মেহেরপুর গ্রামের ভোরগুলো যেন অন্যরকম। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ধানের পাতায় এসে পড়ে, শিশিরবিন্দু ঝলমল করে ওঠে। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ, কোথাও আবার আজানের ধ্বনি ভেসে আসে।এই গ্রামেরই একটি মাটির ঘরে বসে বই খুলে পড়ছিল আরমান।ভোরবেলা পড়ার অভ্যাস তার বাবাই শিখিয়েছিলেন।তিনি বলতেন,ভোরের বেলা পড়া মনে থাকে অনেক বেশি। আর ভোর থেকে দিন শুরু করলে সময় বেশি পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যারা সফল হয়েছে,তারা তাদের কাজ ভোর দিয়েই শুরু করেছে।
আবদুল করিম উঠোনে বসে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি পুরোনো লাঠি। বয়স খুব বেশি না হলেও কষ্টের জীবনে শরীরটা আগেই নুয়ে পড়েছে। তিনি মৃদু গলায় বললেন—
— “আরমান, একটু এখানে আয়।”
আরমান বই বন্ধ করে বাবার পাশে এসে বসলো।
করিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
— “বাবা, তুই কি জানিস আমি কেন চাই তুই পড়াশোনা করিস?”
আরমান মাথা নেড়ে বলল—
— “মানুষ হওয়ার জন্য।”
করিম হালকা হেসে বললেন—
— “হ্যাঁ, মানুষ হওয়ার জন্য। কিন্তু শুধু নিজের জন্য না, অন্যদের জন্যও।”
আরমান বুঝতে চেষ্টা করছিল।
করিম আবার বললেন—
— “আমাদের গ্রামে অনেক মানুষ আছে যারা কষ্টে থাকে। কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না। যদি তুই বড় হস, তুই তাদের পাশে দাঁড়াবি।”
আরমান চুপ করে বাবার কথা শুনছিল।সেদিন সে প্রথম বুঝতে পারল—তার বাবার স্বপ্ন শুধু ছেলেকে বড় করা নয়।মানুষ বানানো।
সময় দ্রুত এগিয়ে চলল।আরমান এখন মিশনারী স্কুলে মাধ্যমিকে পড়ে। বয়স তেরো–চৌদ্দ।সে পড়াশোনায় খুব ভালো।তাই তার বাবা মিশনারী স্কুলে ভর্তি করে কিন্তু দারিদ্র্য এখনো তাদের পিছু ছাড়েনি।অনেক সময় টিউশন ফি দিতে দেরি হয়ে যায়। বই কিনতে সমস্যা হয়।একদিন স্কুলে হেডমাস্টার তাকে ডাকলেন।
— “আরমান, তোমার ফি তিন মাস বাকি।”
আরমান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
হেডমাস্টার আবার বললেন—
— “এইভাবে চললে পড়াশোনা চালানো কঠিন হবে।”
সেদিন তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।
সে বাড়ি ফিরে কিছু বলেনি।কিন্তু রাতে সে শুনতে পেল তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলছেন।
হালিমা বেগম বলছিলেন—
— “ছেলেটার ফি দিতে হবে। না হলে ওর পড়া বন্ধ হয়ে যাবে।”
করিম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “আমি চেষ্টা করছি। কাল বাজারে গিয়ে একটু টাকা ধার করব।”
ঘরের অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে সব শুনছিল আরমান।
তার চোখে পানি চলে এসেছিল। সে মনে মনে বলল— “আমি একদিন বাবার সব কষ্ট দূর করব।”
এভাবেই হেসে খেলে দুঃখ কষ্ট করে দিন অতিবাহিত হতে লাগলো। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে আরমান দেখল গ্রামের এক ছোট ছেলে কাঁদছে।ছেলেটার নাম রাকিব। আরমান জিজ্ঞেস করল—
— “কাঁদছ কেন?”
রাকিব বলল—
— “আমার পড়া কেউ শেখায় না। আমি কিছু বুঝি না।”
আরমান কিছুক্ষণ ভাবল।
তারপর বলল—
— “চল, আমি শেখাব।”
সেই দিন থেকেই আরমান সন্ধ্যায় রাকিবকে পড়াতে শুরু করল।ধীরে ধীরে গ্রামের আরও দুই–তিনটা ছেলে তার কাছে পড়তে আসতে লাগল।এটা ছিল তার জীবনের প্রথম টিউশন।
কেউ টাকা দিত না, কিন্তু সবাই তাকে সম্মান করত। করিম একদিন এটা দেখে বললেন—
— “দেখছি তুই শিক্ষক হয়ে যাচ্ছিস।কিন্তু এতে তো তোর নিজের পড়াশোনার ক্ষতি হবে বাবা ”
আরমান হেসে বলল—
— “না বাবা, শুধু সাহায্য করছি। এতে আমার জ্ঞান বাড়বে। ” করিমের চোখে তখন গর্বের আলো।ছেলে নিজেকে বুঝতে পেরেছে, ও পারবে নিজেকে গড়তে। তারা দারিদ্র কিন্তু জীবনসংগ্রামী।হয়তো এই জীবন সংগ্রামই তাদেরকে বদলে দেবে।
একদিন স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো।সবাই নতুন পোশাক পরে এসেছে।
আরমান পরেছিল তার পুরোনো পাঞ্জাবি।ক্লাসের কয়েকজন ছেলে আবার তাকে নিয়ে হাসতে লাগল।একজন বলল—
— “এই পোশাক পরে অনুষ্ঠানে এসেছে!”
আরেকজন বলল—
— “ও তো গরিব।”
এই কথাগুলো শুনে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সে কিছু বলেনি। সেদিন মঞ্চে তাকে কবিতা আবৃত্তি করতে বলা হলো।
সে যখন মঞ্চে দাঁড়াল, তার হাত কাঁপছিল।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সে নিজের ভয় কাটিয়ে উঠল। সে এমন আবেগ দিয়ে কবিতা পড়ল যে পুরো হলঘর নীরব হয়ে গেল। শেষে সবাই হাততালি দিল। যারা তাকে নিয়ে হাসছিল, তারাও।
সেদিন সে বুঝল—
সম্মান টাকা দিয়ে নয়, যোগ্যতা দিয়ে পাওয়া যায়।
কিছুদিন পর করিম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
কঠোর পরিশ্রমের কারণে তার শরীর ভেঙে পড়ছিল।ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার বললেন—
— “এভাবে কাজ করলে শরীর আর টিকবে না।”
কিন্তু করিমের সামনে তো অন্য পথ নেই। তিনি বললেন—
— “কাজ না করলে সংসার চলবে কিভাবে?”
সেদিন আরমান প্রথমবার বুঝল—
তার বাবার কষ্ট, সংসারের দায়িত্বগুলো। রাতে আরমান পড়ছিল। বাইরে ঝড় উঠেছিল। হঠাৎ সে দেখল তার বাবা উঠোনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। সে কাছে গিয়ে বলল—
— “বাবা, ঘুমাওনি?”
করিম বললেন—
— “ঘুম আসছে না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর করিম বললেন—
— “আরমান, একটা কথা মনে রাখিস।”
— “কি বাবা?”
— “জীবনে অনেক কষ্ট আসবে। কিন্তু কষ্টকে ভয় পেলে চলবে না।” আরমান চুপ করে শুনছিল।
করিম আবার বললেন—
— “মানুষ তখনই বড় হয়, যখন সে কষ্টের সামনে মাথা নিচু করে না।”
এই কথাগুলো আরমানের হৃদয়ে গেঁথে গেল।
সেই রাতেই সে নিজের খাতায় লিখেছিল—
“আমি বড় হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াব।”
তার ছোট্ট সেই খাতা ছিল তার স্বপ্নের ডায়েরি।
সে সেখানে নিজের ভবিষ্যৎ লিখত। লিখত—
“একদিন আমি এমন জায়গায় পৌঁছব যেখানে আমার বাবাকে আর কষ্ট করতে হবে না।”
আরমান এই বয়সেই বুঝে গিয়েছিল জীবন থেকে জানতে হবে, প্রতিটি মানুষের পরিস্থিতি এক নয়,আদিম মানুষ পাহাড়ের গুহায় বাস করত, সেই মানুষের উত্তসূরী নির্মান করছে বিশাল অট্টালিকা।
আজ যে সভ্যতা, চাকচিক্যময় ধরণী এ সবই আধুনিক মানুষের অবদান। মানুষই পারে পৃথিবীটাকে নতুন করে বাঁচআতে। পরদিন খুব ভোরে আরমান ঘুম থেকে উঠল। চারদিকে তখনও কুয়াশা। উঠোনের কোণে রাখা কলস থেকে পানি নিয়ে সে মুখ ধুয়ে নিল।তারপর মসজিদের দিকে হাঁটতে লাগল। নামাজ শেষ করে সে কিছুক্ষণ মসজিদের বারান্দায় বসে রইল। মনে হচ্ছিল তার ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি জন্ম নিচ্ছে।
সে মনে মনে বলল—
“আমি কখনো হার মানব না।”
বাড়ি ফিরে সে বাবাকে উঠোনে বসে থাকতে দেখল।
করিম ধীরে ধীরে বললেন—
— “বাবা, মনে রাখিস—জীবন সবসময় সহজ হবে না।”
— “আমি জানি বাবা।”
— “কিন্তু তুই যদি সৎ থাকিস, আল্লাহ তোকে একদিন পথ দেখাবেন।”
আরমান মাথা নেড়ে বলল—
— “আমি চেষ্টা করব।”
করিম ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
সেই মুহূর্তে হয়তো তিনি বুঝতে পারেননি—
তার এই ছোট্ট ছেলেটা একদিন জীবনের কত বড় বড় ঝড়ের মুখোমুখি হবে। ভালোবাসা তাকে ছুঁয়ে যাবে।আবার বিশ্বাসঘাতকতাও তাকে ভেঙে দেবে।
কখনো সে সব হারাবে, কখনো আবার নতুন করে দাঁড়াবে। কিন্তু আজকের এই সকালটা—
এই সাধারণ কথোপকথন— তার জীবনের পথচলায় এক গভীর ভিত্তি হয়ে রইল। কারণ সেই দিন থেকেই আরমান বুঝে গেল—
বড় মানুষ হওয়া মানে শুধু সফল হওয়া নয়।
বরং কষ্টের মধ্যেও মানুষ হয়ে থাকা। কিন্তু জীবন সবসময় স্বপ্নের মতো হয় না। সামনের দিনগুলোতে তার জীবনে আসতে চলেছে— ভালোবাসা,
অপমান, সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামের মধ্যেই একদিন সে দেখা পাবে এমন একজন মানুষের—
যে তার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। সে মানুষটি হবে— একটি মেয়ে। আর সেই মেয়েকে কেন্দ্র করেই শুরু হবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়।
চলবে?
দ্য বয়
41
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই