ছয় খানা পেন্ট দিয়েছে মা, একটাও হলো না। সব কোমর ছোট হয়ে গেছে। মোটেও আমি মোটা হয়নি। কুক কাজ করি, পেশাগত ঐতিহ্য আমার ভুড়িটা। শেষে বাবার জামা কাপড় পড়তে হলো। মায়ের কোন দোষ নেই। গত চার বছর কোন জামা কাপড় তৈরি করি নি আমি।
করবো বা কেন?? আবুধাবি শহরে একদিন কি দুই দিন গেষ্ট হাউজ থাকি। টাউজার আর ট্রি সার্ট পরি তখন। বাকি নব্বই টা দিন ইউনিফর্ম আর দুটো হাফ প্যান্ট আর দুইটৌ টি সার্টে পড়েই চলে যায়।
আর বাড়িতে আসি মাত্র 24 থেকে 26 দিনের জন্য। সেই সময় দামি জামা কাপড় প্রয়োজন হয় না। কারণ দুই দিন পা টেকে না আমার ঘরে। আমার আয়ের টাকার উপর আমার মা বাবা কোন দিন কোন দাবি রাখেন না। ফলে কিছু সাঙ্গ পাঙ জুটিয়ে পাড়া গায়ে ঘুরে বাড়াই। কারণ পাড়া গায়ের মানুষ গুলোর মুখে হাসি ফুটিয়ে আমি খুশি থাকি।
আসলে সংবাদ মাধ্যমে খবর না হলে , আপনারা কখনো গ্রাম বাংলার কথা ভাবেন না। কিন্তু বাংলার বিভিন্ন গ্রাম , বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন অভাব, অভিযোগ থাকে সেটা সব সময় খবর হয় না।
যেমন এবার ধরুন সব্জি দাম শুনে সবাই বলছেন বাজারে আগুন। কিন্তু খবর রেখেছেন বাংলার প্রচুর মাঠঘাট জলে ডুবে ছিলো এবার বর্ষার জলে। আপনি বলবেন গুল মারছেন কেন দাদা এবছর তো বন্যা হয়নি। কিন্তু দাদা উন্নয়ন তো হয়েছে!! মাঠের মাঝখানে দিয়ে রাস্তা হয়েছে। কিন্তু জল বেড়ানো রাস্তাটা ঠিক মতো হয় নি।
যাইহোক শুধু ত্রান বিলি নয়। আরো অনেক বিষয়ে কাজ করতে হয় আমাদের । হারিয়ে যাওয়া লোক শিল্পীদের উৎসাহিত করা, তাদের তৈরি মাল গুলো বিক্রির ব্যাবস্থা করা এগুলো কাজ। ধরুন ছৌ নাচের কথা সবাই কম বেশি জানেন, কিন্তু ডং পুতুল নাচের কথা কি জানেন?? এদেরকে প্রচারের আলোয় আনতে হবে। আপনারা আপনাদের ছেলেমেয়েদের জন্মদিনে আনুন না, একটা বহুরূপীকে তাহলে হয়তো কিছুটা সহযোগিতা হবে।
ছাড়ুন এসব অকাজের কথা। যাইহোক রানা এসে সমস্যার সমাধান করলো। ওর ভেবেছিলো আমার মামাতো ভাইএর বিয়েতে আসতে পারিনি যখন ওর ছেলের মুখে ভাতে নিশ্চিত আসবো। সেই ভাবনা থেকে আমার জন্য ওরা একটা ব্লেজার কিনে রেখেছিলো আর একটা জুতো কিনে রেখেছিলো। তাই এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। কারণ এ সমাজ পোশাকের একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি কোন কথা না বললেও আপনার পোশাক আপনার সব পরিচয় বলে দেয়।
মোটামুটি একটা মানানসই পোশাক পরে পৌছালাম কলকাতার এক অভিজাত ক্লাবে। এ সব জায়গায় ঢুকতে বেশ লজ্জাই লাগে। কিন্তু পাড়াতুতো ভাই, ভাইয়ের খুব কাছের বন্ধু যখন এসে পড়েছি কবজি ডুবিয়ে খেয়ে যাবো। কিন্তু খাওয়া জায়গা দিকে তাকিয়ে মনটা একটু মেঘ করলো। কাটা চামচে খেতে হবে।
যাইহোক ঢুকে দেখলাম বর বৌকে নিয়ে ব্যস্তু সবাই ছবি তুলতে। মোটামুটি ভাবে ছোট খাটো লাইন পড়ে গেছে স্লেফি টেল্ফি তোলার জন্য। যাইহোক হোক ভিড়ে মধ্যে থেকে হঠাৎ বেড়িয়ে এলো জুন। সহজ সহজ স্বাভাবিক ভাবে বললো " বুবাইদা কত দিন পর তোমাকে দেখলাম। টুবাই, রূপা ওরা কোথায়। "
ও প্রশ্ন উত্তর দিতে একটু সময় নিলাম। কারণ আমার ভিতরে তখন পাটি গনিত, বিজগনিতের হিসাবে নিকাশ চলেছে। ও আমার এক সময়ের বেস্ট ফ্রেন্ডের বোন। জন্ম হয়েছে চোখের সামনে ওকে তুই বলে এসেছি চিরকাল । কিন্তু এখন আমি কোন মেয়েকে আপনি ছাড়া কথা বলি না। ওকে তুই বলা উচিত হবে কিনা সেটা বড় ভাবনার বিষয়। শেষ মেষ বলে সব ভাবনা তুরি মেরে বললাম
" তোর বিয়ের পর বছর দশেক পর কোন বিয়ে বাড়ি এলাম তাই তুই দেখবি কিভাবে আমায়। "
ওর মুখে একটা ছায়া নেমে এলো বোধহয় ওর দাদা আপ্পুর জন্য। কিন্তু ওর সাথে কথা বললবো কি? হঠাৎ চোখ পড়লো আমাদের গুগুল দাদা ওপর। না আমাদের ছোট বেলায় গুগুল ছিলো না। তাই এ নাম আমার মনে মনে দেওয়া। চরিত্রের নাম রাজা দা। পড়াশোনা ভালো ছিলো খুব। পৃথিবীর সবকিছু বিষয়ে কিছু জানতে হলে, ও আপনাকে সঠিক তথ্য দিতে পারতো। ও আমার কাছে একটা প্রেরণা আজো।
যাইহোক রাজা দার সাথে, ছায়া সঙ্গী লাল্টু দা উপস্থিত এই বিয়ে বাড়িতে। লাল্টু দা এমন একটি মানুষ যার জন্য , আমার পদবী ভুল বলতো সবাই স্কুলে। আমার পাশাপাশি ঘরে থাকতাম ও ছিলো খুব ভালো ছাত্র ছিলো। ওকে সবাই চিনতো। ওর নাম ছিলো শমিক পাল। আমার নাম ছিলো মানব মন্তল। ওর ভাই হিসাবে আমাকে সবাই মানব পাল বলে ডাকতো। যাইহোক তাতে যদিও আমার গর্বে বুক ভরে যেতো।
তবে লাল্টু দা আমার জীবন একটা বড় শিক্ষা দিয়েছিলো। আমদের স্কুলের প্রথম স্থান অধীকারি রিতেশ দা ডাক্তারি সুযোগ পেলো। ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী, ও কম যায় না কিছুতেই। ও ইঞ্জিনিয়ারিং সুযোগ পেলো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ও বি এস সি ভর্তি হলো। ওর লক্ষ ছিলো গবেষণা করা। বড় হয়ে বুঝতে পারলাম। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলে অনেক টাকা রোজাগার করা যায়। কিন্তু গবেষক হলে সমাজকে কিছু দিয়ে যাওয়া যায়।
আমাদের আড্ডার দিতে দেখে, রিও কোথা থেকে ধরে নিয়ে এলো পাপ্পুকে। পাপ্পু আমাদের ছোট বেলাকার বন্ধু। তবে ওকে আমি এখন অন্য চোখে দেখি। যখন প্রথম বিদেশে চাকরি করতে গেছিলাম তখন কোন অসুবিধা হয় নি। অনেক অপমান সহ্য, অনেক কষ্ট সহ্য করে চাকরিটা স্থায়ী করে, ভেবেছিলেন ও ফিরে আসবে। কিন্তু ওকে এক বন্ধুকে দিয়ে ফোন করবার পর ও কথা বললো না। তখন মনে হলো নিজের জীবনটা শেষ করে দিই।
আমি মাঝ রাতে একটা সুসাইট নোট পোস্ট করে। সমুদ্রের জলে ঝাঁপ মারা প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখন পাপ্পু কল আমার ম্যাসেঞ্জারে।
ও সেই দিন কোন বকাবকি করে নি , জ্ঞান দেয় নি। ও ওর জীবনের গল্প বলে , আমার সিদ্ধান্ত কতটা বোকামি সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলো। ও শুনলাম অনেক সফল হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায়। এখান ও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড একজন সম্মানিত সদস্য।
আমদের চোখের সামনে বড়ো হওয়া রিও কম যায় না। ও এখান অস্ট্রেলিয়া একটা দূর্গাপূজা শুরু করেছে, এবং এখান গায়ক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায়
বেস জনপ্রিয়। সে যাইহোক, আমার ভাই বললো বোধহয় আর আবার কবে একসাথে দেখা হবে জানি না। একটা স্লেফিতে মুহুর্তটা বন্দী করে রাখালে ভালো হয়।
ছবিটা দেখে সবাই বলে ফেললাম রাজাদের চাতালটার কথা মনে পড়ছে। রাজাকারের চাতাল মানেই তো আরেকজনের কথা আমাদের মনে পরে যায়। বল হাতে সে আমাদের শেন ওয়ার্ন , ব্যাট হাতে জাভেদ মিয়াঁদাদ। মোটেও আমি আপ্পুর সুখ্যাতি করছি না। জাতেদ মিয়াঁদাদ মতো খেলতো না আপু কখনোই। ও ভালোই খেলতো কিন্তু জীবনে কোন দিন একবার আউট হয়ে, ব্যাট ছেড়ে নি ও তাই ওর এই নামকরন। ক্রিকেট খেলা নিয়ে রোজ ঝগড়া করেছি ওর সাথে , তবুও ওর কথা মনে পড়তেই আমার খুব কষ্ট হলো।
আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্যাকেজে ও আমেরিকায় চাকরি পেয়েছে। এখন ওখানে নাগরিক। কিন্তু ও ওর নিজের বোন জুনের বিয়েতেও আসতে পারে নি। এবারে আসতে পারলো না। ভিসা পাওয়া নিয়ে অনেক ঝামেলা চলছে। ওর কষ্টটা হয়তো কেউ বুঝতে পারবেন না, কিন্তু আমি বুঝতে পারি। কারণ আট বছর পর আমিও কোন অনুষ্ঠান বাড়িতে আসতে পারলাম। কত আত্মীয় মার গেলো, কত নতুন সদস্য এলো। খবর পাই কিন্তু উৎসব আনন্দে শোকে অংশগ্রহণ করা হয় না আমার।
যাইহোক খুশির অনুষ্ঠানে মন খারাপ সময় নেই আমাদেরও। কিন্তু দুঃখ দুঃখ ভাবটাও বেশিক্ষন থাকলো না। ছেলেবেলার সব চরিত্র গুলো এই বিয়ে কেন্দ্র করে, এক জায়গায় হাজির হয়েছি শুনে ভিডিও কল করলো আপু নিজেই আবার রাজাদার ফোনে। সবার সাথে চুটিয়ে আড্ডা দিলো। আমি ওকে বললাম নাটক অভিনয়টা ছাড়িস না।
ও বললো " আর কি হবে অভিনয় টভিনয় করে। দলটা এখন করছি না, সময়ের অভাবে। "
রাজাদা বললো " আরে জানিস না বুবাই তো, এখনো গল্প টল্প লেখা চালিয়ে যাচ্ছে। পরে ফ্লিম টিল্ম বানানোর ইচ্ছা আছে ওর। তাই অভিনয় জন্য তোকে নেবে বলেই, অভিনয় চালিয়ে যেতে বলছে।"
আপ্পু সব সময় একটু সিরিয়াস ছেলে ও আমাকে বললো " তুই ছবি বনাবিতো ভালো কথা। রাজাদার বাবা কত বড় অভিনেতা ছিলেন। রাজাদার রক্ত অভিনয় মিশে আছে তুই রাজাদাকে নিয়ে কাজ শুরু করে দে। "
আমি বললাম " দেখ রাজাদার প্রতিডা আছে। লাল্টু দার মেধা আছে। পাপ্পুর রূপ আছে। কিন্তু এদের কাছে আসল জিনিসটাই নেই। আমার গল্প নাম কলপ। এরা সবাই টাকলা তো আমার তোকেই চাই। "
কথা শুনে সবাই হেসে ফেলো। সবাই হাসছে দেখা আরো লোক হাসতে আধঘণ্টার মতো নানা মজার কথা শুনিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছি। এমন সময় একটা মেয়েকে ফিসফিস বলতে শুনলাম "এমন একটা মজাদার লোকে কিভাবে নীলাঞ্জনা ছেড়ে গেলো!"
কেউ একজন প্রশ্নের উত্তর দিলো " ওদের বিয়েটা কাগজের বিয়ে ছিলো তাই তুই চাইলে , তোর ঘটকালি করে দিতে পারি। তোর পাশে মন্দ হবে না। তবে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে আর কি!! "
মনে মনে ভাবলাম কাগজের বিয়ের সুবিধা অনেক সহজেই সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলা যায়।
কাগজের বিয়ে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
16
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating