শেষ ভালোবাসার নামটা ছিলে তুমিই
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
বিয়ের পর আমার স্ত্রীকে প্রথম দেখে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। মেয়ে চুপচাপ, মুখে কোনো হাসি নেই। আমি যতই কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, সে ততই দুরে গেছে। রাতে একসাথে ঘুমাতে দিতো না, পাশে বসলে উঠে যেত। মাঝে মাঝে দেখি, চুপচাপ চোখের পানি ফেলে। জিজ্ঞেস করলে বলে, "কিছু না।"
কিন্তু কিছু তো একটা ছিল। ভেতরে কোনো এক কষ্ট, কোনো এক অতীতের ছায়া সব সময় তাকে গ্রাস করে রাখতো। একটা সময় জানতে পারি, তার জীবনে একজন ছিলো। একজন প্রবাসী ছেলে, পড়াশোনা খুব একটা করেনি, কিন্তু মেয়েটা তাকেই ভালোবাসতো অগাধভাবে। অথচ তার বাবা-মা তাকে সেখানে বিয়ে দেয়নি। তারা চেয়েছিলো পাত্র হোক শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। আর আমিই ছিলাম তাদের পছন্দের সেই পাত্র।
আমি জানতাম না, আমি কারও জীবনে অন্য কারও জায়গা নিয়ে ঢুকে পড়েছি। প্রথমদিকে ভীষণ কষ্ট হতো, মনে হতো, আমি বুঝি চোরের মতো কারও ভালোবাসা চুরি করে এনেছি। কিন্তু আমি তাকে কখনো দোষ দেইনি, বরং প্রতিদিন ধৈর্য ধরে বোঝাতাম, “আমি জানি আপনি কষ্টে আছেন, কিন্তু আপনার কষ্টের মধ্যে আমায় কেনো রাখছেন? আমি তো কিছু জানতাম না।”
প্রতিদিনের কান্না, অনুরোধ, ভালোবাসা দিয়ে তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। একদিন তার হাত ধরে খুব কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, “আপনার প্রেমকে সম্মান করি, কিন্তু আমার ভালোবাসাটাও তো অমূল্য। আপনি চাইলে আমিই চলে যেতাম, কিন্তু এখন তো আপনি এসেছেন… আমাকে একটুও জায়গা দেবেন না?”
ধীরে ধীরে সে বদলাতে শুরু করলো। হয়তো আমার কষ্ট তাকে স্পর্শ করেছিল। হয়তো আমার নিরব ভালোবাসা, যত্ন, সহানুভূতি একটু একটু করে তার পুরনো ঘায়ে প্রলেপ হয়ে উঠেছিল। সময়ের সাথে সাথে সে কাছে আসলো। আমার নামের পাশে তার নামটা মানিয়ে নিতে শিখলো। তার চোখে একসময় আরেক রকমের মায়া দেখতাম… ভালোবাসা, হয়তো না, কিন্তু মায়া — গভীর মায়া।
তিন বছর পর চাকরির প্রয়োজনে আমি চলে গেলাম দূরে। দূরত্ব কাকে বলে, তখন ভালো করে বুঝেছিলাম। ফোনে আগের মতো কথা হতো না, অনুভব করতাম — কিছু একটা হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন ডাকবাক্সে ডিভোর্সের কাগজ আর একটা চিঠি পেলাম।
চিঠিতে লিখা ছিলো:
> “প্রিয়,
আমি হয়তো অন্য কাউকে ভালোবেসেছি, কিন্তু আপনার মতো মানুষকে কষ্ট দিয়েছি — এটা পাপ। আপনি ভালোবাসতে জানেন, আমি শুধু পেয়েও ভুল করেছি। এখন আমি আমার ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিতে চাই, কারণ জীবনে সেইটুকুই সত্য ছিলো আমার কাছে। আপনাকে বললে আপনি বিয়েটা ভেঙে দিতেন, আমি জানি। কিন্তু আমি সাহস পাইনি। এখন আপনার জীবনটা মুক্ত হোক — নতুন করে কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিন। দোয়া করি, আপনি ভালো থাকবেন।”
– সে
চোখের পানি চিঠির কালি ভিজিয়ে দিয়েছিল। তখনও আমি ভেঙে পড়িনি। শুধু চেয়েছি, সে ভালো থাকুক।
তিন বছর পর, একদিন খবর পেলাম — সে নেই। ব্লাড ক্যান্সার… চলে গেছে না ফেরার দেশে। হাসপাতালের শেষ বিছানায়ও নাকি তার মুখে শুধু ছিলো শান্তির ছাপ। দাফনের দিন আমি গিয়েছিলাম। তার জানাজার নামাজ আমিই পড়িয়েছিলাম। তার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “তুমি আমার মেয়ের স্বামী ছিলে, তুমি জানো না সে তোমার জন্যও কত কাঁদতো...”
এলাকাবাসী আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। অনেকে বলেছিল, “তুমি মানুষটা অন্যরকম… এমন ভালোবাসা দেখা যায় না আর।” আমি শুধু চেয়েছিলাম তাকে বিদায় দিতে, যেভাবে একজন ভালোবাসার মানুষকে দেয়। সেই প্রবাসী ছেলের সাথেও আমার দেখা হয় সেদিন। তাকেও আমি জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, “তুমি কেঁদো না ভাই, ও আজ শান্তিতে আছে... আমরা শুধু ভাগ্য হইনি, তুমি ভালোবাসা ছিলে, আমি ছিলাম ভালোবাসার আশ্রয়।”
ভালোবাসা সব সময় পাওয়া হয় না, তবু ভালোবাসি।
আর তার নামটা আজও আমার হৃদয়ের এক কোণে লেখা আছে —
শেষ ভালোবাসার নামটা ছিলো তুমিই।
---
শেষমন্তব্য:
এই গল্পটা শুধু ভালোবাসা, ত্যাগ আর কষ্টের নয়। এটা একজন মানুষের মহত্বের, সহনশীলতার এবং আত্মিক বন্ধনের গল্প। যেটা বলে — সব ভালোবাসা প্রেম হয় না, কিছু ভালোবাসা শ্রদ্ধা হয়ে থেকে যায়… মৃত্যুরও ওপারে।
76
Views
1
Likes
0
Comments
0.0
Rating