তবুও আনন্দ নেই
রহিম মিয়া বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। দূরে কোথাও মসজিদের মাইকে তাকবির ধ্বনি ভেসে আসছে—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…”। চারদিকে ঈদের আমেজ, ঘরে ঘরে ব্যস্ততা, নতুন কাপড়ের গন্ধ, সেমাইয়ের সুগন্ধ—সবকিছু মিলিয়ে যেন আনন্দের ঢেউ বইছে। অথচ তার মনটা অদ্ভুত ভারী।
ঈদ তো আনন্দের দিন। কিন্তু এবার তার কাছে ঈদ মানেই শূন্যতা।
গত বছরও এই সময়ে তার ঘর ভরে থাকত হাসিতে। ছোট মেয়ে মীম নতুন জামা পরে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে দেখত, আর ছেলে রাফি বাবার কাছে ঈদের সালামি নিয়ে দৌড়ে বেড়াত। স্ত্রী সালমা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকত—সেমাই, পোলাও, কোরমা—সবকিছুতেই ছিল ভালোবাসার ছোঁয়া।
কিন্তু আজ…
আজ সেই ঘরে নেই হাসির শব্দ, নেই কারো কোলাহল। শুধু নিঃশব্দ দেয়াল, আর কিছু স্মৃতি।
এক বছর আগের কথা। হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেল। এক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তার স্ত্রী ও সন্তানদের। মুহূর্তের মধ্যে তার জীবন থেকে সব রঙ মুছে গেল। সেই দিন থেকেই ঈদের আনন্দ তার কাছে কেবল একটি স্মৃতি।
গ্রামের মানুষজন তাকে অনেকবার বলেছে—“রহিম ভাই, জীবন থেমে থাকে না। আপনাকে আবার শুরু করতে হবে।”
কিন্তু কীভাবে? যে মানুষগুলো ছিল তার পৃথিবী, তাদের ছাড়া সে কিভাবে নতুন করে বাঁচবে?
ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় পাশের বাড়ির ছোট্ট ছেলে সাকিব এসে বলল,
—“চাচা, আপনি কি আমার সাথে ঈদের নামাজে যাবেন?”
রহিম একটু চমকে উঠল। অনেক দিন পর কেউ তাকে এভাবে ডাকল। সে মৃদু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু হাসিটা যেন চোখ পর্যন্ত পৌঁছাল না।
—“দেখি বাবা, যদি যেতে পারি…”
সাকিব চলে যাওয়ার পর রহিম আবার সেই পুরোনো ছবির দিকে তাকাল। দেয়ালে ঝুলছে সালমা আর দুই সন্তানের ছবি। ছবির দিকে তাকিয়ে তার চোখ ভিজে উঠল।
—“তোমরা থাকলে আজ কত খুশি হতাম…” সে ফিসফিস করে বলল।
রাত বাড়তে লাগল। বাইরে লোকজনের হাসি-আনন্দ, আতশবাজির শব্দ—সবকিছু তার নিঃসঙ্গতাকে আরও গভীর করে তুলছিল।
পরদিন সকাল।
ঈদের দিন।
সকালবেলা গ্রামের মসজিদের দিকে লোকজনের ভিড়। সবাই নতুন কাপড় পরে, মুখে হাসি নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাচ্ছে। রহিম অনেকক্ষণ দ্বিধায় ছিল—যাবে কি যাবে না।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
—“চাচা! চাচা! চলেন না!”
সাকিব আবার এসেছে।
রহিম এবার আর না বলতে পারল না। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, পুরোনো একটি পাঞ্জাবি পরে বাইরে বের হলো।
মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার সময় তার চোখ বারবার ভিজে উঠছিল। সিজদায় গিয়ে সে অনেকদিন পর মন খুলে কাঁদল।
—“আল্লাহ, তুমি আমার সব নিয়ে নিয়েছো… কিন্তু আমাকে শক্তি দাও…”
নামাজ শেষে সবাই একে অপরকে কোলাকুলি করছে। “ঈদ মোবারক” বলছে। রহিমও কয়েকজনের সাথে কোলাকুলি করল, কিন্তু তার ভিতরের শূন্যতা এখনও রয়ে গেছে।
হঠাৎ সে লক্ষ্য করল—মসজিদের পাশে কয়েকজন এতিম শিশু দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গায়ে পুরোনো কাপড়, চোখে লজ্জা আর আশা মেশানো দৃষ্টি।
একটা ছোট মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিতে যেন সে মীমকে দেখতে পেল।
রহিমের বুকটা হুহু করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে তাদের কাছে গেল।
—“তোমাদের নাম কী?”
একজন বলল, —“আমার নাম লাবিবা… আমরা এতিমখানা থেকে এসেছি।”
রহিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ যেন তার ভিতরে কিছু বদলে গেল।
সে তাদের সবাইকে নিয়ে পাশের দোকানে গেল। নতুন জামা, খাবার—যা যা পারল কিনে দিল।
শিশুগুলোর মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠল, তা দেখে রহিমের চোখ আবার ভিজে গেল—তবে এবার সেই কান্নায় কষ্টের সাথে একটুখানি শান্তিও ছিল।
লাবিবা এসে তার হাত ধরে বলল,
—“চাচা, আজ আমার জীবনের সেরা ঈদ।”
এই কথাটা শুনে রহিমের বুকটা কেঁপে উঠল।
হয়তো তার নিজের পরিবার আর নেই… কিন্তু এই পৃথিবীতে এখনও অনেক মানুষ আছে, যাদের জন্য সে কিছু করতে পারে।
সেদিন বিকেলে রহিম তার বাড়ির দরজা খুলে দিল। আশেপাশের এতিম ও গরিব শিশুদের ডেকে এনে তাদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করল।
অনেকদিন পর তার বাড়িতে আবার হাসির শব্দ শোনা গেল।
সে বুঝতে পারল—আনন্দ সবসময় নিজের জন্য নয়। কখনো কখনো অন্যকে আনন্দ দেওয়ার মধ্যেই নিজের সুখ লুকিয়ে থাকে।
রাতে বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রহিম মৃদু হাসল।
—“তোমরা নেই… কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা এখনও আছে।”
ঈদ এলো, তবুও আনন্দ নেই—এই কথাটা আজ আর পুরোপুরি সত্য নয়।
কারণ, সেই শূন্যতার মাঝেই সে নতুন এক আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।
অন্যের হাসিতে, অন্যের সুখে—সে আবার বাঁচতে শিখছে।
40
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই