অফসোরে চাকরি করতে গিয়ে একটাই সমস্যা হয়েছে, আমি আপনাদের মতো দেশ প্রেমিক হতে পারলাম না। আসলে এখানে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সাথেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায় । তাই আমাদের শত্রু দেশের নাগরিক জাভেদের সাথেও কখন ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো জানি না। দুই দেশের সম্পর্ক গত দুই দশক ধরে খুব একটা ভালো না। আমাকে ও অনেক পাকিস্তানে যেতে বলেছে হিংলাজ মন্দির দেখার জন্য। আমি ওকে পুরুলিয়া দেখাবো বলেছি অনেকবার।
আসলে ওদের একটা বাড়ি ছিলো কলকাতায়। স্বাধীনতা আগে ওরা এখানে থাকতো। ওর নানা মুখে ও ছৌ নাঢে কথা শুনেছিলো। ও ছৌ নাচ দেখতে গাইতো আমার কাছে। সুযোগ হলো বালু রামের বিয়ে উপলক্ষে । সহজে এখন ভিসা পায় না ওদেশের মানুষ রা। বিয়ে উপলক্ষে নিমন্ত্রণ পত্র দিখিয়ে ভিসা পেলে। ছৌ নাচে সাথে সাথে ওকে পুরুলিয়া পাহাড় দেখাবো বলেছিলাম।
ভালো সময় এলো ও কালি পূজার পর পর। এ সময় "বাঁদনা পরব" হয় ওখানে।পুরুলিয়া জেলার গ্ৰামবাংলার এক ঐতিহ্যবাহী পরব গুলির মধ্যে এটা অন্যতম। কালিপূজোর পেরের দিন থেকে শুরু করে চলতে থাকে পূর্ণিমার দিন পর্যন্ত। আজ এই গ্ৰাম তো কাল ঐ গ্রাম । গ্ৰামের পর গ্ৰাম। তারপর আবার সবাই নিজ -নিজ ক্ষেত - খামারের কাজ শুরু করে দেন । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা আমাদের এই পুরুলিয়া। প্রকৃতি যেন আপন রং তুলিতে এঁকেছেন আমাদের এই পুরুলিয়াকে । অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা এক সুন্দর প্রকৃতি নিরিবিলি শান্ত -শাল, পিয়ালের গন্ধে ভরা এক নৈস্বর্গিক পরিবেশ "বন সুন্দরী নামে একটা রিসোর্ট। আমার এক বন্ধু আগবাল ঐ রিসোর্ট মালিক। বালু রামের বেচেলার পার্টি ওখানে করবো ঠিক করলাম আমরা।
কলকাতা থেকে লং ডাইভ করে আমাদের পুরুলিয়া যেতে যেতে রাত হয়ে গেলো অনেকটাই। পুরুলিয়া শহর থেকে অযোধ্যা পাহাড় আরো পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। তবে আমরা তিনছেলে ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলতে শুরু করলাম। কিছুটা যেতে পথে একটি সুন্দরী মহিলা আমাদের কাছে লিফট চাইলো। তাঁর গাড়িটা রাস্তার পাশে পরে ছিলো, ডাইভার ভাই অনুরোধ করলো। অযোধ্যা পাহাড়ের উনি যাবে। ওখানে পৌছালেই ওকে হোটেলের ছেলেরা রিসিভ করে নেবে।
কিছুটা পথ চলতে চলতে মহিলা আমাদের সাথে ভাব বসিয়ে ফেললো। আশ্চর্য ব্যাপার উনিও বন সুন্দরীতেই যাচ্ছে। আগবাল নাকি উনি খুব চেনা। বালূরাম আর জাভেদ ওনা রূপে প্রশংসা ব্যস্ত ছিলো সারা রাস্তা। রিসোর্ট এসে ও ওরা আমার কানের কাছে বক বক করতে লাগলো। ওরা নাকি পটিয়ে ফেলে মহিলা কে ওদের কথার জালে। আমি একটু মজা করতে বললাম। " শিকারী এভি শিকার হো গেয়া। ও লরকি নেহি হে 'পিচাল পিয়ারী' হে।
জাভেদ খুব ভয় পেয়ে গেলো। এই শব্দ যেকোনো পাকিস্তানির মেরুদণ্ডে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। পাহাড়ে, কবরস্থানে, অথবা গাছের নিচে সে দেখা দিতে পারে। পিচল পেরি। তার উল্টো দিকে ইশারা করা পা, রাতে চুড়ির শব্দ দেখেই তাকে চেনা যায়। লোভি পুরুষদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে। জীবনে সে এমন একজন ছিল যে প্রসবের সময়, বিছানায়, কেবল অতৃপ্ত অবস্থায় মারা গিয়েছিল।
করাচিতে, সমুদ্র সৈকতে এদের দেখা যায়। যদিও রাতে শিশুদের উপকূলে হাঁটা থেকে বিরত রাখার একটি উদ্দেশ্যে এদের গল্প ফাঁকা হয়েছিল। এদের মুখ কখনো দেখা যায় না, কিন্তু তার উল্টো দিকে ইশারা করা পা অনেকসময় বাইরে বেরিয়ে আসে। মানে এদের পা উল্টো দিকে ঘোরানো থাকে। এই নামটি উর্দু ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ 'উল্টো পায়ের নারী'। এই চরিত্রটি ভারত, পাকিস্তান এবং হিমালয়ের পাদদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ভৌতিক গল্পে পাওয়া যায়।
এরা একটিতে সে একজন সুন্দরী নারী হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা পুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য ব্যবহার করে। এই রূপের একমাত্র ত্রুটি হলো তার উল্টো দিকের পা, যা দিয়ে তার আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। এরা সাধারণত রাতের বেলায় নির্জন বন বা পার্বত্য এলাকায় একা চলাফেরা করা পুরুষদের লক্ষ্য করে।
বালু আমার কথা ওড়িয়ে দিচ্ছিলো কিন্তু আমি বললাম তোরা দেখেছিস কি মেয়েটা গাম বুট পরে ছিলো। এটা কি বর্ষাকাল যে গাম বুট পড়ে ঘুরতে আসবে। জাভেদ যেনো একটু বেশি ভয় পেয়ে গেছিলো। আমি শেষ মেশ বললাম আমি মজা করছি। কিন্তু তাও ও ভয় জরো সরো হয়ে গেলো। পরে ধীরে ধীরে বললো। গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের দিয়ারাম জেলায় ওর বাবা একসময় থাকতো। ওখানে এক হিন্দু মেয়ের সাথে ওর প্রেম হয়। ও নিকাও করে কিন্তু মেয়েটি যখন ওর সন্তান কে জন্ম দিতে যাচ্ছিল তখন ওর বাবার ষড়যন্ত্রের মেয়েটি মারা যায়। আর ওকে ওর বাবা দুবাই পাঠিয়ে দেয়। দেশে ফিরলে করাচি থেকে ওকে বাইরে কোথাও যেতে দেয়না ওর বাড়ি লোক জন। কারণ ওর আব্বার পথ দূর্ঘটনায় মারা গেছিলো। কিন্তু পোস্ট মর্টাম রিপোর্ট দেখা গেছে। ওর আব্বার যকৃত নেই। পিচেল পেরি শিকারকে হত্যা করে এবং তাদের যকৃত খেয়ে ফেলে।
গল্পটা শুনে বালু রামের মুখের রঙ বদলে গেলো। কারণ ওদের ধারণা তৈরি হলো মহিলা পিছলে পেয়েরী। আর জাভেদ মারা জন্য এখানে এসেছে। মাজা হলো তখন, যখন রাতের শেষে ভোরের বেলায় মহিলা যখন গড মরনিং বলে আমাদের দিকে এগিয়ে আসলো। জাভেদ আর বালু রাম পরি কি মরি করে উল্টো পথে দৌড় দিলো। মহিলাকে ওদের উল্টো দৌড়ে পালানোর কারণ জানতে উনিও হাসলেন। কিন্তু উনি যথেষ্ট মর্ডান পোশাক পরে থাকলেও উনার হাতে সবুজ রঙের চুরি আর পা ঢাকা গাউন দেখে আমার মন একটু ভয় বাসা বাঁধলো । কারণ ওনি উনা পা দেখালো আমাকে। ওনা পায়ের পাতা নেই। উনি বললো দূর্ঘটনায় ওনার পায়ের পাতা দুই টো বাদ গেছে উনি নকল পা ব্যবহার করে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে লক্ষ করলাম ওনার চলা ফেরা করতে অসুবিধা হচ্ছে না।জানেন তো অ্যাবারিমন বা অ্যান্টিপোড, পুরাণের কথা অনুসারে এদের পা উল্টো ছিল এবং তারা হিমালয়ের স্থানীয় ছিল। তবে এরাও কিন্তু দৌড়াতে পারতো। গ্রিক ও রোমান পুরাণ এবং লোককথায় এদের কথা পাওয়া যায়। আবার সিগুয়াপা কথায় আসি ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের পৌরাণিক লোককথা ও কিংবদন্তির কাহিনীতে বা ক্যারিবীয় সংস্কৃতিতে দেখা যায় লম্বা, মসৃণ চুল এবং পিছন দিকে ফেরানো পা-যুক্ত একটি সুন্দর মহিলা কে। এই মহিলা চুল খুব লম্বা। আর পা নেই বলেই আরো সন্দেহ বাড়লো। সহানুভুতি কড়াতে উনি ওনার দুঃখের গল্প বলতে থাকলো।
আমার তখন মনে পড়লো পিচল পেরি নিয়ে আমি যে গল্প টা পড়েছিলাম সেখানে বলা হয়েছিল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের এক নির্জন গ্রামে বাস করত আলী নামে এক সাহসী নির্ভীক যুবক বাস করতো । সেও জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে পিচল পেরি পাল্লায় পরে ছিলো। আর তাকে সহানুভূতির গল্প শুনিয়ে ছিলো পিচল পেরি। তাই কোন ক্রম উনাকে এরিয়ে গিয়ে। আমরা দুপুরে মধ্যেই পুরুলিয়া ত্যাগ করলাম।
পিচল পেরি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
24
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating