ছুটন্ত জীবন
রাশেদের বয়স পঁচিশ।
ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করে। বেতন খুব বেশি না, আবার একেবারে কমও না। কিন্তু সংসারের দায় তার কাঁধে ভারী।
গ্রামে থাকে তার পরিবার—
মা, ছোট দুই বোন আর এক কিশোর ভাই।
বাবা নেই। তিন বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। সেই দিন থেকেই রাশেদ বুঝে গেছে—এখন সে আর শুধু নিজের নয়।
শহরে থাকার খরচ কমাতে সে এক কামরার ঘরে আরও দু’জনের সাথে থাকে।
মাস শেষে হিসাব করলে দেখা যায়—নিজের জন্য খুব কমই কিছু থাকে। তবু সে হারাম পথে যায়নি।
অফিসে অনেকেই বলে—
— “এভাবে চললে জীবন দাঁড়াবে না।”
— “সিস্টেম না জানলে পিছিয়ে পড়বি।”
রাশেদ জানে—ওই “সিস্টেম” মানে কী।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে মায়ের ফোন এলো।
— “বাবা, আজ এক আত্মীয় বলছিল—তোর বয়স তো কম না। ছেলেটা একা থাকবে কতদিন?”
রাশেদ চুপ করে রইল।
সে জানে, মা কোনো চাপ দিতে চান না। সমাজটাই চাপ দেয়।
বিয়ের প্রস্তাব আগেও এসেছে।
একবার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মেয়ের কথা উঠেছিল। সবাই বলেছিল—মেয়ে সুন্দর, পড়ালেখা জানা, আধুনিক।
কিন্তু খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল—
নামাজ নেই, দ্বীনের চর্চা নেই, বিয়েকে শুধু আরামের মাধ্যম ভাবে।
রাশেদ সেদিন মাকে শান্ত করে বলেছিল—
— “আম্মা, আমি এমন সংসার চাই না, যেখানে শুরু থেকেই আল্লাহর ভয় থাকবে না।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।
— “তুই ঠিকই বলছিস বাবা… কিন্তু দেরি হচ্ছে।”
সেই রাতে রাশেদ নামাজ শেষে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
মনে পড়ছিল এক হাদিস—
> “❤️একটি দেহ যা হারাম দ্বারা গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
(তিরমিজি)❤️
সে ভাবল—
হারাম শুধু খাবার না।
হারাম সঙ্গী, হারাম পরিবেশ, হারাম সিদ্ধান্ত—সবই ধীরে ধীরে মানুষকে গড়ে তোলে।
এর কিছুদিন পর অফিসের কাজে তাকে এক মসজিদের ট্রাস্ট অফিসে যেতে হয়। হিসাব সংক্রান্ত কাজ।
সেখানেই পরিচয় হয় মুঈন উদ্দিন নামের এক লোকের সাথে। ভদ্র, কম কথা, চোখে চিন্তার রেখা।
কাজ শেষ হওয়ার সময় মুঈন উদ্দিন জিজ্ঞেস করলেন—
— “আপনার পরিবারে কে কে আছেন?”
রাশেদ সংক্ষেপে বলল—মা, ভাইবোন।
কথাটা শুনে লোকটি চুপ করে গেলেন।
কয়েক সপ্তাহ পর তিনি আবার যোগাযোগ করলেন।
— “আমি সরাসরি বলছি। আমার একটি মেয়ে আছে। আমরা এমন ছেলে খুঁজছি, যে দ্বীন আর দায়িত্ব বোঝে। আপনি চাইলে পরিবারের মাধ্যমে কথা বলা যেতে পারে।”
রাশেদ পরিষ্কার করে বলেছিল—
— “আমি মেয়ের সাথে একা কথা বলবো না। আমার মা আছেন। আপনার পরিবার চাইলে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”
এটাই ছিল প্রথম শর্ত।
পরিবার বসে দেখা হলো।
মুঈন উদ্দিন, তার স্ত্রী, রাশেদের মা।
মেয়েটির নাম আফসানা। সে পর্দার ভেতরেই ছিল। কোনো ব্যক্তিগত আলাপ হয়নি। শুধু মৌলিক বিষয়—নামাজ, পর্দা, দায়িত্ব, প্রত্যাশা।
আফসানার পরিবার জানত—রাশেদ ধনী না।
রাশেদ জানত—এই বিয়ে মানে সহজ জীবন না।
অনেকে বলল—
— “আরেকটু সময় নিলে কী হতো?”
— “২৫ তো কিছুই না।”
কিন্তু রাশেদ জানত—সময় শুধু বয়স না, পথও।
বিয়ে হলো খুব সাধারণভাবে।
কোনো ঋণ নেই।
কোনো দেখনদারি নেই।
বিয়ের পর বাস্তবতা সহজ হয়নি।
একবার রাশেদের চাকরি চলে গেল।
বোনের পরীক্ষার ফি বাকি।
মায়ের ওষুধ শেষ।
কিন্তু আফসানার মুখে অভিযোগ ছিল না।
এক রাতে রাশেদ দেখল—আফসানা নামাজ শেষে দোয়া করছে। চোখ ভেজা, মুখে শান্তি।
সে শুধু বলল—
— “হালাল কষ্ট আল্লাহ দেখেন।”
কয়েক মাস পর রাশেদ আবার কাজ পেল। আগের চেয়ে ভালো না, খারাপও না।
কিন্তু ঘরে অদ্ভুত শান্তি।
তার এক বন্ধু তখন দ্রুত টাকা, সুন্দর স্ত্রী, বিলাসী জীবন নিয়ে ভেঙে পড়ছে।
হারাম রিজিক, সন্দেহ, ঝগড়া—সব শেষ করে দিচ্ছে।
রাশেদ তখন মনে মনে উচ্চারণ করল—
❤️সৎ পথে করিও গমন যদিও হয় দেরি
অসৎ নারী করিও না বিয়ে যদিও হয় পরী ❤️
কারণ সে এখন জানে—
দেরিতে পাওয়া হালাল জীবন গড়ে,
আর তাড়াহুড়া করে নেওয়া হারাম জীবন ভাঙে।
এই সত্য সে বইয়ে পড়েনি।
সে নিজের জীবনেই দেখেছে। ছুটন্ত জীবন।কখনো সুখ কখনো বা দুঃখ এভাবেই কেটে যায় সময়। জীবনে কোনটাই স্থায়ী নয়।কিন্তু আমলনামা গুলো স্থায়ী, যার কর্মফল একদিন ভোগ করতে হবে। তাই সব সময় সত্যের পথে চলার চেষ্টা করবো আমরা সবাই ইংশাআল্লাহ।
✍️ Ripon Khan ✍️
79
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই