মায়ে নাক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ষোল বছরের আগের কথা হঠাৎ আজ মনে পড়ে গেলো কফি সপে ঢুকে। ২৫শে মে ২০০৯ সোমবার দুপুরে পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আছড়ে পড়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আয়লা। স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় বাতাসের গতি ছিল ১১০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে মারা যায় ৩৩৯ জন। ১মিলিয়ন মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল।
আজকের যে মানব মন্ডল কে তোমরা চেনো সে হারিয়ে গেছে ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই সময়ের আমি আজকের আমির মধ্যে বিস্তার খারাপ। লিটল ম্যাগাজিন লেখা লিখি করে সংবাদিকতার চাকরি করি। প্রচুর গন্য মান্য ব্যক্তিদের সাথে পরিচয়। তাদের সাথে বিধস্ত সুন্দর বন অঞ্চল দেখতে গিয়ে সঞ্জুর  সাথে আলাপ।
আমার মতো ওর দেখলাম পরিবর্তন হয়েছে। আমি ওকে চিনতে পারি নি। ও যেচেই পরিচয় না দিলে চিনতে পারতাম না। ও আসল পরিচয় ও একটা মৌয়াল। সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীদের বলা হয় 'মৌয়াল'। এটি একটি পেশাভিত্তিক শব্দ, যার অর্থ মধু সংগ্রাহক। ‘মৌয়াল’ শব্দটি ‘মৌ’ (মধু) এবং ‘আল’ (প্রত্যয়) দিয়ে গঠিত।জীবন বাজি রেখে তারা বনের ভিতর থেকে মধু সংগ্রহ করে আনে। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাহিনী থেকে যায় আমাদের কাছে অধরা। সেই মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ করার কাহিনী ভয়ঙ্কর।
আজ কলকাতার বুকে একটা রেস্টুরেন্ট এর মালিক ও। ষোল বছর আগে আয়লার পর ওর পরনে কাপড়টা ঠিক মতো ছিলো না। আজ কি এমন ঘটলো ওর, এতো পরিবর্তন আমার জানতে ইচ্ছা করছিলো। আমি জানতে চাইলে ও নিজে থেকে বললো।" আমার ঘরে চলুন সব বলছি। কারণ আমি কিছু জিনিস না দেখালে আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। "
ওর ঘরে ঢুকতেই একটি স্বর্ণ মুদ্রা দিলো। আমি যতদূর জানি ওটা বাহ্ট  । আগে যখন থাই বাত জাতীয় মুদ্রা ছিল না, তখন এই ধরনের মুদ্রাগুলো মূলত ওজনের একক ছিল এবং তখন ওখানে সোনা ও রূপা দিয়ে তৈরি হতো।
তারপর ভয় ভয় বললো " আমার কথা বিশ্বাস করবেন না জানি। কিন্তু আমাদের সুবজখালি গ্রাম আজ জন শুন্য হয়ে গেছে। আপনি ভালো মানুষ সেই সময় আপনার মারফত আমরা অনেক সাহায্য পেয়েছিলাম। আজো হয়তো আপনি আমাদের বিপদ মুক্ত করতে পারেন সেই উদ্দেশ্যেই আমাদের জীবনে কি ঘটছে বলতে চাই। যদি আপনি শুনতে আগ্রহী হন। "
আমি বললাম ' আমি কি করতে পারি জানি না কিন্তু  এই মুদ্রাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জাননো। আমাদের সুন্দর বন গ্রিক ও রোমান লেখকরা 'গঙ্গারিডাই' নামে এক জনগোষ্ঠী ও এক অঞ্চলের উল্লেখ করেছেন।  'গঙ্গাঋদ্ধি', 'গঙ্গাহৃদি' খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় এদের শক্তি ও সভ্যতা সম্পর্কে জানা যায়, যখন তিনি গঙ্গারিডিদের বিশাল সেনাবাহিনীর ভয়ে তার অভিযান থেকে ফিরে যান বলে বলা হয়। আর এই সভ্যতা ছিল  সুন্দর বনে। তুমি এটা কোথায় পেলে?? "
ও বললো " এটা আমাকে কোয়াং:  দিয়েছে।  ওর যদিও আসল নাম নাক। আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন মুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা একটা পুরনো দিনের কলসি  পেয়েছিলাম।  আলি ভাই ওটা খুলতেই একটা সাদা ধোঁয়া ভরে গেলো অঞ্চল টা। একটা সুন্দরী মেয়েতে পরিনত হলো ধোঁয়াটা।  সে আমাদের  এই স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে বললো তোমাদের মধ্যে কেউ একজন আমাকে বিয়ে করো তাহলে এরকম অনেক স্বর্ণ মুদ্রা পাবে নয়তো তোমরা আমার হাতে প্রাণ হারাবে। আলি ভাই ওকে বিয়ে করে নিয়েছে। আমি ঘটনাটা জানি বলে আমাকে অনেক টাকা দিয়ে  পাঠিয়ে দিয়েছে শহরে। এখন আলি আমাদের গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান। পূরো গ্রামটাই ওর দখলে। নাক আলির অত্যাচারে অতিষ্ঠ সবাই কিন্তু কেউ গ্রাম ছাড়তে পারছে না। সাবাই ওদের কৃতদাস হয়ে জীবন কাটাছে। আপনি কিছু একটা করুন আপনার লেখা আমি পড়েছি। আপনি এরকম  অনেক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন আপনার গল্পে। "
মনের লাইব্রেরি পাতা উল্লাটাতেই।  মায়ে নাক রোমান্টিক গল্পটা কথা মনে পড়লো। তবুও ওর কাছে  থেকে মুদ্রাটা চাইলাম কিছু পরিক্ষা নীরিক্ষার জন্য।
মায়ে নাক" (Mae Nak) থাইল্যান্ডের  বিখ্যাত ভূতের গল্প বা লোককাহিনী। ট্র্যাজেডি গল্প বলতে পারেন। থাইল্যান্ড  নাক (Nak) নামের এক সুন্দরী তরুণী ফ্রা খানং খালের (Phra Khanong canal) তীরে তাঁর স্বামী মাকের (Mak) সাথে সুখেই করতেন। নাক গর্ভবতী থাকাকালীন মাককে যুদ্ধে যেতে হয়েছিল। মাক যখন যুদ্ধে করতে ব্যাস্ত, নাক তখন জীবন মরনের সাথে যুদ্ধ করছিলো শেষ পর্যন্ত সে হেরে যায় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় সে মারা যান।
কিন্তু মাক যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে দেখেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তান তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। মাক জানতেন পারেনি  যে নাক মারা গেছে এবং তিনি তাদের সাথে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল।  গ্রামবাসীরা মাককে বারবার সতর্ক করার চেষ্টা করে, কিন্তু মাক তাদের কথায় কান দেয় নি। কিন্তু একদিন, নাক  রান্না করতে করতে অসভাবিক  কান্ড ঘটালো। তাঁর হাত অনেকটা লম্বা হয়ে যায় মাটিতে পড়ে জিনিস তুলে যথা স্থানে রেখে দিল নিজের জায়গা থেকে একচুলও না সেরে। এই দৃশ্য দেখে মাকে বুঝতে বাকি রইলো না যে নাক ভুত।
মাক ভয়ে পালিয়ে গিয়ে একটি মন্দিরে আশ্রয় নেন, যাতে ঐ পবিত্র স্থানে নাক না আসতে পারে। স্বামীর এই চলে যাওয়ায় নাক রাগে পুরো গ্রামে তাণ্ডব শুরু করেন। অবশেষে পরে বৌদ্ধ ভিক্ষু নাকের আত্মাকে একটি কলসিতে বন্দী করে নদীতে ফেলে দেন। সেই কলসি আলী পেয়েছে।

আমি আলীর সাথে যোগাযোগ করলাম। বললাম সুন্দর বনের ওপর লেখা লেখি করতে চাই। আমার টিম নিয়ে থাকতে চাই ওর গেষ্ট হাউসে। ও ওর নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনলো। ও বললো " দাদা আপনাদের  আমার বাড়িতে থাকতে হবে। আমি বিয়ে করেছি। আমার বৌএর হাতের রান্না খেতেই হবে আপনাকে। "

24 Views
1 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: