এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম মেহেরপুর। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখান দিয়ে কাঁচা রাস্তা, আর দূরে একটা সরু নদী। সেই গ্রামেই একদিন জন্ম নিল একটি ছেলে। বৃষ্টিভেজা রাত ছিল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। মাটির ঘরের ভেতরে কেরোসিনের বাতি জ্বলছিল মৃদু আলোয়।
হঠাৎ ভেতর থেকে শিশুর কান্না শোনা গেল।
ধাত্রী মহিলা দরজা খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে বলল—
— “মোবারক হোক, আপনার ছেলে হয়েছে।”
লোকটার মুখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে চোখে আনন্দের আলো জ্বলে উঠল। লোকটার নাম আবদুল করিম। পেশায় ছোটখাটো কৃষক। নিজের জমি বলতে তেমন কিছু নেই, অন্যের জমিতে কাজ করেই সংসার চলে। তবু সেদিন তিনি মনে মনে বললেন—
“আল্লাহ, আমার কিছু না থাকলেও আমার ছেলেটাকে মানুষ করে দেবেন।”
ঘরের ভেতরে শুয়ে ছিলেন শিশুটির মা হালিমা বেগম। খুব দুর্বল, কিন্তু ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি হাসছিলেন।
করিম ধীরে ধীরে ছেলের পাশে বসে বললেন—
— “আমাদের ঘরে আলো এসেছে।”
সেই রাতেই ছেলেটার নাম রাখা হলো আরমান।
কারণ তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাবা–মায়ের অনেক আরমান (স্বপ্ন)।
আরমানের শৈশব কাটল ধানের গন্ধ আর মেঠো পথের ধুলো মেখে। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী হলেও হালিমার হাতের স্নেহে আর করিমের কড়া শাসনে আরমান বড় হতে লাগল এক অদম্য জেদ নিয়ে। করিম প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে আরমানকে পড়াতে বসাতেন। তেলের খরচ বাঁচাতে অনেক সময় কেরোসিনের বাতি নিভিয়ে আরমান চাঁদের আলোয় উঠানে বসে পড়ত। বাবা বলতেন, "বাবা আরমান, আমি অন্যের জমিতে ফসল ফলাই, কিন্তু আমি চাই তুই নতুন কিছু ফলাবি। শহর থেকে বড় অফিসার হয়ে ফিরে আসবি এই গ্রামে।" বাবার এই কথাগুলো আরমানের মনে তীরের মতো বিঁধে থাকত। বর্ষায় যখন তাদের মাটির ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত, হালিমা বেগম সেই দেওয়া শাড়ি দিয়ে সেই পানি মুছতেন আর বিড়বিড় করে বলতেন, "আমার ছেলে একদিন আমাদের জন্য দালান তুলবে।"আরমান বড় হতে লাগল।দারিদ্র্যের সংসার। কখনো ঠিকমতো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। তবু আরমানের বাবা তাকে খুব ভালোবাসতেন।প্রতিদিন ভোরে করিম মাঠে কাজ করতে যেতেন। যাওয়ার আগে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলতেন—
— “তুই বড় হয়ে মানুষ হবি।”
আরমান তখন ছোট। বাবার কথা পুরো বুঝত না।
কিন্তু একটা কথা সে বুঝত—
বাবা তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন।
আরমান যখন ছয় বছরে পা দিল, তখন তাকে গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করানো হলো।
প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার সময় তার পায়ে ছিল না জুতো। একটা পুরোনো ব্যাগ, তার ভেতরে দুইটা খাতা আর একটা পেন্সিল।স্কুলে গিয়ে সে দেখল অন্য অনেক ছেলের নতুন ব্যাগ, নতুন বই।কেউ কেউ তাকে দেখে হাসছিল।
একটা ছেলে বলল—
— “ওর জুতোই নেই।”
আরমান কিছু বলল না। মাথা নিচু করে ক্লাসে গিয়ে বসে পড়ল।সেদিন বাড়ি ফিরে সে মাকে জিজ্ঞেস করল—
— “আমার কি জুতো হবে না?”
হালিমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন—
— “হবে বাবা, একদিন সব হবে।”
আরমান বুঝে গেল—
এখন তাদের পক্ষে সম্ভব না।
সেদিন রাতে সে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।তার ছোট্ট মনে একটা অদ্ভুত জেদ জন্ম নিল।
সে বড় হবে।
একদিন বিকেলে আরমান মাঠে বাবার কাছে গেল।
করিম তখন জমিতে কাজ করছিলেন।ছেলেকে দেখে তিনি হাসলেন।
— “কিরে স্কুল কেমন?”
আরমান বলল—
— “ভালো।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল—
— “আব্বু, বড় মানুষ কাকে বলে?”
করিম কাজ থামিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
— “যার অনেক টাকা থাকে, সে বড় মানুষ না।”
আরমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
— “তাহলে?”
করিম বললেন—
— “যে মানুষকে সাহায্য করে, কষ্টে ভেঙে পড়ে না— সে বড় মানুষ।”
সেই কথা আরমানের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
এক বছর পর তাদের সংসারে বড় বিপদ এল।
বৃষ্টি না হওয়ার কারণে ফসল নষ্ট হয়ে গেল।করিমের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।অনেক সময় ঘরে খাবার থাকত না।একদিন রাতে আরমান দেখল মা ভাত না খেয়ে বসে আছেন।
সে বলল—
— “মা তুমি খাচ্ছ না কেন?”
হালিমা বেগম হাসলেন—
— “আমার ক্ষুধা নেই।”
কিন্তু আরমান বুঝে গেল—
মা মিথ্যা বলছেন।
সেদিন সে নিজের ভাতের অর্ধেকটা মায়ের থালায় দিয়ে বলল—
— “আমারও ক্ষুধা নেই।”
হালিমা বেগম চোখের পানি লুকিয়ে ফেললেন।
এইভাবেই কয়েক দিন অতিবাহিত হয়েগেল।তবুও তারা আশা করত,সুদিন আসবে,আরমান বড় হয়ে সব দুঃখ কষ্ট দূর করবে।
স্কুলে একদিন শিক্ষক নতুন বই আনতে বললেন।
সবাই বই নিয়ে এল।কিন্তু আরমান আনতে পারল না।শিক্ষক রাগ করে বললেন—
— “বই না আনলে স্কুলে আসিস কেন?”
ক্লাসে সবাই হাসছিল।
আরমানের বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল।বাড়ি ফিরে সে কিছু বলল না।রাতে কেরোসিনের আলোয় সে পুরোনো খাতা নিয়ে বসে থাকল।
তার মনে হচ্ছিল—
দুনিয়াটা খুব কঠিন।এখানে তাকে টিকে থাকতে হলে কঠিন সংগ্রাম করতে হবে।
সেই রাতেই আরমান একটা সিদ্ধান্ত নিল।
সে নিজেকে বলল—
“একদিন আমি এমন জায়গায় পৌঁছব
যেখানে কেউ আমাকে নিয়ে হাসবে না।”
বাইরে তখন বাতাস বইছিল।দূরে মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল।আরমান চুপ করে আকাশের দিকে তাকাল।তার ছোট্ট হৃদয়ে তখন জন্ম নিচ্ছিল, একটা বড় গল্পের শুরু।একটা ছেলের গল্প।যে ছেলে বারবার ভাঙবে। তবুও থামবে না। যে ছেলে অপমান পাবে। তবুও মাথা নিচু করবে না।যে ছেলে হারাবে অনেক কিছু
তবুও একদিন নিজেকে খুঁজে পাবে। সে ডায়েরিতে লিখল একটা ইংরেজি কবিতা। শুধু একটা কবিতা নয় - এ যেন একটা সংকল্প :
A boy means a shoulder of duty,
A heart where dreams arise,
Even when storms surround his path,
He never says goodbye to tries.
A boy means moving forward,
Through darkness on the way,
Though countless barriers stand ahead,
He walks on every day.
A boy means never breaking,
No matter how hard the test,
He hides his pain with silent strength
And gives his very best.
At his own steady pace he walks,
With courage in his soul,
Crossing every obstacle
While moving to his goal.
A boy means hope and bravery,
A spirit standing tall,
No matter how tough the world may be,
He rises over all.
পরদিন ভোরে আরমান খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠল।গ্রামের ওপর তখন হালকা কুয়াশা। দূরে মোরগ ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। করিম নামাজ পড়ে উঠোনে বসে ছিলেন।আরমান ধীরে ধীরে বাবার পাশে গিয়ে বসে পড়ল।করিম অবাক হয়ে বললেন—
— “এত সকালে উঠেছিস?”
আরমান শান্ত গলায় বলল—
— “বাবা, আমি অনেক পড়াশোনা করব।”
করিম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ছোট্ট ছেলেটার চোখে তখন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
তিনি মৃদু হেসে বললেন—
— “পড়বি বাবা, অবশ্যই পড়বি। আল্লাহ চাইলে তুই অনেক বড় হবি।”
সেই সকালটা ছিল খুব সাধারণ একটি সকাল।
কিন্তু কেউ জানত না—
এই ছোট্ট ছেলেটা একদিন এমন সব ঝড়ের মুখোমুখি হবে,যা অনেক মানুষ সহ্য করতে পারে না।জীবন তাকে দেবে ভালোবাসা,অপমান, প্রতারণা,বেদনা। তবুও সে থামবে না।কারণ তার ভেতরে জন্ম নিয়েছে এক শক্তি—সংগ্রাম করার শক্তি।আর সেই শক্তির গল্পই ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে— একজন ছেলের জীবনকথা।
দ্য বয়।
দ্য বয়
42
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই