পূর্ণিমার রাতে

পূর্ণিমার রাতে
"পূর্ণিমার রাতে"

পূর্ণিমার রাত এলেই গ্রামটার আকাশ অন্য রকম হয়ে ওঠে। চাঁদটা যেন শুধু আলো ছড়ায় না—সে স্মৃতি জাগায়, অপেক্ষা বাড়ায়, আর মানুষের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভালোবাসাকে ডেকে তোলে।
এই গ্রামেই থাকত নীলা। সে বিশ্বাস করত, পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় এমন এক কাল্পনিক অস্তিত্ব জেগে ওঠে, যে কেবল তাদের কাছেই আসে, যারা নিঃশব্দে কাউকে ভালোবাসে। কেউ কেউ তাকে বলে “চাঁদের মানুষ”, কেউ বলে “আলোয় গড়া স্বপ্ন”। নীলা অবশ্য তাকে কোনো নাম দেয়নি—নাম দিলে যেন সে বাস্তব হয়ে যাবে, আর বাস্তব হলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
সেই রাতে নীলা নদীর ধারে বসেছিল। জোছনার আলো পানির গায়ে কাঁপছিল, ঠিক নীলার বুকের মতো। হঠাৎ মনে হলো, আলোটা জমে জমে মানুষের অবয়ব নিচ্ছে। ধীরে ধীরে এক যুবক দাঁড়াল তার সামনে—চোখে শান্তি, মুখে এক অদ্ভুত পরিচিত হাসি।
“তুমি কি আমাকে ডেকেছ?” সে জিজ্ঞেস করল, কণ্ঠে বাতাসের মতো নরম সুর।
নীলা মাথা নাড়ল। “আমি কাউকে ডাকি না। আমি শুধু অপেক্ষা করি।”
যুবক হেসে বসল তার পাশে। “অপেক্ষাই তো ডাক।”
তারা কথা বলল—কিন্তু কথার চেয়ে নীরবতা বেশি ছিল। নীলার মনে হলো, এই নীরবতাতেই সে নিজের না বলা সব কথা বলে ফেলছে। যুবক বলল, সে পূর্ণিমার রাতেই জন্মায়, আর ভোরের আলোয় মিলিয়ে যায়। তার অস্তিত্ব টিকে থাকে কেবল ভালোবাসার বিশ্বাসে।
“তাহলে তুমি বাস্তব নও?” নীলা জানতে চাইল।
“ভালোবাসা কি কখনো পুরো বাস্তব হয়?” যুবক পাল্টা প্রশ্ন করল।
চাঁদ আরও ওপরে উঠল। সময় যেন থমকে গেল। নীলা বুঝল, এই মুহূর্ত চিরকাল থাকবে না। বুকের ভেতর অজানা কষ্ট জমল।
“তুমি চলে গেলে আমি কী করব?” নীলা ফিসফিস করে বলল।
যুবক চাঁদের দিকে তাকাল। “আমাকে খুঁজবে না। আমি তোমার মনে থেকে যাব—যখনই তুমি কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসবে, আমি তখনই জন্ম নেব।”
ভোরের আলো ছুঁতেই তার অবয়ব ঝাপসা হয়ে গেল। নীলা হাত বাড়াল, কিন্তু ধরতে পারল না—শুধু আলো রইল, আর একরাশ শান্তি।
সেই থেকে নীলা পূর্ণিমার রাতে নদীর ধারে যায়। সে জানে, সে একা নয়। ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তবে কাল্পনিক অস্তিত্বও বাস্তবের চেয়ে বেশি জীবন্ত হতে পারে।









61 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই