিন্তু চরিত্র নয়। তিনি মাথা উঁচু করে বেরিয়ে এলেন। তিনি গরিব হতে পারেন, কিন্তু তাঁর আত্মসম্মান ওই ফ্ল্যাটের মালিকদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি জানেন, মিতুকে তিনি যে মূল্যবোধ শিখিয়েছেন, তা একদিন এই অন্ধকার কাটিয়ে দেবে।।

কোন মন্তব্য নেই